Home Blog Page 4

বাঙলাদেশ লেখক শিবিরের আয়োজনে সদ্যপ্রয়াত লেখক ও চিন্তক রিপন ইউসুফকে নিয়ে স্মরণসভা

সদ্যপ্রয়াত লেখক ও চিন্তক রিপন ইউসুফ স্মরণে ‘কবি-গল্পকার-চিন্তক রিপন ইউসুফ-এর স্মরণসভা’ শীর্ষক এক স্মরণসভার আয়োজন করেছে ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ (শুক্রবার) দুপুর ৩ টায় নবধারা প্রি-স্কুলে অনুষ্ঠানটি আরম্ভ হয়। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’র সভাপতি জনাব নাজমুল আলম সোহাগ।

শুরুতেই সদ্যপ্রয়াত লেখক-বুদ্ধিজীবী বদরুদ্দীন উমর, লেখক-গবেষক যতীন সরকার, প্রখ্যাত লালনসঙ্গীতশিল্পী ফরিদা পারভীন এবং লেখক রিপন ইউসুফের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ এক মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালন করা হয়।

নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া, কবি ও সম্পাদক সুমন ইউসুফ, কবি ও ঔপন্যাসিক শাদমান শাহিদ, কবি হাসনাইন হীরা, কবি আল মনির, কবি ও প্রকাশক মোশাররফ মাতুব্বর, কবি এমরানুর রেজা, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী মঈনুল ইসলাম মীরু, প্রয়াত রিপন ইউসুফের পরিবার, বন্ধু, আত্মীয়-স্বজনসহ আরো কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং জেলার বিভিন্ন প্রান্তের নিবেদিতপ্রাণ সংস্কৃতিকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় সকলেই রিপন ইউসুফের সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র ভাবনা, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তা নিয়ে আলোকপাত এবং লেখকের সাথে প্রত্যেকের ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করেন।

কবি হাসনাইন হীরা জানান, “রিপন ইউসুফ আমার বন্ধু, আমার ভাই, আমার সহযাত্রী। শিল্প-সাহিত্যের নানা অলি-গলির ভেতরে তার সাথে সম্পৃক্ত থেকেছি। নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্ক করেছি। বাংলা অঞ্চল নিয়ে গভীর চিন্তা করতেন রিপন ইউসুফ। ম্যাজিক রিয়ালিজম নিয়ে অনেক কৌতূহল এবং কাজ ছিলো তার।”

অধ্যাপক জহির মৃধা বলেন, “রিপন সর্বদা চিন্তাশীল মানুষ ছিলো। সিআইডিপি রোগে অনেকদিন আক্রান্ত ছিলো। তার মৃত্যু আমাদের খুব কাঁদায়, আমাদের খুব ভাবায়।”

কবি আল মনির বলেন, “তার যে বহুমুখী প্রতিভা, এটা সবার মধ্যে থাকে না। এ-ধরনের প্রতিভা আমাদের সমাজে কম।”

কবি এমরানুর রেজা জানান, “জন্মানোর সাথে সাথে আমাদের জন্য অনিবার্য হয়ে যায় মৃত্যু, আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। আদর্শগত দিক থেকে রিপন ইউসুফ অত্যন্ত মার্জিত ও সুন্দর ছিলেন। তার আদর্শের জায়গা থেকে কলমকে কখনো বিক্রি করেন নাই। তিনি আত্মমগ্ন মানুষ। রিপন ইউসুফ কখনো হারাবেন না।”

শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী মঈনুল ইসলাম মীরুর বক্তব্য ছিলো, “রচনার সংখ্যা দিয়ে কবিকে বিচার করা যায় না। রিপন ইউসুফ চিন্তক মানুষ, স্বল্পভাষী মানুষ। …সে নিঃসন্দেহে ভালো লেখক।”

কবি ও সম্পাদক সুমন ইউসুফ  বক্তব্যে বলেন, “রিপন ইউসুফের সাথে এক দশক চলেছি। সে সংগঠনে বিশ্বাস করতো না। ব্যাপক সংগঠনবিমুখ ছিলো। আবার সমাজ ও রাষ্ট্রে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা কতোটুকু, সে-বিষয়ে তার সম্যক ধারণা ছিলো।”

প্রফেসর গোলাম মোস্তাফা মিয়া বলেন, “সত্যিকার অর্থে তার মৃত্যুটা অকালমৃত্যু। যখন চিন্তায়-দর্শনে পরিপক্বতা সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আমরা তাকে হারিয়েছি। …তার সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলাম চিন্তার জায়গা থেকে। আমাদের তার চিন্তার জায়গাটুকু আলাদাভাবে আলোচনা করা দরকার। রিপন বেঁচে থাকবে তার সৃষ্টি ও কর্মের মাধ্যমে।”

তাছাড়া শিক্ষক শাহজাহান, সংস্কৃতিকর্মী মাইনুল রহমান খান, কবি ও প্রকাশক মোশাররফ মাতুব্বর, কবি মমিন আফ্রাদ, কবি শাহ আলম, কবি নাজমুল শাহরিয়ার, কবি ইফতেখার, কবি আল সউদ, রিপন ইউসুফের বড়ো ভাই রাসেল ওয়ালিদসহ আরো অনেকে কথা বলেন। পাশাপাশি রিপন ইউসুফের রচিত কবিতা, গল্প ও অনুবাদের বিভিন্ন অংশ পাঠ করা হয়৷

প্রসঙ্গত, রিপন ইউসুফ ছিলেন নরসিংদীর টাউয়াদীতে বসবাসকারী একজন নিবেদিতপ্রাণ কবি, গল্পকার এবং চিন্তক। তার বেশকিছু কবিতা, গল্প, অনুবাদ, রিভিউ, রাষ্ট্র-সমাজ বিষয়ক ভাবনা, চলচ্চিত্র বিষয়ক গদ্য জাতীয়-স্থানীয় বহু পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন সিআইডিপি নামক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন। গত ১৯ জুলাই ২০২৫ (শনিবার) বিকেলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।

অকালে হারানো অনুজপ্রতিম এক বন্ধুর কথা

“পৃথিবীতে জন্ম মানেই মৃত্যু। আমাদের জীবন এবং পার্থিব অস্তিত্বের প্রারম্ভ জন্ম দিয়ে এবং এর অনিবার্য সমাপ্তি মৃত্যুতে।”— এই মহাসত্য আমাদের মানতেই হবে, কিন্তু মৃত্যু যখন হয় অকালে, তখন তা মানতে কষ্ট হয়, নানা প্রশ্নে মন জর্জরিত হয়, হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়।

মানুষের জীবনের আয়ুষ্কাল খুব বেশি নয়। শত বছরের উপরের সংখ্যা গণনার মধ্যে আসে না। আশি-নব্বই বছর বাঁচার সংখ্যাও কম। জীবন চলার নানা পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু সম্ভবত বর্তমানে সত্তরের মতো। রিপন ইউসুফ এই বেঁচে থাকার জীবন-সংগ্রামে সেই আয়ুও পেলো না। রিপন মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে এসেছিলো ১৯৮৮ সালের ১৯ মার্চ (যদিও স্কুলের একজন শিক্ষক এসএসসি রেজিস্ট্রেশনে তার জন্মসাল ১৯৯১ উল্লেখ করে দেন)। আর পৃথিবী ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছে ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে, শেষ বিকেলে। ৩৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ইহজগত থেকে অনন্তে যাত্রা। তার এই অকাল প্রয়াণের শোক আমরা বন্ধু-স্বজন, আত্মীয়-পরিজন— সবাই মেনে নিয়েছি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে, আর স্মরণ করছি তার স্মৃতিকে।

রিপন ইউসুফের পৈতৃক বাড়ি নরসিংদীর মেঘনার চরাঞ্চল নজরপুর ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামে। জন্ম নিয়েছেন নরসিংদী শহরের বৌয়াকুড়ে। শৈশব-যৌবন কেটেছে নরসিংদী শহরেই। লেখাপড়া শুরু শিশুবাগ বিদ্যাপীঠ থেকে, তারপর ব্রাহ্মন্দী কামিনী কিশোর মৌলিক উচ্চ বিদ্যালয়, নরসিংদী সরকারি কলেজ। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রথমে শান্তা মারিয়াম বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনের উপর। তারপর সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেছেন স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে।

রিপন ইউসুফের বাবা জাহাঙ্গীর আলম ডাক বিভাগের পরিদর্শক পদে চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। নরসিংদী সদরের চিনিশপুর ইউনিয়নস্থ টাওয়াদী গ্রামে বাড়ি করে পরিবার নিয়ে থাকতেন। রিপনের মা গৃহিণী, বাবার অনুপস্থিতিতে মা-ই ছেলেদের নিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। রিপনরা দুই ভাই— রাসেল ওয়ালিদ বড়ো, রিপন ছোটো।

লেখালেখিতেও রিপন তার সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদেও তার হাত ভালো ছিলো। এসব মাধ্যমে ছোটো ছোটো করে লেখাগুলোর মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যেতো। রূপক-প্রতীকে সুনিপুণ অলঙ্কৃত শব্দ ব্যবহারে তার লেখাগুলো অন্যদের থেকে আলাদা এবং শিল্পমর্যাদায় উন্নীত হতে পেরেছে বলে আমি মনে করি।

রাসেল ও রিপন ভাই হলেও সম্পর্ক ছিলো বন্ধুত্বের, পরস্পরের বোঝাপড়া ছিলো অনেক সুন্দর। রাসেল বিয়ে করেছে, একটি কন্যা সন্তানও এসেছে এই পরিবারে। সবাইকে নিয়ে মায়ের নেতৃত্বে সংসার চলছিলো পরিকল্পিতভাবে। এর মধ্যে রিপনের দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়া এবং অকালে চির বিদায়ে পরিবারটি নতুন জীবন-সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছে।

রিপনের সাথে আমার পরিচয় নরসিংদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব থেকে ২০০৯ সালের শেষে অবসর নেয়ার পর। নাজমুল আলম সোহাগ (আমার স্নেহভাজন ছাত্র) নরসিংদীর খালপাড় চেয়ারম্যান মার্কেটে বই-পুস্তক লাইব্রেরি দেয়ার পর সেখানে দিনের নানা সময়ের আড্ডায় বসতাম। সেখানে রিপনও আসতো। আসতো জহির মৃধা, মাইনুল, মিরু, প্রণব, লিংকন, সনেট, শাদমান শাহিদ, সুমন ইউসুফ, শাহীন সোহান, মীর লোকমান, মমিন আফ্রাদ, অনির্বাণ মাহবুব, রাসেল ওয়ালিদসহ আরো অনেকে, যাদের অধিকাংশ আমার ছাত্র। জীবন চলার পথে শিশু, প্রবীণ, আমার সহকর্মীরা যেমন আমার বন্ধু, তেমনি আমার তরুণ ছাত্ররা, ছাত্রতুল্যরাও আমার সবচাইতে ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই বন্ধুদের আড্ডায় রিপন ইউসুফ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো। এই দৃষ্টি আকর্ষণের প্রথম এবং প্রধান বিষয় ছিলো বই। নতুন বইয়ের সন্ধান তার কাছে পাওয়া যেতো। আমি ছাত্রজীবন থেকেই বই পাগল ছিলাম। এ নিয়ে অনেক গল্প-কথা আছে। এখনো বই পড়া-বই সংগ্রহ করার অভ্যাস চলমান। রিপনের বই পড়া এবং বই সংগ্রহের নেশা ছিলো। প্রথমত বই পড়া, নতুন বইয়ের সন্ধান এবং সংগ্রহের আগ্রহের মিল থেকেই তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যায়। আমার লাইব্রেরিতে আড্ডায় বসা, রিপনের ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতেও তার নিজস্ব কক্ষে আড্ডায় বসে আমাদের আলাপচারিতা বাড়তে থাকে। আলাপচারিতায় প্রাধান্য পায় সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব, চলচ্চিত্র। এসব বিষয়ে দুর্লভ এবং নতুন বই আমি রিপনের মাধ্যমে সংগ্রহ করার সুযোগ পাই। অনেক বই, যেগুলোর হার্ডকপি (সরাসরি প্রিন্ট কপি) পাওয়ার সুযোগ ছিলো না, সেগুলো অনলাইন থেকে বের করে নিজে পড়তো এবং আমাকেও পিডিএফ করে পড়ার ব্যবস্থা করে দিতো। এসব বিষয়ে জ্ঞানের জগতে তার সাথে আমার একটি ভিন্নমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

বইকেন্দ্রিক আড্ডার পাশাপাশি চলচ্চিত্র নিয়ে কথা, চলচ্চিত্র দেখা সমতালে চলতে থাকে। প্রায় সকল জনরার ছবি দেখার অভ্যাস ছিলো তার। বইয়ের মতো চলচ্চিত্র নিয়েও অনেক আগ্রহ ছিলো রিপন ইউসুফের। সারা পৃথিবীর সকল ভাষার শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র দেখার বাসনা থেকে সে ল্যাপটপে ডাউনলোড করতো ছবিগুলো। আমি সেখান থেকে পেনড্রাইভে করে টেলিভিশনের বড়ো পর্দায় দেখতাম নিয়মিত। কখনো কখনো রিপনও আমার সাথে থাকতো। রিপন বাড়িতে দেখতো তার মোবাইল এবং ল্যাপটপে। অনেক ছবি ভাষার সমস্যার কারণে বুঝতে অসুবিধা হতো, সেগুলো নিয়ে তার সাথে কথা হতো। ছবি দেখতে দেখতে চলচ্চিত্রকে বোঝার অনেক পরিপক্বতা এসেছিলো রিপনের। তানভীর মোকাম্মেলের চলচ্চিত্র বিষয়ক অনেক কর্মশালায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে তার শিক্ষা চলচ্চিত্রকে ভালোভাবে বোঝার শক্তি তৈরি করেছিলো। তার সাথে এ-বিষয়ে যুক্ত হয়ে আমিও অসংখ্য পেনড্রাইভে পাগলের মতো প্রায় কয়েক শতক ভালো মানের দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্র সংগ্রহ করে ফেলি। সাথে সাথে আমার পাঠাগারে চলচ্চিত্র বিষয়ক বইয়ের সংখ্যাও অনেক পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। নরসিংদী শিল্পকলা একাডেমির চলচ্চিত্র সংসদেও রিপনকে যুক্ত করে ফেলি। সেখানে চলচ্চিত্র উৎসবের ছবি ছাড়াও বিভিন্ন সময় পর্দায় অনেক ছবি দেখার সুযোগ তৈরি হয়। রিপনের মাধ্যমে আমার কয়েক শতক ছবির সংগ্রহের তালিকা থেকে বিশ্বসেরা কয়েকটি চলচ্চিত্রের নাম উল্লেখ না করে পারছি না। ‘মন্তাজ’-এর সফল পরীক্ষামূলক ছবি রাশিয়ার পরিচালক সের্গেই আইজেনস্টাইনের ‘দ্য ব্যাটেলশিপ পটেমকিন’, চার্লি চ্যাপলিনের ‘মডার্ন  টাইমস’, ইতালির পরিচালক ভিত্তরিও ডিসিকার ‘বাইসাইকেল থিভস’, ‘টু উইমেন’, ‘সানফ্লাওয়ার’, জাপানের পরিচালক আকিরা কুরোসাওয়ার ‘রশোমন’, ‘সেভেন সামুরাই’, ফ্রান্সের পরিচালক জ্যাঁ রেঁনেয়ার ‘দ্য রিভার’, আলফ্রেড হিচককের ‘দ্য বার্ডস’, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি ‘অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নির্মিত ছবি ‘দ্য ব্রিজ অন দ্য রিভার কাউয়াই’, ‘ব্যালাড অব অ্যা সোলজার’, ব্রাজিলের ছবি ‘সিটি অব গড’, ইরানের পরিচালক মাজিদ মাজেদি’র ‘চিলড্রেন অব হ্যাভেন’, দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালক কিম কি দুকের মহামতি গৌতম বুদ্ধের দর্শন নিয়ে অসাধারণ ছবি ‘স্প্রিং-সামার-ফল-উইন্টার অ্যান্ড স্প্রিং’।

