চরসিন্দুরে শাহী অপেরা থেকে রিকাবদার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘একটি পয়সা’ নাটক করার। ইতোপূর্বে এ-নাটকটি করেছিলো বাবুল অপেরাসহ আরো কিছু দল। বাবুল অপেরার ‘একটি পয়সা’ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো। চরসিন্দুর ও পাঁচদোনায় একাধিক প্রদর্শনী হয়েছিলো শাহী অপেরার ‘একটি পয়সা’র।
বিচিত্র এক শিল্পীজীবন যাপন করেছেন আব্দুল বাতেন রিকাবদার। সংক্ষেপে এ বি রিকাবদার। ছিলেন একাধারে অভিনেতা, নির্দেশক, গায়ক, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী, গল্পকার, কবি, শিক্ষক ও সংগঠক। বিভিন্ন দলের হয়ে দেশের নানা প্রান্তে দাপটের সাথে যাত্রা ও মঞ্চনাটকে অভিনয় করেছেন, রাজশাহী বেতারে তাঁর গানের রেকর্ড বেজেছে। অথচ তাঁর জীবন পায়নি প্রচারের সামান্যতম আলো। এমনকি সময়ের সাথে হারাতে বসেছে তাঁর কাজও। তাঁর একটি আত্মজৈবনিক রচনা ও একটি গল্প-গান-কবিতার পাণ্ডুলিপি সংগৃহীত ছিলো তাঁর মেয়ের কাছে। এই লেখার মূল তথ্যসূত্রও সেই পাণ্ডুলিপি।

এ বি রিকাবদারের জন্ম ১৯৩৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, নরসিংদীর শিবপুর থানার ব্রজেরকান্দি গ্রামে। পিতা সৈয়দ আলী রিকাবদার এবং মাতা নূরজাহান বেগম। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন উত্তর সাধারচর পশ্চিমপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থানার পাঠানেরকান্দী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। মাধ্যমিক শিক্ষালয় ছিলো হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও চরসিন্দুর উচ্চ বিদ্যালয়।
রিকাবদারের নাটকে প্রথম অভিনয় কিশোর বয়সেই। ১৯৪৮ সাল। এক বিকেলে চরসিন্দুর বাজারে ঘুরতে গিয়ে আনসার ক্যাম্পে ঢুঁ মারেন তিনি। আনসার অফিসে ডি এল রায়ের ‘সীতা’ নাটকের মহড়া চলছিলো। নির্দেশক ছিলেন ডাকসাইটে আনসার কমান্ডার ও যাত্রানাটকের নির্দেশক আজম আলী। কিশোর রিকাবদারের ওপর নজর পড়তে নির্দেশক তাকে মহড়ার জন্যে ডেকে নেন। দাঁড় করিয়ে দেন সীতাপুত্র ‘লব’ চরিত্রে। কিশোর রিকাবদার নিজের সবটা ঢেলে দেন ‘লব’কে ফুটিয়ে তুলতে। সেই হাতেখড়ি অভিনয়ে। ভালোবেসে ফেললেন অভিনয়কে-নাটককে। জীবনের পরবর্তী পুরো সময় নিজেকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছেন নাটকের সাথে।
১৯৫২ সালে প্রথমবার মেট্রিক পরীক্ষায় বসেন এবং অকৃতকার্য হন। নাটকে-অভিনয়ে নিজেকে এতোটাই আচ্ছন্ন করে ফেলেছিলেন যে, পড়াশোনাটা ঠিকঠাক করা হয়ে ওঠেনি। পরে কৃতকার্য হলেও পড়াশোনা করেছিলেন এই মাধ্যমিক পর্যন্তই।
