একটি কৌশলী মহল প্রস্তাব দেয়, কলেজটির নাম যদি ‘হরেন্দ্র চন্দ্র মহিলা কলেজ’ রাখা হয়, তাহলে তো আপত্তি থাকবে না। …প্রশাসনের প্রস্তাব হরেন্দ্র সাহার পরিবার মেনে নেয়। তাঁরা কলেজের জন্যে ৪৩ শতাংশ বাড়ি ছেড়ে দেন, আজকের বাজারে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার পর দেখা যায়, ফটকে আর হরেন্দ্র চন্দ্রের নাম নেই। সেই আগের নাম ‘নরসিংদী মহিলা কলেজ’ নামেই সাইনবোর্ড ওঠে। এমনকি হরেন্দ্র সাহার সম্পত্তির উপর কলেজ প্রতিষ্ঠার কোনো স্বীকৃতি-ফলকও স্থাপন করা হয়নি।
প্রতিষ্ঠার ১২৬ বছর পার করেছে সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন (১৯০১-২০২৬)। মহেশ্বরদী পরগণার সবচেয়ে প্রাচীন এই ইংরেজি স্কুলটি শিক্ষিত সমাজ গঠনে বড়ো ভূমিকা পালন করেছিলো। এর গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস গর্বের সঙ্গে স্মরণ করে থাকে নরসিংদীবাসী। যাঁদের নেতৃত্বে ভারতবর্ষব্যাপী মেধার আলো জ্বলে ওঠেছিলো, তাঁদের মধ্যে হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা (১৮৯৬-১৯৬৯) চিরস্মরণীয় এক নাম। স্থানীয় শিক্ষা ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত নায়ক। শিক্ষাদান পদ্ধতি আর প্রশাসনিক দক্ষতায় তাঁর সমকক্ষ প্রধান শিক্ষক বাংলায় বিরল ছিলো। ছাত্রজীবনে তিনি যেমন অতি মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন, তেমনি শিক্ষকতায়ও ছিলেন পুরোপুরি সফল। তিনি নিজ যোগ্যতায় কালী কুমার ইনস্টিটিউশনকে অবিভক্ত বাংলার একটি শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। সাদা ধবধবে ধুতি, পাঞ্জাবি আর পাম-সু পরা মানুষটির শিক্ষকতা জীবন ছিলো সৎ, নির্মল ও পরিশ্রমে ভরপুর। আপোষ করেননি কোনো অন্যায়ের কাছে। শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন ঋষিতুল্য। সহকর্মী শিক্ষকরা তাঁকে মনে করতেন দিকনির্দেশক অভিভাবক। তাঁর আদর্শ ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা শিরোধার্য হিসেবে গ্রহণ করতেন। দায়িত্বের ক্ষেত্রে যেমন কঠোর ছিলেন, তেমনি তাঁর মনে বাস করতো কোমলতা।
হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা এমন একজন শিক্ষক, যাঁকে ছাড়া নরসিংদীর শিক্ষা-দীক্ষার ইতিহাস সম্পূর্ণ হবে না। সেই সফল শিক্ষাবিদ সম্পর্কে বর্তমান প্রজন্ম কতোটুকুই আর জানে? অনেক প্রবীণ ও বর্ষীয়ান ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এমনকি তাঁর সম্পর্কে কোনো প্রবন্ধ, নিবন্ধ, ফিচার কোনো পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন বা স্মরণিকায় ছাপা হয়নি।
২০০১ খ্রিস্টাব্দে কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের প্রকাশিত স্মরণিকায়ও তাঁর সম্পর্কে কোনো কিছু প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি এই কিংবদন্তিতুল্য প্রবীণ শিক্ষকের ছবি পর্যন্ত ছাপা হয়নি। তবে হরেন্দ্র সাহা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে বারবার ব্যর্থ হয়ে যখন হতাশায় ছিলাম, ঠিক তখনই আলোর পিদিম হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ও গবেষক ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিক। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে শিক্ষকতা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত আমেরিকার অস্টিন পি স্টেট ইউভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে দেবদূতের মতো আমার সামনে এলেন। তিনি জানালেন, তাঁর শ্রদ্ধেয় বাবা মরহুম মৌলভী বদরুজ্জামান ছিলেন হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ক্লাশফ্রেন্ড। তাঁরা একসঙ্গে কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুলে পড়তেন। একসঙ্গে পড়লেও সবাই বন্ধু হয় না। কিন্তু আকস্মিকভাবে ‘ভাওয়াইল্লা’ বদরুজ্জামান এবং ‘পূূব্বা’ হরেন্দ্র’র বন্ধুত্ব আমৃত্যু বজায় ছিলো। এখানে একজন ভাওয়ালের, অন্যজন শীতলক্ষ্যা নদীর পূর্বপাড় নরসিংদীর।
হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। নরসিংদীর সাটিরপাড়া নিবাসী এক ধনাঢ্য সাহা বণিক বংশে তিনি ১৮৯৫ কিংবা ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে ১৭ বছর ২ মাস বয়সে প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করে সর্বত্র হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। তখন অতি মেধাবী ছাড়া কেউ প্রথম বিভাগে মেট্রিক পাশ করতে পারতেন না। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দিতে হতো। ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন তিনি। বিএ পাশ করেন ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে, প্রথম বিভাগে, যা ছিলো আরেকটি বিস্ময়কর ঘটনা। তখন এমন ভালো ফলাফল করা ছাত্র ছিলো বিরল। তিনি বিএ পাশ করে সোজা নরসিংদী চলে আসেন। সাটিরপাড়া স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।


অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিক জানান, তাঁদের বাড়ি কালীগঞ্জের ভাদার্ত্তী গ্রামে। সেই গ্রামে ১৩০০ বঙ্গাব্দের ১২ মাঘ মৌলভী বদরুজ্জামান জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন আদর্শ ও সৎ শিক্ষক হিসেবে নারায়ণগঞ্জ হাই স্কুল, ধামরাই হার্ডিঞ্জ হাই স্কুল, নাগরী সেন্ট নিকোলাস মিডল স্কুল, কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুল, জামালপুর বিদ্যাপীঠ, সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন ও কালীগঞ্জ গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সব তৃপ্তি পেয়েছিলেন কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করে। কারণ সেই স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন তাঁরই বন্ধু হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা।
মৌলভী বদরুজ্জামান কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুলে দীর্ঘ ৩৫ বছর চাকরি করে ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে অবসরগ্রহণ করেন। তিনি যখন অবসরে যান, তখন তাঁর বেতন ছিলো ২০০ টাকার নিচে। বাড়িতে বসেই তিনি অবসর যাপন করছিলেন। সারা জীবন যিনি শিক্ষকতাকে আরাধনা হিসেবে উপভোগ করেছেন, তাঁর পক্ষে বাইরে গিয়ে বসে বসে খাওয়া অসম্ভব ছিলো। তাঁকে অস্থিরতা ঘিরে ধরেছিলো। জীবনে কী দিলেন, কী পেলেন, এমন প্রশ্নও এসে যায় মাথায়। ঠিক সেই সময়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের হেড মাস্টার হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা মৌলভী বদরুজ্জামানের খোঁজ করেন। কী অবস্থায় আছেন, কী করছেন, এমন প্রশ্নের উদয় হয় তাঁর মনে। তখন জানতে পারেন, বরেণ্য শিক্ষক বদরুজ্জামান বাড়িতে বসে অবসর জীবনযাপন করছেন। এতে তিনি কিছুটা অবাক হন। তাঁর মতো এমন গুণী শিক্ষককে কি ছাত্রদের থেকে দূরে রাখা ঠিক হচ্ছে! সঙ্গে সঙ্গে তিনি বন্ধুকে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে, ৩৭০ টাকা মাসিক বেতনে, কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে চাকরি করার প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি তৃতীয় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং সাত বছর চাকরি করে ৭১ বছর বয়সে অবসরে যান। তিনি ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে যোগদান করেছিলেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে নিজ বাড়িতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিকের তথ্যমতে, তাঁর বাবা কোনোদিন টাকার হিসাব-নিকাশ করে মানুষ গড়ার কারিগরি করেননি। কখনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান হয়ে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেননি। সহজ-সরল জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি যখন কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে চাকরির প্রস্তাব পান, তখন স্কুলে গিয়ে দেখেন, সেখানে একই পদে চাকরি করছেন রবীন্দ্র মল্লিক ওরফে ফণী মল্লিক নামে একজন স্বাধীনতাপ্রেমী বিপ্লবী, যিনি দেশের জন্যে ১০-১২ বছর জেল খেটেছেন। তাই মৌলভী বদরুজ্জামান কোনোভাবেই তাঁকে সরিয়ে এসিস্ট্যান্ট হেড মাস্টার হতে রাজি হননি। তাই বন্ধু ও সহপাঠী হরেন্দ্র চন্দ্র সাহাকে বললেন, “হেড মাস্টার হয়েছিস, আমি তোর অধীনে যেকোনো পদে চাকরি করতে প্রস্তুত।”
বন্ধু হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতার শেষ ছিলো না। অবসর জীবনে তাঁর প্রশংসা করে কাটিয়েছেন। তাঁর সমতুল্য শিক্ষক বাংলায় আর দ্বিতীয়টি ছিলো না বলে গর্ব বোধ করতেন। কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের মতো একটি উঁচু মানের ইংরেজি স্কুলে শিক্ষকতা এবং বড়ো অঙ্কের (৩৭০ টাকা) বেতনে তিনি খুবই খুশি হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, “হরেন্দ্র আমার জন্য যা করেছে, সে ঋণ পরিশোধযোগ্য নয়।”
হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা সম্ভবত ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। বন্ধুর মৃত্যুতে বদরুজ্জামান মানসিকভাবে বেশ আঘাত পেয়েছিলেন। সুযোগ পেলেই তিনি স্ত্রী-সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনদের কাছে হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার স্মৃতিচারণ করতেন। বিশেষ করে, কালী কুমার হাই স্কুলে পড়ানোর সময়কার স্মৃতিগুলো বারবার আওড়াতেন।
হরেন্দ্র কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুলের হিন্দু বোর্ডিংয়ে থেকে লেখাপড়া করতেন। স্কুলের সর্বোচ্চ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সেখানকার মাসিক পত্রিকা ‘ছাত্র-সুহৃদ’-এ নিয়মিত লিখতেন। বাবা মৌলভী বদরুজ্জামানের মুখ থেকে কালী কুমার ইনস্টিটিউশন ও প্রধান শিক্ষক হরেন্দ্র সাহার অসংখ্য গল্প শোনেন আমেরিকা প্রবাসী শিক্ষাবিদ ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিক। ছোটোবেলায় বাবার কর্মস্থল নরসিংদীতে এসেছেন। তাই সেই স্মৃতি এবং মেঘনার পাবদা, রুই, চিংড়ি মাছ, ঘন দুধ আর সাগরকলার স্বাদ তিনি এখনো অনুভব করেন। জমিদার ললিতমোহন রায় ও মহান শিক্ষক হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা সম্পর্কে সময় পেলেই স্মৃতিচারণ করেন সুদূর আমেরিকায় বসে।