এভাবে বাংলাদেশ, ভারত, আমেরিকা, রাশিয়া, জাপান, ইতালি, স্পেন, ইসরাইল, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ইরান, কোরিয়াসহ সারা পৃথিবীর ছবি আমরা দেখেছি। ছবি পর্যালোচনা করেছি। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, বাংলাদেশের তারেক মাসুদের ছবি দেখা এবং আলোচনা প্রাধান্য পেতো। রিপন আজ নেই, সবই যেন স্মৃতির পাতায় জমা হয়ে গেলো। আর শূন্যতা আর একাকিত্বের মধ্যে পড়ে গেলাম আমি।

রিপনের লেখালেখির পাশাপাশি চলচ্চিত্র নির্মাণের আকাঙ্ক্ষাও ছিলো প্রবল। চলচ্চিত্র পরিচালকদের সাথে যুক্তও হয়েছিলেন। নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেছিলেন। পরীক্ষামূলকভাবে শর্টফিল্ম নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছিলেন। ‘দৃশ্যকল্পদ্রুম’ প্রযোজনা সংস্থার মাধ্যমে তার নির্মিত শর্টফিল্ম ‘রাস্তার কোণার লোক’-এর মধ্যে আমরা তার সম্ভাবনার চিহ্ন পেয়েছিলাম।

লেখালেখিতেও রিপন তার সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, অনুবাদেও তার হাত ভালো ছিলো। এসব মাধ্যমে ছোটো ছোটো করে লেখাগুলোর মধ্যে তাকে আলাদা করে চেনা যেতো। রূপক-প্রতীকে সুনিপুণ অলঙ্কৃত শব্দ ব্যবহারে তার লেখাগুলো অন্যদের থেকে আলাদা এবং শিল্পমর্যাদায় উন্নীত হতে পেরেছে বলে আমি মনে করি।

দীর্ঘ লেখার সুযোগ নেই, ‘গঙ্গাঋদ্ধি’তে প্রকাশিত তার শেষ কয়েকটি লেখা নিয়ে সংক্ষিপ্ত করে কিছু বলা যায়। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র ডিসেম্বর ২০২৪ সংখ্যায় তার প্রকাশিত কবিতা ‘রাষ্ট্র, তোমারে ধরতে চেষ্টা করতেছি, পারতেছি না’ কবিতাটি দেখতে পারি :

দিন দিন তুমি কেমন বিটকয়েন হইয়া যাইতেছো রাষ্ট্র! কেমন ক্রিপ্টোময়, নাগালের বাইরে। তোমারে ধরতে চেষ্টা করতেছি। পারতেছি না। এই মৃতপ্রায় হেমন্তের দিনগুলোতে তোমারে নিয়া ভাবতে বসলে প্রটোকল মাইনিং কইরা চলতে হয়। না জানি কোন ট্যাগের টেলিগ্রাম আসে! অথচ আমরা ভাবছি ভবিষ্যত হইবে ক্যাশলেস, বাইন্যান্সময়। আর মনোনয়ন পাবে, সমতার বন্দোবস্ত। কিন্তু তাকায়া দেখি পুরোনো চিন্তার নতুন নতুন এয়ারড্রপ। সত্যিই, দিন দিন তুমি কেবল বিটকয়েনই হইয়া উঠতেছো রাষ্ট্র, এক্কেরে নাগালের বাইরে। তোমারে বাঁধতে পারতেছি না এমন কোনো ব্লকচেইনে, যেখানে রাষ্ট্র হবে না কেবল ক্ষমতাবানদের, রাষ্ট্র হবে না কেবল শুয়োরের বাচ্চাদের!

ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, রাষ্ট্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কণ্ঠে প্রতিনিয়ত যা ধ্বনিত হচ্ছে, তারই ভিন্নমাত্রিক কবিতার শৈল্পিক আঙ্গিকে প্রকাশ। নরসিংদী জেলার কাগজ ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র ত্রৈমাসিক সাহিত্য সাময়িকী ‘গগনশিরীষ’ ২০২৫-এর মে সংখ্যায় রিপনের প্রকাশিত গল্প ‘একটি লাশের তদন্ত’। গল্পটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। রূপক-প্রতীকের খোলসে এই ছোটো পরিসরের গল্পটিতে তার সৃষ্টিশীল সাহিত্যরূপের স্বাদ পেয়েছি।

‘গগনশিরীষ’-এর দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রবন্ধ আঙ্গিকে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ লেখা ‘কেন ভূমিভিত্তিক জাতীয়তাবাদ; প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বাঙলাদেশ’ ছাপা হয়েছে। প্রবন্ধটিতে বাঙালির ইতিহাস পর্ব বিশ্লেষণে ভূমিভিত্তিক জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব ও যুক্তিগ্রাহ্যতা তুলে ধরেছেন সুন্দরভাবে এবং প্রবন্ধের শেষ অংশে ‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের’ বাস্তবতা উল্লেখ করে স্পষ্টত বলেছেন, “ভবিষ্যত পৃথিবীর ‘পুঁজি’ স্বাভাবিকভাবেই ‘প্রযুক্তি’। ‘প্রযুক্তি’ই নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যত।” রাজনৈতিক বাংলাদেশে কল্যাণকর জীবনের জন্যে পরিবর্তিত ‘পুঁজি’তে আমাদের অবস্থান কী হবে, এই প্রশ্ন রেখে প্রবন্ধটি শেষ করেছেন। বিষয়টি আমাদের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

অনুবাদেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন রিপন। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায় মার্কিন লেখক ও কার্টুনিস্ট জেমস থারবার (১৮৯৪-১৯৬১)-এর Fables for Our Time and Famous Poems Illustrated গ্রন্থের The Rabbits Who Caused All The Trouble গল্পটির বাংলা অনুবাদ ‘খরগোশের বাচ্চারা, যারা ছিলো সমস্ত ফ্যাসাদের মূলে’ প্রকাশিত হয়েছে। ছোটোগল্পটি খুবই অল্প কথার। কিন্তু গল্প শেষে অসাধারণ একটি ম্যাসেজ রয়েছে, “এই পৃথিবীতে পালিয়ে যাওয়াদের কোনো স্থান নেই। …দৌড়াও। যতোদূর দৌড়াতে পারো।”

পূর্বেই বলেছি, রিপনের লেখালেখি শিল্পের মানে উত্তীর্ণ। রিপন নেই, আমরা যারা আছি, আমাদের দায়িত্ব তার অল্প পরমায়ুর জীবনে যেসব সাহিত্যকর্ম রয়েছে, তা দ্রুত গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে তার সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখা।

রিপন আড্ডাপ্রিয় মানুষ ছিলো। আড্ডা আমারও পছন্দ। আমাদের আড্ডা ছিলো ঘরে-বাইরে। আড্ডা হলো পছন্দমতো জায়গায় একত্রে বসে অবাধ ও স্বতঃস্ফূর্ত কথোপকথন, যা প্রাণকে বাঁচিয়ে রাখে, যেখান থেকে প্রাণ নতুন করে জন্ম লাভ করে। রিপন আড্ডা দিতো নজরপুরের চেঙ্গাতলী বাজারের চায়ের দোকানে, বদরপুর ব্রিজ সংলগ্ন চায়ের দোকানে, বটতলা বাজারের চায়ের দোকানে, গ্রন্থকল্পদ্রুম, বই-পুস্তক লাইব্রেরিসহ আরো অনেক স্থানে। টেলিফোনে জানতে চাইতাম, রিপন তুমি কোথায়? উত্তর আসতো চেঙ্গাতলী, বদরপুর, বটতলা বাজার। এই তিন জায়গাতেই আড্ডা বেশি চলতো, বিদায়বেলায় বই-পুস্তক ও ছাপাঘরে। আড্ডায় শুধু নানা বিষয়ে কথোপকথনই নয়, চলতো শিল্প-সাহিত্যের চর্চাও।

রিপন আজ নেই, মনে পড়ছে অনেক কথা, অনেক স্মৃতিময় সময়। পারিবারিক-ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আমার সাথে পরামর্শ করতো। বাবার অনুপস্থিতিতে মা, বড়ো ভাইকে নিয়ে সংসার পরিচালনা বিষয়ে কথা হতো। কথা হতো একটি মানসম্মত বইয়ের দোকান গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ‘গ্রন্থকল্পদ্রুম’ প্রতিষ্ঠা বিষয়ে, সিনেমা নির্মাণ প্রসঙ্গে, আমাকে নিয়ে ‘মৃদুস্বরের উজ্জ্বল আলো’ গ্রন্থ প্রকাশ বিষয়ে। গ্রন্থটি প্রকাশে সুমন ইউসুফ, শাহীন সোহান, শাহীনুর মিয়ার সাথে রিপন ইউসুফেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অংশগ্রহণ ছিলো। একদিন দীর্ঘসময় তার জীবনের কথা, একটি মেয়েকে ভালোবাসার কথা, জীবনের নানা পরিকল্পনার কথা শুনেছিলাম— সবই আজ স্মৃতি।

২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রিপন অসুস্থ হয়ে পড়লো। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ‘সিআইডিপি’ নামক দুরারোগ্য ব্যাধি শনাক্ত হলো। ডাক্তারই তাকে বলেছিলো, এই রোগ ভালো হওয়ার নয়, নানা উপসর্গ নিয়ে জীবনের সমাপ্তি ঘটবে। শুরুও হয়েছিলো সেসব অবস্থা : হাঁটতে না পারা, চোখের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলা। সে চেষ্টা করেছিলো মানসিক শক্তি নিয়ে সব মোকাবেলা করার। মা-বড়ো ভাই রাসেল চিকিৎসার কোনো ত্রুটি করেনি। আমরাও ডাক্তারদের সাথে কথা বলেছি। ডাক্তারদের কথা, চিকিৎসা চলবে, কিন্তু রোগের চির মুক্তি ঘটবে না। অসুস্থতার সময়গুলোতে তার মনের অবস্থার কথা ভাবতে গিয়ে হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।

একদিন সময় এলো। জীবনের অনেক স্বপ্নকে অপূর্ণ রেখে হলো তার চির বিদায়। নবীপুর কবরস্থানে নির্জনে ঘুমিয়ে আছে রিপন ইউসুফ। তার আত্মার শান্তি হোক।


গোলাম মোস্তাফা মিয়া
সাবেক অধ্যক্ষ, নরসিংদী সরকারি কলেজ

আমরা কেন রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি

আমরা দাঁড়িয়ে আছি মৃতদেহের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার অনুষ্ঠানের মুখোমুখি হয়ে। আমাদের পাশে আমাদের বন্ধুর মৃতদেহ অথবা আমাদের বন্ধুর মৃতদেহের পাশে আমরা। যেমন আমরা পাশাপাশি বসেছি অনেকদিন অথবা দিনের পর দিন। আমরা ভাবছি, আমাদের সময়গুলোকে যেভাবে আমরা ভাবতে শিখেছিলাম কিংবা শিখেছিলাম চিন্তাগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখতে। আমরা বেড়ে ওঠতাম, অশ্বত্থ গাছের তলায় যেভাবে বেড়ে ওঠতো নকশা করা পাতাঅলা গাছ। আমরা বাতাসের সঙ্গে পরিচিত হতাম আমাদের নিজস্ব কায়দায়। কিন্তু জানাজার নেতৃত্বদানকারী ইমাম সাহেবের অপরিচিত ছিলাম সামাজিক সামষ্টিক কায়দার কারণে। তিনি চিনতে পারতেন না রিপন ইউসুফকে, বিগত দিনগুলোতে এমনকি তার প্রয়াণ দিবসেও। তিনি চিনতে পারেননি আমাদেরকেও, যারা এসেছি এলাকার বাইরে থেকে। তার মতো সবাই তাকে চিনতো এলাকাবাসী হিসেবে, যার বাবা তার মতো অকালপ্রয়াত হয়েছিলেন বেশ আগেই। কিন্তু আমরা চিনতাম আমাদের বন্ধুকে, যে অনুধাবন করেছিলো যে, ‘আগন্তুক’ সিনেমার মামার মতো আমাদের একসাথে বসে আড্ডা নামক বস্তুটির গতিপথটি ঠিক কোনদিকে হওয়া প্রয়োজন এবং আমরা ঠিক কোনদিকে আমাদের নিজেদেরকে নিয়ে যাবো। তখন আমাদের বাকিদের হয়তো এতো অল্প বয়সে ‘প্রয়োজন’ শব্দের ওজনের মানদণ্ড গজিয়ে ওঠেনি, তাই আমরা হয়তো এর ভার ঠাহর করে ওঠতে পারিনি। আমাদের বাকিদের কাছে এই ‘প্রয়োজন’ শব্দটি ছিলো এক-আধটু বই পড়া বা ভিনদেশি সিনেমা দেখে অন্যদের থেকে নিজেকে একটু আলাদা করার প্রক্রিয়া। সোজা কথায় যদি বলি, একটু লোকেদের দেখানো যে, দেখো, আমরা কেমন জাতে উঠছি! কথাটাকে ‘শোঅফ’ বলে দিলে সবার ধরতে হয়তো সুবিধা হয়। কিন্তু রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠছিলো সবার চেয়ে আলাদা। নিজের বোধশক্তির উন্নতির জন্যে ছিলো রিপন ইউসুফের এই যাত্রা। এই যাত্রায় রিপন ইউসুফ যে-আলো জ্বেলেছিলো, বাকি বন্ধুদের মতো সেই আলো প্রবেশ করেছিলো আমার চোখেও। সেই আলোতে আমি বুঝতে চেয়েছি, আমরা কেন রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি।

তার সাহিত্যপাঠের উদ্দেশ্য ছিলো জীবনকে নিবিড়ভাবে জানা, আরো বিশেষভাবে বললে এই অঞ্চলের আদি মানুষের সরল জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ। এই বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্যও ছিলো তার। এই বিষয়ে তার জোরালো বক্তব্যও ছিলো। তার মতে, এখানকার আদি মানুষের সঠিক ইতিহাস না জানলে এখানকার মানুষকে কখনোই বোঝা যাবে না আর এখানকার মানুষকে না বুঝলে মানুষের জন্যে যেকোনো উন্নয়নই মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

আমার বন্ধু রিপন ইউসুফ সদ্যপ্রয়াত। এই প্রেক্ষিতে সামগ্রিক স্মৃতিচারণ আমার এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। বরং আলবেয়র কাম্যু’র মুরসাল্টের মতোন রিপন ইউসুফ কোনো চরিত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলো কি না, যে প্রচলিত সত্যের বাইরে কোনো গভীর সত্যের প্রতি টান অনুভব করতো; যেটা নিশ্চিতভাবেই কোনো দায়বদ্ধতা না হয়ে শুধুই একটা টান অনুভব থেকেই হতো।