১৯৫৬-৫৭ সালে ‘কে দেবে জবাব’ নাটকে ‘শ্রীধর পণ্ডিত’ চরিত্রে অভিনয়ের খাতিরে প্রথমবার সঙ্গীতের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ তাঁর। শ্রীধর পণ্ডিত চরিত্রটি ছিলো নাটকের ‘বিবেক’ (যাত্রাপালা বা যাত্রা নাটকের প্রথাবদ্ধ চরিত্র বা Stock Character. এই চরিত্র নাটকের কাহিনির সমান্তরালে চলা এক দার্শনিক ও নৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করে। বিবেক মূলত গায়ক, তবে অনেক সময় সংলাপেও অংশ নেয়। সাধারণত দলের সবচেয়ে ভালো গায়ককেই বিবেক চরিত্রে রাখা হয়)। স্বভাবতই তাঁকে গান গাইতে হতো। কিন্তু সঙ্গীতের ব্যাকরণিক শিক্ষা তাঁর ছিলো না। তাই মঞ্চে গাইবার জন্যে নাটকের সঙ্গীত পরিচালক গানের ওস্তাদ শৈলেশ ভৌমিকের কাছে সুর-তাল-লয়ের দীক্ষা নেন। এখান থেকে গায়ক পরিচয়টি যুক্ত হয় তাঁর নামের সাথে। পরবর্তী জীবনে গান লিখেছেন, সুর করেছেন, গেয়েছেন এবং সঙ্গীতশিল্পী হিসেবেও যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন।
১৯৪৮ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি চরসিন্দুরের সেই দলের হয়ে অনেক যাত্রানাটকে অভিনয় করেন। চরসিন্দুর ছাড়াও প্রদর্শনী করেছেন ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায়। ‘কে দেবে জবাব’-এ বিবেক করার পর তিনি সব নাটকে বিবেক হিসেবে টাইপকাস্ট হতে থাকেন। তবে সুঅভিনেতা হিসেবে ততোদিনে তিনি পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন।

তাঁর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ছিলো না। বাবা স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। তার বেতনের সামান্য টাকাতেই সংসার চলতো। তাই রিকাবদারকেও বেরিয়ে পড়তে হয়েছিলো জীবিকার খোঁজে। ১৯৫৮-৫৯ সালে রংপুর সুগার মিলের ইক্ষু বিভাগে কেরানি পদে চাকরি নেন তিনি। কিন্তু সেই চাকরি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। এক বছরের মাথায় চাকরিচ্যুত হয়ে ফিরে আসেন চরসিন্দুরে। শুরু করেন অভিনয়।
কিন্তু জীবিকার তাগিদ পিছু ছাড়েনি। এক বছর পরই আবার ঢুকে যেতে হয় চাকরিতে। মামার সুপারিশে সিরাজগঞ্জের সেটেলমেন্ট অফিসে ঢোকেন এবার। সিরাজগঞ্জে গিয়ে তিনি সন্ধান পান ‘রেনেসাঁ ক্লাব’-এর, যেখানে গান হয়, নাটক হয়। সেখানে যুক্ত হয়ে যান, অভিনয় করেন শরৎচন্দ্রের ছোটোগল্প ‘মহেশ’-এর নাট্যরূপে, কসাই চরিত্রে।
এর পরপরই তাকে বদলি হয়ে যেতে হয় পাবনা জেলার চাটমোহর অফিসে। সেখানেও স্থানীয় নাটকের দলে যুক্ত হন ‘বাহাদুর শাহ’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে। চাটমোহরে ঘটনাক্রমে পরিচিত হন সঙ্গীত শিক্ষক ওয়াছিউদ্দিন আহমেদের সাথে। চাটমোহর গার্লস হাই স্কুলে ছাত্রীদের গান শেখাতেন তিনি। তার বাসায় গিয়ে গানের চর্চা করতেন রিকাবদার।