এমন মহৎ একজন ব্যক্তিত্ব হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার গুণকীর্তন করলেও আমরা নরসিংদীবাসী তাঁদের ভুলতে বসেছি। বিশেষ করে, হরেন্দ্র সাহার মতো শিক্ষাজাদুকরকে ভুলে গেছি। তাঁকে ভুলে গেলেও হয়তো মনকে সান্ত্বনা দেয়ার মতো কিছু খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তাঁকে চরম অবমাননা করার অধিকার কারো নেই। তাঁর বসতবাড়ি দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি নরসিংদীর একটি সাম্প্রদায়িক ও দখলদার চক্র, তাঁর নামে একটি কলেজ করার অঙ্গীকার করেও সেটা রক্ষা করেনি চক্রটি। এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে নরসিংদী মহিলা কলেজের ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার সময়। কলেজটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দ। তা একসময় নরসিংদী গার্লস স্কুল ক্যাম্পাস হিসেবেও পরিচালিত হতো। ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় এর নিজস্ব ক্যাম্পাস খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। সাটিরপাড়ায় ছিলো হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ১ একর ২৩ শতাংশের বিশাল বাড়ি। সেই বাড়িতে একটি চুন-সুরকির একতলা ভবন। এর চারপাশে ৪-৫ টি টিনের ঘর ছিলো। মূল পাকা ভবনের সামনের দিকে লেখা ছিলো ‘মহিম নিবাস’। হরেন্দ্র মাস্টারের বাবা মহিম চন্দ্র সাহা বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। নরসিংদী বাজারে যতো ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন, তাঁদের মধ্যে মহিম সাহা অন্যতম। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে জমিদার ললিতমোহন রায় যখন কালী কুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তিনি মোটা অঙ্কের অর্থ দান করেছিলেন স্কুলটির উন্নয়নে। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে এই বাড়িতেই স্কুল শুরু হলে হরেন্দ্র সাহার সন্তানেরা বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নেন। যুদ্ধের পর তাঁর চার ছেলের মধ্যে দুই ছেলে ভারতে চলে যান। এই সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল মহান শিক্ষাবিদ হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার বাড়িতে নরসিংদী মহিলা কলেজ স্থানান্তরের পরিকল্পনা করে। তখন স্থানীয় সচেতন মহল ও হরেন্দ্র সাহার পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতিবাদও করা হয়।
যাঁর হাত ধরে নরসিংদীর জ্ঞানের বাতি জ্বলে ওঠেছে, সেই মহান শিক্ষকের বাড়ি দখল করে মহিলা কলেজ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অনেকেই মেনে নিতে পারেননি। তখন একটি কৌশলী মহল প্রস্তাব দেয়, কলেজটির নাম যদি ‘হরেন্দ্র চন্দ্র মহিলা কলেজ’ রাখা হয়, তাহলে তো আপত্তি থাকবে না। এতে কাজ হয়। হরেন্দ্র সাহার বিশাল সম্পত্তির একাংশে যদি কলেজটি তাঁর নামে প্রতিষ্ঠা পায়, তাহলে কিংবদন্তিতুল্য এই শিক্ষকের কিছুটা হলেও মূল্যায়ন হবে। তাই প্রশাসনের প্রস্তাব হরেন্দ্র সাহার পরিবার মেনে নেয়। তাঁরা কলেজের জন্যে ৪৩ শতাংশ বাড়ি ছেড়ে দেন, আজকের বাজারে যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১৫ কোটি টাকা। কিন্তু কলেজ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার পর দেখা যায়, ফটকে আর হরেন্দ্র চন্দ্রের নাম নেই। সেই আগের নাম ‘নরসিংদী মহিলা কলেজ’ নামেই সাইনবোর্ড ওঠে। এমনকি হরেন্দ্র সাহার সম্পত্তির উপর কলেজ প্রতিষ্ঠার কোনো স্বীকৃতি-ফলকও স্থাপন করা হয়নি।
প্রথমদিকে হরেন্দ্র সাহার জন্মস্থান ও মৃত্যুস্থান হিসেবে চিহ্নিত পুরোনো পাকা ভবনটিকে কেরানী দপ্তর হিসেবে পরিচালনা করা হতো। পরবর্তীতে সেই স্মৃতিচিহ্নটিও সংস্কার না করে ভেঙে ফেলা হয়। এভাবে বিভিন্ন ঘটনা ঘটানোর পর হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার পুত্র শান্তি রঞ্জন সাহা ও সত্যব্রত সাহা কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে অঙ্গীকার ভঙ্গের প্রতিবাদ করেন। স্থানীয় কয়েকজন সচেতন নাগরিক কয়েকদিন হৈচৈ করার পর আবার থেমে যায়। তাদের কেউই আইনের পথে হাঁটেননি।
হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার সন্তানেরা অমায়িক ও শিক্ষকতা পেশার নিরেট ভদ্রলোক। এখনো মনে মনে সেই কষ্ট পুষে রেখেছেন। হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার নাতি এবং সাবেক ব্যাংকার মণীশ সাহা বলেন, “আমার দাদু তো ছিলো নরসিংদীবাসীর প্রিয় হরেন্দ্র স্যার। তাঁর হাতে কতো যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, শিক্ষাবিদ, বৈজ্ঞানিক জন্ম হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। পরমপুজ্য এই শিক্ষকের নামে কলেজের নামকরণ করা হলে বরং কলেজের মর্যাদা বৃদ্ধি পেতো। স্থানীয় শিক্ষাকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে তিনি তো তাঁর জীবন বিসর্জন দিয়ে গেছেন। তিনি নরসিংদীবাসীর শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্যে জন্মভূমির মাটি আঁকড়ে থেকেছিলেন। আর সে-মাটিতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।”
স্থানীয় রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান খোকন বলেন, “হরেন্দ্র সাহার নাম নরসিংদীবাসীর স্বর্ণাক্ষরে বাঁধাই করে রাখা উচিত। উল্টো তাঁর স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার অপচেষ্টা করা হয়েছে। যা শুধু দুঃখজনকই নয়, নিন্দনীয় ঘটনাও বটে। মহিলা কলেজ কর্তৃপক্ষ যদি হরেন্দ্র সাহার নামে নামকরণের কথা দিয়ে থাকেন, তাহলে এখনো তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সদিচ্ছা থাকলে ‘হরেন্দ্র সাহা মহিলা কলেজ’ নামের সাইনবোর্ড সেখানে উঠতে পারে।”


হরেন্দ্র সাহার পুরো পরিবার ছিলেন মহান শিক্ষকতা পেশার। তাঁর আট ছেলেমেয়ের মধ্যে ছেলেরা সবাই শিক্ষকতাকে বৃত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরা হলেন শান্তি রঞ্জন সাহা, সুধীর রঞ্জন সাহা, সুব্রত সাহা ও সত্যব্রত সাহা। এর মধ্যে শান্তি রঞ্জন সাহা বাবার প্রতিষ্ঠান কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের শিক্ষক ছিলেন। সুধীর রঞ্জন সাহা আগরতলা টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, সুব্রত সাহা ত্রিপুরার আগরতলার রামঠাকুর কলেজের প্রফেসর ও সত্যব্রত সাহা পাঁচদোনা স্যার কে জি গুপ্ত উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন। হরেন্দ্র সাহার চার মেয়ে— জ্যোৎস্না রাণী চৌধুরী, শোভা সাহা, আভারাণী সাহা ও অরুন্ধতী সাহা। শান্তি রঞ্জন সাহার ছেলে মুকুল বরণ সাহাও কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে শিক্ষকতা করেছেন। শেষ জীবনে তিনি কলকাতা বিলগরিয়ার হরিসভা মন্দিরের পাশে বাড়ি করে বসবাস করতে শুরু করেন। কয়েক বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর ভাই মনোজ সাহা সমবায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ছিলেন। আরেক ভাই মণীশ সাহা সোনালী ব্যাংকের ডিজিএম পদ থেকে ২০২১ খ্রিস্টাব্দে অবসরে গেছেন। মণীশ সাহাও হরেন্দ্র সাহার মতো দেশপ্রেমিক। কালী কুমার ইনস্টিটিউশন ও নটরডেম কলেজে পড়ে জগন্নাথ কলেজ থেকে ভূগোলে মাস্টার্স করে ব্যাংকার হয়েছেন। পৈতৃক বাড়িতে দোতলা ভবন নির্মাণ করে অবসর জীবনযাপন করছেন বর্তমানে। তিনি এই মাটিতেই মিশে যেতে চান। তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মুকুল সাহার এক ছেলে ব্যবসায়ী ও আরেক ছেলে চাকরিজীবী। এক মেয়ে বিয়ের পর সংসারী হয়েছেন।
সব শিক্ষকের মধ্যে সব গুণ থাকে না। কেউ পড়াশোনা শেখানোর কৌশল খুব ভালো জানেন। আবার কোনো শিক্ষক প্রশাসনিক দক্ষতার দিক দিয়ে এগিয়ে থাকেন। কিন্তু হরেন্দ্র সাহা ছিলেন তুখোড় শিক্ষক। যেমন ছাত্র সুহৃদ, তেমনি দক্ষ কর্মকর্তা। এমন একজন আদর্শ শিক্ষকের পদধ্বনিতে নরসিংদীর মাটি ধন্য হয়েছে। তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের স্মৃতিচারণে সেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে, “আমার স্কুল জীবনের প্রথম পর্যায়ে হরেন্দ্র সাহা ছিলেন প্রধান শিক্ষক। অতুলনীয় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ এবং আদর্শ শিক্ষক। তৎকালীন প্রতিটি ছাত্রের জীবনের শেষদিন পর্যন্ত হরেন্দ্র সাহার প্রভাব থাকতে বাধ্য।”
প্রখ্যাত আইনজীবী মোখলেসুর রহমান চৌধুরী ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণে জানা যায়, দেশভাগের পর নরসিংদীর সিংহভাগ অভিজাত হিন্দু সপরিবারে দেশ ত্যাগ করে। এর ফলে স্কুলটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। সে-সময় প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়ে হরেন্দ্র সাহা এর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখেন। মেধাবী শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে স্কুলটিকে পূর্বের মতো স্বনামধন্য হিসেবে গড়ে তোলেন।