নিষ্ঠুর রসিকতার জন্যে সে ছিলো একদমই আলাদা। যেকোনো বিষয়ে তার রসিকতা অনেক সময় মানুষকে বিব্রত ও বিভ্রান্ত করেও দিতো। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সেটা নিষ্ঠুরতার মাত্রা ছাড়িয়ে ব্যক্তিকে বিষাদগ্রস্ত করে দিতো। এখানে একটা বিষয় ভাবার থাকে, এই নিখাদ রসিকতার পেছনে রিপন কতোটা দায়ী ছিলো অথবা যাকে নিয়ে এসব রসিকতা করা হতো, তারা নিজেরা কতোটা দায়ী ছিলো। তাদের ভাঁড়ামির বিপরীতে সান্ত্বনার প্রত্যাশায় রিপন ইউসুফের কাছে আসা এবং তার বিপরীতে প্রাঞ্জল রসিকতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আত্মপক্ষপাতদুষ্ট না হলে হয়তো তারা নিজেদের ভাঁড়ামি অতিক্রম করে নিজেদেরকে নির্মাণের সুযোগ দিলেও দিতে পারতো। রিপন ইউসুফের আয়নায় তাদের নিজেদেরকে দেখার ব্যর্থতা কি রিপন ইউসুফের আয়নার অস্বচ্ছতা নাকি তাদের নিজেদেরকে না দেখার প্রকাণ্ড অনিচ্ছা, তা বুদ্ধিমানদের কাছে প্রশ্ন রাখা যেতেই পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, যেচে রসিকতা করার উদাহরণ রিপন ইউসুফের ক্ষেত্রে বিরল। ব্যক্তি রিপন ইউসুফের এই বিতর্কিত গুণটি তাকে অন্যদের থেকে সমাজে আলাদা ও প্রাসঙ্গিক করেছে নিশ্চিত রূপেই। রিপন ইউসুফ সকলের কাছে সর্বপ্রথম পরিচিত হয়ে ওঠেছিলো একজন চলচ্চিত্র বোদ্ধা হিসেবে। যদিও তার সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যের পাঠ চলছিলো সমানতালেই। সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে পরিকল্পনা ছিলো তার বেশ আগে থেকেই। পাশাপাশি চলছিলো প্রস্তুতি। আমার মতো অনেকেরই ভিন্ন দেশের ভিন্ন রূপের সিনেমার পরিচয় হয়তো রিপনের কাছ থেকেই। প্রথম বয়সে সিনেমা নির্মাণ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আয়োজন থাকলেও হয়তো সেটা বাস্তব হয়ে ওঠতো না বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে। সেই সীমাবদ্ধতার ছিলো বিবিধ কারণ, যে-বিষয়ে আমি লিখতে অনিচ্ছুক।

সিনেমাটোগ্রাফি বিষয়ে চমৎকার ধারণা ছিলো তার। বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলো সে এই বিষয়ে। সিনেমা নির্মাণের টানে মফস্বল পেরিয়ে রাজধানীতে গেলেও সেখানকার পেশাদারদের কাজ এবং কাজের মান নিয়ে তার ছিলো হতাশা। যে-মানের কাজ রিপন দেখতে চাইতো বা কাজ হবে বলে মনে করতো, সেই মানের কাজ সেখানে সে পায়নি। নিরাশ হতে হয়েছিলো তাকে। ‘ঘুড়ি’ ও ‘যিশু আপনি কোথায়’ নামক দুইটি শর্টফিল্ম করার চেষ্টা করে। তারপর হাত দেয় শর্টফিল্ম ‘রাস্তার কোণার লোক’ বানানোর কাজে। চমৎকার গল্প আর চিত্রনাট্য থাকলেও যে-সমস্যা সামনে এসে দাঁড়ায়, তা হলো কারিগরি ও বাজেট দুর্বলতা। সিনেমাটির গল্প সূক্ষ্ম মেকআপ এবং ফিনিশিংয়ের দাবি রাখতো। সেখানে অপ্রতুল বাজেট এবং মেকআপ সুবিধার কারণে বেশকিছুটা খাপছাড়াও লেগেছিলো। বাজেট যদি আরো বেশি থাকতো, তবে হয়তো তা সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ না হলেও ঋতুপর্ণর ‘হীরের আংটি’ হয়ে ওঠতে পারলেও পারতো। রিপন ইউসুফের নিজের কাজের প্রতি খুব বেশি আত্মতুষ্টি ছিলো না কখনোই। সিনেমা হচ্ছে এমন একটি শিল্প, যেখানে অনেক লোকের পরিশ্রম একত্রিত হয়ে সিনেমা আকারে রূপ নেয়। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগের অনীহা ও আলসেমি রিপন ইউসুফের সিনেমা বিষয়ক প্রতিভা ও জ্ঞানকে বঞ্চিত করেছে নিশ্চিতভাবেই। তবে তার সিনেমা বিষয়ক অগাধ জ্ঞান স্রেফ তার সিনেমার প্রতি অনুরাগের ফসল বলেই আমার মনে হয়। সিনেমা পরবর্তী সময়ে সাহিত্য হয়ে ওঠেছিলো তার প্রধান বিচরণ ক্ষেত্র। সাহিত্যের বিভিন্ন জায়গায় ছিলো তার বিচরণ। উপন্যাস, ছোটোগল্প, কবিতা, ইতিহাস, প্রবন্ধÑ সবই ছিলো তার পাঠের বিষয়। তার ব্যক্তিগত বইয়ের সংগ্রহ দেখলে তা সহজেই বোঝা যায়। এমন না যে, শুধু বই সংগ্রহ করতো সে, বই সে পাঠও করতো। তার সংগ্রহে থাকা এমন বই খুব কমই আছে, যা সে পড়েনি। আমাদের পরিচিত একজন লোক ছিলেন, যার সংগ্রহে অনেক বই ছিলো। রিপন ইউসুফের তার বইয়ের উপর বেশ লোভ ছিলো এবং সেই লোকের মৃত্যুর পর তার বইয়ের সংগ্রহের উপর তার একটা বাসনা ছিলো। কারণ সেই লোকের সন্তানেরা বই তেমন পড়ে না, তারচেয়ে রিপন বইগুলো নিয়ে নিলে অনেকদিন ধরে এগুলো সে পাঠ করতে পারবে। যদিও-বা এগুলো ছিলো স্রেফ কথার কথা। আমার এই ঘটনার উল্লেখ করা শুধু এটা বোঝানোর জন্যে যে, পার্থিব জীবনে রিপন ইউসুফের আকর্ষণের বিষয় ও বস্তুটি তুলে ধরা। যদিও হায়, এখন রিপন ইউসুফের সংগ্রহের বই নিয়ে কী করা হবে, তা আমরা বন্ধুরা ভাবছি। এখনো আমরা এই তল্লাটে তার বইয়ের উপর লোভ করা কাউকে খুঁজে পেয়েছি কি? সাহিত্যের ছোটোগল্প ও কবিতার প্রতি তার অনুরাগ ছিলো বিশেষ। সাহিত্যের প্রায় সব জায়গায় তার নিবিড় পাঠ থাকলেও ছোটোগল্প ও কবিতা লেখার বিষয়ে সে ছিলো বিশেষ আগ্রহী। তার কবিতার মাঝখানে লাতিন সাহিত্যের গন্ধ পাওয়া যেতো। লেখাগুলো কেমন তার নিজের লেখারই অনুবাদ মনে হতো। এটাকে হয়তো সাহিত্যে নতুন কিছু করার প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। কবিতা লেখার পর কিছু কবিতা সে আমাকে পাঠ করতে দিতো। কিছু কিছু কবিতার চিত্রকল্প নির্মাণ ছিলো বেশ জোরালো ও সচেতন। কবিতার সচেতন নির্মাণে রিপন ইউসুফ ছিলো অতীব মনোযোগী। শব্দের ভারিক্কিহীন ব্যতিক্রমী প্রকাশ রিপন ইউসুফের কবিতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিলো কবিতার মাঝে রিপন ইউসুফের নিজস্বতার ছাপ অর্থাৎ কবিতা পড়তে দিলে নাম না দেখেই বলে দেয়া যেতো, এটা রিপন ইউসুফের কবিতা। ছোটোগল্পের ব্যাপারে তাকে বেশ নিরীক্ষাধর্মী লেগেছে। কবিতার মতো গল্পের ক্ষেত্রেও সে তার নিজস্বতার ছাপ রাখতে পেরেছে বলেই আমার মনে হয়। তার কিছু ছোটোগল্প আমার কাছে ভালো লেগেছে। তার একটা গল্প আমার বিশেষভাবে ভালো লেগেছিলো। গল্পটি ছিলো এক যুবক আর একটি বিড়ালকে কেন্দ্র করে। গল্পটিতে চরিত্রের পরিবর্তন বেশ চমকপ্রদ ছিলো। গল্পটি প্রথম পাঠেই আমি মুগ্ধ হয়ে যাই এবং তাকে এটা জাতীয় মাসিক সাহিত্য পত্রিকায় ছাপানোর পরামর্শ দিই। তখন সে আমাকে জানায়, সে আরো কিছু গল্পসহ বই প্রকাশ করতে চায়। তার লেখার সমালোচনার বিপরীতে তার প্রতিক্রিয়া কিছুটা তীব্র ছিলো। তার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়াই হয়তো এর কারণ ছিলো। মাঝে মাঝে এমন হয়েছে, তাকে ইচ্ছে করে রাগান্বিত করার জন্যে আবোল-তাবোল কিছু সমালোচনা করে দিতাম… ওই যে, নিষ্ঠুর মজা…! আমরাও কি কম করেছি? যা-ই হোক, হয়তো গল্পগুলো বই আকারে প্রকাশিত হলে পাঠকের তা ভালো লাগতেও পারে।

তার কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী লেখাও আছে, যা এখানকার ইতিহাস-সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদ বিষয়ে তার নিজস্ব বিশ্লেষণ। সেই বিশ্লেষণ ছিলো সুচিন্তিত ও প্রাসঙ্গিক। এই ধরনের লেখায় তার রাজনৈতিক সচেতনতা প্রকাশ পায়। তার রাজনৈতিক চিন্তায় সে এমন একটি ‘টানেল’ পদ্ধতিতে বিশ্বাস করতো, যেখানে আপনি যে-মতবাদেই বিশ্বাস করেন না কেন, আপনাকে নিয়ম মেনে সেই টানেলে ঢুকতে হবে এবং নিয়ম মেনে অন্যের অসুবিধা না করে আপনার নিজস্ব বিকাশ ঘটাতে হবে। চিত্রনাট্য লেখার একটা চিন্তাও সে করেছিলো। লিখেছিলোও একটা। তবে সব ছাপিয়ে একটা বিষয় বিশেষভাবে পরিলক্ষিত, তার সাহিত্যপাঠের উদ্দেশ্য ছিলো জীবনকে নিবিড়ভাবে জানা, আরো বিশেষভাবে বললে এই অঞ্চলের আদি মানুষের সরল জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে তার জানার আগ্রহ। এই বিষয়ে বিশেষ পাণ্ডিত্যও ছিলো তার। এই বিষয়ে তার জোরালো বক্তব্যও ছিলো। তার মতে, এখানকার আদি মানুষের সঠিক ইতিহাস না জানলে এখানকার মানুষকে কখনোই বোঝা যাবে না আর এখানকার মানুষকে না বুঝলে মানুষের জন্যে যেকোনো উন্নয়নই মানুষের কোনো কাজে আসবে না। এখানকার তান্ত্রিক জীবনের পদ্ধতির বিস্তারিত ছিলো তার গবেষণার বিষয়। তার মতে, তান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থাই এখানকার আদি এবং প্রাসঙ্গিক জীবন ব্যবস্থা। এটি হারিয়ে যায়নি বরং তান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা বর্তমানে বিদ্যমান আছে বিচ্ছিন্নভাবে। এই জীবন ব্যবস্থাকে কেবল ফিরিয়ে আনতে পারা যাবে এর নিবিড় পাঠ ও প্রয়োগের মাধ্যমে। সে মনে করতো, এখানে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করেছিলো আর্যরা, যারা এখানে দ্বিতীয় ধাপে প্রবেশ করেছিলো এবং এখানকার বিদ্যমান তান্ত্রিক জীবনের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিলো বিভিন্ন ঈশ্বর ব্যবস্থা চাপিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। এবং এখানকার আদি বাসিন্দারা পাহাড়ে বা দুর্গম অঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলো তাদের সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে। বিক্ষিপ্তভাবে হলেও তারা কিছুটা সেই ব্যবস্থা ধারণ করে। তাদের মাতৃতান্ত্রিক জীবন ব্যবস্থা এই তান্ত্রিক জীবনের একটি অন্যতম দিক, যেখানে একজন নারী পরিবারের প্রধান হিসেবে বিবেচিত হন এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করেন। তদের জীবন ব্যবস্থার কিছু চমকপ্রদ বিষয় সে আড্ডায় তুলে ধরতো। এছাড়া ইউরোপীয় খাপছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে আমাদের গুরুমুখী শিক্ষার প্রাণনাশ করলো এবং এই ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের মাঝে কীভাবে কেরানি মানসিকতা উৎপাদন করছে আর এই উৎপাদিত মানসিকতা কীভাবে আমদানি করছে পশ্চিমের অযাচিত চাহিদার জঞ্জাল, তা আড্ডায় আলোচনা করতো। এসবই ছিলো তার বিস্তর পাঠের ফসল, যা উৎপাদিত হয়েছিলো কেবল পাঠের প্রতি ভালোবাসা থেকে। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি তার কখনোই আস্থা ছিলো না। দশম শ্রেণিতে টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করেছিলো সে। অংক এবং হিসাববিজ্ঞানে। ফলে পরের বছর এসএসসি দিতে হয়। এইচএসসিতে সারাদিন কলেজের বাইরে বাইরে বদরপুর থেকে বুধিয়ামারা ঘুরে বেড়াতো বন্ধুদের সাথে আর বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আর আড্ডা চলতো। ফলাফল যা হবার, তা-ই হলো, অই কোনোরকম পাশ। ভর্তি হলো শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটিতে ফ্যশন ডিজাইনের ছাত্র হিসেবে। টিকলো না সেখানে। তারপর স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজে। সেখান থেকেও চলে এলো, গ্রাজুয়েশন হলো না। আমি বললাম, গ্র্যাজুয়েশন করলি না, এখন ভদ্রঘরের মেয়ে দিবে তোকে কেউ? উত্তরে হাসতো আর বলতো, আরে খোক্কা, যখন লাগবে, ঠিকই বিয়ে করে নেবো। বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলো একবার, একটা বায়োডাটা তৈরি করেছিলো। আমাকে দেখালো, আমি দেখলাম পেশার ঘরে লেখা : লেখক ও সম্পাদক। আমি পেট ফাটিয়ে হাসলাম আর বললাম, এই বায়োতে বিয়ে হবে না, সংশোধন করতে হবে। লিখতে হবে দলিল লেখক ও সাধারণ সম্পাদক, তাহলেই বিয়ে হতে পারে।

রিপন ইউসুফ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেছিলো এক জ্ঞানের প্রতিচ্ছবি। কেউ যদি ব্যক্তিবিদ্বেষ এবং তর্কের জন্যে তর্ক করতে না চায়, তাহলে তাকে এই কথাটা মানতে হবে। যদিও কথাটা সিদ্ধান্ত এবং স্পর্শকাতর বিষয়, তবু হ্যাঁ, আমাকে এখানে পৌঁছুতেই হয়। সে আমাদের মধ্যে বহু অপরিচিত ও অপ্রচলিত আলাপ ও চিন্তা জারি রেখেছে। তার এই অপ্রচলিত চিন্তা বর্তমানে ব্যাপক প্রচলিত ব্যবস্থার বিপক্ষে একটি শক্ত ধাক্কা নিঃসন্দেহে। আর এই প্রচলিত অসম্পূর্ণ জীবন ব্যবস্থা থেকে মুক্তির জন্যে আমরা যখন আমাদের মস্তিষ্ককে ব্যবহার করি, তখন আমরা প্রকারান্তরে রিপন ইউসুফই হয়ে ওঠি। রিপন ইউসুফ কেবল আমাদের বন্ধুরই নাম নয় বরং একটি চিন্তার নাম। সে মনে করতো, আমাদের এই অঞ্চলে ইন্টেলেকচুয়াল মানুষের বড়ো ঘাটতি। এখানকার বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা সবলভাবে দাঁড়ায়নি। এখানকার সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তার নিষ্ক্রিয়তা তার কথার স্বপক্ষে শক্ত প্রমাণ। আমরাও যখন এই দুর্যোগ সমভাবে অনুভব করি, তখন হ্যাঁ, আমরাও রিপন ইউসুফ হয়ে ওঠি।