১৯৬১ সালে ওয়াছিউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রণে স্কুলের গানের অনুষ্ঠানে যান তিনি। ছাত্রীদের নানা পরিবেশনা তাঁকে মুগ্ধ করে। এর মাঝেই একজন তাঁর হৃদয়ে বিশেষ আলোড়ন তোলে। পিছু নিয়ে কথা বলে জানেন, মেয়েটার নাম লুৎপুন্নেছা, পড়ে গার্লস স্কুলে, নবম শ্রেণিতে। বাড়ি চাটমোহরেরই চড়ুইকুল গ্রামে। আত্মীয় ও নাটকদলের সহকর্মীদের মাধ্যমে মেয়েটির বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হন। ১৯৬১ সালের ৬ জুলাই লুৎপুন্নেছার সাথে পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হন রিকাবদার। বিয়ের পর এই চাকরিও ছেড়ে বাড়িতে চলে আসেন। আবার জড়ান নাটকে, চরসিন্দুরের দলের সাথে। অভিনয় করেন বেশকিছু প্রযোজনায়।
কিন্তু সংসার চলে না অর্থের যোগান ছাড়া। বাধ্য হয়ে ১৯৬২ সালে আবার নিতে হয় চাকরি। আবারো মামার সুপারিশে। এবার কর্মস্থল হয় পাবনা শহরের সেটেলমেন্ট অফিস। পাবনায় যাতায়াতের পথে তাঁর চোখে পড়ে ‘পাবনা থিয়েটার’ নামের সাইনবোর্ড। জড়িয়ে যান তাদের সাথে। আবার নাট্যাভিনয়। পাশাপাশি তাঁর পরিচয় হয় গানের ওস্তাদ কানু মাস্টারের সাথে। তাঁর সাথে আবার শুরু হয় সঙ্গীত শিক্ষা ও চর্চা।
এই চাকরিতেও মনে বসে না রিকাবদারের। মাথায় সবসময় ঘুরতে থাকে নাটক। চাটমোহরে তাঁর নাটকের অন্যতম সহশিল্পী ছিলেন রাজ্জাক। তিনি তখন ডাক পেয়েছিলেন একটি পেশাদার যাত্রাদলে। উল্লাপাড়ার নারায়ণ বিশ্বাসের ‘জনতা অপেরা’। তিনি সুপারিশ করেছিলেন রিকাবদারের জন্যেও। আবার চাকরি ছেড়ে রিকাবদার তিন হাজার টাকা চুক্তিতে ঢুকে গেলেন যাত্রাদলে। এই দলের সাথে নাটোর, নওগাঁ, জয়পুরহাট, বগুড়াসহ বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে নাটক করেছেন তিনি।
এই পার্টির ছুটি হলে আবার বাড়ি এসে বসে যান রিকাবদার। সংসারে অনটনের অন্ত নেই। এক বাবার আয়ে চলছে না। এদিকে ১৯৬২ সালের শেষদিকে তিনি প্রথম কন্যা সন্তানের পিতা হয়েছেন। ১৯৬৩ সালের শেষে সংসারে আসে দ্বিতীয় কন্যা। তখন তিনি চরসিন্দুর বাজারে সাইনবোর্ড লেখার কাজ ধরেন। আর আশেপাশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে গিয়ে ভাড়ায় নাটক করে বেড়ান। কখনো করেন পার্শ্বচরিত্র, কখনো বিবেক। এভাবে সংসার চলে না। একপর্যায়ে চল্লিশ টাকায় হাতঘড়ি বন্ধক রেখে স্ত্রী-সন্তানসহ চলে যান শ্বশুরবাড়ি। ১৯৬৪ সাল। গিয়ে কোনো কাজে যোগদানের আগেই স্থানীয় যুবকদের অনুরোধে চড়ুইকুল প্রাইমারি স্কুলের মাঠে নাটক নামানোয় হাত দেন। স্থানীয় মৌলবাদীদের বাধা সত্ত্বেও ‘গাঁয়ের বধূ’ ও ‘পল্লীসমাজ’ নাটকের প্রদর্শনী হয় স্কুলের মাঠে। এ-নাটকদুটো দিয়েই এ বি রিকাবদারের নির্দেশনায় হাতেখড়ি।
