ইতিহাসকার সরকার আবুল কালামকে আমরা এতো দ্রুত ভুলে গেলাম কী করে? জীবদ্দশায় তিনি যেকোনো সাহিত্যসভা, স্মরণসভা, এবং নানান পরিসরে সরব ছিলেন এবং আসন অলংকৃত করে রাখতেন। অথচ মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার আগেই তিনি নরসিংদীর সবরকম পরিমণ্ডল থেকে একদম নাই হয়ে গেলেন।
২০২১ সালের আগস্ট মাসের ৩০ তারিখ ৭৫ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গিয়েছিলেন নরসিংদীর ‘মাটি খামচানো’ লেখক সরকার আবুল কালাম। তিনি একাধারে ছিলেন নাট্যকার, ইতিহাসকার, গল্পকার। মূলত নরসিংদীর লেকজন তাঁকে চেনে একজন ইতিহাসকার হিসেবে।
নরসিংদীর গুণী মানুষজন, যাঁদের মধ্যে ছিলেন রাজনীতিক, চিকিৎসক, লেখক, শিক্ষক, কবিয়াল— যাঁরা মূলত ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছেন নিকট কিংবা দূর অতীতে, তাঁদের নিয়ে সরকার আবুল কালাম একটি গ্রন্থ রচনা করলেন ২০০৩ সালে, ‘নরসিংদীর গুণীজন’ নামে। খুব বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই বই বেরোনোর আগে এই জনপদের মানুষ জানতোই না তাদের কথা! কতিপয় প্রবীণ বাদে (তারাও খুব বেশি চর্চায় রাখেননি ঐসব বরেণ্য নরসিংদীবাসীদের) আর কোনো শ্রেণির মানুষই খুব বেশি খবর রাখতো না তাঁদের। এই বইটা বহুল পঠিত হলো। এখনো অনেকের কাছে এই বইটা সংরক্ষিত আছে। অনেক লেখক রেফারেন্স হিসেবে এটা ব্যবহার করেন।
তিনি এই অঞ্চলের বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশী, ধ্রুপদী লেখক গিরিশচন্দ্র সেন, কবিয়ালসম্রাট হরিচরণ আচার্য্য, জমিদার ললিতমোহন রায়কে জনগণের সামনে এনে দেখিয়েছেন এই গোটা অঞ্চল কতোটা সমৃদ্ধ ছিলো। তাঁর দেখানো পথ ধরে পরবর্তীতে আরো কয়েকজন এই ধারাকে সম্মুখবর্তী করেছেন, কিন্তু গোড়াপত্তন করেছিলেন সরকার আবুল কালাম। তাঁর আগে আরো দু-একজন এই অঞ্চলের ইতিহাসের নানান অংশের কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি যখন বললেন, তখন এর বিষয় ও ভঙ্গি একদম অন্যরকম হয়ে জনপ্রিয় হয়ে গেলো। হ্যাঁ, সিরিয়াসলি তিনি জনপ্রিয় ইতিহাসকার ছিলেন। তার কারণ হচ্ছে, তিনি মূলত ‘গল্প’ বলতেন। ব্যাপারটাকে তিনি উপস্থাপন করতেন ‘কিংবদন্তী’ হিসেবে। আর এখানে এসে তিনি বোদ্ধা পাঠকদের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যেতেন প্রায়শই। ইতিহাসের নিরেট সত্য ঘটনাকেও তিনি ‘কিংবদন্তী’ বলে একটা বিভ্রান্তিতে ফেলে দিতেন, বিশেষত নতুন প্রজন্মকে। তবে এক সাক্ষাতকারে তিনি অকপটে বলেছেন, “আমি কিংবদন্তীরই মানুষ। গল্প বলাই আমার প্রধান অভিপ্রায়।”
সরকার আবুল কালাম ১৬/১৭ টির মতো গ্রন্থ লিখেছেন। এবং এর অধিকাংশই এই অঞ্চলের লোকসাহিত্য, লোকসাহিত্যিক, লোকজ ছড়া, প্রান্তিক নানা জাতিগোষ্ঠীর হদিস, স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবী, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতিনিধিত্বশীল জীবনী, এমনকি আধুনিক কবিদের নানান তথ্য ও জীবনী সহযোগে একটি বর্ণাঢ্য মিউজিয়াম গড়ে তুলেছেন দিনের পর দিন ধরে। নরসিংদীর নাগরিক সমাজ তাঁকে সঙ্গত কারণেই শিকড়সন্ধানী লেখক, নরসিংদীর আলোর কণা, ঐতিহ্যের নাবিক ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করেছিলেন জীবদ্দশায়।
তিনি অতোটা ডিটেইলে করে যেতে পারেননি। কিন্তু তিনি পথ দেখিয়েছেন। এবং এই পথটা দেখিয়েছেন খুবই প্রকৃষ্টভাবে। তাঁর অবিস্মরণীয় কাজ হিসেবে রয়ে যাবে প্রবাদপ্রতিম ইতিহাসকার, পূর্বসূরী সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ’র ‘পূর্ব্ববঙ্গে মহেশ্বরদী’ গ্রন্থখানি খুঁজে বের করে তা সম্পাদনা করে পাঠকের কাছে তুলে ধরা। যদিও দুর্লভ এই গ্রন্থখানি নিজের সংগ্রহে রেখে অশেষ ধন্যবাদার্হ হয়ে আছেন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক, সুন্দর আলী গান্ধীর ভাতিজা শাহাদাত হোসেন মন্টু। তিনিও সদ্য প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর কাছে আরো অনেক দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের সন্ধান হয়তো পাওয়া যেতো।
যাই হোক, ইতিহাসকার সরকার আবুল কালামকে আমরা এতো দ্রুত ভুলে গেলাম কী করে? জীবদ্দশায় তিনি যেকোনো সাহিত্যসভা, স্মরণসভা, এবং নানান পরিসরে সরব ছিলেন এবং আসন অলংকৃত করে রাখতেন। অথচ মৃত্যুর মাত্র পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়ার আগেই তিনি নরসিংদীর সবরকম পরিমণ্ডল থেকে একদম নাই হয়ে গেলেন। তাঁর মৃত্যুদিবসে কোনো সংগঠন শোকসভার আয়োজন করে না। সমাজের গুণী মানুষদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে এটা খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত।
সরকার আবুল কালাম নিঃসন্দেহে একটা গোটা অঞ্চলের ভাষা-সংস্কৃতি-ইতিহাস ইত্যাদি জাগরণ এবং জনপ্রিয়করণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে নিয়ে একটা ‘স্মারকগ্রন্থ’ হতে পারতো। এই পরিসরে যারা শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে মাথা ঘামান, তারা বিষয়টা ভেবে দেখতে পারেন।