নাজমুল শাহরিয়ার কবি

হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো মনীষাফুল

0

বাঙলা অঞ্চল রিপন ইউসুফের প্রধানত চূড়ান্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বাংলাদেশের স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতকে হৃদয়ে ও মগজে ধারণ করে বর্তমানের বিধ্বস্ত দিশাহীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সমাধান খোঁজার চেষ্টায় রত ছিলো নিয়ত।

সাহিত্যের বাজারে পূর্ণরূপে আত্মপ্রকাশ যে সাধনার বিষয়,  দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে একটা প্রকৃষ্ট মাহেন্দ্রক্ষণে এটা ঘটে— এই বোধবুদ্ধি রিপন ইউসুফের জানা ছিলো খুব যথাযথভাবেই। এমনিতেই দেশি-বিদেশি সাহিত্যপাঠের গহ্বরেই তার নিত্য পরিভ্রমণ ছিলো। মূলত সে লিখতো কবিতা, পরে গল্প, তারও পরে প্রবন্ধ। তবে গল্প নিয়ে বেশি সিরিয়াস ছিলো। জাতীয় বিভিন্ন পত্রিকায় গল্প ছাপা হবার পর আত্মবিশ্বাসও বেড়ে গিয়েছিলো। তার প্রথম গল্পগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত ছিলো, এবং প্রকাশনীর দ্বারে করাঘাত করা হচ্ছিলো মাত্র।

কিন্তু রিপন ইউসুফ সাহিত্যের পরিমণ্ডলে নিছক ‘সাহিত্য’ করার জন্যেই বিচরণ করতে চায় নাই। এরকম অভীপ্সা তার ছিলো না। সে একটা ফিলোসফি ধারণ করতো। সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায় অনুভব করতো।

বাঙলা অঞ্চল রিপন ইউসুফের প্রধানত চূড়ান্ত আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো। রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বাংলাদেশের স্বর্ণোজ্জ্বল অতীতকে হৃদয়ে ও মগজে ধারণ করে বর্তমানের বিধ্বস্ত দিশাহীন বাংলাদেশের উন্নয়নের সমাধান খোঁজার চেষ্টায় রত ছিলো নিয়ত। এবং সমাধান সে জানতোও। মূলত এগুলোই রিপন ইউসুফের লেখালেখি, পড়াশোনা আর চিন্তার নিয়মিত অনুষঙ্গ ছিলো।

চারপাশে এই যে রাষ্ট্র আর রাজনীতি বুঝে ফেলা প্রচুর মানুষের দঙ্গল, নিজেদের মগজে যতোটুকু ধারণক্ষমতা, ততোটুকু দিয়েই সমাজ-রাষ্ট্র-দর্শন ইত্যাদি নিজেদের বাপ-দাদা প্রভাবিত মতামত দ্বারা আদিষ্ট হয়ে উচ্চবাচ্য করা মানুষের মব, ৫৪ বছরেও বুদ্ধিজীবী আর তাত্ত্বিকদের ব্যর্থতার ভাগাড় এই আমার রাষ্ট্র, কেন এখনো ভাগাড়ই রয়ে যাবে— এইসব প্রশ্ন উত্থাপন আর উত্তর খোঁজার চিন্তার প্র্যাক্টিস রিপন ইউসুফের মজ্জাগত বিষয় ছিলো। মানুষেরা আসলে ভালো সমাধান চায়, কিন্তু এর বিপরীতে একেকজন বিএনপি, আওয়ামী লীগ, বাম আর হেফাজতের ভেতর এসবের সমাধান খোঁজে, এরকম ভাবনায় রিপন ইউসুফ প্রথমে আমোদ অনুভব করতো, পরে গভীরভাবে ভাবতো। একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে রাষ্ট্রে, প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধপরায়ণতায় নিয়মিত ব্যস্ত থাকছে মানুষেরা, একই কাজ কিন্তু সবাই করছে, দুই বা তিনদলে বিভক্ত হয়ে একে অপরকে একই ভাষায় গালাগাল করছে— স্বৈরাচার, ফ্যাসিবাদ এরকম বলে। এবং এসব তৎপরতাকে মানুষ ভাবছে রাজনীতি। এইসব তাৎপর্যহীন আচরণ আর এক্টিভিজম চলছে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী।

সাইত্রিশ বছরের একটা যুবক এক দশক নিবিষ্টভাবে পরিশ্রম ও সাধনা করে গেছে সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো শিল্পকলার এমনসব উৎকর্ষের সাথে, যা নিজের সাথে সাথে সমাজ-রাষ্ট্র বা মানুষের অন্তর্জগতে আলোড়ন তুলতে পারার মতো গৌরব বয়ে আনতে পারতো।

রিপন ইউসুফ সমাজ আর রাষ্ট্রকে আর সামাজিক বা রাজনৈতিক দর্শনকে পরিশুদ্ধ করার পথঘাট খুঁজে পেয়েছিলো বাঙলার একদম প্রাকআর্য যুগে। সেখান থেকেই মণিমুক্তা সংগ্রহ করে প্রচার করাই ছিলো তার সাহিত্য আর বক্তব্য আর চিন্তার প্রধান অভিপ্রায়। প্রস্তুতিও শেষ হয়ে গিয়েছিলো। এখন কেবল প্রকাশের পালা।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির ১০ তারিখ আমরা নির্ধারণ করেছিলাম ‘রিপন ইউসুফের একক বক্তৃতা’ আয়োজনের। বিষয় ছিলো ‘কেন জাতীয়তাবাদ; প্রসঙ্গ রাজনৈতিক বাংলাদেশ’। নরসিংদীতেই আয়োজন করার প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিলো আমাদের। বর্তমান রাষ্ট্রের জন্যে এক আলোচিত বিষয় ছিলো এটা। উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বও ছিলো। জাতীয়তাবাদ নিয়া মানুষের যে আপ্ত কিছু ধারণা আর জ্ঞান, যে নিন্দা আর ভুল বোঝাবুঝির আস্তরণ, মূলত এগুলো নিরসনের চেষ্টা করা যুক্তি আর বাস্তবতার মাধ্যমে— এই আয়োজনের উদ্দেশ্য ছিলো এরকমই। কিন্তু হায়, জানুয়ারির শেষের দিকেই তার দুরারোগ্য ব্যাধি ধরা পড়ে এবং নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে থাকে। কেবল মনের জোরে পরবর্তী আট মাস টিকে ছিলো সে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এতোটা সক্রিয় ছিলো না রিপন ইউসুফ। সে যে-সোসাইটিতে বসবাস করতো, সেখানেও নয়। খুব অল্প মানুষের সাথেই কথা-গল্প-আড্ডা আর চিন্তা বিনিময় করতে পারতো।

রিপন ইউসুফ ৫ আগস্টের একদিন পর ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলো, অভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল! আমরা এক বছর অতিবাহিত করার পর তার ভবিষ্যতবাণীর মর্ম বুঝতে পারছি।

এটা আমাদের জন্যে বড়ো বেদনার মতো বাজে যে, সাইত্রিশ বছরের একটা যুবক এক দশক নিবিষ্টভাবে পরিশ্রম ও সাধনা করে গেছে সাহিত্য, দর্শন, চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো শিল্পকলার এমনসব উৎকর্ষের সাথে, যা নিজের সাথে সাথে সমাজ-রাষ্ট্র বা মানুষের অন্তর্জগতে আলোড়ন তুলতে পারার মতো গৌরব বয়ে আনতে পারতো। অথচ সবকিছু একটা ব্যাগে ভরে আত্মপ্রকাশের রাস্তায় পা ফেলার সাথে সাথেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো। আর দেখা গেলো না কোথাও। আমরা এটা জেনে ফেলেছি যে, সত্যিকার অর্থেই আর কখনো কোথাও তাকে দেখা যাবে না। কী হাস্যকর অদ্ভুত বিচারব্যবস্থা নিয়তির! মানুষজন্মের অ্যাবসার্ডিটি নিয়ে নূতন করে আর ভাবার কী আছে বুঝি না!

রিপন ইউসুফের অপ্রকাশিত সব লেখাপত্র শীঘ্রই প্রকাশিত হচ্ছে বলে জানি। তার চিন্তার প্রদীপ প্রজ্জ্বলিত থাকবে সদা তার সেসব লেখার মধ্যেই।


সুমন ইউসুফ
সভাপতি, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

রিপন ইউসুফ কোথায় গেলো

0

রিপনের সাথে তর্কটা এখানো শেষ হয়নি, তার আগেই সে চলে গেলো; এভাবে চলে যাওয়ার অভ্যাস তার আগে ছিলো না। কে জানে কী হয়েছে, হুট করে এভাবে তর্কের মাঝপথে বিরতি দেয়াটা ভালো হয়নি; সবার তর্কের দম থাকে না, সবাই তর্ক বোঝেও না, তর্কের বিষয় রেখে অধিকাংশই ব্যক্তিগত বিষয়ে ঢুকে পড়ে, তারপর যা হবার তাই হয়; তর্ক ঢুকে পড়ে পরচর্চার কুৎসিত অন্ধ গলিতে। রিপন এমন অন্ধ গলির নোংরা ময়লা এড়িয়ে চলতে জানে। তাই রিপনের সাথে তর্কটা জরুরি।

কবিতা, কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, চিত্রকলা, দর্শন, রাজনীতি, অর্থনীতি, দেশ, রাষ্ট্র, সমাজ নিয়ে আমাদের অনেক কথা বাকি আছে। কবিতা লিখে কি আসলেই কিছু হয়? কিংবা সিনেমা কতোটুকু ভূমিকা রাখে আসলে সমাজে? আর রাখলেই বা কী, কতোজন সেটি দেখতে যায়? এর থেকে বোধ হয় রাজনীতি অনেক সরাসরি বিষয়। রাষ্ট্র নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে আলাপের একটা পথরেখা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু রাজনীতি কারা করে? কেন করে? কী তাদের রাজনীতি? দেশ, মানুষ, প্রকৃতি-প্রযুক্তির সাথে তাদের সংযোগ কেমন?

রেলস্টেশনের বটতলা কিংবা মেঘনার পাড়ে শ্মশানঘাট, থানারঘাট অথবা দূর নির্জন আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারে কবি রিপন ইউসুফের সাথে অসংখ্য বিতর্ক এখনো বাকি।

এসব আলাপ আসলে অদরকারি। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া মানুষের কোনো পথ নাই। তো মানুষের মুক্তির জন্যে কতো টাকা লাগে? কী পরিমাণ সম্পদ হলে মানুষ ভাবতে পারে যে, তার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটেছে? এই মাত্রা কে নির্ধারণ করবে? মানদণ্ডের বাটখারা সেই লোকটাকেই-বা আমরা মানতে যাবো কেন? হিউম্যান সাইকোলজি এখানে কী বলে? ‘ডিজায়ার’ কি কোনো মাত্রায় পরিমাপ করা সম্ভব? দেল্যুজ তো বললো, মানুষের ‘ডিজায়ারিং মেশিন’-এর তো কোনো সমাপ্তি নাই। এটা কি যোগ দর্শনের ‘চিত্তবৃত্তি নিরোধ’? চিত্তবৃত্তি না থাকলে মানুষের থাকে কী? কিছু একটা তো থাকতে হবে।

কী আছে মানুষের? ঐ একটা মাথা, আর সেটা ভর্তি করা চিন্তা-দুশ্চিন্তা-কুচিন্তা। এই চিন্তার মালিক তো সে নিজে না, অন্য কেউ চিন্তা রেডি করে দেয়ার পর সে এক্সিকিউট করে বেড়াচ্ছে। চিন্তাও যদি নিজের না হয়, তাহলে কী আছে তার? শরীর? সেটি কি চিন্তার ফল? নাকি শরীরের ফল চিন্তা? শরীর না থাকলে কি তার চিন্তা থাকতো? চিন্তা না থাকলে কি তার শরীর থাকতো? ডিম আগে না মুরগি আগের দশা। ভাই, শেষ পর্যন্ত আমার সারভাইবাল কোশ্চেন, আমাকে তো নিজেকে বহন করে নিয়ে যেতে হবে।

কিন্তু এর তো একটা ভিত্তি আছে, কোথাও দাঁড়াতে হয়, আমরা কি কোথাও দাঁড়াতে পারছি? আমাদের কোনো একটি পাটাতনে দাঁড়াতে দেয়া হচ্ছে না। কারা দিচ্ছে না, কেন দিচ্ছে না, সেটি তারা পারে কীভাবে? ঐ দেখবেন, কিছু বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বুদ্ধিজীবীর ভেক ধরে জাতিকে জ্ঞান দিচ্ছে, সে এই জ্ঞান কোথায় পাইলো, কিছু বিশ্ববিখ্যাত তাত্ত্বিকের নাম আওড়াতে দেখবেন, ঐ-সকল তাত্ত্বিকের কপি করে কিন্তু তার মতো আর দাঁড়াতে পারে না, কারণ তাদের দাঁড়াবার আলাদা শক্ত পাটাতন আছে, সেখানে আমার জায়গা হবে না, এটা মাথায় রাখতে হবে, সে তার জায়গা আমার জন্যে ছেড়ে দিবে না, কিন্তু আমি তো উদাম করে দাঁড়িয়ে আছি, সমস্যা এখানেই, আপনার মাটিতে আপনার পা নেই, ভেসে ভেসে বেশিদূর যাওয়া যাবে না, ধপাস করে পড়ে যাবেন, নাক-মুখ থেতলে যাবে।

অবশ্য এই থেতলানো মুখ পুঁজি করে আবার ভিক্ষা ভালো পাওয়া যায়, নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে রাখতে চাইলে, আর কোনোমতে ভিক্ষুদের সর্দারি বাগিয়ে নিতে পারলে এক জীবন ভালোই কেটে যেতে পারে। পশ্চিমের লোকজন বেশ দয়ালু হয়ে ওঠেছে, তারা সব শুষে নিলেও নিজেদের মলমূত্র সাফ করানোর জন্যে কামলা বাঁচিয়ে রাখে, আর বেঁচে থাকার মতো পরিমিত ভিক্ষা তারা দেয়, এই উদারতা তাদের আছে। পশ্চিমা তাত্ত্বিকের তৈরি করা তত্ত্ব ভিক্ষা করেও আমাদের একই দশা হচ্ছে, এসব পারলে বাদ দেন, নতুবা দূরে যান…

চা-সিগারেট কতোগুলো খাওয়া হয়, এই হিসেব কখনো করা হয়নি, রেলস্টেশনের বটতলা কিংবা মেঘনার পাড়ে শ্মশানঘাট, থানারঘাট অথবা দূর নির্জন আড়িয়াল খাঁ নদীর ধারে কবি রিপন ইউসুফের সাথে অসংখ্য বিতর্ক এখনো বাকি। বইমেলায় প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা আমার পরবর্তী বইয়ের বিষয়টি নিয়েও জরুরি কথা আছে। বাঙালি, বঙ্গীয়, বৃহৎবঙ্গ, গ্লোবালাইজেশনের বিতর্কগুলো তো একটা পরিণতির দিকে নিতে হবে; রিপনের সিরিয়াস চরিত্রের ভেতর এই খামখেয়ালিটুকু আমি নিতে পারি না, সবারই ব্যক্তিগত কাজ আছে, ব্যক্তিগত জীবন আছে, তাই বলে তর্কের মাঝপথে যখন-তখন চলে যাওয়া যায় না।