এর কিছুদিন পর আবার হাজির হন চাটমোহরের বন্ধু রাজ্জাক। তিনি সেবার দুটো যাত্রাদলের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। যশোরের ‘সারথী অপেরা’ ও চট্টগ্রামের ‘বাবুল অপেরা’। সেই সময়টায় দেশের আনাচে-কানাচে অনেক পেশাদার যাত্রাদল ছিলো। এর মধ্যে কিছু দল ছিলো দেশব্যাপী প্রসিদ্ধ। ‘বাবুল অপেরা’ ছিলো তখনকার অন্যতম বড়ো যাত্রাদল। রিকাবদারের পরামর্শে রাজ্জাক স্থির করেন, বাবুল অপেরায় যাবেন। রিকাবদারকেও নিয়ে যেতে চান সাথে।
দুজনে চট্টগ্রামে গিয়ে উপস্থিত হন ‘বাবুল অপেরা’র শুভক্ষণ অনুষ্ঠানে। তখনকার পেশাদার দলগুলোর নিয়মের মধ্যে একটি ছিলো এই ‘শুভক্ষণ’ অনুষ্ঠান। তখনকার বড়ো দলগুলোর স্থায়ী কিছু কলাকুশলী থাকতেন, যাদের সাথে চুক্তি থাকতো— তাঁরা অন্য কোনো দলে যোগ দিতে বা কাজ করতে পারবেন না। বাকি শিল্পীদের একটি নির্দিষ্ট দিনে ডেকে কথাবার্তা বলে নির্দিষ্ট মৌসুমের জন্যে কন্ট্রাক্ট করানো হতো। একেই বলা হতো ‘শুভক্ষণ’ অনুষ্ঠান। সে-বার ছিলো ১৯৬৫-৬৬ মৌসুম। রাজ্জাকের সাথে সাথে রিকাবদারও চুক্তিবদ্ধ হলেন ‘বাবুল অপেরা’য়।
এই দলে তিনি বেশ কিছুদিন ছিলেন। অভিনয় করেছেন অনেকগুলো যাত্রায়। সে-মৌসুমে ‘বাবুল অপেরা’র দশটি নাটকের মধ্যে সবচেয়ে জননন্দিত প্রযোজনা ছিলো ‘সোহরাব রুস্তম’। এই নাটকে বিভিন্ন সময়ে তিনটি চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। কখনো রুস্তমপুত্র খুররম, কখনো বিবেক, আবার কখনো কমেডিয়ান। এই দলের সাথে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের নানা অঞ্চলে, যার মধ্যে নিজ এলাকা চরসিন্দুরও ছিলো।
১৯৬৬ সাল। স্ত্রী-সন্তানদের ছেড়ে অনেক দূরে— কখনো দেশের এ-প্রান্তে, কখনো ও-প্রান্তে নাটক করে বেড়াচ্ছেন। নিজের মাঝেই আবার তাগিদ অনুভব করলেন সংসারী হবার। ‘বাবুল অপেরা’ প্রদর্শনীর জন্যে রাজশাহী গেলো। রিকাবদার এক ফাঁকে ঢুঁ মারলেন রাজশাহী চিনিকলে, পরিচিত কারো সন্ধান পেতে পারেন ভেবে। পেয়েও গেলেন চরসিন্দুরের নাট্যদলের এক সহকর্মীকে, যিনি চিফ কেমিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার মাধ্যমেই পেয়ে গেলেন চিনিকলের রসায়ন বিভাগে ডি. এম. এফ. মেটের চাকরি। যাত্রার দল থেকে পালিয়ে এসে বরণ করে নিলেন শ্রমিকজীবন।
চিনিকলের চাকরিতে রিকাবদার ছিলেন দীর্ঘদিন। পারিবারিক কারণে ১৯৮৩ সালে ছেড়েছেন এই চাকরি। চিনিকলের চাকরিতে কার্যকাল ছিলো মৌসুমভিত্তিক। অক্টোবর-নভেম্বরে আখের যোগান পাওয়ার পর মৌসুম শুরু হতো, শেষ হয়ে যেতো পরের বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চে। মাঝখানের ছুটিতে রিকাবদার স্ত্রী-সন্তানসহ কখনো থাকতেন চরসিন্দুরে, কখনো থাকতেন পাবনার চড়ুইকুলে। পুরো সময়টা জুড়েই নিবেদিত ছিলেন নাটক আর গানে। যখন যেখানে ছিলেন সেখানেই নাটক করে বেড়িয়েছেন।