তাঁর প্রাক্তন ছাত্রদের অনেকেই বলেছেন, এমন যোগ্য শিক্ষক পেতে যুগ যুগ অপেক্ষা করতে হয়। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। হরেন্দ্র বাবুর প্রাক্তন ছাত্র নীল রতন চক্রবর্তী একটি চমৎকার স্মৃতিচারণ করেছেন ‘আমার দেখা সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশন’ প্রবন্ধে। যোগেশ্বর সেনের পর হরেন্দ্র সাহা যখন প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন স্কুলের অবস্থা ছিলো খুবই করুণ। ছাত্র সংখ্যা দারুণভাবে হ্রাস পাওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। কিন্তু তাঁর সুযোগ্য পরিচালনাগুণে সেই ধকল কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে স্কুলটিকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনেন। কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের যে-সাফল্যগাথা, তার সর্বশেষ স্থপতি ছিলেন হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা।
তিনি ছিলেন আদর্শ শিক্ষক ও দক্ষ প্রশাসক। শ্রেণিকক্ষে তাঁর পাঠশৈলী ও জ্ঞানের কথা যে-শিক্ষার্থীরা আহরণ করতে পেরেছে, তাদেরকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ন্যায়ের ক্ষেত্রে ছিলেন ফুলের মতো শুভাসিত আর অন্যায়ের ক্ষেত্রে বজ্রের মতো কঠোর। তিনি ছাত্রদের কখনো দেখানোর মতো করে স্নেহ করতেন না। বাইরের দিক দিয়ে কঠোর মনে হলেও তিনি ভেতর থেকে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল। কঠোর গাম্ভীর্য তাঁকে মহীয়ান করে তুলেছিলো। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে নীল রতন চক্রবর্তী বলেন, “ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার আগে টেস্ট পরীক্ষায় আমি অনেক দিন স্কুলে যাইনি, কিন্তু একদিন পাড়ার রাস্তার বাঁক ঘুরতেই সোজা হরেন স্যারের সামনে পড়ে যাই। স্যারও আমাকে দেখে ফেলেছেন। যেন হিংস্র বাঘের সামনে নিরীহ হরিণশাবক। যেখানে ছিলাম সেখানেই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলাম। কাছে আসতেই নমস্কার জানালাম। তিনিও আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন। বুক দুুরু দুরু করছে। পরক্ষণেই গুরুগম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, স্কুলে যাও না কেন? আমতা আমতা করে বললাম, স্যার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছি। তিনি বললেন, হুম! ঠিকমত পড়াশোনা করবে। কোন বিষয়ে অসুবিধা হলে সোজা আমার বাসায় চলে আসবে। আর বললেন, অংক কে দেখায়? বললাম, ক্ষিরোদ বাউল স্যারের কাছে অংক শিখি। তিনি সম্মতি জানিয়ে বললেন, ঠিক আছে। প্রয়াত হরেন্দ্র সাহা স্যারের মত এমন শিক্ষক আর আসেনি। ভবিষ্যতে আসবে বলে মনে হয় না। শিক্ষকের আসনে এমন পিতৃতুল্য মানুষের স্মৃতি কোন দিন মন থেকে মুছে ফেলা সম্ভব নয়।”
কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের কৃতী শিক্ষার্থী ও পরবর্তীতে আদর্শ শিক্ষক মো. ইউসুফ মিঞা সরাসরি হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার ছাত্র ছিলেন। আর্থিকভাবে তেমন সচ্ছল ছিলেন না। এ-কারণে ঠিকমতো স্কুলের বেতন-ভাতা দিতে পারতেন না। তাই কীভাবে হরেন্দ্র স্যারের কল্যাণে তিনি বিনা বেতনে স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন, তার বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, “আমি উক্ত স্কুলে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে ম্যাট্রিক পাশ করি। আমি ছিলাম পিতৃহীন গরীব ছাত্র। তাই একদিন মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন ও মজিবুর রহমানের সুপারিশপত্র নিয়ে হরেন্দ্র চন্দ্র স্যারের কাছে যাই। নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েই বিনা বেতনে পড়ার জন্য সেই সুপারিশ। কিন্তু প্রধান শিক্ষক হিসাবে তিনি কিছুই বললেন না। এতে আমি হতাশ হয়ে অন্য স্কুলে চলে যাওয়ার চিন্তাভাবনা শুরু করি। ইতিমধ্যে আমার প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শেষ হয়। উক্ত পরীক্ষায় আমি প্রথম হই। ৪-৫ দিন পর হরেন স্যার ইংরেজি ক্লাস নিতে আসেন। সেদিন আমার পড়া ও অন্যান্য প্রশ্নের উত্তর শুনে খুবই সন্তুষ্ট হন। কিন্তু ক্লাসে তিনি কিছুই বললেন না। ক্লাস শেষ করে গম্ভীর মেজাজ নিয়ে তিনি তার অফিসকক্ষে ফিরে গেলেন। সেখানে দপ্তরিকে দিয়ে আমাকে তাঁর সামনে হাজির করতে নির্দেশ দিলেন। দপ্তরি এসে বললে আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে স্যারের সামনে হাজির হই। স্যার বললেন, তুমি তো এতদিন ফ্রি পড়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেছো। আজ থেকে তোমাকে একটি পয়সাও দিতে হবে না। প্রয়োজনে তোমাকে বইও কিনে দেওয়া হবে। সেই থেকে স্কুলে আমাকে একটি পয়সাও দিতে হয়নি। এমনকি ম্যাট্রিক পরীক্ষার ফি পর্যন্ত হরেন্দ্র স্যার স্কুল তহবিল থেকে দিয়েছিলেন।”
হরেন্দ্র মাস্টারের সাহিত্য চর্চা
অমর শিক্ষক হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার আরেকটি সত্তা ছিলো সাহিত্যচর্চার। স্কুল জীবনে তিনি পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা ও প্রবন্ধ লেখায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন। স্কুল জীবনে তিনি যে লেখালেখি করতেন, তার বেশকিছু নির্দশন পাওয়া গেছে। কলেজ জীবনে তাঁর সাহিত্যচর্চার সোনালি অধ্যায় থাকলেও সেসব নিদর্শন এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কোনো উৎসাহী গবেষক অনুসন্ধান চালালে হয়তো সেসব নিদর্শন খুঁজে পাবেন। এতে বাংলা সাহিত্যের মূল্যবান উপাদান উৎঘাটিত হতে পারে।