যান, কাদের ব্যবসা ফুলে-ফেঁপে ওঠছে, সেটাও সুযোগমতো দেখেন; বাঙালি বলার সমস্যাটুকুকে কারা পুঁজি করে অন্য ব্যবসা করে, কারা বিদ্বেষ উসকে দেয়, কারা এই শব্দে আদিবাসীদের নিয়ে রাজনীতির বড়ো দান বাগিয়ে নেয়, আমরা কি সেসব দেখিনি? আসলে কেউ সমাধান চায় না, ক্ষত বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের বুদ্ধিজীবীতাকে উপভোগ করতে চায়। বস্তুত সমাধান কীভাবে আসতে পারে, তার কোনো ধারণাই তাদের নাই, থাকলে কই? এতো যে বড়ো বড়ো কথা, বড়ো বড়ো চিন্তা, অজস্র পরামর্শ, তাহলে আমাদের দিন দিন আরো অধঃপতন হচ্ছে কেন? সন্দেহ করেন, যারা কথা বলছে, তাদের প্রত্যেককে সন্দেহ করেন; হয় তারা জানে না, নির্বোধ অথবা অসৎ, এর বাইরে অন্য কিছু হলে আমরা তার কিছু না কিছু ফলাফল দেখতে পেতাম।

ফলাফল থাকবে কীভাবে? এখানে কি কেউ থাকে? এই মাটিতে কারো কোনো স্বপ্ন নেই, সব ধ্বংস হয়ে গেছে কবি সাহেব, কবিতা লেখেন, সিনেমা বানান, তত্ত্ব আওড়ান, একটা বেশ নান্দনিক জীবন উপভোগ করেন, আপনার তো দায়িত্ব নাই, অন্য কেউ আপনার জন্যে লালগালিচা পেতে দিবে, আপনি বিভিন্ন পোজে ছবি তুলবেন। চলেন, এর চেয়ে ভালো হয় সোহান-রাসেল-সুমনসহ একটা ছবি তুলি, ফেসবুকে দেওয়া যাবে, ‘আজকে দারুণ আলাপ হলো’, এই তো, প্রচার সর্বস্বতা, এর বাইরে কী? একটা সমাজ পাল্টাতে কয় জনম অপেক্ষা করতে হয়!


দ্রাবিড় সৈকত
কবি, চিত্রকর
সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

নরসিংদীর মাটি খামচানো ইতিহাসকার : চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সরকার আবুল কালাম (২৮ জানুয়ারি ১৯৪৬-৩০ আগস্ট ২০২১) | ছবি : তৌফিক সাহাব কুশল

এই মহান ইতিহাসকার ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেছেন, নরসিংদীর সাটিরপাড়ার নিজ বাসভবনে। রেখে গেছেন অমূল্য সব লেখাপত্র আর গ্রন্থসমূহ। তাঁর এসব কর্মের সাথেই তিনি জড়িয়ে থাকবেন আরো বহু বহু কাল।

নরসিংদীর স্থানীয় ইতিহাস রচয়িতা লেখক সরকার আবুল কালাম মারা গেছেন চার বছর হয়ে গেলো। সদা জাগ্রত, কর্মতৎপরতায় নিবিষ্ট, ধ্যানী ও প্রাজ্ঞ লেখক ছিলেন তিনি। তাঁর লেখার এবং ব্যক্তিআচরণের প্রধান ভঙ্গি ও বৈশিষ্ট্য ছিলো নিরেট, নির্মল রসময়তা।

পেশায় ছিলেন শিক্ষক। নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছিলেন দীর্ঘদিন। তরুণ বয়সে ডিটেকটিভ গল্প লিখে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। নারী স্বাধীকার-কেন্দ্রিক অনবদ্য চরিত্র ‘চমন’ তাঁর গোয়েন্দা গল্প সিরিজ। পরে স্থানীয় ইতিহাস রচনায় মনোনিবেশ করেন। নরসিংদীর সর্বস্থানে তিনি হন্যে হয়ে খুঁজে বের করেন মানুষ ও তাদের জীবনের বহুরৈখিক ফসিল; যা পরবর্তী প্রজন্মকে গবেষণা করার জন্যে এগিয়ে নেবে নানান তথ্যে ও তত্ত্বে। তিনি বলতেন, তিনি মূলত কিশোরদের জন্যে লেখেন। অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফেরা কিংবদন্তীকে নূতন কথা ও রসে জারিত করে ‘গল্প’ বলা তাঁর প্রধান অভিপ্রায়।

আমরা জানি যে, স্থানীয় ইতিহাস বা ঐতিহাসিক খণ্ড খণ্ড উপাদান জোড়া দিয়েই জাতীয় ইতিহাস রচিত হয়। একটা জাতির প্রতিনিধিত্বশীল ছবি আঁকতে হলে প্রথমেই এসব স্থানীয় উপাদান প্রয়োজন হয়। সরকার আবুল কালাম এই স্থানীয় তথ্যাবলি সংগ্রহের একটা মহৎ প্রতিষ্ঠান ছিলেন। তাঁর ১৫/১৬ টা গ্রন্থ এই অঞ্চলের, বিশেষত মুঘল আমল থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত একটা ছিন্ন খেরোখাতা হিসেবে অবশ্যই চিহ্নিত হবার যোগ্যতা রাখে। তিনি এমন কিছু ব্যক্তি, স্থান ও স্থাপনা-কেন্দ্রিক তথ্য পাঠকদের সামনে ফেলে রেখে গেছেন, যা কারো দ্বারা ‘পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস’ নির্মাণ করার জন্যে সহায়ক হবে।

সরকার আবুল কালাম এ-অঞ্চলের লোকসাহিত্য, লোকসাহিত্যিক, লোকজ ছড়া, প্রান্তিক নানা জাতিগোষ্ঠীর হদিস, স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবী, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের একটা প্রতিনিধিত্বশীল জীবনী, এমনকি আধুনিক কবিদের নানান তথ্য ও জীবনী সহযোগে একটা বর্ণাঢ্য মিউজিয়াম গড়ে তুলেছিলেন দিনের পর দিন পরিশ্রম করে।

নরসিংদীর নাগরিক সমাজ তাঁকে সঙ্গত কারণেই শিকড়সন্ধানী লেখক, নরসিংদীর আলোর কণা, ঐতিহ্যের নাবিক ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করেছেন।

সরকার আবুল কালামের এই যে এ-অঞ্চলের মাটি খামচিয়ে আপাতঘুমন্ত অথচ জীবন্ত ফসিল বের করে আনার ক্লান্তিহীন ঝোঁক ছিলো মৃত্যু অবধি, তা পৃথিবীর যেকোনো জাতির স্থানীয় ইতিহাস রচয়িতা ও গবেষকদের মধুর ঈর্ষার কারণ হওয়া খুব স্বাভাবিক।

এই মহান ইতিহাসকার ২০২১ সালের ৩০ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেছেন, নরসিংদীর সাটিরপাড়ার নিজ বাসভবনে। রেখে গেছেন অমূল্য সব লেখাপত্র আর গ্রন্থসমূহ। তাঁর এসব কর্মের সাথেই তিনি জড়িয়ে থাকবেন আরো বহু বহু কাল।

সরকার আবুল কালাম রচিত গ্রন্থসমূহ
১. নরসিংদীর শহীদ বুদ্ধিজীবী। ১৯৯১
২. নরসিংদীর গুণীজন। ২০০৩
৩. কিংবদন্তীর নরসিংদী। ২০০৩
৪. নরসিংদীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। ২০০৭
৫. কিংবদন্তীর নরসিংদী-২, মনীষীকথা। ২০১০
৬. কিংবদন্তীর নরসিংদী-৩, কন্যা জায়া জননী। ২০১১
৭. নরসিংদী জেলায় ইসলাম। ২০১২
৮. কিংবদন্তীর নরসিংদী-৪, কথা-উপকথা। ২০১৩
৯. কিংবদন্তীর নরসিংদী-৫, রামনগর থেকে জাহাঙ্গীরনগর। ২০১৩
১০. নরসিংদীর ভাষা ও লোকজীবন (ড. মনিরুজ্জামানের সাথে যৌথভাবে)। ২০১৫
১১. কিংবদন্তীর নরসিংদী (নির্বাচিত)। ২০১৬
১২. নরসিংদীর ঐতিহ্যকথা। ২০১৭
১৩. নরসিংদীর চরএলাকার মাটি ও মানুষ, ব্রিটিশ ও মুঘল আমল। ২০১৭

সরকার আবুল কালাম সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ
১. পূর্ব্ববঙ্গে মহেশ্বরদী, সুরেন্দ্রমোহন পঞ্চতীর্থ। ২০১৪
২. নরসিংদীর লোক সংস্কৃতি লোক ঐতিহ্য, আবুল হোসেন পাঠান। ২০১৮
৩. বিদগ্ধ দিনের প্রান্তর, আজিজুল হাকিম (কাব্যগ্রন্থ)। ২০১৮

সম্মাননাসমূহ
১. কবিয়াল হরিচরণ স্মারক সম্মাননা ও সনদ ২০১০ (ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত কর্তৃক)
২. আবদুর রশীদ সাহিত্য পুরস্কার ও সম্মাননা ২০১০ (নীলাচলে কলাবিতান সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পরিষদ, মনোহরদী কর্তৃক)
৩. শেকড় সন্ধানী লেখক অভিধা ও সম্মাননা ২০১০ (আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুল, নরসিংদী কর্তৃক)
৪. নরসিংদীর ঐতিহ্যের নাবিক অভিধা ও সম্মাননা ২০১৩ (ন্যাশনাল কলেজ অব এডুকেশন, নরসিংদী কর্তৃক)
৫. আলাউদ্দিন আল আজাদ সাহিত্য পুরস্কার ২০১৪ (আলাউদ্দিন আল আজাদ স্মৃতি পরিষদ, ঢাকা কর্তৃক)
৬. নরসিংদীর আলোর কণা অভিধা ও সম্মাননা ২০১৫ (নবধারা কণ্ঠশীলন, নরসিংদী কর্তৃক)
৭. সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে সম্মাননা স্মারক ২০১৯ (জেলা প্রশাসন, নরসিংদী কর্তৃক)
৮. সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্যে সম্মাননা স্মারক ২০১৯ (উন্মোচন সাহিত্য পরিষদ, নরসিংদী কর্তৃক)

কমরেড লোকমান ছিলেন এক অনিবার্য অনুসূর্য : সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি

রক্ত দাঁড়িয়ে যাও, বুক টানা দিয়ে, ভয়কে ভীষণ
লাঠিপেটা করে, সময়কে কাছা মেরে শক্ত
সাহসের ভেতর, ধূর্ত ধমকের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাও তুমি,
অব্যক্ত অধিকার, এগিয়ে যাও বারবার;
তোমার মাথায় থাকবে ভয়ঙ্কর লাল নিশান,
তোমার চোখে থাকবে শ্যেনদৃষ্টি,
তোমার মুষ্টিবদ্ধ হাতে ভীষণ
কাঁপতে থাকবে পরিবর্তনের অঙ্গীকার, তুমি সামনে
এগিয়ে যাবে ঝঞ্ঝার মতো, তোমার স্পর্ধায়
ছিন্নভিন্ন হবে নষ্ট নৃপতির নিষ্ঠুর নিগ্রহ, পুরাতন এই গ্রহ।

যার কাছ থেকে আমরা আগুনের ব্যবহার শিখতাম, তার নাম মীর লোকমান। বেঁটে, পেটানো শরীর। স্ফীত বক্ষদেশ। গৈরিক আগুনের চুল্লির মতো দৃষ্টি। অহং চূর্ণ করার আত্মপ্রত্যয় ও তিমিরবিনাশী তীক্ষ্ণ আগুনফলা ছিলো তাঁর চোখে-মুখে। কমরেড লোকমান আমাদের এক অনিবার্য অনুসূর্য। নষ্ট সময়ের দেউড়িতে দাঁড়িয়ে আগুনের বর্ণমালা পড়াতেন আমাদের। কমরেড লোকমান বলতেন, ভেতরের ফ্যাসিবাদী ফসিল পোড়াতে মানুষের চোখে-বুকে আগুন পুষতে হয়, নুয়ে পড়া সময়কে সোজা করতে হৃৎ-আগুনের ব্যবহার জানতে হয়।

শূন্য দশকের তুখোড় সাহসী ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী লোকমান (নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করেন) ২০১২ সালের পর কাঁধে তুলে নেন নরসিংদী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। সাহস, আত্মপ্রত্যয় ও ত্যাগ-তিতিক্ষাকে পুঁজি করে দারুণ ধাবিত হন সামনের দিকে। সারাদেশে কৃষক নিগ্রহ, লাগামহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও পুঁজিবাদের নগ্ন উত্থানের বিরুদ্ধে দারুণ প্রতিবাদী ছিলেন মীর লোকমান। শ্লোগানে শ্লোগানে কাঁপিয়ে দিতেন তখতে তাউশ।

এককালে আমাদের নরসিংদী ছিলো সাহসী সংগ্রামের পাদপীঠ। অগ্নিযুবক সতীশচন্দ্র পাকড়াশী, সোমেন চন্দ, মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ, সুন্দর আলী গান্ধী, বিপ্লবী রহমান মাস্টার, ফয়েজ মাস্টার, কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকারের এই নরসিংদী ছিলো সংগ্রাম ও বিপ্লবের  অগ্নিকুণ্ড। কালক্রমে সেই আগ্নেয়গিরি শীতল ও শান্ত হয়ে যায়, সেই সাহসী বিপ্লবীদের চেতনার চাতালে উত্থান ঘটে চরম সুবিধাভোগী, আত্মলীন, শিড়দাঁড়াহীন এক নব্য দালালচক্রের, যারা বিভিন্নভাবে ধ্বংস করেছে আমাদের তাঁতশিল্প, ধ্বংস করেছে আমাদের কৃষি, ধ্বংস করেছে আমাদের ভূ-রাজনীতি।

আওয়াজ যতো ছোটো ও ক্ষীণই হোক, তবু ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার বিপরীতে সমগ্র বাংলাদেশে অবিরাম যে-প্রতিবাদী আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছে, কমরেড লোকমান ছিলেন সেই আওয়াজে আমাদের নরসিংদীর এক শক্তিমান সান্ত্রী। বিশেষ করে, স্বাধীনতার পরে সারা দেশে ধীরে ধীরে চোর ও লুটেরা শ্রেণির উদ্ভব হয়। চোরাচালানি, মুনাফাখোরি, লাগামহীন ঘুষ-দুর্নীতির কারণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। বঙ্গবন্ধুর আর্তচিৎকার তখন তাদের কানে ঢোকেনি। তবু তখনো বাম রাজনীতির একটি প্রোজ্জ্বল শক্তিশালী শিখা আমাদের পথ দেখিয়ে গেছে। কিন্তু ১৯৯১ সালে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক সরকারের পতনের পর আমাদের দেশেও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অপমৃত্যু হয়। ঝঞ্ঝাক্রান্ত জাহাজের মতো সীমাহীন সমুদ্রে দিকভ্রান্ত হয়েছে আমাদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন। তবু সারাদেশে প্রগতি ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে যে-আন্দোলন মাথা উঁচু করে এগিয়ে গেছে সাম্য ও শান্তির ঝাণ্ডা উড়িয়ে, তার নাম বাম আন্দোলন, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বা কমিউনিস্ট আন্দোলন। আওয়াজ যতো ছোটো ও ক্ষীণই হোক, তবু ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার বিপরীতে সমগ্র বাংলাদেশে অবিরাম যে-প্রতিবাদী আওয়াজ উচ্চারিত হয়েছে, কমরেড লোকমান ছিলেন সেই আওয়াজে আমাদের নরসিংদীর এক শক্তিমান সান্ত্রী। ততোক্ষণে রাজনীতি চলে যায় পুঁজিবাদীদের হাতে, একধরনের ভূঁইফোড় ব্যবসায়ীরা রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। সমাজতন্ত্রের বদলে মাঠে নামে ভোগবাদের বলগা ঘোড়া। সেই ঘোড়ার তীক্ষ্ণ খুঁড়ের তলে শ্রমজীবী মানুষ যখন নিষ্ঠুরভাবে দলিত হতে থাকে, ঠিক তখনই অনেকটা হেরাল্ডের মতো নরসিংদীর বাম রাজনীতিতে উদিত হন কমরেড লোকমান।