চিনিকলে ঢোকার পর একসাথে থাকার সুবাদে শুরুতেই পরিচয় হয় এম এ মান্নানের সাথে। মান্নান বেতারে আধুনিক গান করতেন তখন। তাঁর সাথে গানের চর্চা শুরু করেন রিকাবদার। নিবন্ধিত হন রাজশাহী বেতারে ‘পল্লীগীতি শিল্পী’ হিসেবে। ১৯৬৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি রিকাবদারের কণ্ঠে দুটি গানের রেকর্ড রাজশাহী বেতার থেকে প্রচারিত হলো। এরপর আরো অনেক গান গেয়েছেন তিনি রেডিওতে। তাঁর লেখা অনেক গান অন্য বিখ্যাত গীতিকারদের নামে চালিয়েছেন অনেক শিল্পী।
১৯৬৬ সালের মার্চের শেষভাগেই রাজশাহী বেতার থেকে দ্বিতীয়বার রেকর্ডিংয়ের জন্যে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। তখন ব্রডকাস্টের জন্যে রেকর্ডিংয়ের আগে গানের লিরিক জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হতো। রিকাবদার দুটো গানের লিরিক জমা দিলে প্রযোজক একটি গান কেটে দেন। কারণ গানের একটি জায়গায় কপালে সিঁদুর দেয়ার কথা বলা হয়েছিলো। কথাগুলো ছিলো— ‘পদমূলে আলতা দিবো কপালে সিঁদুর/ হস্তে দিবো হীরার কঙ্কন, কণ্ঠে দিবো সুর’। পরবর্তীতে রিকাবদার ‘কপালে সিঁদুর’ অংশটি বদলে ‘কপালেতে টিপ’ লিখে দিলে গানটি অনুমোদন পায়। বেতারের মতো জায়গায়ও সংস্কৃতিচর্চায় রাষ্ট্র কর্তৃক চাপানো এমন সাম্প্রদায়িক প্রতিবন্ধকতা রিকাবদারকে বেশ ভাবিয়েছিলো।
চিনিকলে তখন নিয়মিত বার্ষিক নাটক হতো। প্রতিবছর তিনি সেসব নাটকে অভিনয় করতেন। পাশাপাশি জুটে গিয়েছিলেন সেখানকার স্থানীয় নাটকের দলের সাথেও। ১৯৬৮ সালে মিলের নাটকে তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের অফিসে আমন্ত্রণ জানান বিনোদপুরের ‘খেয়ালী নাট্য সম্প্রদায়’-এর সদস্যরা। অনুরোধ করেন তাদের প্রযোজনায় অভিনয় করতে। ‘এক পয়সার আটা’ নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে ‘খেয়ালী’র সাথে যাত্রা শুরু হয় রিকাবদারের। যতোদিন রাজশাহী ছিলেন, ‘খেয়ালী’র সাথে কাজ করেছেন নিয়মিত।
‘খেয়ালী’র সাথে তাঁর কাজগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো ‘সিরাজউদ্দৌলা’। ১৯৬৮ সালের শেষদিকে ‘খেয়ালী’ এই প্রযোজনায় হাত দেয়। চরিত্র নির্ধারণ হয় অডিশনের মাধ্যমে। অডিশন দিয়ে কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘সিরাজ’-এর জন্যে নির্বাচিত হন রিকাবদার। এই চরিত্র রূপদানের জন্যে ঢেলে দিয়েছিলেন সামর্থ্যের সবটা। এক মাস মহড়ার পর পদ্মা রঙ্গমঞ্চে মঞ্চায়িত হলে ‘সিরাজ’কে দেখে অভিভূত হন দর্শকরা। রাজশাহীর শিল্পামোদী মানুষের মধ্যে তাঁর অভিনয়ের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। সবার মুখে মুখে তাঁর নাম। ১৯৬৯ সালে মিলের ছুটিতে শ্বশুরবাড়ি পাবনার চড়ুইকুলে গেলে সেখানকার যুবকদের অনুরোধে আবার ‘সিরাজ’ করেন রিকাবদার। এবার নাটকটি হয়েছিলো তাঁরই নির্দেশনায়। চড়ুইকুলের মানুষ ‘সিরাজ’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় দেখে এতোই মুগ্ধ হয় যে, তারা চড়ুইকুলে তাঁকে সপরিবারে থাকার জন্যে বাড়িই করে দিতে চায়। এবং পরে একসময় বাড়ি করেও দিয়েছিলো। সেই বাড়িতে পরবর্তীতে অনেকটা সময় সপরিবারে বসবাস করেছিলেন তিনি।
