প্রয়াত লেখক রিপন ইউসুফের নির্বাচিত রচনা নিয়ে গ্রন্থ প্রকাশ ও পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠান

গতকাল ১৯ জুলাই ২০২৬ (রবিবার) প্রয়াত কবি-গল্পকার ও চিন্তক রিপন ইউসুফের নির্বাচিত রচনা সংবলিত গ্রন্থ ‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’-এর পাঠ উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। ‘প্রত্ন’র আয়োজনে নরসিংদীর নবধারা প্রি-স্কুলে বিকেল সাড়ে পাঁচটায় বইটির পাঠ উন্মোচন করা হয়।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন শিক্ষক ও রাজনীতিক নাজমুল আলম সোহাগ। স্বাগত বক্তব্যে তিনি প্রত্ন প্রকাশনী সামাজিক ও গুণগত উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন। অতঃপর আবৃত্তিশল্পী ও মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের সভাপতি জহির মৃধা তার বক্তব্যে বলেন, “সম্মিলনের মধ্য দিয়েই সভ্যতার বিকাশ। রিপন ইউসুফরাও তৈরি হয়েছে সম্মিলন থেকেই। রিপনদের তুলে ধরা ও বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রত্ন’র মতো সৃজনশীল প্রতিষ্ঠান আরো গড়ে উঠবে।” তারপরই তিনি গ্রন্থ থেকে রিপন ইউসুফের ‘অবসর’ ও ‘তুমি— সেকালের ঘোড়া অথবা সাইকেল’ কবিতা দুটি আবৃত্তি করে ‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’-এর পাঠ উন্মোচন করেন।

বইটির প্রকাশক ও ‘প্রত্ন’র কর্ণধার শাহীন সোহান বলেন, “রিপন ইউসুফের অনুপস্থিতিতে তাঁর বই প্রকাশ করাটা একদিকে যেমন দুঃখের, আবার অন্যদিকে এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা বই দিয়ে প্রকাশনার যাত্রা করতে পারাটা সৌভাগ্যেরও।” তিনি রিপন ইউসুফসহ তার আরো সহযাত্রীর সাথে করা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বলেন, “আমাদের পরিকল্পনা ছিলো নরসিংদীতে একটা কালচারাল হাব তৈরি করা, যেখানে সংস্কৃতির সব বলয়ের মানুষ একত্রিত হবে। এই হাব একজন তরুণকে সেই প্ল্যাটফর্ম দেবে, যেখানে সে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরিখে তার সৃষ্টিকর্মের বিচার করতে পারবে। রিপন ইউসুফের বই দিয়েই এই পরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু হলো।”

‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’ বইয়ের সম্পাদক কবি সুমন ইউসুফ ‘প্রত্ন’র সম্পাদনা বোর্ড গঠন করার প্রারম্ভিক উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, “প্রতি বইমেলায় বই বিক্রির যে-সংখ্যা আমরা পাই, সেই অনুযায়ী বিচার করলে প্রশ্ন করা যায়, এই পাঠকরা কারা? কোথায়? বই মগজে ধারণ করলে আমাদের সমাজ তো এতো পশ্চাৎপদ থাকতো না।” রিপন ইউসুফের সাহিত্যচর্চা ও চিন্তা সম্পর্কে বলেন, “রিপন ইউসুফ আন্তর্জাতিক চিন্তা করতো। বাংলাদেশ রাষ্ট্র ছিলো তার ভাবনায়। রিপন ইউসুফের মৃত্যুতে বাংলাদেশ ও নরসিংদী উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” তিনি আরো যোগ করেন, “রিপন ইউসুফের কাজের বিচার তার পাঠকেরাই করবে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রত্ন প্রকাশন নান্দনিক বই প্রকাশের চেয়ে সমৃদ্ধ বই প্রকাশে আগ্রহী হবে।

রিপন ইউসুফের সহোদর গল্পকার রাসেল ওয়ালিদ তাঁর প্রয়াত ভাইকে স্মরণ করেন গভীর আবেগের সাথে। ‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’ বইয়ের নামকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা রিপনকে বলতাম, অশ্বত্থগাছের নিচে বসে সে বোধিলাভ করেছে। রিপনও সেটা স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করতো। অশ্বত্থের নিচে বসে পাওয়া চিন্তার সমগ্র হিসেবে এই নামটা রিপনকে ধারণ করবে।”

কবি ও ছড়াকার মহসিন খোন্দকার বলেন, “রিপন ইউসুফ ছিলেন একজন অতীন্দ্রিয়বাদী। তিনি সংস্কৃতির চর্চা দিয়ে সমগ্র দেশ, সমগ্র বিশ্বকে পরিবর্তন করার স্বপ্ন দেখেছেন।” তিনি রিপন ইউসুফকে উৎসর্গ করে তাঁর লেখা কবিতা ‘ডানা মেলা দুপুর’ পাঠ করে শোনান উপস্থিত সকলকে।

সবশেষে নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া রিপন ইউসুফকে সস্নেহে স্মরণ করেন। বলেন, “মৃত্যু মানুষের জীবনের অনিবার্য পরিণতি। রিপনের মতো অসম্ভব সম্ভাবনাময় কারো অকালমৃত্যু সমাজ ও রাষ্ট্রের অপূরণীয় ক্ষতি।” তিনি কবি, গল্পকার ও চিন্তকের বাইরে রিপন ইউসুফের আরো দুটি পরিচয়কে তুলে ধরে বলেন, “রিপন ছিলো একজন অত্যন্ত শুদ্ধ পাঠক ও সত্যিকারের চলচ্চিত্রবোদ্ধা।” তিনি আরো বলেন, “রিপন ইউসুফের চিন্তা ও তাঁর চিন্তাকে আমরা কীভাবে ধারণ করছি— দুটোই একটা স্মারকগ্রন্থের আদলে তুলে আনা আবশ্যক। সেখানে তার অপ্রকাশিত লেখা ও ছবি-দলিলাদিও উঠে আসা প্রয়োজন।” ‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’ বইটিকে একটি মানসম্মত প্রকাশনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি ‘প্রত্ন’ প্রকাশনীকে অভিনন্দন জানান।

এছাড়া কথা বলেন মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ সনেট, কল্লোল নাট্য সংস্থার সভাপতি শাহ আলম এবং পলাশ চক্রবর্তী। নরসিংদীর সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

প্রসঙ্গত, রিপন ইউসুফ ক্ষণজন্মা এক সৃজনশীল প্রাণ। ১৯৮৮ সালে জন্ম তাঁর, বসবাস করতেন নরসিংদীর টাওয়াদীতে। রচনা করেছেন গল্প-কবিতা-গদ্য, সম্পাদনা করেছেন লিটলম্যাগ ‘আষাঢ়ে মুখের আড়ত’ ও গল্পের চর্চাপত্র ‘খাঁকারি’। এক দুরারোগ্য ব্যাধি মাত্র ৩৭ বছর বয়সেই কেড়ে নেয় এই লেখকের প্রাণ। ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই পরলোকে পাড়ি জমান রিপন ইউসুফ। এক বছর পর তাঁর মৃত্যুদিনেই আজ পাঠ উন্মোচন করা হলো তাঁর নির্বাচিত রচনা সংবলিত গ্রন্থের। সুমন ইউসুফের সম্পাদনায় বইটি প্রকাশ করেছে ‘প্রত্ন’ প্রকাশনী। বইটির মাধ্যমে ‘প্রত্ন’-ও তার যাত্রা শুরু করলো।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