শূন্য দশকের তুখোড় সাহসী ছাত্র ইউনিয়ন কর্মী লোকমান (নরসিংদী সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদ নির্বাচনে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ভিপি পদে নির্বাচন করেন) ২০১২ সালের পর কাঁধে তুলে নেন নরসিংদী জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব। সাহস, আত্মপ্রত্যয় ও ত্যাগ-তিতিক্ষাকে পুঁজি করে দারুণ ধাবিত হন সামনের দিকে। সারাদেশে কৃষক নিগ্রহ, লাগামহীন দুর্নীতি, লুটপাট ও পুঁজিবাদের নগ্ন উত্থানের বিরুদ্ধে দারুণ প্রতিবাদী ছিলেন মীর লোকমান। শ্লোগানে শ্লোগানে কাঁপিয়ে দিতেন তখতে তাউশ।

‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, নিপাত যাক’, ‘মৌলবাদের আস্তানা, ভেঙ্গে দাও, গুঁড়িয়ে দাও’, ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না তা হবে না’, ‘জাল যার জলা তার, লাঙ্গল যার জমিন তার’— এসব শ্লোগান দিতে দিতে মীর লোকমান যেন মিশে যেতেন ইকারুসের আকাশে।

কমরেড লোকমান একজন শ্লোগানসৈনিক, সম্মোহনী শক্তিসম্পন্ন আবৃত্তিশিল্পী ও চারণরাজনীতিবিদ। তবে ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন বেশ অগোছালো ও উদাসীন। জীবনের জটিল জিজ্ঞাসাকে অবজ্ঞা করতেন অবলীলায়। সেজন্যে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক, এই দ্রোহী সত্তা আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছেন ২০১৮ সালের ২০ আগস্ট, মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে। হঠাৎ এমন নান্দনিক নক্ষত্রের পতনে আমরা খুব ব্যথিত হয়েছি, তবে বিস্মিত হইনি। কারণ, এই দেশে দুপুরেও সন্ধ্যা নামে!

চেতনায় বেঁচে থাকো কমরেড।


মহসিন খোন্দকার
সাধারণ সম্পাদক, প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

প্রগতি লেখক সংঘের ‘বিধ্বস্ত নীলিমায় শামসুর রাহমান স্মরণ’

২০০৬ সালের ১৭ আগস্ট বাংলা সাহিত্যের আকাশ থেকে ঝরে পড়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যিনি পূর্ব বাংলার মানুষের মুক্তি, শোষণ, গণজাগরণ, স্বৈরশাসকের নেতিবাচক ক্ষমতাচর্চাকে ছন্দে-কথায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলেন কবিতায়। সেই কবি শামসুর রাহমানের ১৯তম প্রয়াণ দিবস ছিলো গতকাল। কবির প্রয়াণ দিবসে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী কর্তৃক ‘বিধ্বস্ত নীলিমায় শামসুর রাহমান স্মরণ’ শীর্ষক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ১৭ আগস্ট (রবিবার) নরসিংদী প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত হয় সভাটি। উক্ত সভায় বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পিনু, নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়া, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদীর সাধারণ সম্পাদক কবি মহসিন খোন্দকার, কবি মমিন আফ্রাদ, টিইও নুরুদ্দীন দরজী, কবি ও গবেষক ফারহান ইশরাক, জাকির হোসেনসহ অনেকে আলোচনা উপস্থাপন করেন। তাছাড়া বাংলাদেশ ও নরসিংদীর বিভিন্ন অঞ্চলের কবি, শিক্ষক, প্রভাষক, সংস্কৃতিকর্মী, আবৃত্তিশিল্পী, ছাত্র, সাংবাদিক, গায়ক উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রম আরম্ভ হয় বিকাল তিনটায়। শুরুতেই মাইলস্টোন স্কুল এন্ড কলেজে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করা শিশুদের জন্যে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। হাসান মাহমুদ সনেটের মাধুর্যপূর্ণ সঞ্চালনার পাশাপাশি শামসুর রাহমানের বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করেন জেলার আবৃত্তিশিল্পীরা।

আলোচনা পর্বে আলোচকেরা কবির কাব্যসত্তা, চিন্তাসত্তা, ব্যক্তিজীবন, পেশা, মনন, কবিতা, সমাজ-রাষ্ট্রেচিন্তা, মানবতাবোধের বিস্তারিত আলোচনা করেন। সূচনা বক্তব্যে কবি মহসিন খোন্দকার বলেন, “শামসুর রাহমানই একমাত্র কবি, যিনি জীবনানন্দ দাশের পরে বাংলা সাহিত্য ও কাব্যকে বেগবান করেছেন, আধুনিক করেছেন। রাজনীতির সংগ্রামকে কবিতার মধ্যে আরো কাব্যিকভাবে প্রকাশ করেছেন।”

শিক্ষক-এক্টিভিস্ট-সংস্কৃতিকর্মী ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল, নরসিংদীর আহ্বায়ক নাজমুল আলম সোহাগ বলেন, “শামসুর রাহমান কবি হিসেবে প্রধান।”

কবি ও গবেষক ফারহান ইশরাক বলেন, “কবি শামসুর রাহমান এমন ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন, যা সেই সময়কার ক্ষমতা-কাঠামোর সঙ্গে একটি সাযুজ্যপূর্ণ এবং গভীর আন্তঃসম্পর্ক তৈরির জন্য অনুকূল ছিলো না।”

নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তাফা মিয়ার মতে, “শামসুর রাহমান কি শুধু স্বাধীনতার কবি? আমি মনে করি, তাঁর সৃষ্টির সাথে সেভাবে পরিচিত হয়েই তাঁকে ধারণ করতে হবে।”

বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম কিবরিয়া পিনু বলেন, “শামসুর রাহমানই একমাত্র কবি, পঞ্চাশ-ষাট বছরে যিনি তাঁর আদর্শ-চিন্তা-চেতনার জন্যে বারবার পদ-পদবী বদলাননি।”

বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদীর সভাপতি এবং উক্ত অনুষ্ঠানেরও সভাপতি কবি ও সম্পাদক সুমন ইউসুফ বলেন, “তাঁকে স্মরণ করছি এমন একটা সময়ে, যখন রাষ্ট্র-সমাজ বিধ্বস্ত অবস্থায় আছে, নানান মাত্রিকতায় বিধ্বস্ত।”

তাছাড়া তরুণ কবি মমিন আফ্রাদ, কবি হাসনাইন হীরা ও জাকির হোসেন প্রমুখ তাদের আলোচনা রাখেন দর্শক-শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে।

আলোচনার পাশাপাশি আবৃত্তিশিল্পী অরিত্রী বিহঙ্গ, কারিমা পুষ্পিতা, চিত্রা বিশ্বাসসহ আরো কয়েকজন শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে হে স্বাধীনতা’, ‘আসাদের শার্ট’, ‘পান্থজন’সহ আরো বেশ কিছু কবিতা আবৃত্তি করে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত করে তোলেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের এক বছর : প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি

0

ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে স্বৈর সরকার পরিবর্তনের এক বছর পূর্ণ হলো। এই এক বছরে বাংলাদেশের অর্জন কী? জনগণের প্রত্যাশা কী ছিলো আর কী প্রাপ্তি ঘটেছে? ফ্যাসিবাদের পতন কি হয়েছে? না হলে কেন হয় নাই, কোথায় ঘাটতি— এসব বিষয় নিয়ে ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার সাতজনের মতামত তুলে ধরেছে। এই মতামত একান্তই যার যার ব্যক্তিগত ভাবনা উৎসারিত।

আজহারুল হক লিংকন
সংগঠক, জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন

জুলাই কোনো তথাকথিত গণঅভ্যুত্থান নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম রাজনৈতিক সংগঠিত শক্তির সরাসরি তত্ত্বাবধানে বা নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান হয় নাই। রাজনৈতিক ক্ষমতার গঠনের দিক দিয়ে এটি ছিলো একটি বিকেন্দ্রিভূত গণগঠন। যদিও পরবর্তীতে ছাত্রদের নেতৃত্বে একটি রাজনৈতিক দল তৈরি হয়েছে এবং কেউ কেউ এটাকে সেই রাজনৈতিক সংগঠনের অধীনে সংগঠিত একটি অভ্যুত্থান হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু আদতে সেটা বাস্তবতা পরিপন্থী। জুলাই একটি স্বতঃস্ফূর্ত গণবিস্ফোরণ, যেখানে সাহসী তরুণদের সমন্বয়ধর্মী নেতৃত্বকে সামনে রেখে মানুষ সংগঠিত হয়ে একটি ফ্যাসিস্ট কাঠামোর দখলকারীদের উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু ফ্যাসিস্ট কাঠামোটি এখনো তার ডালপালা নিয়ে বহাল তবিয়তে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের ব্যর্থতা হচ্ছে জুলাইয়ের এই গণগঠনটিকে আমরা রাষ্ট্র বিনির্মাণের কোনো নির্দিষ্ট আকাঙ্ক্ষা কিংবা আকাঙ্ক্ষাগুচ্ছের সাপেক্ষে একাট্টা রাখতে পারি নাই। অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি পক্ষ নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থের বিপরীতে গণসার্বভৌম রাষ্ট্র নির্মাণের প্রয়োজনকে উপেক্ষা করেছি ও যার যার পেটি স্বার্থকে গণঅভ্যুত্থানের প্রধান উদ্দেশ্য হিসেবে প্রচার করে মানুষকে বিভ্রান্ত করেছি ও নিজেদের মধ্যে লড়াই-সংগ্রামে ব্যস্ত থেকেছি। যার মধ্যে শাতিম কেন্দ্রিক উগ্র ডানপন্থী রাজনীতি যেমন আছে, তেমনি আছে পৈতৃক সম্পত্তিতে সমানাধিকারের মতো সময় অনুপযোগী কৌশলগত ভুল সেক্যুলার আন্দোলন। আমরা ভুলে গেছি মানুষের অর্জিত সম্পত্তির অধিকার থেকে কেউ যাতে বঞ্চিত না হয়, সেই ব্যবস্থা কায়েম করাটা কৌশলগতভাবে আগের কর্তব্য। ঘোড়া কাঁধে নিয়ে জিনের অধিকার নিয়ে কামড়া-কামড়ি আমাদের জুলাইকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্রের মধ্যে তফাৎ সম্পর্কে আমাদের রাজনৈতিক অজ্ঞতাই এই পতনের কারণ। ঘোড়ার জিন আপনি বাঘের পিঠে চড়িয়ে বসতে পারবেন না। রাষ্ট্রের গঠন যদি মানুষখেকো হয়, তাহলে সরকারে আপনি ইউসুফ নবীকে বসিয়ে দিলেও তিনি আপনাকে নিয়ে তরতর করে এগিয়ে যেতে পারবেন না। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গঠনের আমূল পরিবর্তন ও মানুষের সরাসরি রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণীতে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব নিশ্চিত করার আগেই তড়িঘড়ি একটা নির্বাচন দিয়ে সরকার পরিবর্তন করে হয়তো আবারো আমরা মানুষখেকো একটা রাষ্ট্রব্যবস্থার খপ্পরেই পড়তে চলেছি। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, জুলাই বঙ্গোপসাগরের তীরে এই অচ্ছুৎ নমশুদ্র ও মেচ্ছেলদের সম্বিলিতভাবে বাঘ শিকার করতে শিখিয়ে দিয়ে গেছে। তথ্য প্রযুক্তির এই বিপ্লবী সময়ে মুহূর্তেই গণগঠনের শিক্ষা আমাদের সামষ্টিক লড়াইয়ের ইতিহাসকে আর পেছনে ঠেলে নিয়ে যেতে দেবে না। আমাদের সামনে আরো অসংখ্য ছোটো-বড়ো লড়াই অপেক্ষা করছে। জনতার সামষ্টিক অভিপ্রায়ের বিকাশ ঘটিয়ে শক্তিশালী গণরাজনৈতিক ধারা কীভাবে গড়ে তোলা যায়, দ্রুত সেই রাজনৈতিক শিক্ষা আমাদের নিজেদের অর্জন করা ও ছড়িয়ে দেয়াই এখনকার মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করি।