তিনি উদ্যোগ নিয়েছিলেন নাটক করে আয়কৃত অর্থে চড়ুইকুলে একটি স্কুল করার। ১৯৭২ সালে তিনি চরসিন্দুরের দলটিকে নিয়ে যান চড়ুইকুলে। চরসিন্দুরের দলের নাম দেয়া হয় ‘শাহী অপেরা’। তাদের পরিবেশনায় নাটক করে যে-অর্থ উপার্জন হয়, তা দিয়ে চড়ুইকুলে স্কুল তো হয়ই, তার সাথে এলাকাবাসী রিকাবদারকে একটি বাড়িও করে দেয়। আর সেই স্কুলটি এখনো আছে চড়ুইকুল উচ্চ বিদ্যালয় নামে।
সে-বছরই চরসিন্দুরে শাহী অপেরা থেকে রিকাবদার উদ্যোগ নিয়েছিলেন ‘একটি পয়সা’ নাটক করার। ইতোপূর্বে এ-নাটকটি করেছিলো বাবুল অপেরাসহ আরো কিছু দল। বাবুল অপেরার ‘একটি পয়সা’ ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলো। চরসিন্দুর ও পাঁচদোনায় একাধিক প্রদর্শনী হয়েছিলো শাহী অপেরার ‘একটি পয়সা’র। চিনিকলের মৌসুম শুরু হলে রাজশাহী ফিরেও নানা জায়গায় বিভিন্ন দলের হয়ে ভাড়ায় ‘একটি পয়সা’র পাগল কবি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি।
১৯৭৪ সালে রাজশাহী শহর থেকে ডাক আসে তাঁর। রাজশাহী শহরে দুটো নাটকের প্রস্তুতি চলছিলো। ‘চোরাগলিমন’ ও ‘পাহাড়ীকুল’। অলকা সিনেমা হলে মঞ্চস্থ হওয়া দুটি নাটকেই অভিনয় করেছিলেন তিনি। এখানে সহশিল্পী হিসেবে পেয়েছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা আনোয়ার হোসেনকে। চলচ্চিত্র অভিনেতা আনোয়ার হোসেনের মঞ্চাভিনয় মুগ্ধ করতে পারেনি রিকাবদারকে।
১৯৭৭ সালে মিল ছুটি হলে তিনি চলে আসেন চরসিন্দুরে। চরসিন্দুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বেলায়েত হোসেনের অনুরোধে যোগ দেন স্কুলের খণ্ডকালীন সঙ্গীত শিক্ষক হিসেবে। মেয়েদের নিয়ে ‘কাগজের ফুল’ নাটকও করেন।
১৯৮৩ সালে মৌসুম শেষ হলে পারিবারিক জটিলতার কারণে রাজশাহী চিনিকলের চাকরি ছেড়ে পরিবারের কাছে চলে আসতে বাধ্য হন রিকাবদার। একইসাথে অবসান ঘটে ‘খেয়ালী নাট্য সম্প্রদায়’-এর সাথে তাঁর দীর্ঘ ১৫ বছরের পথচলার। এই পনেরো বছরে ‘খেয়ালী’র অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করেছিলেন রিকাবদার। সহকর্মীরা ব্যথিত হৃদয়ে বিদায় দিয়েছিলেন তাঁকে।
বাড়ি ফিরে চরসিন্দুর গার্লস স্কুলে আবার শিক্ষকতা শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি চরসিন্দুরে আবার শুরু করেন নাটক। ১৯৮৪ সালে ইউনিয়নভিত্তিক নাট্য প্রতিযোগিতা শুরু হলে তারা ‘একটি পয়সা’ নাটক নিয়ে যোগ দেন চরসিন্দুর ইউনিয়নের দল হিসেবে। অর্জন করেন প্রথম স্থানও।