শেষ ভরসাস্থল ছিলো তাঁর স্বপ্নের কর্মস্থল কালী কুমার ইনস্টিউশন। সেখানেও একই অবস্থা। স্কুলের পুরোনো নথিপত্র, স্কুল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্র কোনোটাই সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ললিতমোহন রায়ের ছবিটি কলকাতাস্থ তাঁর পরিবারের কল্যাণে পাওয়া গেছে। হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার কোনো ফাইল, লেখা ও ছবি অনেকবার খুঁজেও পাওয়া যায়নি। লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি তাঁর কলকাতার এক বংশধরের কল্যাণে পাওয়া গেছে। সাটিরপাড়ায় হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার পৈতৃক ভিটায় তাঁর বংশধর বাস করলেও তাঁদের কাছে কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নেই। তিনি যে প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতেন, সেটা তারা জানেন না।
কালীগঞ্জের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ স্কুলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিলো, সেখান থেকে নিয়মিত ‘ছাত্র-সুহৃদ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশিত হতো। এতে স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক- কর্মচারীদের পাশাপাশি স্থানীয় সাহিত্যিকদের লেখা স্থান পেতো। ১৩১৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাস থেকে ১৩২০ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে পত্রিকাটির সর্বমোট ২৫ টি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিলো, যা এতোদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে ছিলো। দীর্ঘদিন অনুসন্ধান-গবেষণা করে আমেরিকা প্রবাসী প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ড. মোহাম্মদ ওয়াহিদুজ্জামান মানিক ২৫ টি সংখ্যা থেকে ২৪ টি সংখ্যা (একটি সংখ্যা পাওয়া যায়নি) নিয়ে ‘ছাত্র-সুহৃদ : হিরণ্ময় স্মৃতি’ শীর্ষক একটি বই প্রকাশ করেছেন ২০২৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্টে।

সেই সূত্র ধরেই আমরা হরেন্দ্র মাস্টারের সাহিত্য জীবনের সন্ধান পাই। তিনি যখন রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ছিলেন, তখন ‘ছাত্র-সুহৃদ’ সাহিত্য পত্রিকাটি সগৌরবে প্রকাশিত হচ্ছিলো। হেড মাস্টার বগলা প্রসন্ন বিশ্বাস ও সেক্রেটারি কালীভূষণ মুখোপাধ্যায়ের প্রচেষ্টায় ‘ছাত্র-সুহৃদ’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ১৩১৮ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যায় ‘বালক লুথার’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা। কতোটা মেধাবী ছাত্র হলে ইতিহাসের আলোচিত মার্টিন লুথার কিং সিনিয়র (১৮৯৯-১৯৮৪)-এর ছোটোবেলার কষ্টের জীবন এবং সততার এমন সহজ-সরল বিবরণ দেয়া সম্ভব। প্রবন্ধটি ছোটো হলেও যেকোনো পাঠক লেখকের লেখার হাত সম্পর্কে প্রশংসা করতে বাধ্য। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় এমন উপদেশমূলক প্রবন্ধ যে-বালক লিখতে পারেন, ভবিষ্যতে তাঁর কাছ থেকে দেশ ও জাতি বড়ো কিছু অবশ্যই পেতে পারে। আর সেটা হরেন্দ্র মাস্টার প্রমাণও করে গেছেন। তাঁর প্রথম সাহিত্য নিদর্শনটি নিম্নে বর্ণিত হলো :
বালক লুথার
একদিন অরুণকিরণ প্রতিভাত ঊষাকালে ছিন্নবস্ত্র-পরিহিত একটী বালক আপন মনে গান করিতে করিতে জনশূন্য লণ্ডন-নগরীর রাজপথ দিয়া ধীরে ধীরে চলিয়া যাইতেছিল। তখন তরুণ-তপনের লোহিতাভ কিরণছটা তুষারকণাবৃত শ্যামল দুর্ব্বাদলের উপর পতিত হইয়া প্রকৃতির সৌন্দর্য্য কতই বৃদ্ধি করিতেছিল। অদূরবর্তী গীর্জ্জা হইতে মুহুর্মুহু মুক্ত ঘণ্টাধ্বনি নগরীর প্রাভাতিক নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করিতেছিল। বালকের সপ্তমোখিত স্বরলহরী সমীরণের স্তরে স্তরে ঝংকৃত হইয়া উন্মুক্ত আকাশমার্গে বিলীন হইয়া যাইতেছিল। দারিদ্র্যনিপীড়িত রোগকৃশ বালক বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে যেন হেলিয়া দুলিয়া পড়িতেছিল। তাহার বিষাদগ্রস্ত বদন হইতে মেঘাবৃত সূর্যকরের ন্যায় প্রতিভার অপূর্ব্ব জ্যোতিঃ ছড়াইয়া পড়িতেছিল। সূর্য্যরে কিরণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যেন বালকের গতির বেগও বাড়িতেছিল। ক্ষুধাতুর বালক তিন দিবস যাবৎ অভুক্ত; পূর্ব্ব দিবস একটী আতাফল মাত্র ভক্ষণ করিয়া দারুণ উদর জ্বালা কিঞ্চিৎ প্রশমিত করিয়াছিল। বুভুক্ষু উদর ক্ষণে ক্ষণে দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠিতেছিল।