বালাক রাসেল
সম্পাদক, dheki24.com

ব্রিটেনের একদল গবেষক সারা দুনিয়া থেকে তিনশত ষাটটি আন্দোলন নিয়ে গবেষণা করে দেখিয়েছেন যে, কোনো আন্দোলনে যদি একটি ভূখণ্ডের মোট জনসমষ্টির দুই থেকে তিন শতাংশ মানুষ রাস্তায় নামে, তাহলে সেই আন্দোলনের সফলতার হার মোটামুটি একশত ভাগ না হলেও কাছাকাছি। সেই হিসেবে বাংলাদেশের প্রায় আশি শতাংশের বেশি  মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে তাদের ক্ষোভ ঝেরেছেন। এই সফল অভ্যুত্থানের পলিটিক্যাল ট্রান্সলেশন নিয়ে এখনো পর্যন্ত ব্যাপক বিতর্ক এবং আলোচনা-সমালোচনা বিদ্যমান। তবে অন্তত এটা সবাই মেনে নিয়েছে যে, জনগণ একটা বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের চাহিদা নিয়ে রাজপথ দখল করেছিলেন। বেশ কিছুদিন ধরেই কিছু মানুষ অভ্যুত্থানের একজন সমর্থক হিসেবে আমাকে বলেছে যে, যারা এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন, তারা প্রতারিত হয়েছেন। আসলে বিষয়টি যারা বলছে, একদিক থেকে এটার ট্রান্সলেশনটা জটিল। প্রতিউত্তরটা বর্তমান সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আলোচনা করলে মোটামুটি চিত্রটা দেখা যাবে। গণঅভ্যুত্থানে জনগণ নেমে এসে ভুল করে নাই। আর ইতিহাস বলে, প্রতিটি গণঅভ্যুত্থানেই জনগণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে থেকে ন্যায্যতার ভিত্তিতেই আন্দোলন করে। চব্বিশেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। জনগণ অভ্যুত্থান করে দানব হটিয়ে বিদায় করেছে, এটা তাদের সফলতা। কিন্তু রাষ্ট্র মেরামতের কাজ তো আর জনগণের করার কথা নয়। যারা এখন রাষ্ট্র মেরামতের কাজ করছে, রাষ্ট্রের গঠন যদি না করতে পারে, সেটা তাদের দোষ। আখের গোছানোর এই অভ্যুত্থানের পরপরই জনমনে পোক্ত ধারণা জন্ম নিয়েছিলো যে, দেশের গাঠনিক কাঠামো এবার বদলাইয়া ওঠবে। প্রয়োজনের তাগিদেই সেটা হতে হবে। অভ্যুত্থান পরবর্তী এক বছরে অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের নিষ্প্রভ আচরণ অনেক কিছুরই ইঙ্গিত বহন করে। তাদের নির্লিপ্ততা বৃক্ষের গোড়ায় পানি ঢালার ন্যায়। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির উত্থান আরেকটি বড়ো উদ্বেগের বিষয়। যেখানে লাইভ টকশোতে এসে বাংলাদেশকে তালেবানি রাষ্ট্র বানানোর ইচ্ছা বা হুমকি দেন, তখন আমরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ি নারী শিক্ষার বিরোধিতা  আর খেলাফতি কায়দায় দেশ পরিচালনা নিয়ে। অভ্যুত্থানের নারী শক্তির হেনস্তার মধ্য দিয়ে তা মোটামুটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বামদের আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে রাজি না হওয়া, জামাতের নিজের মতো সংবিধান তৈরি করা, মুক্তিযুদ্ধের বিকল্প হিসেবে অভ্যুত্থানকে দাঁড় করানো, বিএনপির চাঁদাবাজি, এনসিপির কর্মকাণ্ড, ইউনুসের গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি, ছয়শত ছেষট্টি কোটি টাকার কর রেয়াত, পাঁচ বছরের ট্যাক্স মওকুফ, গ্রামীণ ব্যাংকের সরকারি মালিকানা পঁচিশ থেকে দশ শতাংশে আনা, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মব কালচার, আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি, আমেরিকার শুল্ক ইত্যাদি এমন আরো বহু সমস্যায় জর্জরিত বাংলাদেশের ইন্টেরিম সরকারের সময়টা অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে অতিক্রম করছে। এটা তাদের ব্যর্থতা। এদিকে মুক্তিযুদ্ধকে পাশ কাটিয়ে ‘নতুন বাংলাদেশ’ আর ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’র ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর আপ্রাণ চেষ্টা জামায়াতের ইতিহাসের খপ্পরে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পায়তারা ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে ফেলেছে। এদিকে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানকে ইসলামি বিপ্লব নামে যে-এস্টাবলিশমেন্টের প্রচেষ্টা, এটা কেবল গণতন্ত্রকে খামচেই ধরবে না, একে খেলাফতি কায়দায় নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে বাকস্বাধীনতায় শেষ পেরেকটি ঠুকে দিবে।  ডিপ স্টেটের মাধ্যমে  ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা আমাদের শুধু অবাকই করেনি, সেই সাথে আতঙ্কেরও জন্ম দিয়েছে। অভ্যুত্থান পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সরকার নিয়ে প্রথম যে-বাক্যটি ব্যয় করেছিলাম, সেটা হলো বিপ্লবী সরকার গঠন। কিন্তু  হয়নি।

মফিজুল ইসলাম
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল, নরসিংদী

আসলে ১৭ বছর স্বৈরশাসনের পর যে-অভ্যুত্থানটা হলো ছাত্র সমাজের মাধ্যমে, দেশের মঙ্গলার্থেই এটা ঘটেছে। তবে আমরা আশা করেছি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটা পরিবর্তন আসবে; ইদানিং আমরা যেটা দেখছি যে, বিভিন্ন জায়গায় চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপকর্ম হচ্ছে, সেগুলোও থাকবে না। যার যার দল থেকে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। আমি আশা করি, এই সাময়িক অপচ্ছায়া দূর হয়ে যাবে। আর কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনটা হয়ে গেলে, দলীয় সরকার ক্ষমতায় আসলে আরো কঠোরভাবে দমন করা যাবে। আমরা সবাই জানি, দেশে ঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। বিভিন্ন বাহিনি যারা আছেন, পুলিশ-আর্মি— তাদের আরো সোচ্চার হওয়ার দরকার ছিলো। আমরা আশা করেছিলাম দেশে সেনাবাহিনির মাধ্যমে একটা চিরুনি অভিযান হবে, দোষী যারা আছে, দেশে অবৈধ অস্ত্র যেগুলো আছে, সেগুলো উদ্ধার হবে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এগুলো পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা যদি আরো পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝির অবসান করে একত্রে কাজ করেন, তাহলে সবার জন্যই মঙ্গল হবে। আমরা যুদ্ধ করে লাল সবুজের পতাকা পেয়েছি, এটা ধরে রাখতে চাই। গণতান্ত্রিক মানুষের মুক্তির যে-স্বাদ, সেটা হচ্ছে নির্বাচন। সেই নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা একটা সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।

রবিউল আলম নবী
কবি ও গল্পকার

আমাদের দেশটা স্বপ্নপুরী। আসলেই কি তাই? আসলেই কি তাই নয়? এই স্বপ্নপুরীর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে দানব-দৈত্য-রাক্ষস-ভোক্ষক-খোক্ষক। জ্বিন-পরী, দেও-দানব। পরতে পরতে আমলাবাজ-দুর্নীতিবাজ। উগ্রধর্মবাজ, উগ্রবিধর্মবাজ। আজানবাদী। নারায়ে তাকবিরবাদী। যারা সুন্দরের ধ্বংসকামী, অসুন্দরের উত্থানকামী। নতুবা ৩৬-এর গণঅভ্যুত্থানের পর যে-অলৌকিক চেহারা বেরিয়ে আসছে এইসব দৈত্য-দানবের, সে-চেহারা কোনো হিউমেন বিয়িংয়ের চেহারা নয়। মানুষ চেয়েছিলো মানুষের অধিকার। চেয়েছিলো রাষ্ট্রটি এমন একটি রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হবে, যে-রাষ্ট্রে বাক-ভোট-বুদ্ধির স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তার কিছু তো হয়ইনি, বরং ক্রমে ক্রমে তলিয়ে যাচ্ছে সমগ্র সম্ভাবনার সুলুক। বিশ্বফিগার হিসেবে ড. ইউনুসের কাছে প্রত্যাশা ছিলো বাংলাদেশকে গ্লোবাল পলিটিক্যাল এনভায়রনমেন্ট দেয়া। কিন্তু তিনি পদে পদে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। পারছেন না মবতন্ত্রকে সামাল দিতে, পারছেন না প্রশাসনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে। একটি বিশৃঙ্খল-উলঙ্গ সমাজব্যবস্থা ক্রমে অশ্লীলতার দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রাষ্ট্রে এখন একটি হারমোনিয়ামও মেট্রোরেলে ওঠার ক্ষমতা রাখছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রায়ত্ত্ব প্রতিষ্ঠানও নারীদের যাপিত জীবনে ফেলছে আবরণ ও আভরণগত নিষেধাজ্ঞা। মোড়ে মোড়ে চাঁদাবাজি। মানুষ হত্যার একটা টি-টোয়েন্টি উল্লাস চলছে বাংলাদেশ নামক স্টেডিয়ামে ও তার দর্শক গ্যালারিতে। এখন এটা সত্যিই একটা স্বপ্নপুরীÑ মধ্যযুগে সদ্য ইউটার্ন নেয়া দানব-দৈত্য-রাক্ষস-ভোক্ষক-খোক্ষকময় এক অবক্ষয়পুরী। আজানবাদী মারছে ঘণ্টাবাদীকে, নারায়ে-তাকবিরবাদী মারছে নারায়ণবাদীকে। সারা বাংলাদেশ জুড়ে ৩৬-এ নিহত হওয়া সন্তানের মায়েদের চিৎকার ছাড়া আর কিছু প্রবেশ করছে না কারো কর্ণকুহরে।

সুমাইয়া শিকদার
সদস্য, নারী অঙ্গন

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আগস্টের ৫ তারিখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। আমরা যারা জুলাইয়ের ময়দানে, মাঠে ছিলাম, যারা আমাদের পাশে ছিলো, জুলাই পরবর্তী সময়ে আমাদের, দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ছিলো, এবার আমাদের দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশার লাঘব হবে। নিরাপদ জীবনযাপন করবে। কিন্তু জুলাই পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে আমরা লক্ষ্য করছি যে, গত একবছরে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, আইন-শৃঙ্খলার কোনো উন্নতি হয়নি। নারী নিপীড়ন, ধর্ষণ-হত্যা, খুন, মব-মোরাল পুলিশিংয়ের নামে হেনস্তা, একের পর এক নাগরিকের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। এসবের বিরুদ্ধে সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বরং বিপরীতে আমরা দেখছি, একজন নারী হেনস্তাকারীকে মব নিয়ে গিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করা হচ্ছে, অপরাধীর হাতে কুরআন শরীফ তুলে দিয়ে পুরস্কৃত করছে। জুলাইয়ের প্রতিবাদী নারীদের অনলাইন-অফলাইনে সমানে হেনস্তা করা হয়েছে। এমনকি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। অথচ আমাদের আশা ছিলো সিস্টেমের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন-যাপন সহজ করা হবে, প্রত্যেকের মৌলিক চাহিদা পূরণ হবে। জুলাইয়ে শহীদদের পূর্ণ মর্যাদা দেয়া হবে, আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে, কিন্তু তা হয়নি। এখনো পর্যন্ত জুলাইয়ের আওয়ামী সন্ত্রাসীদের, হত্যাকারীদের বিচারের আওতাভুক্ত করতে পারেনি। আমরা দেখেছি, সেনাবাহিনির সহায়তায় হাসিনা যেভাবে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, ঠিক সেভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আসার পর আওয়ামী লীগের বড়ো বড়ো নেতাকর্মীরা দেশ থেকে পালিয়েছে। আমরা চাই, এই আওয়ামী দোসরদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসুক। এদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।

নির্জনা
সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

জুলাই গণঅভ্যুত্থান অনেকের কাছে নিজের চোখ, পা, শরীরে গুলির জখম, সহযোদ্ধা হারানো, আপনজন হারানো, আবার কারো কাছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান মানে একটা ‘কোটা আন্দোলন’। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এসেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা আমাদের কাছে একটুও ম্লান হয়ে যায়নি। আমরা যারা জীবনকে হাতে নিয়ে রাজপথে নেমেছিলাম, তাদের কাছে আমরা যারা পুলিশি হামলা আর ছাত্রলীগের তাণ্ডবের শিকার হয়েছিলাম, তাদের কাছে, এমনকি এদেশের জনতা, যারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের কাছে কোনোদিন জুলাই গণঅভ্যুত্থান ম্লান হবে না। আমার মনে পড়ে, ১৬ জুলাই নরসিংদীর বিপ্লবী শিক্ষার্থীরা ঘোষণা দেয়, জেলখানার মোড়ে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। সেদিন ছাত্রলীগ পুলিশের সাথে একজোট হয়ে আমাদের উপর হামলা করে আর একই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই পুলিশ আমাদের নিকটবর্তী তিনজন সহযোদ্ধা (মিজানুর রহমান, রাকিবুল ইসলাম, শাহীন ভূঁইয়া)-সহ নানা স্থান থেকে আন্দোলনে যোগ দেয়া শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার করে। আর সেদিন বিকেলে চালায় নির্মম হত্যাকাণ্ড। সেই হাসিনা বাহিনির হাতে আমাদের ভাই তাহমিদসহ আরো অনেকে নিহত ও আহত হয়। এই ইতিহাস আসলে ম্লান হওয়ার ইতিহাস না।  কিন্তু আমরা যখন ৫ আগস্টে স্বৈরশাসক হাসিনার পতন ঘটাই এবং তাকে পালাতে বাধ্য করি, তখন থেকেই আমরা যে ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ অর্জন করেছি, এই ধারণা ছিলো ভুল। আমরা দেখতে পাই, হাসিনার পতনের পর যে-ইন্টেরিম সরকারকে দেশ পরিচালনার ভার আমরা দিয়েছি, সেই ইন্টেরিম সরকার আমাদের বারবার নিরাশ করেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর সংখ্যালঘুদের উপর হামলা, বিভিন্ন জায়গায় মাজার ভাঙা, মন্দির ভাঙা, মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ভাঙা, নাটক বন্ধ করে দেয়া, বাউলমেলা বন্ধ করে দেয়া, সিনেমা হল বন্ধ করে দেয়াসহ নানা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। তাছাড়া বিপুল পরিমাণ নারী নিপীড়কের উত্থান দেখে আমরা অবাক হই। বিভিন্ন জায়গায় মবতন্ত্র আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে ভেঙে দেয়। ইন্টেরিম সরকারের এনজিও কোটা আর মৌলবাদীদের প্রতি নীরব সমর্থন আমাদের আশাহত করে। এমনকি ইন্টেরিম সরকার বন্দর, করিডোরের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তাতেও দেশবাসী হতাশ। ফলস্বরূপ আমরা দেখছি, অনেকে বলছি, এই গণঅভ্যুত্থান মার্কিন এক্টিভিস্টের এক কালার রেভ্যুলেশন। আমরা আমাদের লড়াই জারি রেখেছি। বন্দর, করিডোর রক্ষায় আমরা ঢাকা টু চট্টগ্রাম দুইদিনের রোডমার্চ কর্মসূচির ডাক দিই আর ছাত্রজনতার অংশগ্রহণের মাধ্যমে রোডমার্চ সফল করি। আমরা আরো দেখতে পাই, গণঅভ্যুত্থানের পর ইন্টেরিম সরকার কুখ্যাত রাজাকার জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে বেকসুর খালাস দেয়। তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল করে আমরা বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন তার প্রতিবাদ জানাই রাজু ভাস্কর্যের সামনে অবস্থান করে। কিছুদিন আগে যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামকে ঐতিহাসিক  সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়াতেও ছাত্র ইউনিয়ন নিন্দা জানায়। আমরা মনে করি, যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলামকে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে ইন্টেরিম সরকার মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছে। তাছাড়াও বিভিন্ন দেয়ালচিত্রে বাংলাদেশকে মুসলিমবঙ্গ উল্লেখ্য করার মতো নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আমরা লক্ষ্য করি গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে। তবুও নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে দেশের স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে পাওয়াই এখন আমাদের একমাত্র প্রত্যাশা। তাতেও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা দল ও গোষ্ঠীর লোকজন নির্বাচন পেছানোর নানা এজেন্ডা হাতে নিচ্ছে। আমাদের লড়াই এখনো শেষ হয়নি।  জুলাই এখনো চলমান।

সাহাদাত হোসেন
ব্যবসায়ী, শেখেরচর বাজার

আপনি প্রশ্ন করেছেন, ২৪-এর পরে কেমন বাংলাদেশ চেয়েছি, আমি কেমন বাংলাদেশ চেয়েছি। আমি অবশ্যই বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চেয়েছি। আর ২৪-এর আন্দোলনটা শুরু হয়েছিলো বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন হিসেবে। কিন্তু আমি আশাহত হয়েছি যে, সেই বৈষম্য এখনো রয়েই গেলো। এতোগুলো মানুষ শহীদ হলেন, কিন্তু বৈষম্যবিরোধী যে-আন্দোলন, সেটা আসলে এখন পর্যন্ত  আলোর মুখ দেখেনি। কারণ, যে-স্বপ্ন নিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধ অর্থাৎ একাত্তরে দেশ স্বাধীন হয়েছিলো, গত চুয়ান্নো বছরে সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে কিন্তু পারিনি। তারপর আমরা আশা করেছিলাম, একটি অভ্যুত্থান বলেন, বিপ্লবই বলেন, ২৪-এ একটা পরিবর্তন সাধিত হবে। কিন্তু সেটাও উলট-পালট হয়ে গেছে। মনে করেছিলাম যে, একটি সুষ্ঠু ধারার রাজনীতি ফিরে আসবে। মানুষে মানুষে বৈষম্য থাকবে না, অসাম্প্রদায়িক চেতনা আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হবে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম, আমরা দেখলাম মব-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি-নৈরাজ্য— কোনো জায়গায়ই শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। স্বাস্থ্যে বলেন, যোগাযোগে বলেন, কোনো জায়গায়ই শৃঙ্খলা ফিরে আসেনি। সুস্থ ধারার রাজনীতি এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতি— কোনোটাই আমরা দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু আমি আশাহত মানুষ নই, আমি আশাবাদী মানুষ। আমরা আবার সুন্দর একটা বাংলাদেশ, স্বপ্নের একটা বাংলাদেশ দেখতে চাই। আমাদের স্বপ্ন পূরণ হোক, এই আশা রাখছি। আসসালামু আলাইকুম।