তখন নাটকের বাজার আগের মতো নেই। দিকে দিকে অনেক কমে এসেছে নাটক। কোথাও আর আগের মতো ব্যাপক চর্চা দেখা যায় না, প্রদর্শনীও হয় কম। নানা কারণে যাত্রা নিষিদ্ধের পর্যায়েই চলে যায়। রিকাবদারেরও নাটক করার সুযোগ কমে আসে। এর মধ্যে নানা জটিলতায় পড়ে পরিবারসহ পলাশে বসবাস শুরু করেন তিনি। খানেপুর বাজারে আর্টের একটা দোকান খুলে বসেন। ব্যানার-সাইনবোর্ড লেখার কাজ করতেন। ১৯৮৭ সালে পলাশে ‘স্বরলিপি থিয়েটার’ প্রতিষ্ঠা হলে তিনি এতে যুক্ত হন। অভিনয় করেন ও নির্দেশনা দেন বেশকিছু নাটকে। ১৯৯১ সালে হরণখোলা থেকে ডাক এলে ‘গরীবের মেয়ে’-তে বিবেক চরিত্র করেন। ১৯৯৩ সালে জন্মস্থান ব্রজেরকান্দিতে ‘বাগদত্তা’ নাটকে অভিনয় করেন। ১৯৯৪ সালে ‘কয়েদী’ নাটকে কয়েদী চরিত্রে অভিনয় করেন। একই বছর শেরপুর জেলায় মেয়ের শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে গিয়েও একটি নাটকে অভিনয় করেন তিনি। ১৯৯৫ ও ১৯৯৬ সালে ‘স্বরলিপি’র হয়ে নরসিংদী শিল্পকলা একাডেমিতে নাট্য প্রতিযোগিতায় প্রদর্শনী করেন। ১৯৯৫ সালে তিনি প্রতিযোগিতায় ‘সেরা অভিনেতা’ হিসেবে পুরস্কৃত হন।
পলাশে গণসংস্কৃতি কেন্দ্র গঠিত হলে ১৯৯৬ সালে তিনি এই সংগঠনে যোগ দেন। এই সংগঠনের হয়েও কিছু নাটকে অভিনয় করেন তিনি। এছাড়া কেন্দ্রের হয়ে বিভিন্ন দিবসের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন পরিবেশনা নিয়ে। শেষ কাজ করেন ২০১০ সালে সোমেন চন্দ পাঠাগারে হওয়া মান্নান হীরা রচিত ‘পন্তা আকালী’ পথনাটকে।
এই নাটক-গানের চর্চা তাঁকে অর্থকড়ি, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তো দেয়ইনি, এমনকি সামান্য স্বীকৃতিটুকুও এনে দেয়নি। অভিনয়ে তাঁর অসামান্য দক্ষতার গল্প ছিলো দর্শকদের মুখে মুখে। অথচ নিজে জীবন কাটিয়েছেন খেয়ে-না খেয়ে। পারিবারের মুখেও পর্যাপ্ত খাবার তুলে দিতে পারেননি সবসময়। নিজের সব খুইয়ে দিয়ে গেছেন শিল্পকে। কারো কাছে হাত পাতেননি, অস্বীকৃতি জনিয়েছেন সরকারি সাহায্যেও।
নাটক ও গানের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার দিকেও ঝুঁকেছিলেন এ বি রিকাবদার। রচনা করেছেন বেশকিছু গল্প, কবিতা ও গান। তাঁর ২০ টির মতো গল্প ছাপা হয়েছিলো গণসংস্কৃতি কেন্দ্রের পত্রিকা ‘চোখ’ এবং ‘নরসিংদীর কথা’ কাগজে।
তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য ছিলো মানবিক সম্পর্ক, জীবন, প্রেম ও সংগ্রাম। তাঁর ‘মা’ গল্পে দেখা যায়, বাজারে যখন আমের আকাল, তখন শিহাবের মা নিজে না খেয়ে একটি আম ছেলের হাতে তুলে দেন। তার মাকে আমটি দিয়েছিলেন তার নানি। আবার শিহাবও সেই আমটি নিজে না খেয়ে তুলে দেয় সন্তানদের হাতে। ‘বৃত্তের আগুন’ গল্পে আমরা দেখি ছয়-সাত বছরের শিশু শওকতকে, যে রূঢ় বাস্তবতায় নিজ শৈশব ও ভবিষ্যতের সমস্ত সম্ভাবনা বিসর্জন দিয়ে চায়ের দোকানে কাজ নেয়। সমাজের অবস্থাপন্ন ব্যক্তিরা তাকে নিয়ে আফসোস করলেও কেউ দায়িত্ব নিতে রাজি নয়। তাঁর কবিতা ও গানে ফুটে ওঠে প্রেমের আকুতি ও বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা। তবে তাঁর এই লেখাগুলো অগ্রন্থিতই রয়ে গেছে।
আপাদমস্তক শিল্পীমানুষ ছিলেন এ বি রিকাবদার। কখনো সংসারী হয়ে উঠতে পারেননি। জীবনের বড়ো অংশ কাটিয়েছেন পরিবার থেকে দূরে। ১৯৭২ সালে পিতৃবিয়োগ হলে সংসারের ভার আরো তীব্র হয়ে কাঁধে চাপে। কিন্তু সংসারের বোঝা তিনি কখনোই পুরোপুরি কাঁধে নিতে পারেননি।
চার কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক রিকাবদার। ছেলেমেয়েরা ভালোভাবে তাঁর সান্নিধ্য পায়নি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেকে চাকরি জুটিয়ে দিয়েছেন রাজশাহী চিনিকলে। সংসার রেখেও নিজ সত্তায় বয়ে বেড়িয়েছেন অদ্ভুত বৈরাগ্য। কিন্তু নাটক থেকে, গান থেকে কখনোই দূরে যেতে পারেননি। এই অভাবের সংসার টেনেও রিকাবদারের নাটক করা নিয়ে কোনো অভিযোগ ছিলো না, বরং অকুণ্ঠ সমর্থন ছিলো যে-স্ত্রীর, তিনিও শেষ জীবনে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে স্ত্রীও পরলোকে পাড়ি জমান।
অথচ এই নাটক-গানের চর্চা তাঁকে অর্থকড়ি, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য তো দেয়ইনি, এমনকি সামান্য স্বীকৃতিটুকুও এনে দেয়নি। অভিনয়ে তাঁর অসামান্য দক্ষতার গল্প ছিলো দর্শকদের মুখে মুখে। অথচ নিজে জীবন কাটিয়েছেন খেয়ে-না খেয়ে। পারিবারের মুখেও পর্যাপ্ত খাবার তুলে দিতে পারেননি সবসময়। নিজের সব খুইয়ে দিয়ে গেছেন শিল্পকে। কারো কাছে হাত পাতেননি, অস্বীকৃতি জনিয়েছেন সরকারি সাহায্যেও।
২০২০ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পলাশে মেয়ের বাড়িতে দেহাবসান হয় তাঁর। শেষ জীবন তিনি এই মেয়ের কাছেই কাটিয়েছেন। এখনো সস্ত্রীক শায়িত আছেন মেয়ের বাড়ির পাশেই।
আব্দুল বাতেন রিকাবদারকে জানা আমাদের জন্যে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করা আবশ্যক। রিকাবদারের জীবন, তাঁর চর্চা আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। আমাদের সার্বিক সংস্কৃতিচর্চা এখন যে-ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে, রিকাবদারের মতো মানুষেরা প্রচারের আলোয় না এলে সেই ক্রান্তিকাল থেকে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। যে-জাতিগত সাংস্কৃতিক পরিচয় আমরা হারাতে বসেছি, রিকাবদারদের পাঠ ও চর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করা না গেলে সেই পরিচয় অন্ধকূপেই পতিত হবে।