বালকের পিতা ছাপাখানায় কেরাণীগিরি কার্য্য করিতেন। তাঁহার সামান্য উপার্জ্জনে পরিবারের প্রাত্যহিক ব্যয় সঙ্কলন হইত না। বিশেষতঃ তাঁহার পুস্তক ক্রয় করা একটি রোগের মধ্যে দাঁড়াইয়াছিল। সুতরাং অর্থাভাবে অনেক সময়েই তাঁহাকে সপরিবারে উপবাসী থাকিতে হইত। আজও তিন দিন যাবৎ পরিবার উপবাসী। বালক আহারান্বেষণে ইত্যতঃ ঘুরিতে ঘুরিতে দেখিতে পাইল একখানি দোকানে সুস্বাদু খাদ্যদ্রব্য সজ্জিত রহিয়াছে। খাদ্যের মনোহর সুবাস যেন তাহার নাসারন্ধ্রে প্রবিষ্ট হইয়া বুভুক্ষিত উদরের প্রজ্বলিতানলে ঘৃতাহুতি প্রদান করিল। সে ঐ মিষ্টান্নগুলির উপর হস্তার্পণ করিতে উদ্যত হইল। কি আশ্চর্য্য। অমনি হৃদয়ের অন্তস্থল হইতে বজ্রনাদে কে যেন বলিয়া উঠিল “চুরি করা মহাপাপ”। বালক তখনই চমকিত হইয়া ঐ কার্য্য হইতে নিরস্ত হইল। সে ত জানে না অপরের জিনিস না বলিয়া লইলে চুরি করা হয়। বিশেষতঃ সে বুভুক্ষিত উদরের কাতর-ধ্বনিপ্রণোদিত হইয়া মিষ্টান্নগুলির উপর হস্তার্পণ করিতে উদ্যত হইয়াছিল।
স্নেহময়ী জননীর ও বালিকা ভগিনীর বিষাদকাতর মুখখানি তাহার মানসপটে অঙ্কিত ছিল, এবং তাহাদের উপবাস কষ্টে দিশাহারা হইয়াই বালক আজ এমন ঘৃণিত কাজ করিতে উদ্যত হইয়াছিল। কিন্তু বালক যেমন শুনিল “চুরি করা মহাপাপ” অমনি আপনার মনে বলিয়া উঠিল “না আমি চুরি করিব না, আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিব”। বালক দৌড়িয়া অদূরবর্তী উপাসনাগৃহে প্রবেশ করিয়া পুনঃ পুনঃ পরম প্রভুর নিকট পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য একান্ত মনে প্রার্থনা করিতে লাগিল ।
ধর্ম্মযাজক অন্তরাল হইতে সমস্ত পর্যবেক্ষণ করিয়া সস্নেহে বালককে বলিলেন, “বালক, তোমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হইয়াছে; প্রভু তোমাকে পুণ্যের পথে লইয়া যাইবেন।” এই বলিয়া করুণহৃদয় ধর্ম্মযাজক আপনার খাদ্য তাহাকে প্রদান করিলেন। এই স্নেহার্দ্রহৃদয় যাজকের সাহায্যে পরে বালক আপনাকে ঐহিক ও পারত্রিক উন্নতির পথে লইয়া যাইতে সমর্থ হইয়াছিল। ইহার পর এই বালক হইতে যে আলোক বিকীর্ণ হইল, তাহাতে যে কেবল ইংলণ্ডই আলোকিত হইল এমন নহে, সে আলোকশিখা ক্রমে সুদূর আমেরিকায় বিস্তৃত হইয়া জগতের বহুস্থানে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। এই বালকই শেষে অদ্বিতীয় ধর্মবীর “মার্টিন লুথার” নামে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন।
শ্রী হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা
৯ম মান
কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই ইংলিশ স্কুল
শুধু প্রবন্ধই নয়, কবিতায়ও হরেন্দ্র মাস্টার সিদ্ধহস্ত ছিলেন। তিনি ছাত্র জীবনে অনেক কবিতা লিখলেও ছাপার অক্ষরে তা দেখা যায়নি বললেই চলে। শুধুমাত্র ‘ছাত্র-সুহৃদ’ পত্রিকার কল্যাণে তাঁর দুটি কবিতা উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। প্রথম কবিতা ‘আবাহন’ ছাপা হয়েছিল ১৩১৮ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যায়, ‘ছাত্র-সুহৃদ’-এ। ১৬ লাইনের কবিতায় তিনি যে ছন্দ আর শব্দ চয়ন করেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। নবম শ্রেণির একজন ছাত্র এতো পরিপক্ব কবিতা লিখতে পারেন, সেটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু সেই অসাধ্য সাহিত্যচর্চা করেছেন বিস্ময় বালক হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা। কবিতাটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো :
আবাহন
ওগো বীণাপাণি তব জ্ঞানের আলোকে,
মুছে ফেল সকলের হৃদয়-আঁধার।
বিস্তার সুষমা তব জগতের দিকে,
অজ্ঞান তিমিররাশি নাশি সবাকার।
উঠুক ভাতিয়া তব জ্ঞানের কিরীটী,
চাহিয়া উহারে জাগি উঠুক সকলে।
জ্ঞানের সৌরভ তব চলে যাক্ ছুটী
ইরম্মদ বেগে মুক্ত আকাশের তলে।
শান্তিময় ক্রোড়ে তব লইয়া সন্তানে,
নাশিও অশান্তি সব অয়ি মা বরদে;
ক্ষুদ্রতা পুড়িয়া ফেল মহত্ত্ব ইন্ধনে।
নিঃস্বার্থ রবিতে নাশ স্বার্থের জলদে।
তুমি তোল গো তোমার পুণ্যের আলোতে
পাপ তমঃ নাশি, ধরা উজল করিয়া।
তব আবাহন গীতি গাহিতে গাহিতে
আনন্দে সকলে মোরা উঠিব জাগিয়া।
শ্রী হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা
৯ম মান
তাঁর আরেকটি কবিতার সন্ধান পাওয়া গেছে ‘ছাত্র-সুহৃদ’ পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যায় (জ্যৈষ্ঠ ১৩১৯)। এমন উচ্চমানের কবিতা একজন স্কুল ছাত্রের কাছ থেকে পাওয়া সৌভাগ্যের ব্যাপার। তৎকালীন সময়ে জাতীয় কবিদের মতো প্রশংসিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। নতুন করে যেসব পাঠক তা পাঠ করবেন, তারা নিশ্চয় তাঁর আরো কবিতার খোঁজ করবেন। তাঁর কবিতার বই কেনার জন্যে গ্রন্থালয়ে যাবেন। কিন্তু তাদেরকে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার থাকবে না। পাঠকদের জন্যে তা পুনর্মুদ্রিত হলো :
শীতলা
অয়ি তটিনি! অয়ি স্ফটিক নির্ম্মলে
অনন্ত সাগর পানে চল গো।
আনন্দ উচ্ছ্বাসে কল কল তানে
দুকূল প্লাবিয়ে তুমি চল গো।
অনন্ত সাগরে করিতে শয়ন অনন্ত শান্তিতে করিতে গমন
তুমি, ধলেশ্বরী সনে করিয়া মিলন,
তব ব্যাকুল তরঙ্গ আকুল প্লাবন লইয়া হৃদয়ে তুমি চল গো।
হে মথুরা! হে কোমলা! হে তটিনি!
তর তর বেগে তুমি চল গো।
২
তোমার জীবনে ঢালিয়া জীবন ভাসিয়া চলিছে জলজীবগণ
তারা কেহ নিমজ্জিত কেহ ভাসমান, পুনঃ কেহ পাপপতি কেহ বা সজ্জন সবারে লইয়া হৃদয়ে গো।
জননী-স্নেহের কণা বিতরিয়ে
হে চিরকুমারি! তুমি চল গো।
৩
তোমার হৃদয় করি বিতাড়িত
বাহিয়া বহিয়ে চলে কত শত,
তাহে নহগো বিরক্ত নহগো দুঃখিত
তব জগতের সেবা জীবনের ব্রত,
তাই বুঝি আনন্দ-নর্ত্তন গো।
রজত-বরণ— সলিল-প্রতিমা,
অয়ি শান্তিবাণি! তুমি চল গো।
৪
স্রোতাধৌত-পাদ অই মহীরুহ
বিসর্জি বক্ষেতে সুবিশাল দেহ
বলে “সুখের সংসার আনন্দের গেহ এই জগতে কিছুই চিরস্থায়ী নহ
শীতলা বক্ষে সবে পড়িবে গো।
তোষামোদ-প্রিয় অহঙ্কারী নর!
মোর দশা তব ঘটিবে গো
৫
ভাঙ্গা গড়া বুঝি নিয়ম, তোমার,
ভাঙ্গিয়া এখানে সোনার সংসার অই অন্যস্থানে তারে গড়িছ আবার;
ওগো প্রতিনিধি বুঝি তুমি বিধাতার,
অনন্ত-অম্বর-প্রতিচ্ছবি গো।
হে তরুণে! হে করুণে! হে বঙ্কিমে!
অনন্ত সাগরে তুমি চল গো।
৬
অই ব্রহ্মপুত্র কতই গরবে
যতেক তটিনী রাজিছে এ ভবে
সে ত আনন্দে বিবাহ করিয়া সরবে কিন্তু ঠেকিলা আসিয়া তব পাশে এবে
মধুর ‘জননী’ ডাক ডাকিল গো!
অয়ি ব্রহ্মপুত্র-দরপ-দলনি!
অনন্ত সাগরে তুমি চল গো!
শ্রী হরেন্দ্র চন্দ্র সাহা
৯ম মান
স্কুল জীবনে যে-ছাত্র এমন প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতে পারেন, কলেজ জীবনে জানি কতোটা সাহিত্যচর্চা করেছেন। এই অভিলাষ নিয়েই তাঁর সাহিত্য নিদর্শনের অনুসন্ধান শুরু করি। বিশেষ করে তাঁর কলেজ জীবনের সময়টায় ঢাকা জগন্নাথ কলেজে কোনো স্মরণিকা, সাহিত্যপত্রে কোনো লেখা খুঁজে পাওয়া যায় কি না। তিনি ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে আইন ও ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে বিএ প্রথম শ্রেণিতে পাশ করেন। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সেই সময়ের কলেজ ম্যাগাজিন কিংবা সাহিত্যপত্র পাওয়া যায়নি। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত প্রাচীন জগন্নাথ কলেজের কোনো পুরোনো ম্যাগাজিন, সাহিত্য পত্রিকা এমনকি নথিপত্র অক্ষত নেই। কয়েক বছর আগে পুরোনো লাইব্রেরি ভবনটি ভেঙে বহুতল ভবন করার সময় পুরোনো নথিপত্র, পত্র-পত্রিকার কফিনে শেষ পেরেক মারা হয়।
শেষ ভরসাস্থল ছিলো তাঁর স্বপ্নের কর্মস্থল কালী কুমার ইনস্টিউশন। সেখানেও একই অবস্থা। স্কুলের পুরোনো নথিপত্র, স্কুল ম্যাগাজিন ও সাহিত্যপত্র কোনোটাই সংরক্ষণ করা হয়নি। এমনকি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ললিতমোহন রায়ের ছবিটি কলকাতাস্থ তাঁর পরিবারের কল্যাণে পাওয়া গেছে। হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার কোনো ফাইল, লেখা ও ছবি অনেকবার খুঁজেও পাওয়া যায়নি। লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি তাঁর কলকাতার এক বংশধরের কল্যাণে পাওয়া গেছে। সাটিরপাড়ায় হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার পৈতৃক ভিটায় তাঁর বংশধর বাস করলেও তাঁদের কাছে কোনো স্মৃতি সংরক্ষিত নেই। তিনি যে প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতেন, সেটা তারা জানেন না।
কোনো গবেষকই হতাশ হন না। অবিরাম তল্লাশি আর খোঁজ-খবর করেই তিনি সামনে এগিয়ে যান। তাই আমরাও আশাবাদী। মহান শিক্ষাবিদ ও লেখক হরেন্দ্র মাস্টারের আরো সাহিত্য উপাদান ভবিষ্যতে হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে। তখন হয়তো কালী কুমার স্কুলের সফল হেড মাস্টারের পাশাপাশি একজন গুণী সাহিত্যিক সত্তার খোঁজও মিলবে। আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারবো, ছাত্র শাসন করেই তিনি ক্ষান্ত ছিলেন না, একই সঙ্গে সাহিত্যচর্চায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।
তথ্যসূত্র
১. জেলে ত্রিশ বছর; ব্রিটিশ : পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস, ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী;
২. ছাত্র-সুহৃদ, ১৩১৮ বঙ্গাব্দ থেকে কালীগঞ্জ রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ হাই স্কুল থেকে প্রকাশিত পত্রিকার বিভিন্ন সংখ্যা;
৩. হরেন্দ্র চন্দ্র সাহার উত্তরাধিকার ও অন্যান্যদের সাক্ষাতকার।
আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