মহেশ্বরদী প্রতিভা : কৃতী শিক্ষাবিদ আমির উদ্দিন মাস্টার

0

এক সময়কার সুবর্ণবীথি থেকে মহেশ্বরদী, তারপর মহেশ্বরদী  থেকে নরসিংহদী, নরসিংহদী থেকে আজকের নরসিংদীর জন্ম। সেই নরসিংদী শহরের কোল ঘেঁষে যে-গ্রামটি বিস্তৃত, সেটি হাজীপুর গ্রাম। ছোটো হাড়িধোয়া নদীর পাড় ঘেঁষে গ্রামটি পূর্বাংশে বর্ধিত হয়েছে। গ্রামের দক্ষিণ পাশ দিয়ে সুবিশাল মেঘনা নদী প্রবাহিত। অতীতে বিভিন্ন বর্গের কৃষক, মৎস্য শিকারী ও ছোটোখাটো ব্যবসায়ীদের বাস ছিলো সেখানে। হিন্দু প্রধান নরসিংদী শহরে বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী, আড়তদার ও চাকুরিজীবীদের তুলনায় হাজীপুর অনেকটা পিছিয়ে ছিলো। শিক্ষা-দীক্ষা ও জীবনযাত্রার দিক দিয়েও তারা আশানুরূপ ছিলো না।

এমন একটি পিছিয়ে পড়া জনপদে আমির উদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেও পরবর্তী জীবনে উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে ওঠেছিলেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে তিনি যেমন মেধাবী ছিলেন, কর্মক্ষেত্রে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর সাফল্য ছিলো বিরল এবং তাঁর শিক্ষা ও মেধার মাধ্যমে নরসিংদীতে একটি শতবর্ষী শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত পরিবারের জন্ম হয়, যার ধারাবাহিকতায় তাঁর ভাই ও বংশধরদের অনেকেই ব্রিটিশ আমলে ইংরেজি শিক্ষায় আলোকিত হয়।

আমির উদ্দিন আহমেদের জন্ম আনুমানিক ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে। তা নিয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। মৃত্যুবরণ করেন ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুলাই। পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছে। আমির উদ্দিন আহমেদ কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ও প্রেসিডেন্সি কলেজের কৃতী ছাত্র ছিলেন। তিনি ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে এন্ট্রান্স ও ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে বিএ পাশ করেন। উক্ত জনপদ থেকে কোনো মুসলমান ছাত্র হিসেবে সম্ভবত তিনিই প্রথম কলকাতা আলিয়া মাদরাসা ও প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে যথাক্রমে এন্ট্রান্স ও  ডিগ্রি সনদপ্রাপ্ত হন। জানা যায়, আলিয়া মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এন্ট্রান্স পাশ করার পর ঢাকা নওয়াব বাড়ি থেকে হাতির পিঠে চড়িয়ে আমির উদ্দিন আহমেদকে পুরো এলাকা ঘুরানো হয়। কলকাতা থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি গ্রামে চলে আসেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের গ্র্যাজুয়েট হিসেবে কলকাতায় যেকোনো পদস্থ সরকারি চাকুরি গ্রহণ করতে পারতেন। কিন্তু সেই লোভ  পরিত্যাগ করে তিনি ১৯১৩ কিংবা ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে আদিয়াবাদ ইসলামিয়া ইংরেজি হাই স্কুলে শিক্ষকতার চাকুরি গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিনি ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে অবসরে যান। কিন্তু তিনি বসে থাকার মতো লোক ছিলেন না। পরবর্তীতে ব্রাহ্মন্দীর স্থানীয় জমিদার জিতেন্দ্র কিশোর মৌলিক কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কামিনী কিশোর মৌলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি স্কুল পরিচালনা পর্ষদে জড়িত ছিলেন। স্কুলটি ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে পথচলা শুরু করেছিলো। উক্ত স্কুলে তিনি ইংরেজি ও অঙ্ক ক্লাশ নিতেন।  জনশ্রুতি ছিলো, স্কুলটি এক পর্যায়ে আর্থিক সংকটে পড়ে। তখন আমির উদ্দিন মাস্টার শখের বন্দুক বিক্রি করে দিয়ে শিক্ষকদের বেতন পরিশোধে সহযোগিতা করেছিলেন।

দাঙ্গা ছাড়াও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তখন না খেয়ে অনেকে মারা যান। বুভুক্ষু মানুষ কঙ্কালসার অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতেন। তাদের মুখে আহার দেয়ার জন্যে তিনি বাড়িতে লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। নিজের জমি বামা সুন্দরী নামক ধনাঢ্য মহিলার নিকট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে তাদের জন্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তখন অনেকে অভাবের কারণে বাস্তুহারা হয়েছিলেন। তাদের থাকার জন্যে স্থাপনাও নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।

সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি একজন সফল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। একজন সুবিচারক হিসেবে মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। তিনি ব্রিটিশ আমলে হাজীপুর ইউনিয়নের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন। একাধারে অনেক বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাছাড়া ঢাকা জেলা বোর্ডের সদস্য, জুরিবোর্ডের সদস্য ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ মহকুমা লোকাল বোর্ডের মেম্বার হিসেবে অনেকদিন দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখ্য যে, তিনি জেলা বোর্ডের মেম্বার থাকাকালীন এই অঞ্চলে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কূপ স্থাপনে সুপারিশ করতে হতো। সে-সময় তিনি রাস্তাঘাট উন্নয়ন, শিক্ষা ও সালিশী ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে বিশেষ অবদানের জন্যে স্বর্ণের মেডেল, আংটি ও সুরমাদানি পুরস্কারপ্রাপ্ত হন ব্রিটিশ প্রশাসন কর্তৃক। একবার কচুরিপানার দৌরাত্ম্যে মেঘনা নদীর নৌপথ বন্ধ হয়ে যায়। তখন আমির উদ্দিন আহমেদের প্রচেষ্টায় সেই নৌপথ সচল হয়। এই অবদানের জন্যে প্রশাসন একটি স্বর্ণের মেডেল পুরস্কার দিয়েছিলেন।

১৯৪৬ ও ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকা ও তার আশেপাশে ব্যাপক দাঙ্গা শুরু হয়, যার তাপ এসে লাগে নরসিংদীতে। হিন্দু প্রধান এলাকা হওয়ায় দাঙ্গা হওয়ার উপক্রম হয়। তখন সুন্দর আলী গান্ধী, আমির উদ্দিন মাস্টার, মৌলভী তফাজ্জল হোসেন, মধু ভূঞা, নৃপেন্দ্রচন্দ্র রায় প্রমুখ দাঙ্গা বন্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তাদের অসাম্প্রদায়িক মানসিকতার কারণে এলাকায় হিন্দু-মুসলমানদের সহাবস্থান নিশ্চিত হয়। আমির উদ্দিন আহমেদ মাস্টার তাঁর বাড়িতে অনেক হিন্দুকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।

দাঙ্গা ছাড়াও ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তখন না খেয়ে অনেকে মারা যান। বুভুক্ষু মানুষ কঙ্কালসার অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতেন। তাদের মুখে আহার দেয়ার জন্যে তিনি বাড়িতে লঙ্গরখানা খুলেছিলেন। নিজের জমি বামা সুন্দরী নামক ধনাঢ্য মহিলার নিকট বিক্রি করে সেই অর্থ দিয়ে তাদের জন্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তখন অনেকে অভাবের কারণে বাস্তুহারা হয়েছিলেন। তাদের থাকার জন্যে স্থাপনাও নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।

তিনি শিক্ষা প্রসারে ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। শিক্ষকতার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারে তাঁর ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। এলাকায় ১৯২৮ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার আলো জ্বেলেছিলেন। নিজ অর্থে বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও সরকারিকরণের অর্থ জমা করেন। এর আগে তিনি নিজ বাড়ির বাংলোঘরে অবৈতনিক পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে নিজেই শিক্ষা দিতেন। অনেক গরীব-অসহায় শিক্ষার্থীদের জন্যে তিনি নিজের টাকায় বই-পুস্তক ও শিক্ষাসামগ্রী কিনে দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বালাপুরের জমিদার কালী বাবুর পরিত্যক্ত জমিতে এলাকার মানুষের জন্যে গড়ে তোলেন চিকিৎসা কেন্দ্র, যা পরবর্তীতে আর্থিক সংকটে বন্ধ হয়ে গেলে সেই জায়গাটি এলাকার খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি আনসার ক্যাম্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে।

একজন আদর্শ শিক্ষক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবে নরসিংদীর বহু গুণীজনের সঙ্গে তাঁর সুসম্পর্ক ছিলো। অনেকের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে ওঠেছিলো। তাঁদের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি অনেক সামাজিক ও মানবিক কাজও করেছেন। সম্পর্কের সুবাদে তাদের অনেকেই আমির উদ্দিন মাস্টারের হাজীপুরের বাড়িতে একাধিকবার বেড়াতে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে দার্শনিক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ, কংগ্রেস নেতা সুন্দর আলী গান্ধী ও তাঁর ভাই শিক্ষানুরাগী বেলায়েত হোসেন মাস্টার, ‘সংবাদ’ পত্রিকার মালিক ও ঘোড়াশাল মিয়াবাড়ির জমিদার আহমেদুল কবির, ব্রাহ্মন্দীর জমিদার জিতেন্দ্র  কিশোর  মৌলিক, সাবেক এমপি রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজুর বাবা প্রখ্যাত আইনজীবী আফছারউদ্দিন আহমেদ, পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম গর্ভনর সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সাটিরপাড়ার জমিদার ও পরবর্তীতে ভারতের চন্দননগরের গর্ভনর ও পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিব সুনীল বরণ রায়, ঢাকার নবাব বাড়ির এস এ সেলিম, যোগেন্দ্র মাস্টার, মজিবুর পণ্ডিত, নকুল কুমার পণ্ডিত প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

ব্যক্তিগত জীবনে আমির উদ্দিন আহমেদ চিনিশপুর ইউনিয়নের পুরানপাড়ার জমিদার জয়েন উদ্দিন ভূঁইয়ার বড়ো মেয়ের (মধু ভূঁইয়ার বড়ো বোন) সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯১৫ সালে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সংসার জীবনের কোনো-এক সময়ে প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর ১৯২৫ সালে তিনি শিবপুর থানাধীন বৈলাব গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের জনাব আজাহার আলী (দুদু) খন্দকারের বড়ো মেয়ে আক্তার খাতুনের সাথে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন।

আমির উদ্দিন মাস্টারের কৃতিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ নানা মন্তব্য করেছেন। তন্মধ্যে বিশিষ্ট দার্শনিক ও নরসিংদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ তাঁর ‘মনের আরশিতে নরসিংদী’ লেখায় আমির উদ্দিন মাস্টারের শিক্ষানুরাগ ও সমাজসেবার প্রশংসা করেন। নরসিংদীর খ্যাতনামা শিল্পপতি মৌলভী তফাজ্জল হোসেনের লেখা ‘আমার জীবন কথা’ গ্রন্থে আমির উদ্দিন মাস্টার সাহেবের কথা এসেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন ও পত্রিকায় আমির উদ্দিন মাস্টারের কৃতিত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, বহুভাষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। ঢাকা গেলে তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে যেতেন। আদিয়াবাদ ইসলামিয়া হাই স্কুলে একবার ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অতিথি হয়ে এসেছিলেন। তখন আমির উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয়। উল্লেখ্য, দুজন একই কলেজের ছাত্র ছিলেন।

হাজীপুরের আদি বাসিন্দা ছিলেন আমির উদ্দিন আহমেদ মাস্টার। তাঁর পূর্বপুরুষ হিসেবে আবদুল হালিম দেওয়ানের নাম পাওয়া যায়। ধারণা করা যায়, তিনি মুঘল আমলে এলাকায় দেওয়ান বা প্রধান খাজনা আদায়কারী ছিলেন। তাঁর দুই পুত্রের নাম মাজুম দেওয়ান ও হাজারী দেওয়ান। মাজুম দেওয়ানের ছেলে উমেদ আলী, হাজারী দেওয়ানের তিন সন্তান— জনাব আলী (মুন্সি), আমুদ আলী ও আহমদ আলী। জনাব আলী মুন্সির দুই স্ত্রীর গর্ভে ছয় ছেলের জন্ম হয়। যথা— আফসার উদ্দিন, আমির উদ্দিন, ছাফির উদ্দিন, আলফাজ উদ্দিন, গোলাম কিবরিয়া ও গোলাম রব্বানী। এদের মধ্যে জনাব আলী ও সাহারবানুর গর্ভে আমির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন সবচেয়ে মেধাবী ও শিক্ষিত। তাঁর চার ছেলে ও ছয় মেয়ে। তাদের নামÑ রুহুল আমিন, ফখরুল আমিন, রাফিকুল আমিন, সদরুল আমিন, জাহানারা বেগম, নূরজাহান বেগম, সেতারা বেগম, খালেদা বেগম, লায়লা বেগম ও মাহমুদা বেগম। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সদরুল আমিন সবচেয়ে খ্যাতিমান। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সাবেক ডিন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির দুইবারের সভাপতি ও ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বেশ কিছু বই লিখেছেন। মাতৃভূমির প্রতি আমির উদ্দিন মাস্টারের ছিলো অগাধ ভালোবাসা। কলকাতার শিক্ষা জীবন বাদ দিলে তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিলো নিজ এলাকা। শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে আমৃত্যু কাজ করে গেছেন। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই পরবর্তীতে দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তিনি নিয়মিত দিনলিপি লিখতেন। পত্রিকা পাঠ করা ছিলো নিয়মিত অভ্যাস। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ফিচার কাটিং করে সংরক্ষণ করতেন। তাঁর আরেকটি ব্যতিক্রমী শখ ছিলো চা প্রীতি। ব্রিটিশ আমলে মানুষ চা সম্পর্কে কিছুই জানতো না। চায়ের প্রচারে তিনি হাজীপুরের নিজ বাড়িতে ‘চা প্রচার ক্যাম্প’ করেছিলেন। সেখানে বিনা পয়সায় চা পানের ব্যবস্থা করা হয়েছিলো চা পানের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্যে। তিনি চায়ের প্রচারকাজে অংশ নিতে অনেককে নিয়োগ দিয়েছিলেন।

এই কৃতী মানুষটির স্মৃতি ধরে রাখার জন্যে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কিছু মহতী কাজ করে যাচ্ছেন ‘আমির উদ্দিন আহমেদ মাস্টার ফাউন্ডেশন’ গঠনের মাধ্যমে। ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে উক্ত ফাউন্ডেশন স্থানীয় অসহায়-গরীব শিক্ষার্থীদেরকে বৃত্তি প্রদান করছে। ভবিষ্যতে তারা আরো কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছেন। যার মাধ্যমে এই কৃতী শিক্ষাবিদ মানুষের মনে জাগ্রত থাকবেন।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক