Home Blog Page 8

কবি মহসিন খোন্দকারের ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ কবিতাগ্রন্থের পাঠ-আলোচনা অনুষ্ঠান

কথা বলছেন কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

দিনটা শনিবার, ১০ মে ২০২৫। ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’ কর্তৃক আয়োজিত হয় ‘মহসিন খোন্দকারের কবিতাগ্রন্থ ব্যথার বঙ্গানুবাদ-এর পাঠ-পরাপাঠ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। নবধারা প্রি-স্কুল প্রাঙ্গণে বিকেল ৩ টা ৩০ মিনিটে আরম্ভ হয় অনুষ্ঠানটি। উপস্থিত ছিলেন নরসিংদীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা কবি-লেখক-সংস্কৃতিকর্মী এবং সাহিত্যপ্রেমীরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন প্রগতি লেখক সংঘের সহ-সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ সনেট। কবি মহসিন খোন্দকার রচিত ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ কাব্যের যুক্তিনিষ্ঠ পক্ষ-বিপক্ষের বাক-বিতণ্ডায় অনুষ্ঠানটি মুখরিত ছিলো। গ্রন্থটির কাব্যভাবনা, বিষয়, ভাষা, ছন্দসহ কবিতার মৌলিক ব্যাকরণিক বিষয়-আশয় চমৎকার বাকচাতুর্য দ্বারা তুলে ধরেন আলোচকগণ। আলোচকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন নরসিংদীর বিশিষ্ট শিক্ষক, লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ, কবি ও সম্পাদক মমিন আফ্রাদ, কবি ও সম্পাদক শাহীন সোহান, কবি হাসনাইন হীরা, এক্টিভিস্ট ও রাজনীতি বিশ্লেষক নাজমুল আলম সোহাগ এবং কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি। কাব্যগ্রন্থকে কেন্দ্র করে প্রত্যেকের ধারাবাহিক আলোচনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণোচ্ছ্বল হয়ে ওঠে।

লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ বলেন, “যা অনুভব, তা-ই কবিতা। কবি মহসিন খোন্দকার আঞ্চলিক ভাষার কবি। তার কবিতার জগত চমৎকার, শব্দবিন্যাস, বয়ানভঙ্গি অসাধারণ। সংকেত, উপমা, নতুন শব্দ প্রয়োগ ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে কাব্যখানি সার্থক হয়েছে।”

আলোচনা করছেন লেখক ও গবেষক প্রফেসর কালাম মাহমুদ | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

গ্রন্থের কবিতাগুলোর মৌলিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন সম্পাদক ও কবি শাহীন সোহান। তিনি বলেন, “এটি বিষয়, শব্দ, বাক্য, ভাষাভঙ্গি, রূপক, চিত্রকল্পে ঠাসা প্রেমের কাব্যগ্রন্থ। তবে কবিতার এতো সরল বাক্য আমার কাছে সুখকর মনে হয়নি।”

আলোচনার পর আলোচনায় চলে কাব্যের রসবোধ ও প্রকৃত নির্যাস। কবি মমিন আফ্রাদ বলেন, “প্রচুর ব্যক্তিগত প্রতীক ব্যবহার করেছেন কবি। যেমন : ভি-কাট রাত, চোখ ভর্তি জোনাকি, তিন ফর্মার আকাশ, ভাববিস্কুট, ফুলফুর্তির ফনেটিকস, মাখন মুহূর্ত, সাইকো সাফিক্স ও বয়সের তিরতিরানি তো আছেই।”

আরেকজন আলোচক কবি ও ঔপন্যাসিক মনোয়ারা স্মৃতি বলেন, “প্রতিটি কবিতা গূঢ় রসায়নে তাৎপর্যপূর্ণ। কাব্যের স্বকীয়তা হলো শব্দচয়নে। ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ একটি সমৃদ্ধ-সার্থক কবিতাগ্রন্থ।”

কবি হাসনাইন হীরা গ্রন্থটির শিল্পমান বিচার করতে গিয়ে সৈয়দ শামসুল হকের ‘পরাণের গহীন ভেতর’ ও আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যের সাথে তুলনা করে আলোচনা করেন। তিনি আরো বলেন, “আমার কাছে কাব্যের সবগুলো কবিতা একটি কবিতা মনে হয়েছে।”

কথা বলছেন কবি হাসনাইন হীরা | ছবি : রাজিব ভূঁইয়া

শিক্ষক, এক্টিভিস্ট ও সংস্কৃতিকর্মী নাজমুল আলম সোহাগ বলেন, “কবিতা কিছু শব্দ, কিছু চিত্রকল্পের গভীর উপলব্ধিবোধ। মহসিন খোন্দকারের নতুনত্ব, উচ্ছ্বাস-প্রবণতা, ছেলেমানুষি আমার মুগ্ধতার জায়গা। তিনি নিরন্তর লিখে যাবেন, এই আশা রাখি।”

এছাড়া চিত্রশিল্পী সাদেক মুকুল, সাবেক শিক্ষা অফিসার ও কলামিস্ট নূরুদ্দীন দরজী, লেখক নূরুল ইসলাম নূরচান, লেখক নূরজাহান বেগমসহ আরো অনেকে তাদের মূল্যবান বক্তব্য রাখেন। আলোচনা অনুষ্ঠানটি আরো প্রাণবন্ত হয় কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে। আলোচকদের আলোচনার ফাঁকে ‘ব্যথার বঙ্গানুবাদ’ গ্রন্থ থেকে ‘ভাববিস্কুট’, ‘আমাকে সরানো এতো সহজ না’ এবং ‘রঙিন রাতের ঠোঁট’ কবিতা আবৃত্তি করেন আবৃত্তিকার রওনক জাহান মুন ও কারিমা পুষ্পিতা।

অনুষ্ঠানটি সমাপ্ত হয় ‘প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’ এবং এই অনুষ্ঠানের সভাপতি সুমন ইউসুফের বুদ্ধিদীপ্ত ও চিন্তাশীল আলোচনায়।

হরিচরণ আচার্য্য : স্থানীয় ইতিহাসে উপেক্ষিত সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল

0

দুই বাংলা, আসাম, ত্রিপুরা, বর্ধমান, শিলিগুড়ি, দার্জিলিং, উড়িষ্যা ও পাটনাসহ আরো অনেক স্থানে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল এবং বৈষ্ণব সাধক হিসেবে যুগ যুগ ধরে পূজণীয় হয়ে আসছেন শ্রী হরিচরণ আচার্য্য কবিগুণাকর (১৮৬১-১৯৪১)। বিশেষ করে, ‘কবিগানের অমর স্রষ্টা’ অভিধাপ্রাপ্ত এ-ব্যক্তিত্ব স্বদেশি আন্দোলন, রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামাজিক অবক্ষয় ও সাংস্কৃতিক ভাঙাগড়ায় যে-খাঁটি বাঙালিত্বের প্রমাণ রেখে গেছেন, তা কোনোদিনই আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে না। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংক্রান্তির দিনে তৎকালীন ঢাকা জেলার মহেশ্বরদী পরগণাধীন নরসিংদী গ্রামে (নরসিংদী বর্তমানে একটি জেলা শহর) জন্মগ্রহণকারী হরিচরণ আচার্য্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো নিজ পৈতৃক ভিটায় আরাধ্য দেব-দেবী ‘শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রম’ প্রতিষ্ঠা। শেষ জীবনে কবিগান ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ-আশ্রমের মাধ্যমেই তিনি জাগতিক সব সুখ-শান্তি আর আত্মতৃপ্তি খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করেছেন।

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) সম-সাময়িক ব্যক্তি হিসেবে তিনি কবিদলে দোহারনট্ট (ঢোলকবাদক), তবলচি, বাঁশিঅলা, খোল-মন্দিরা ও বেহালাবাদক সহযোগে সারা বাংলাসহ ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় আসর মাতিয়ে রেখেছিলেন। আখ্যা পেয়েছিলেন ‘কবিয়াল সম্রাট’। নদীমাতৃক বাংলার জমিদার, তালুকদার, রাজকর্মচারী ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষকতায় বেড়ে ওঠা কবিগানের ত্রাণকর্তা হিসেবে হরিচরণ আচার্য্য ‘বায়না’ পেয়েই নিজস্ব ‘পানসি’ নৌকাযোগে সর্বত্র ছুটে বেড়িয়েছেন। সেখানে প্রতিপক্ষ কবিয়ালকে টপ্পা, ছড়া কাটাকাটি, বাকচাতুর্যে পরাস্ত করে, ডাক-মালসী, মিলন আগমনী সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে তিনি জয়ের মালা গলায় পরতেন। কৃষক-শ্রমিক, সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ থেকে শুরু করে জমিদার, তালুকদারেরা তাঁর গানে মুগ্ধ হয়ে মেডেল, সোনা-রূপার মোহর, এমনকি নগদ অর্থও পুরস্কৃত করতেন।

নরসিংদী বাজারে বসবাসকারী ‘আচার্য্য ব্রাহ্মণ’ বিষ্ণুমোহন আচার্য্য বংশগতভাবে মূর্তিশিল্প ও ফলিত জ্যোতিষী বিদ্যাকে পেশা হিসেবে বেছে না নিয়ে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত হিসেবে খ্যাতি পেয়েছিলেন। স্ত্রী বিষ্ণুশশীপ্রিয়া দেবী একজন দায়িত্বশীল গৃহিণী এবং পূজা অর্চনায় শ্রদ্ধাশীল নারীর ভূমিকায় ছিলেন অনন্যা। তাঁরাই হলেন হরিচরণ আচার্য্যরে পিতা-মাতা। তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন গুরুচরণ আচার্য্য। তিনি দক্ষ মূর্তিশিল্পী ও ফলিত জ্যোতিষচর্চার মাধ্যমে কুলগত বৃত্তিতে খ্যাতিমান হয়েছিলেন।

হরিচরণ আচার্য্য সাটিরপাড়ার রঘুনাথ ব্রহ্মচারীর টোলে চতুষ্টয় বৃত্তি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ছেদ পড়ে। তখন পারিবারিক কুলবৃত্তি এবং কবিরাজী চিকিৎসাবিদ্যা শেখানোর চেষ্টা করা হয়। এর কোনোটাতেই তাঁর স্থিতি হয়নি। বরং নরসিংদী ও তার আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে অনুষ্ঠিত পালা ও রামায়ণ গানের আসরে সময় কাটাতে থাকেন বালক হরিচরণ। উক্ত গানের আসরে তিনি এতোটাই অনুরক্ত হয়ে ওঠেছিলেন যে, ১৪ বছর বয়সে নিজেই রামায়ণ গান গাইতে শুরু করেন। ১২৮৩ বঙ্গাব্দের পর সাটিরপাড়ার স্বরূপ কবিরাজের রামায়ণ গানের দলে ভিড়ে যান। অল্পদিনের মধ্যে উক্ত গানে তিনি অদ্বিতীয় হয়ে ওঠেন। বঙ্গদেশে তার যশ-খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

সেই সময় বাংলার সর্বত্র কবিগানের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছিলো। মাধবদীর দক্ষিণের গ্রাম আলগী নিবাসী রামকানাই আচার্য্য, রায়পুরার ডৌকাদীর হরিশচন্দ্র চক্রবর্তী, পারুলিয়ার জয়হরি সরকার, বৈকুণ্ঠনাথ চক্রবর্তী ওরফে পাগল দ্বিজদাস প্রমুখ তখন কবিগানের আসর মাত করে যাচ্ছিলেন। রামায়ণ গান গাওয়ার পাশাপাশি হরিচরণ আচার্য্য এসব খ্যাতনামা কবির সংস্পর্শে আসেন।

এরই মধ্যে একদিন পারুলিয়া গ্রামে কবিগানের আসরে জয়হরি সরকার ও শিবচন্দ্র দাসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কথা থাকলেও এক পর্যায়ে শিবচন্দ্র আসর ছেড়ে গা ঢাকা দেন। আসর ধরে রাখার জন্যে তৎস্থলে যুবক হরিচরণ আচার্য্যকে নামিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু উপস্থিত দর্শক-শ্রোতা ও বোদ্ধা মহলকে তাক লাগিয়ে দিয়ে স্বনামধন্য জয়হরি সরকারকে পরাজিত করে দেন। এ-ঘটনা মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে চাউর হয়ে যায়। কবিয়াল হিসেবে শুরু হয় হরিচরণের নবযাত্রা। এরপর তাঁকে আর কবিগানের ক্ষেত্রে কখনো পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। সেই সময় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার, আধুনিক নাটক, থিয়েটারসহ আরো কিছু বিনোদন সামগ্রী আমদানি হওয়ার ফলে কবিগান একমাত্র অশিক্ষিত সাধারণ সম্প্রদায়ের মনোরঞ্জন করে টিকে ছিলো। ফলে এতে অশ্লীলতা ও স্থূলতা ব্যাপকভাবে ঢুকে পড়ে। শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা কবিগান শোনা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। এমনি ক্রান্তিকালে একক ত্রাণকর্তা হয়ে আসেন হরিচরণ আচার্য্য। নিখুঁত লহর রচনা, গানে সাহিত্যরস সংযোজন এবং ছড়া-টপ্পা সংযুক্ত করে তিনি কবির আসরে নতুন প্রাণ ফিরিয়ে আনেন। চিতানে গান শুরু করে দিয়েই সব গায়ক বসে পড়ে, সর্বোত্তম গায়ক একটি বেহালা ও ঢোলের তালে বেশ মাজাঘষা সুরে গানটি গেয়ে যায়। এভাবে চারদিকে চারজন দাঁড়িয়ে একে একে গানটি আদায় করে। এ-প্রথার স্রষ্টা হলেন হরিচরণ আচার্য্য।

কবিগানের আধুনিকায়ন নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে। প্রাচীনকালে কবিয়ালরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে পর্যায়ক্রমে গান গাইতেন। রাম বসুই সর্বপ্রথম মৌখিক ছড়া কাটা এবং বাকযুদ্ধের অবতাড়নার সূচনা করেন। আর কবিগানের সর্বোজ্জ্বল সূর্য হিসেবে গানের কথায়, সুরে এবং বাদ্যযন্ত্রে আমূল পরিবর্তন এনে হরিচরণ আচার্য্য অমরত্ব লাভ করেছেন। সবচেয়ে প্রাচীন কবিয়াল গুঁজলা গুই অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে পেশাদার কবিগানের সূচনা করার পর রঘুনাথ দাস, লালুনন্দলাল, রামজী দাস, হরু ঠাকুর, কেষ্টা মুচি, নিতাই বৈরাগী, রাম বসু, ভোলা ময়রা, ঠাকুর দাস, নবাই ঠাকুর, এন্টনি ফিরিঙ্গি, রামকুমার সরকার, রামুমালী, নিমচাঁদ ঠাকুর, রামকানাই প্রমুখ কবিগান গেয়ে দেশ ভাসিয়ে ছিলেন। হরিচরণ আচার্য্য তাঁর স্বীয় মেধা আর যোগ্যতাবলে এতে পূর্ণতা আনেন।

হরিচরণ আচার্য্য অধিকাংশ সময় পানসি নৌকাতে কাটাতেন। পানসির এক বিশেষ কামরায় গদির উপর তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে পদ্মাসনে বসে হাতে মালা নিয়ে জপ করতেন, বিশ্বামিত্র মুনির মতো। দেখতে তিনি ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ, আজানুলম্বিত বাহু, মুখে লম্বা দাড়ি, মস্তকে টাক ও পেছনে সামান্য কিছু কেশ ঝুটি বাঁধা। চোখ দুটি যেন কোন ভাবাবেশে ঢুলুঢুলু। গান গেয়ে যেটুকু সময় পেতেন, তার পুরোটাই ব্যয় করতেন নিজ ভিটায় গড়ে তোলা শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমের কাজে। ফলে সারা বাংলার অজস্র কবিয়ালদের কাছে হরিচরণের মতো তাঁর প্রতিষ্ঠিত আশ্রমটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেছিলো। ‘মা-দাদা সম্প্রদায়’-এর প্রতিষ্ঠাতা শ্রী বসন্ত সাধুর শিষ্যত্ব গ্রহণ করার পর বৈষ্ণব মন্ত্রে দীক্ষিত হয়েই আশ্রম গড়ে তোলার ব্রত গ্রহণ করেছিলেন তিনি। বাংলার অধিকাংশ কবিয়ালের সাথে হরিচরণ আচার্য্যের বাকযুদ্ধ হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলেন তিনি।

সুদীর্ঘ কবিয়াল জীবনে হরিচরণ বেশ কিছু ছাত্র-শিষ্য সৃষ্টি করে কবিগানকে আরো সমৃদ্ধ করার পথ প্রশস্ত করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নরসিংদী বাজারের প্রহ্লাদ সরকার, ঝালকাঠির নকুলেশ্বর সরকার, রূপগঞ্জের তারিণী সরকার, বেনুপুরের অম্বিকা পাটনী, জিনারদীর হরেন্দ্র চক্রবর্তী, সাধারচরের সর্বানন্দ আচার্য্য, ভৈরবের দ্বারিকা সরকার, কুমিল্লার অর্জুন দেবনাথ, চাপাতলীর কালী কুমার দে, নোয়াখালীর রমেশ আচার্য্য ও খুলনার রাজেন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ। তাঁর কবির দলে ধরতা দোহার হিসেবে কাজ করেছেন মনোমোহন আচার্য্য। তিনি ছিলেন হরিচরণের জ্ঞাতি ভাই। ‘আচার্য্য কর্তা’র দলে দোহার ও বাদ্যযন্ত্র সংগতকার হিসেবে আরো ছিলেন মদন, গোবিন্দ আর আদরমণি নামে এক সুকণ্ঠী বালিকা। তাঁরা ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কবিগানের আসর মাত করে রেখেছিলেন।

১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ১৩ জ্যৈষ্ঠ হরিচরণের প্রস্থান ঘটলে বাংলা থেকে একজন দ্বিগ্বিজয়ী কবিয়ালের যে-শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তাতে লোকসঙ্গীতের এ-ধারা ভঙ্গুর পথে প্রবাহিত হতে থাকে। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী জন্ম না নেয়ায় কবিগান প্রায় হারিয়ে গেছে। বই-পুস্তকের পাতা ছাড়া এ-গানের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। কবিগানের নিজস্ব যুগ প্রবর্তনকারী হরিচরণ আচার্য্যের ভাগ্যে কোনো রাষ্ট্রীয় সম্মান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি না জুটলেও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, কৃষক, শ্রমিকদের কাছে ‘কবিয়াল সম্রাট’, ‘আচার্য্য কর্তা’ তথা প্রাণের মানুষ অভিধায় সিক্ত হয়েছিলেন। একই সাথে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী থানাধীন মসূয়া গ্রামের একদল সংস্কৃত পণ্ডিত তাঁকে কবিগুণাকর উপাধি দিয়েছিলেন ১৩৬৫ বঙ্গাব্দের ১৯ অগ্রহায়ণ। নরসিংদী শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রম প্রাঙ্গণে যখন উপাধিপত্রটি কবিয়ালের হাতে তুলে দেয়া হয়, তখন সেখানে এক উৎসব বয়ে গিয়েছিলো।

শ্রী চৈতন্যের বৈষ্ণব ধর্মানুসারী, আজন্ম নিরামিষভোগী ও নির্লোভ চরিত্রের অধিকারী হরিচরণ আচার্য্য সংসার জীবনে ছিলেন নিঃসঙ্গ। অম্বিকাচরণ আচার্য্য নামের একমাত্র পুত্র অকালে মৃত্যুবরণ করলে তাঁর বংশ নির্বংশ হয়ে যায়। তবে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গুরুচরণ আচার্য্যের বংশধরদের একটি শাখা ত্রিপুরার আগরতলায় বিদ্যমান রয়েছে। হরিচরণ গবেষণাগার নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে জগদীশচন্দ্র আচার্য্য গণেশ নিজ বংশীয় হরিচরণ চর্চা এখনো অব্যাহত রেখেছেন। তবে বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির অমূল্য সম্পদ হলো তাঁর সৃষ্টি গান, লহর, ছড়া, পাঁচালী, টপ্পা, কবিয়াল জীবনের স্মৃতিকথা, অলৌকিক ঘটনাবলির বর্ণনা, ধর্মীয় বিবরণ প্রভৃতি। সুখের কথা, হরিচরণ আচার্য্যই একমাত্র কবিয়াল, যাঁর এসব গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পুস্তিকা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিলো। এগুলো কবিগান ও কবিয়ালদের নিয়ে যেকোনো গবেষণায় আকরগ্রন্থ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ-যাবতকালে হরিচরণ আচার্য্যের লেখা ১০ টি গ্রন্থের নাম পাওয়া যায়। গ্রন্থগুলো হলো : কবির ঝংকার (১ম খণ্ড), কবির ঝংকার (২য় খণ্ড), পরিশিষ্ট (কবির ঝংকারের ৩য় খণ্ড), অমিয় লহরী, বঙ্গের কবির লড়াই, বসন্ত লীলামৃত, নবদ্বীপ সুধা, নদীয়া মঙ্গল, শ্রী দাদার অমিয় বাণী ও শ্রী শ্রী গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া গীতি চয়নিকা। তাছাড়া তাঁর অসংখ্য সাহিত্য উপাদান এখনো অগ্রন্থিত অবস্থায় এখানে-সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, এসব দুষ্প্রাপ্য রচনাসম্ভার হারিয়ে যেতে বসেছে। কোনো কোনো গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ হলেও তা এখন আর বাজারে পাওয়া যায় না। তবে সুখের বিষয়, এসব দুষ্প্রাপ্য রচনাবলির মধ্যে বঙ্গের কবির লড়াই, অমিয় লহরী ও কবির ঝংকার (১ম খণ্ড)-র অংশবিশেষ এক মলাটে প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে নতুন করে হরিচরণ আচার্য্যের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে অমিয় লহরী ও কবির ঝংকারের দ্বিতীয় সংস্করণ ছাপা হয়েছে।

এই লেখায় কালজয়ী কবিয়াল হরিচরণ আচার্য্য সম্পর্কে যৎসামান্য ধারণা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এতে আমার নিজস্ব কোনো কৃতিত্ব নেই। বিস্মৃতপ্রায় এ-কবিয়ালের নামধাম, যশ-খ্যাতি এবং সাফল্যগাঁথা— সবকিছু জনসমক্ষে প্রস্ফুটিত করার জন্যে স্মরণীয় হয়ে আছেন কয়েকজন হরিচরণ প্রেমী। নিঃস্বার্থ এই মানুষগুলোর মধ্যে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, ড. দীনেশচন্দ্র সিং, ময়মনসিংহ নাসিরাবাদ কলেজের সাবেক অধ্যাপক যতীন সরকার, ‘নরসিংদীর ইতিহাস’ গ্রন্থের লেখক শফিকুল আসগর, অধ্যাপক (অব.) প্রণব চক্রবর্তী, প্রফেসর গোলাম মোস্তাফা মিয়া, সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের প্রয়াত প্রবীণ শিক্ষক সত্যেন্দ্রনাথ মোদক এবং একনিষ্ঠ হরিচরণ ভক্ত হরিপদ সাহার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের সাথে নরসিংদীরই মানুষ বর্তমানে আগরতলা প্রবাসী জগদীশচন্দ্র আচার্য্য গণেশের এবং ডা. সুভাষ ভৌমিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। দেশত্যাগী ভাবুক এ-মানুষটি হরিচরণ চর্চাকে তাঁর জীবনের একটি অংশ করে নিয়েছেন। জানা যায়, শ্যামাচরণ সাহা (শ্যাম সাধু) হরিচরণের একনিষ্ট ভক্ত ছিলেন। তাঁকেও গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমে গুরুর সমাধির সন্নিকটে সমাধিস্থ করা হয়। শ্যাম সাধুর পুত্র মনোরঞ্জন সাহা (কণা সাধু) মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত আশ্রমের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং কণা সাধুর পুত্র ডা. দিলীপ কুমার সাহা এখনো আশ্রমের কর্মধারার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। তিনি গৌর বিষ্ণুপ্রিয়া আশ্রমধাম কমিটির বর্তমান সেক্রেটারি। সভাপতি হিসেবে আছেন অধ্যক্ষ অহিভূষণ চক্রবর্তী। হরিচরণ আচার্য্য সম্পর্কে ডা. দিলীপ কুমার সাহা বলেন, “হরিচরণ আচার্য্য হচ্ছেন আমাদের এই উপমহাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিয়াল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও হরিচরণ আচার্য্যের জন্ম-মৃত্যু একই সালে। আমি মনে করি, বাংলার আকাশে একই সময়ে দুই নক্ষত্রের বিচরণ ঘটেছিলো— পশ্চিম দিগন্তে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ এবং পূর্ব দিগন্তে আমাদের হরিচরণ আচার্য্য।”

ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবীদের সংগঠক ও সহায়ক শিক্ষানুরাগী ললিতমোহন রায়, মহাত্মা গান্ধীর অনুসারী সুন্দর আলী গান্ধী, অভয় মোদক, দীননাথ মোদক প্রমুখের সাথে হরিচরণ আচার্য্যের সম্পর্ক ছিলো সুনিবিড়। শুধু কবিয়াল হিসেবেই নয়, তিনি একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ও দেশসেবক হিসেবেও ইতিহাসে স্থান করে আছেন। কিন্তু স্থানীয়ভাবে ঠিক ততোটাই উপেক্ষিত তিনি। অথচ তাঁকে নিয়ে কলকাতা ও আগরতলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিসহ নানা গবেষণা হয়েছে, হচ্ছে।

কবিগানের পুনরুদ্ধারকারী, কর্কশ ও অশ্লীল কবিগানকে শ্রুতিমধুর করে অমরত্ব দান করায় অমর হয়ে থাকবেন হরিচরণ আচার্য্য। অথচ নিজভূমে তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত। সুদূর আগরতলায় হরিচরণ গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হলেও জন্মস্থান নরসিংদীতে তিনি হারিয়ে যেতে বসেছেন। তাঁর জন্ম-মৃত্যু তিথিতে তাঁকে স্মরণ পর্যন্ত করা হয় না। অথচ নরসিংদীর অমূল্য সম্পদ তিনি। কতোটা অকৃতজ্ঞ হলে স্থানীয় মানুষজন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এমনটা করতে পারে। তাঁকে সম্মান জানানোর এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে সঠিক ইতিহাস রেখে যাবার দায়বোধ কবে জাগবে, সেটাও অনিশ্চিত।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক মোহাম্মদ আজমের সাথে নির্দিষ্ট আলাপ

0

মোহাম্মদ আজম। লেখক ও গবেষক। বর্তমানে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। আজ (১৬ এপ্রিল ২০২৫, বুধবার) নরসিংদী সরকারি মহিলা কলেজের বাংলা বিভাগ কর্তৃক আয়োজিত ‘আধুনিক বাংলা কাব্যের ধারাক্রমে জসীমউদ্দীনের বিশিষ্টতা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সেখানেই ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র পক্ষ থেকে তাঁর এই ছোট্টো সাক্ষাতকারটি গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন সম্পাদক সুমন ইউসুফ।


 

বাংলাদেশে এখন প্রচুর লেখক-কবি বা বুদ্ধিজীবীদের ফ্যাসিবাদের বয়ান রচনাকারী বা বিগত সরকারের সমর্থক নাম দিয়ে বাংলা একাডেমি, পাঠ্যপুস্তক বা আরো নানা পরিসর থেকে বাদ দেয়ার যে-সংস্কৃতি চালু আছে, এটা কি ইনক্লুসিভ জাতি বা রাষ্ট্র নির্মাণের সহায়ক হচ্ছে?

মোহাম্মদ আজম :  না। যদি ব্যাপারটা এরকমই হয় যে, শুধু একজনকে ট্যাগ দিয়ে বাদ দেয়া হচ্ছে, তাহলে সেটা ডেফিনেটলি ইনক্লুসিভ রাষ্ট্র গঠনের অন্তরায়। কিন্তু একটা কথা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, বিগত সরকারের অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে, অন্যায়ের সঙ্গে, বাড়তি ও অন্যায় সুবিধা নেয়ার সঙ্গে যদি কেউ যুক্ত থাকে, তারও একটা ফয়সালা আগে হওয়া উচিত। সেটা হওয়ার পরে এসবের সাথে যারা যুক্ত ছিলো না, তাদেরকে এক্সক্লুড করা কোনো কাজের কথা নয়।

এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্যে আপনারা কি নির্মোহ-নিরপেক্ষ কোনো পদ্ধতি চালু করেছেন?

মোহাম্মদ আজম : আপনি যদি বাংলা একাডেমির কথা বলেন, তাহলে আমি বলবো, আমরা একেবারে শতভাগ নির্মোহ থাকতে পারছি, সেই দাবি আমি করবো না। কিন্তু আমরা ডেফিনেটলি কাজ করি। বাংলা একাডেমি এমন বিষয় নিয়ে কাজ করে, যেটার সাথে বিশেষজ্ঞতার সম্পর্ক আছে। ফলে আমরা কোনো একটা পক্ষযুক্ত যে-কাউকে এনে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি না। আমাদের বিশেষজ্ঞতার একটা লেভেল মেনটেইন করতে হয়। এবং সেক্ষেত্রে আমরা এমন অনেককেই আমাদের লেখালেখি বা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছি, যাদেরকে আর যা-ই হোক, আওয়ামী বিরোধী বলা যাবে না।

আমি উদাহরণস্বরূপ বলি সাইমন জাকারিয়ার বিষয়টা। আপনারা ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার মব ট্রায়াল থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, সেগুলো কি যথাযথ হচ্ছে?

মোহাম্মদ আজম : কোনো কোনো ক্ষেত্রে যেটা ঘটেছে, সেই ব্যাপারটা হলো, বাংলা একাডেমি তো কোনো আইনী প্রতিষ্ঠান না। বাংলা একাডেমি পুলিশ নিয়োগ করে ব্যারিকেড দিয়ে কোনো সেমিনার করতে পারে না। ফলে যখন বিপুল পরিমাণ লোক কোনো একটা ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে, তখন আমাদের সাময়িকভাবে সেই সিদ্ধান্তটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তার মানে এই নয় যে, তিনি অন্য কোনো কাজ করছেন না। তার মানে এই নয় যে, তিনি আর কখনোই কাজ করবেন না। তার মানে এই নয় যে, তাদের দাবির সাথে আমরা একমত পোষণ করেছি।

অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেয়ার পরে তো তাদের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করাই হলো…

মোহাম্মদ আজম : না, একাত্মতা পোষণ হলো না। আমরা যেটা করলাম, সেটা হলো, একটা অনুষ্ঠান আমাদের নির্দিষ্ট সময়ে করতে হবে, এটা একটা ফিজিক্যাল প্রেজেন্স। সেখানে একটা মারামারি বা ফ্যাসাদের যে-ঝুঁকি, সেই ঝুঁকিটা আমরা কাটালাম মাত্র। এর মানে এই নয় যে, আমরা তাদের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেছি।

এটা আপনি স্পষ্ট করে বলছেন?

মোহাম্মদ আজম : এক্সাক্টলি দ্যাট।

বাংলাদেশে সমাদৃত তিনজন লেখককে বাংলা একাডেমি পুরস্কারের জন্যে নাম ঘোষণা করেও বাদ দিয়েছেন…

মোহাম্মদ আজম : না। সেলিম মোরশেদের যে-ব্যাপারটা, সেটার সাথে বাকি দুজনের ব্যাপারটা এক নয়। সেলিম মোরশেদ তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে পরিষ্কারভাবে লম্বা বয়ান দিয়েছেন। এবং সেখানে নির্বাচক, বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ এবং সমস্ত কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। কিন্তু বাকি দুজনের ওই সময়ের গণহত্যা বা অন্যায় কর্মকাণ্ডে, যেটা কোনো নৈতিক অন্যায় নয়, ফৌজদারী অন্যায়, সেই ব্যাপারে তাদের অবস্থান কখনো কখনো অস্পষ্ট এবং কখনো কখনো সরাসরি ঐকমত্যমূলক। তো সেই সময় আমরা যে-পর্যালোচনা করেছি, সেখানে এসব প্রমাণিত হওয়ায় আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এই বিষয়ে আমার শেষ প্রশ্ন, বাংলা একোডেমি পুরস্কার নিয়ে প্রতিবারই কোনো-না-কোনো বিতর্ক হয়। এগুলো এড়ানো কি সম্ভব নয়? আপনি যেহেতু এখন দায়িত্বে আছেন, আপনার কী মনে হয়?

মোহাম্মদ আজম : কথা হলো যে, এই জিনিস একেবারে আমি বা বাংলা একাডেমি— এই পার্টিকুলার আসপেক্ট থেকে আলাপ করলে আমরা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের রাষ্ট্রের সমস্যা হলো স্ট্রাকচার তৈরি না হওয়ার সমস্যা, প্রতিষ্ঠান তৈরি না হওয়ার সমস্যা। প্রতিষ্ঠান তার দীর্ঘ ইতিহাসের মধ্যে সেই মর্যাদা অর্জন করে, যে-মর্যাদা দশজনের স্বীকৃতি পায়। আমাদের এখানে এই বিতর্ক শুধু বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়েই হয় না। প্রথমত, একটা পুরস্কার অন্তত আপনি দেখাতে পারবেন না, যে-পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক হয় নাই। তার মানে, বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক যে-অপূর্ণতা, এবং তার সাথে স্বীকৃতির যে-সম্পর্ক, জনসম্মতির যে-সম্পর্ক, এটার যে-অভাব, এই পুরো ব্যাপারটি নিয়ে আলাপ না করলে আমরা এর কোনো সুরাহা করতে পারবো না। আমি বলবো যে, আমাদের পুরো সংস্কৃতির মধ্যে এই ব্যাপারটা নিয়ে ঘোরতর সংকট আছে। আমাদের কাজ হবে, প্রতিষ্ঠানকে জোরালো করে, কাঠামোকে জোরালো করে এই সংস্কৃতিকে অতিক্রম করে যাওয়া।

আচ্ছা, সরকারের বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের এজেন্ডা বাস্তবায়নই কি বাংলা একাডেমির প্রকৃত কাজ? সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতির মনন এবং সৃজন বিকাশে বাংলা একাডেমি কি কাজ করতে পারবে বলে মনে করেন আপনি?

মোহাম্মদ আজম : প্রথম কথা হলো যে, স্বায়ত্তশাসন শব্দটি আপনি যে-ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছেন, আপনি আগে, বামপাশে, ‘সম্পূর্ণ’ শব্দটি যোগ করেছেন, তার মানে হলো, এই বিষয়ে আপনারই দ্বিধা আছে। এখন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান মানেই রাষ্ট্রের আওতা বহির্ভূত প্রতিষ্ঠান নয়। রাষ্ট্র কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে স্বায়ত্তশাসিত হিসেবে কাজ করতে দেয় সিম্পলি এই কারণে যে, রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন রাজনৈতিক দল বা রাজনৈতিক মতাদর্শ সাপেক্ষে যেন প্রভাবিত না হয়। যাতে করে সেই প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদী কাজ করতে পারে। যেমন ইউনিভার্সিটি। ইউনিভার্সিটি দীর্ঘমেয়াদে কাজ করে। আবার বাংলা একাডেমি, আমরা ধরে নিই যে, এটি একটি গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠান, গবেষণামূলক রচনাবলি প্রকাশ করবে এবং নতুন নতুন গবেষণার উদ্যোগ নেবে। এই প্রতিষ্ঠান যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন একটি দল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে গবেষণা বলে যে-ব্যাপারটা, সেটাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এজন্যে এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। কিন্তু কথাটা বুঝতে হবে যে, স্বায়ত্তশাসিত কথাটা কোথাও অ্যাবস্যুলিউট না। আপনি যদি পার্টিকুলার উদাহরণ দিতে পারেন যে, বাংলা একাডেমি গত সাত মাসে রাষ্ট্রের ধ্বজাধারী হয়ে কী কী কাজ করেছে, তাহলে ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার বলতে আরো সুবিধা হবে। একটা কথা খেয়াল রাখতে হবে যে, বাংলা একাডেমি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় বাজেটে পরিচালিত এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রতিষ্ঠান। এই পুরো অংশটা বাদ দিয়ে আপনি যদি শুধু ‘স্বায়ত্তশাসিত’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তাহলে কিন্তু ব্যাখ্যাটা হচ্ছে না। যদি এর আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ স্বনির্ভরতা থাকতো, তাহলে সে যেই স্বায়ত্তশাসন ভোগ করতে পারতো, আর্থিকভাবে সরকারের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অঙ্গীভূত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেই মাপের স্বায়ত্তশাসন ভোগ করাটা সম্ভব নয়।

বাংলা একাডেমির পুরোনো ধারাবাহিকতার জায়গা থেকে একটি প্রশ্ন করতে চাই। সেটি হলো, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আপনার উপর কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করছে কি না?

মোহাম্মদ আজম : ব্যক্তি এখানে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো কাঠামো এবং ইনস্টিটিউশন। আমি গত সাত মাসে প্রধানত যে-চেষ্টাটা করেছি, সেটা হলো, আমি একটা বই পুনর্প্রকাশ হবে কি না, পুনর্মুদ্রণ হবে কি না, এই বিষয়েও নিজে কোনো সিদ্ধান্ত জানাইনি। আমি কাগজে বরাবরই লিখে দিয়েছি আমার সংশ্লিষ্ট বিভাগকে যে, এই বইয়ের পুনর্মুদ্রণের সম্ভাবনা যাচাই করে আমাকে জানান। তার মানে, আমি এটাকে ইনস্টিটিউট আকারে ডেভেলপ করার জন্যে কাজ করছি। এটার কোনো সুফল ভবিষ্যতে হয়তো দেখা গেলেও যেতে পারে।

বাংলা একাডেমি সাহিত্যকে বাংলার প্রান্তে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যে কী কাজ করছে? এ-ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী?

মোহাম্মদ আজম : বাংলার প্রান্তীয় অঞ্চলে সাহিত্যকে ছড়িয়ে দেয়ায় বাংলা একাডেমির কাজ আসলে খুবই অপ্রতুল। এবং এটা বাংলা একাডেমির বর্তমান যে-স্ট্রাকচার, সেই স্ট্রাকচারে আসলে সম্ভব নয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে আসলে যেটা মনে করি, রাষ্ট্রীয় যেকোনো সাংগঠনিক, কাঠামোগত আয়োজন উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত সম্পূর্ণরূপে বিস্তার করা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান কাঠামো অনুযায়ীই সম্ভব। এবং এটাই করা উচিত। সেক্ষেত্রে প্রত্যেক উপজেলাতেই একটি কালচারাল হাব তৈরি করা জরুরি, যেখানে পাবলিক লাইব্রেরি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলা একাডেমির এটলিস্ট প্রতিনিধিত্ব থাকবে। তার মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ে সমস্ত কর্মকাণ্ড সাধিত হবে। একমাত্র এ-ধরনের একটি কাঠামো যদি বাংলাদেশ রাষ্ট্র তৈরি করে, এটা কোনো আদর্শবাদী বা কাল্পনিক সিদ্ধান্ত নয়, সরকার চাইলে এই সিদ্ধান্ত আজকেই নিতে পারে, তাহলেই একমাত্র এই কাজটা হতে পারে। বাংলা একাডেমির বর্তমান যে-কাঠামো, সেই কাঠামোতে বাংলাদেশের প্রান্ত পর্যন্ত সাহিত্যকে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়।

আমার শেষ প্রশ্নটি হলো, বর্তমান সরকার আসার পরেও যেসব নিয়োগ হয়েছে, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, বাসস এগুলো তো আসলে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হলো। তাহলে কি পুরোনো ধারাবাহিকতাই বহাল থাকলো না?

মোহাম্মদ আজম : এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোথাও অন্য কোনো পদ্ধতি আছে কি না, আমি জানি না। তবে কেউ কেউ প্রস্তাব করেছে যে, ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে যেমন সার্চ কমিটি করা হয়, এরকম একটা সার্চ কমিটি করা যেতে পারে। সমস্ত পৃথিবীর অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, এটা বেটার পদ্ধতি হতে পারে, এটা অসম্ভব নয়।

রায়পুরায় দুই কিশোরীকে ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী মানববন্ধন

রায়পুরার চর আড়ালিয়ায় দুই কিশোরী ধর্ষণকাণ্ডের চারদিন কেটে গেলেও এখনো পর্যন্ত কোনো আসামিকে গ্রেফতার করা হয়নি। এই ঘটনার তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে আজ সকাল ১০ টা ৩০ মিনিটে নরসিংদী প্রেসক্লাবের সামনে ‘সচেতন নাগরিক সমাজ, নরসিংদী জেলা’র ব্যানারে ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবিতে প্রতিবাদী মানববন্ধন আয়োজিত হয়। এই মানববন্ধনে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন সংগঠন, ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ (রায়পুরা ও বেলাব শাখা), পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকমণ্ডলী, নারী অঙ্গন, নরসিংদী প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলন, চিন্তাস্বর ইত্যাদি সংগঠন ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারে এতে অংশগ্রহণ করে।

রায়পুরা সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান আরেফা ফেরদৌস বলেন, “আমাদের মায়েরা, শিশুরা, বোনেরা কোথাও নিরাপদ নয়। তাদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকে দিতে হবে। ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে।”

পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু মূসা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে বলেন, মামলা হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও এখনো কেন আসামিরা গ্রেফতার হয়নি? প্রশাসনের নীরব ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন এবং সকল শিক্ষার্থী যেন নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারে, সেই দাবি জানান।

‘নারী অঙ্গন’-এর সম্পাদক নাদিরা ইয়াসমিন বলেন, “ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধীদের বিচার সামাজিকভাবে সম্ভব কি? এখনো কেন ধর্ষকদের গ্রেফতার করা হয়নি?” ধর্ষণ বন্ধে রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রাখেন। সর্বশেষ তিনি অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।

শিক্ষক নেতা রঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, “গত ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায় এই গণধর্ষণের শিকার হয় দুই স্কুল ছাত্রী। পরবর্তীতে ৯ এপ্রিল মামলা করা হলেও ধর্ষণকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি।” তিনি আরো বলেন, “যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার না করা হয়, তাহলে আমরা আরো কঠিন কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামবো। আমরা ডিসি অফিস ও এসপি অফিস বরাবর পদযাত্রা করবো।”

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাবেয়া খাতুন শান্তি এই কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী সকলকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, “ধর্ষণ একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। এই অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং সারাদেশে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”

এছাড়া আরো বক্তব্য রাখেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল্লাহ খন্দকার, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী রিমন, নরসিংদী সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রী জয়শ্রী সাহা, রায়পুরা সরকারি কলেজের শিক্ষক আমজাদ হোসেন, কবি ও নাট্যজন শাহ্ আলম, শিক্ষক ও লেখক তপন আচার্য্যসহ প্রত্যেকেই এই ধর্ষণকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান এবং ধর্ষকদের দ্রুত গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান।

উল্লেখ্য যে, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চর আড়ালিয়ায় গত সোমবার (৭ এপ্রিল ২০২৫) দুই কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেদিন বিকেলে ভুক্তভোগী কিশোরীরা দুই তরুণের সঙ্গে নৌকায় বেড়াতে যায়। সন্ধ্যায় দুই তরুণ নৌকা তীরে ভিড়িয়ে আনে ও কৌশলে দুই কিশোরীকে একটি বিদ্যালয়ের পিছনে নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। তাদের আরো ছয় বন্ধুকে সেখানে ডেকে আনে। এরপর ভুক্তভোগী দুই কিশোরীকে ভয় দেখিয়ে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে সেখানেই ফেলে রেখে চলে যায়। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী কিশোরী দুজন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরলে তাদের এই অবস্থা দেখে পরিবারের লোকজন ঘটনা জানতে চাইলে তারা এই নৃশংস ঘটনার বর্ণনা দেয়। ভুক্তভোগী দুই কিশোরী পূর্ব বাঘাইকান্দী এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অভিযুক্ত ধর্ষণকারীরা একই এলাকার প্রভাবশালী পরিবারের। ভুক্তভোগী পরিবার প্রথমে ভয়ে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিতে সম্মতি দেয়নি, তারা ওই এলাকার ইউপি চেয়ারম্যানের নিকট বিচারের দাবি জানান। তারপর দুদিন কেটে গেলেও বিচারের কোনো ব্যবস্থা হয় না, এ-অবস্থায় ভুক্তভোগী পরিবার গত বুধবার (৯ এপ্রিল ২০২৫) স্থানীয় থানায় ৮ জনের নাম উল্লেখসহ আরো ২/৩ জন অজ্ঞাতনামা আসামি করে দুটি মামলা দায়ের করে।

দৈনিক প্রথম আলোর তথ্যসূত্রে জানা যায়, দুটি মামলায় এজাহারভুক্ত আসামিরা হলেন ইমরান মিয়া (১৯), রাজ্জাক মিয়া (২৫), আবদুর রহমান (২৭), ইস্রাফিল মিয়া (২৩), সাইফুল মিয়া (২৮), রমজান মিয়া (২২), কাইয়ুম মিয়া (২১) ও মুন্না মিয়া (২৩)।

বঙ্গদেশের বাণিজ্যে বসতি

আমরা জানি, কল্পকথা এবং মিথের শক্তি কেমনভাবে সামষ্টিক নির্জ্ঞান (Collective Unconscious) তৈরি করে; বঙ্গসন্তানদের অক্ষমতার গল্প, হীনমন্যতা, অলস প্রকৃতি এবং চরিত্র হননকারী বানোয়াট মিথের পরিমাণ এতো বেশি যে, এখানে আসল কথাটি শুনলেই বানোয়াট মনে হয়। আর বানোয়াট গল্পকে তো আমরা সত্য মনে করে বসেই আছি। এমনই একটি চরম বানোয়াট প্রকল্প হলো বাঙালিকে আপাদমস্তক কৃষিজীবী হিসেবে চিহ্নিত করা। এই সামষ্টিক নির্জ্ঞান বা যৌথ অবচেতনের নির্মিত আর্কিটাইপ আমাদের সামগ্রিক সত্তাকে সূচিত করে। ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানে কথিত আছে, আমাদের প্রায় সকল পূর্বসূরি ছিলেন কৃষক, দিনমজুর। ‘ভেন্নাপাতার ছানি দেয়া আসমানীদের ঘরে’ থাকতেন। অর্থাভাবে-অন্নাভাবে কখনো-সখনো উপোসও করতেন। দুর্ভিক্ষ প্রায় লেগেই থাকতো। পরতেন মলিন জামা-কাপড়। চরম অভাব ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। আর আমরা তো আরেকটি প্রবাদ ঠোঁটস্থই রাখি যে, ‘অভাবে স্বভাব নষ্ট’। অতএব তার স্বভাব-চরিত্র ভালো হবার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। অর্থাৎ বঙ্গবাসী মানুষজন অভাবী এবং চরিত্রহীন। আমাদের সিনেমা, সাহিত্য, শিল্পকলায়ও এই অভাব, গরীবানা, প্রতারণা, বঞ্চনা ও চরিত্রহীনতার কাহিনিই প্রধান প্রতিপাদ্য বিষয়। এভাবে বঙ্গসন্তানদের বোঝার জন্যে কৃষি ও কৃষিভিত্তিক জীবনকে বোঝার বুদ্ধিবৃত্তিক বাধ্যবাধকতা তৈরি করা হয়েছে। এটি প্রায় আপ্তবাক্যের মতো হয়ে ওঠেছে যে, এখানকার মানুষকে বুঝতে হলে কৃষি এবং কৃষককে বুঝতে হবে। আমাদের বিদ্বান-পণ্ডিতগণ প্রবল আত্মবিশ্বাসের সাথে এমন সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিতে পড়ে আছেন। তারা এই দেশ, এই মাটি এবং এর মানুষজনের কিছুই পড়তে পারেননি। সাধারণ মানুষকে তারা সার্বক্ষণিকভাবে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। বাঙলা অঞ্চলের মানুষ, তাদের ইতিহাস-দর্শন-সংস্কৃতি সম্পর্কে বিপুল অজ্ঞতা নিয়ে আমাদের বুদ্ধিজীবীরা জ্ঞান বিতরণ করছেন। আমাদের বুদ্ধিজীবীতার এই করুণ দশা এবং বিভ্রান্তিকর অবস্থা কীভাবে হয়েছে, সেসব লম্বা আলোচনা-পর্যালোচনার বিষয়, আপাতত আমাদের সেদিকে যাওয়ার সময় নেই।

একটি পুরো জাতিকে কৃষিজীবী বলে দেয়া; জাতির ইতিহাসকে কৃষকের ইতিহাস বলে দেয়ার ভেতরে রয়ে গেছে অনেক বড়ো মাপের ষড়যন্ত্র কিংবা ক্ষমার অযোগ্য নির্বুদ্ধিতা। কৃষি-অর্থনীতি বা কৃষকের সন্তান বলে গর্ব করার ভেতরে যে-বোকামিটুকু আছে, তাকে বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরা পুঁজি করে আমাদের পদানত করতে পারে সহজেই।

পৃথিবীর সকল সভ্যতার সূচনাই কৃষিকে কেন্দ্র করে ঘটেছে। কিন্তু যারা শুধুই কৃষির উপর থেকে গেছে, তাদের বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। যারা ক্রমান্বয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের প্রসার ঘটিয়েছে, তারা অর্জন করেছে পর্যাপ্ত পরিমাণ সমৃদ্ধি। বঙ্গভূমি সভ্যতার প্রায় সূচনালগ্ন থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের সাথে যুক্ত হয়েছে, কৃষি ছিলো তার সমর্থনে পার্শ্বচরের ভূমিকায়। কিন্তু কৃষিকে প্রধান চরিত্রে প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যকে ভুলিয়ে দেয়ার অর্থ হলো তাকে তার ইতিহাস থেকে বিচ্যুত করা। আমরা ইতিহাস বঞ্চিত দুর্ভাগা জাতি। ইতিহাস-ঐতিহ্য-শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পরিণতি কী হয়, সেটি আজকের বাঙালি সমাজকে দেখলেই টের পাওয়া যায়। আর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি বলার মাধ্যমে ব্যাপারটি এখানেই শেষ হয়ে যায় না। কেননা যিনি কৃষিজীবী, তার কিছু নির্দিষ্ট চরিত্র আছে, কৃষক বলার মাধ্যমে তার চরিত্রে সেইসব গুণাবলিও আরোপ করা হয়। কৃষক অপরিবর্তিত, অচল, রক্ষণশীল, স্থবির, যুগের পর যুগ ধরে একইভাবে একই পরিস্থিতিতে বসবাস করে। তার কোনো পরিবর্তন নেই। মহামতি কার্ল মার্কস যেই প্ররোচণায় এই অঞ্চলের মানুষ এবং তাদের ইতিহাসকে বলেছিলেন জড়িমাগ্রস্ত, উদ্ভিদপ্রতিম, ইতিহাসহীন, ধ্বংস করে দেয়ার উপযোগী। এর সাথে আমাদের শিল্প-সাহিত্য-দর্শনের একেবারে প্রাইমারি চরিত্রের গরীবানাও মুখ্য হয়ে ওঠেছে, আমাদের চিত্রশিল্প হয়ে যায় ফোক আর্ট, আমাদের চলচ্চিত্র হয় হাহাকার, আমাদের নাচ-গান-সাহিত্য হয় অতি সরল-তরল-স্থূল এবং বৈচিত্র্যহীন; কেননা কৃষক এর বেশি ভাবতে পারে না, এর বেশি নিতে পারে না, তার মাথার উপর দিয়ে যায়। রুচি-নন্দন-সৃজনের এখানে ভোক্তা কিংবা উৎপাদক কোনোটিই নেই, কেননা তারা কৃষক-কৃষিজীবী- কৃষকের সন্তান। কৃষকের কোনো আবিষ্কারের স্বপ্ন নেই, দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন জোগাড়েই তার সময় শেষ হয়ে যায়, স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়। কৃষক কোনো দূরদর্শী চিন্তায় সক্ষম নয়। অভিজ্ঞতাবাদী দার্শনিক ডেভিড হিউম যাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, এরা জ্ঞান-বিজ্ঞান-আবিষ্কারের সক্ষমতা রহিত মানুষ। কৃষকের জমি, সার, বীজ, উৎপাদনের উপকরণ নিয়ন্ত্রণ করে ব্যবসায়ী। কৃষকের জীবন, চিন্তা, ভবিষ্যত ব্যবসায়ীর হাতে (কোনো জাতি কৃষক হলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করে অন্য ব্যবসায়ী জাতি), কাজেই একটি পুরো জাতিকে কৃষিজীবী বলে দেয়া; জাতির ইতিহাসকে কৃষকের ইতিহাস বলে দেয়ার ভেতরে রয়ে গেছে অনেক বড়ো মাপের ষড়যন্ত্র কিংবা ক্ষমার অযোগ্য নির্বুদ্ধিতা। কৃষি-অর্থনীতি বা কৃষকের সন্তান বলে গর্ব করার ভেতরে যে-বোকামিটুকু আছে, তাকে বিশ্বের অন্যান্য মানুষেরা পুঁজি করে আমাদের পদানত করতে পারে সহজেই। তাই কৃষক বলে আবেগে গদগদ হবার যে-ক্ষতি, তার বিষয়ে সচেতন থেকে এই বিষয়ে কথা বলতে হবে। আমাদের কৃষি অবশ্যই আছে, কিন্তু এর অর্থ এমন কেন দাঁড়ালো যে, একমাত্র কৃষিই আছে? কেন ব্যবসার কথা বলা হচ্ছে না, এর গভীরে খতিয়ে দেখা দরকার। পৃথিবীকে এ-যাবতকালে যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তারা গভীরভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্পের সাথে জড়িত। এখনো বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো মূলত ব্যবসায়ী। সারা বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চল থেকে পঙ্গপালের মতো বাঙলায় ছুটে আসা মানুষজন বাঙলার ব্যবসায় ভাগ বসাতে এসেছে। পর্তুগিজ, ফরাসি, দিনেমার, ব্রিটিশ, গ্রিক, আরব বণিকেরা দূর-দূরান্ত থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসেছে, কাদের সাথে? স্থানীয় কৃষকদের সাথে (!)? ব্যবসা দখলকে কেন্দ্র করে এখানে হয়েছে প্রায় সকল যুদ্ধ, তাহলে সেই ব্যবসায়ী-বণিকদের ইতিহাস কোথায়? হঠাৎ তারা কোথায় উধাও হয়ে গেলো? এই ইতিহাস লোপাট হয়ে যাবার কারণ কী? কারা বাঙলার বাণিজ্যের ইতিহাস ভুলিয়ে দিতে চায়? কারা এই অঞ্চলকে ভুখা-নাঙ্গা-চরিত্রহীন অধঃপতিত দেখতে চায়? তাতে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য কেমন রমরমা হয়ে ওঠে এবং লাভের ভাগ কীভাবে বেড়ে যায়, তার খোঁজ আমাদের রাখা দরকার।

নদীমাতৃক বাংলাদেশকে ভুলভাবে কেবল কৃষি অর্থনীতির একটি দেশ হিসেবে পরিচিত করানো হয়েছে। কৃষির বিকাশে নদীর অবদান যেমন অনস্বীকার্য, তেমনি শিল্প স্থাপনেও নদীর বিকল্প নেই। আধুনিক সময়ের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়তো এই সমস্যার অনেকটাই বিকল্প তৈরিতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু তিনভাগ জলের পৃথিবীতে শেষ বিচারে নদী, সমুদ্র বা জলপথই ভরসা। ইতিহাসের অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাঙলা অঞ্চলের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর হয়ে পড়ায় সাধারণ বিবেচনায় আমরা ধরেই নিয়েছি, বাঙলা মূলত কৃষিজীবীদের দেশ এবং আমাদের সমাজতাত্ত্বিকদের বিশ্লেষণে তাই কৃষিমানসের বিশ্লেষণই লক্ষণীয় হয়ে ওঠেছে। কিন্তু আমাদের এটিও জানা থাকার কথা, ইংরেজরা এসে আমাদের মসলিন শিল্পীদের আঙুল কেটে নেয় এবং কাপড়ের কাঁচামাল উৎপাদন করে সেটি ইংল্যান্ডে পাঠাতে বাধ্য করে। স্থানীয় কলকারখানা বন্ধ করে দেয়া হয় অধ্যাদেশ জারি করার মাধ্যমে। কলকারখানা বন্ধ করে একটি শিল্পসমৃদ্ধ জাতিকে তাদের উৎপাদিত পণ্যের সাধারণ ক্রেতায় রূপান্তরিত করে। অর্থাৎ শিল্প ও বাণিজ্য বন্ধ করে দিয়ে কাঁচামাল উৎপাদনকারী কৃষকে পরিণত হতে বাধ্য করা হয়; ইতিহাসে এমন অপকর্মগুলোর শক্ত প্রমাণ রয়েছে। এসব বিষয়ের অনুপুঙ্খ বিবেচনায় না নিলে বাঙলার মানুষের বৈশিষ্ট্য নির্ণয়েও একটা বড়ো ফাঁক থেকে যাচ্ছে। কেননা কৃষক, শিল্পপতি আর বণিকের মানস কাঠামো এক নয়। বাঙলার অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকার পরেও কৃষিই প্রাচীন বাঙলার অর্থনীতির একমাত্র এবং প্রধান ভিত্তি নয়। বর্তমান পৃথিবীতে, বিশেষত বাংলাদেশে কৃষি অর্থনীতির শ্রমিক অর্থাৎ কৃষকের মর্যাদাও একেবারে তলানির দিকে। কেউ কৃষকসন্তান হলে তার সামাজিক মর্যাদা বণিকসন্তান, শিল্পপতিসন্তান বা চাকুরিজীবীর সন্তানের চেয়ে অনেক নিচেই থাকে। কেননা মনস্তাত্ত্বিকভাবে অবচেতন মানসেই আমরা তাকে অবহেলাযোগ্য বলে মনে করি। কৃষি অর্থনীতিই আমাদের মূল অর্থনৈতিক ভিত্তি চিহ্নিত করার ভেতরে কাজ করে একটা সুস্পষ্ট অবজ্ঞার সুর। তাই আমাদের দেখার দরকার আছে, প্রাচীন বাঙলার অর্থনৈতিক ভিত্তি আসলেই কি শুধু কৃষি ছিলো? আমরা যে সোনার বাঙলার কথা বলি, সেই সোনার বাঙলা কি শুধুই কৃষিনির্ভর ছিলো? অবশ্য সোনার বাঙলা নিয়েও অনেক ইতিহাস-দর্শন-সংস্কৃতি-সমাজমূর্খ বুদ্ধিজীবীর প্রবল তাচ্ছিল্য আছে। প্রাচীন ইতিহাসের সচেতন পাঠক মাত্রই জানেন, বাঙলার অর্থনীতিতে কৃষি এবং শিল্প— দুটোই ছিলো সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, শুধু তা-ই নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছিলো শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাধান্য। মধ্যযুগের সাহিত্যে নায়ক হলো চাঁদ সদাগর, সীমান্ত সদাগর, ধনপতি সদাগর— এরা। তারা বাণিজ্য করতে যান চীন জাপান সিংহলে। আমাদের সামষ্টিক নির্জ্ঞানে বাণিজ্যের স্মৃতি জাগরিত আছে। তাম্রলিপ্ত এবং চন্দ্রকেতুগড়ে গ্রেকো-রোমান শিল্পকলারও ছাপ পাওয়া যায়, কেননা তখন বাণিজ্য চালু ছিলো। ছিলো বৈশ্বিক আদান-প্রদান।

সেই অতীতের অনেক কিছুই আমরা বেমালুম ভুলে বসে আছি। সুপ্রাচীনকাল থেকেই বাঙলার সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিস্তৃত ছিলো সমগ্র পৃথিবীর। মানুষের প্রাচীনতম সভ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় মেসোপটেমীয় সভ্যতাকে। পারস্য উপসাগর, আরব সাগর হয়ে সুমেরীয়, কেলডীয়, আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয় এবং মিশরীয় সভ্যতার জনগোষ্ঠীর সাথে বাঙলার বণিকদের ছিলো পণ্য আদান-প্রদানের সম্পর্ক। ক্রিট দ্বীপপুঞ্জ, রোমান, গ্রিকদের সভ্যতার সাথে ছিলো বাণিজ্য সম্পর্ক। সেইসব সময়ের অনেক নথিপত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজও রয়েছে বিস্তর। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি পাল্টে গেলে বাঙলার বণিকদেরও সুদিন ফুরিয়েছে। দুর্গম জলপথে জলদস্যুদের আক্রমণের হার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাঙলার ব্যবসায়ী সমাজ পশ্চিমের দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য বর্জন করে সিংহল, যবদ্বীপ, মালয় প্রভৃতি দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে আরম্ভ করেছিলো। ষোড়শ শতাব্দী থেকে পর্তুগিজ ও মগ দস্যুদের আক্রমণ বাড়তে থাকে। বস্তুত ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকে বাঙালি বণিকদের বৈদেশিক বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। জলদস্যুদের আক্রমণে অতিষ্ঠ হয়ে বাঙলার বণিকসমাজ ধীরে ধীরে সমুদ্রবাণিজ্যে আগ্রহ হারাতে থাকে। তবে শিল্প ও বাণিজ্যে আগ্রহী অপরাপর জাতিগোষ্ঠীর লোকেদের আগমন বাড়তে থাকে এই অঞ্চলে। অর্থাৎ ব্যবসা-বাণিজ্যের ধরন পাল্টালেও সেটি একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। কৃষির গুণগান গাইতে গাইতে আমরা ভুলতে বসেছি শিল্প ও বাণিজ্যসমৃদ্ধির গৌরবময় ইতিহাস। আমাদের সামষ্টিক নির্জ্ঞানে এগুলো রয়ে গেছে, যখন বহির্বাণিজ্য নেই, তখনো চাঁদ সদাগরেরা চলে যায় সিংহলে।

আমাদের লোককাহিনিগুলো লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সওদাগরদের প্রবল উপস্থিতি। চাঁদ সদাগরের প্রভাব ও প্রতিপত্তির কথা আমরা জানতে পারি, যখন সে স্বয়ং দেবীকেই প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে, যদিও পরিণামে তার বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছে। কিন্তু সওদাগরের বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার ভিত্তি হলো নৌ-বাণিজ্যের অর্থনৈতিক শক্তি। পূর্ববঙ্গ গীতিকায় সাগর পাড়ি দেয়ার আছে বহু গল্প। প্রাচীন ব্রতকথাগুলোতে দেখা যাবে, বাবা-ভাই-স্বামীর বাণিজ্যযাত্রা নিয়ে বাড়িতে থাকা মেয়েরা স্বজনের মঙ্গলকামনা করছে, ব্রত পালন করছে, সুরে সুরে গাইছে মঙ্গলগীতি :
“ভেলা! ভেলা! সমুদ্রে থেকো
আমার বাপ-ভাইকে মনে রেখো!”
অথবা
“সাগর! সাগর! বন্দি।
তোমার সঙ্গে সন্ধি।
ভাই গেছেন বাণিজ্যে,
বাপ গেছেন বাণিজ্যে,
সোয়ামি গেছেন বাণিজ্যে।
ফিরে আসবেন আজ…”
কিংবা
“কাগা রে! বগা রে! কার কপাল খাও?
আমার বাপ-ভাই গেছেন বাণিজ্যে, কোথায় দেখলে নাও?”

মধ্যযুগের বাঙলা সাহিত্য, বাঙলার প্রাচীন বিভিন্ন লিপিমালা এবং সংস্কৃত সাহিত্যে বাঙালির নৌ-বাণিজ্যের প্রচুর প্রমাণ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। একটি সমৃদ্ধ জাতির অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি শুধু কৃষির উপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। কৃষির যেমন কিছু ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা আছে, যা কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত দুরূহ, ব্যবসায় তেমন নয়। তাই সমৃদ্ধ প্রাচীন বাঙালির যে-ইতিহাস আমরা পাই, তা শুধুই কৃষিনির্ভর ভাবার অবকাশ নেই। নীহাররঞ্জন রায় তাঁর ‘বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব’তে উল্লেখ করেছেন, “মৌখরী-রাজ ঈশানবর্মের হড়হা লিপিতে (ষষ্ঠ শতকের দ্বিতীয় পাদ) গৌড়দেশবাসীদের (গৌড়ান্) “সমুদ্রশ্রয়ান্” বলা হইয়াছে; […] সামুদ্রিক বাণিজ্যই যাহার আশ্রয়। কালিদাস রঘুবংশে রঘুর দিগ্বিজয় প্রসঙ্গে বাঙালীকে “নৌসাধনোদ্যতান্” বলিয়া পরিচয় দিয়াছেন। পাল ও সেন বংশের লিপিমালায় নৌবাট, নৌবিতান প্রভৃতি শব্দ তো প্রায়শ উল্লিখিত হইয়াছে। এই উভয় রাজবংশের, এবং সমসাময়িক বাঙলাদেশের অন্যান্য রাজবংশেরও, সামরিক শক্তি নৌবলের উপর অনেকটা নির্ভর করিত; ইহার উল্লেখ তো অনেক শিলালিপিতেই আছে। বৈদ্যদেবের কমৌলি লিপিতে নৌযুদ্ধের বর্ণনাও আছে।”

আভ্যন্তরীণ এবং আন্তঃদেশীয় বাণিজ্যে প্রধান বাহনই ছিলো নৌযান। ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সীমান্ত রক্ষা ও যুদ্ধের প্রয়োজনেও ব্যবহৃত হয়েছে বিভিন্ন আকার ও নকশার নৌকা। নৌকার সাথে, নদীর সাথে বাঙালির জীবন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। সমুদ্রগামী সুবিশাল নৌকা বা জাহাজ তৈরিতে বাঙালির দক্ষতাও ছিলো বিশ্বের অপরাপর জাতির কাছে সুবিদিত। বাঙলার নানা স্থানে নৌকা ও জাহাজ নির্মাণের কেন্দ্র ছিলো, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে। কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে বলেছেন যে, কখনো কখনো নৌকাগুলি ৩০০ গজ লম্বা ও ২০০ গজ চওড়া হতো। দ্বিজ বংশীদাস তাঁর মনসামঙ্গলে ১০০০ গজ লম্বা নৌকার কথাও বলেছেন। চীনা পরিব্রাজক মাহুন্দের লেখনী থেকে জানা যায়, তুরস্কের সুলতান আলেকজান্দ্রিয়ার জাহাজ নির্মাণ পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম থেকে জাহাজ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ নদ-নদীবহুল হওয়ায় স্বভাবতই বাঙলার মানুষের প্রধান বাহন হয়ে ওঠে নৌকা আর বাণিজ্যের জন্যে জাহাজ। অক্ষয়কুমার দত্ত প্রণীত ও শ্রীরজনীনাথ দত্ত সম্পাদিত ‘প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার’ নামক গ্রন্থে ভারতীয় তথা এই অঞ্চলের মানুষের নৌ-বাণিজ্যের বেশ জোড়ালো স্বাক্ষ্য পাওয়া যায় : “ঋগ্বেদ যে অতি প্রাচীন গ্রন্থ, তাহা ব্যক্তিমাত্রেরই বিশ্বাস আছে। এই সুপ্রাচীন গ্রন্থে অর্ণবপোত, বাণিজ্য ও বণিকদিগের সমুদ্রযাত্রা-সম্বন্ধীয় প্রসঙ্গ দেখিতে পাওয়া যায়। উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলস্থ পঞ্চবিংশতি সূক্তের রচয়িতা মহর্ষি শুনঃশেফ বরুণ দেবের কীর্ত্তন করিতে করিতে বলিয়াছেন যে, ‘সমুদ্র-মধ্যে যে স্থানে পোত-সমূহের যাতায়াতের জন্য পথ আছে, তাহা বরুণ দেব অবগত আছেন। …উক্ত গ্রন্থের প্রথম-মণ্ডলের ছাপান্ন সূক্তটি ঋষিবর শৈব্য দ্বারা রচিত। বণিকেরা যে সমুদ্রযাত্রা করিত, তাহা মহর্ষি প্রকাশ করিয়াছেন।’” মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম গ্রন্থ ঋগ্বেদ থেকে শুরু করে লিখিত এবং প্রত্নতাত্ত্বিক প্রাচীন প্রামাণ্য দলিলসমূহ থেকে বেশ স্পষ্টভাবেই বোঝা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্যের রয়েছে সমৃদ্ধ অতীত।

বাঙলা ও বাঙালির সাম্প্রতিক দুর্দশার পেছনেও অনুঘটক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই শিল্পসমৃদ্ধির বয়ান। বিদেশি পর্যটক এবং ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে বাঙলার ধন-রত্নের গল্প যখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে, তখনই বিভিন্ন দস্যুবৃত্তিতে অভ্যস্ত জাতিগোষ্ঠী এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিবেক-বিবেচনাহীন অর্থলোভী লুটেরার দল এই অঞ্চলে আসতে থাকে, তাদের নানা মুখোশ; কেউ ধর্মপ্রচারক, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ পরিব্রাজক, কেউ-বা নিতান্তই ভবঘুরে; কিন্তু সবার সেই একই উদ্দেশ্যÑ কিছুটা উন্নত জীবন উপভোগের সুযোগ লাভ করা। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ রাজ্যের প্রভাব-প্রতিপত্তির গল্প এতোটাই ছড়িয়েছিলো যে, বিশ্বজয়ী আলেকজান্ডার এখানে রাজ্য বিজয়ের নামে অভিযান পরিচালনার সাহস সঞ্চয় করতে না পেরে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই শিল্পসমৃদ্ধি আবার অনেকের ঈর্ষার পাত্রও করে তুলেছিলো বাঙলা অঞ্চলকে। আগত আর্যরা যেমন দীর্ঘদিন বাঙলাকে করায়ত্ত করতে না পেরে বিভিন্নভাবে বাঙলার নামে দুর্নাম রটিয়েছে। অক্ষমতার লজ্জাকে ঢাকতে বাঙলাকে বলেছে অসুরদের অঞ্চল, যেখানে কেউ ভ্রমণ করলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তাঁর ‘গঙ্গাঋদ্ধি থেকে বাংলাদেশ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : “হিন্দু ধর্মশাস্ত্র-পুরাণ-উপাখ্যানে উপেক্ষিত গঙ্গাঋদ্ধি ভাস্বর হয়ে আছে কার্তিয়াস, দিওদোরাস, প্লুতার্ক প্রমুখ গ্রিক লেখকদের ইতিবৃত্তে, স্ট্রাবো ও টলেমি ভূগোলবৃত্তান্তে, আর ভার্জিলের মহাকাব্যে। ভার্জিল ভেবেছিলেন তাঁর জন্মভূমি মালটুয়ায় ফিরে গিয়ে এক মর্মর মন্দির স্থাপন করবেন এবং মন্দির চূড়ায় স্বর্ণ-গজ-দন্তে গেঁথে দেবেন গঙ্গাঋদ্ধির বীরত্ব গাথা।”

বাংলাদেশের প্রাচীন পরিচয় ‘গঙ্গাহৃদয়’ বা ‘গঙ্গাঋদ্ধি’ নামে। এর হৃদয় গঙ্গার মতোই সুবিশাল। অনন্তকাল ধরে বহমান। উদার চিত্তে সবার পাপ-তাপ ধুয়ে পবিত্র করে দিচ্ছে। অথচ এর সন্তানেরা অনবরত নিমগ্ন হয়ে যাচ্ছে বহিরাগত পঙ্কিল স্রোতের প্রচণ্ড গরলে। অবোধ শিশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে খরখরে মরুভূমি ও কনকনে বরফের প্রাণহীন শুষ্কতায়। গঙ্গাহৃদয় জানে, এই শিশুরা একদিন বড়ো হবে, আবার অধোবদনে এসে দাঁড়াবে তার সামনে, কিন্তু তাদের অবাক করে দিয়ে গঙ্গাহৃদয় তাদের স্থান করে দেবে অনন্ত মিঠাপানির আদি ও অকৃত্রিম ভালোবাসায়। আমাদের ইতিহাস আছে, তবে ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায় আত্মস্থ করতে ব্যর্থ হলে আত্মপরিচয় তৈরি হয় না। প্রকৃত আত্মপরিচয়ের যথার্থ ছায়াতলে আজ অথবা আগামীকাল আমাদের ফিরে আসতেই হবে।

কিন্তু আমাদের দীর্ঘকালের পরাধীনতা, অন্যদের দেয়া খুদকুঁড়া, উচ্ছিষ্ট ভোগের লোভ, ভিক্ষার ফুটা পয়সার মতো বিবিধ তত্ত্ব ও তথ্যের অনুকরণ আমাদের মানসিক বিকৃতি তৈরি করেছে। এই অবস্থায় আমরা নিজেদের দেখতে পাই না, যতোটুকু দেখতে পাই, সেইটুকু পুরোপুরি বিভ্রান্ত করে ছাড়ে। আমাদের একটি সামষ্টিক অবিশ্বাস এবং সংশয় আছে যে, আমরা আসলেই কারা? সমস্যার শেকড়ে আমাদের প্রবেশের সক্ষমতা নেই, ফলে আমাদের বুদ্ধিজীবী-পণ্ডিত-বিদ্বানগণ ভুল পথে হাঁটছেন, ভুল রোগের ভুল চিকিৎসা দিয়ে ভুক্তভোগীর জীবনকে মর্মান্তিক করে তুলছেন। কবি নজরুল অনেকটা আক্ষেপের সাথেই বলে গেছেন, “পরাধীনতার মতো জীবন হননকারী তীব্র হলাহল আর নাই। অধীনতা মানুষের জীবনীশক্তিকে কাঁচাবাঁশে ঘুণ ধরার মতো ভুয়া করিয়া দেয়। ইহার আবার বিশেষ বিশেষত্ব আছে, ইহা আমাদিগকে একদমে হত্যা করিয়া ফেলে না, তিল তিল করিয়া আমাদের জীবনী-শক্তি, রক্ত-মাংস-মজ্জা, মনুষ্যত্ব, বিবেক সমস্ত কিছু জোঁকের মতো শোষণ করিতে থাকে। আখের কল আখকে নিঙড়াইয়া পিষিয়া যেমন শুধু তাহা শুষ্ক ছ্যাবা বাহির করিয়া দিতে থাকে, এ অধীনতা মানুষকে তেমনই করিয়া পিষিয়া তাহার সমস্ত মনুষ্যত্ব নিঙড়াইয়া লইয়া তাহাকে ওই আখের ছ্যাবা হইতেও ভুয়া করিয়া ফেলে। তখন তাহাকে হাজার চেষ্টা করিয়াও ভালোমন্দ বুঝাইতে পারা যায় না। আমাদেরও হইয়াছে তাহাই। আমাদিগকে কোনো স্বাধীনচিত্ত লোক এই কথা বুঝাইয়া বলিতে আসিলেই তাই আমরা সাফ বলিয়া দিই, ‘এ লোকটার মাথা গরম!’”

এখন থেকে আরো শত বছর আগেই কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ‘আমাদের শক্তি স্থায়ী হয় না কেন?’ প্রবন্ধে এ-কথা বলে গিয়েছেন। আশ্চর্য ব্যাপার, নজরুল এতো সাবলীলভাবে এমন নিরেট সত্য কথাগুলো বলেছেন তাঁর সমাজের মানুষকে। এবং নিশ্চিতভাবেই এ-কারণে তাঁকে নিগৃহীত হতে হয়েছে। ফলে তাকে শুনতে হয়েছে, ‘এ লোকটার মাথা গরম!’


দ্রাবিড় সৈকত
সহযোগী অধ্যাপক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

বিপ্লবী সতীশচন্দ্র পাকড়াশী

0

চরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মূতিউল্লাহ ভূঁইয়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ক্লাশ নাইনে পাঁচদোনা স্যার কে জি গুপ্ত স্কুলে ভর্তি হয়েছিলাম ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। স্কুলঘেঁষা ছিলো বাংলার শ্রেষ্ঠ মনীষী ও ব্রাহ্ম ধর্মের প্রচারক গিরিশচন্দ্র সেনের (১৮৩৪-১৯১০) পৈতৃক বাড়ি। তাঁকে নিয়ে অনেক গল্প শুনতাম শিক্ষক-সহপাঠী ও স্থানীয় মুরুব্বীদের মুখে। কোরানের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী, মুসলিম মনীষীদের প্রথম বাংলা জীবনীকার ও নারী শিক্ষার পথিকৃৎ— এরকম নানা অভিধায় বিশেষায়িত হয়েছিলেন এই মহান ধর্মপ্রচারক ও সমাজ সংস্কারক। তখন পাঁচদোনার পার্শ্ববর্তী মাধবদীর সতীশ পাকড়াশী (১৮৯১-১৯৭৩) বিপ্লবী নেতা হিসেবে আমাদের কাছে স্বপ্নের নায়ক হিসেবে ধরা দিয়েছিলেন।

ঘরবাড়ি ও সংসারত্যাগী এই বিপ্লবীর জীবনের বড়ো একটি অংশ হয় জেলে নয়তো আত্মগোপনে কেটে গেছে। স্বাধীনতার জন্যে বিয়ে করার সময় পাননি। অকৃতদার আত্মত্যাগী এই বিপ্লবীর অস্থিমজ্জায় রোপিত ছিলো দেশপ্রেম, মানবতা আর আত্মত্যাগ। স্বাধীনতার জন্যে জীবনের সবকিছু উজার করে দিয়ে নিজের জন্যে কানাকড়িও রাখেননি। শেষ জীবনটা কেটেছে কলকতায় কমিউনিস্ট পার্টির অফিসের ছোটো একটি কক্ষে। পার্টির কর্মীরা তাঁর দেখাশোনা করতেন। সেখানেই ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। কলকাতার কেওড়াতলা শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য করার সময় দলের নেতাকর্মীরাই আপনজন হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

এমনসব কাহিনি লোকমুখে শুনে একদিন মাধবদী বাজারে গিয়ে সতীশ পাকড়াশীর খোঁজ করি। অনেকেই নাম শুনেছেন, কিন্তু তাঁর বাড়ি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য জানাতে পারছেন না। এভাবে কয়েকদিন আসা-যাওয়ার পর একদিন মাধবদী কলেজের পেছনে ‘পাকড়াশী বাড়ি’র সন্ধান পাই। সেটারও সন্ধান দেন আরেক বিপ্লবী ও প্রখ্যাত কৃষকনেতা কাজী আবদুল ওহাব, যিনি সতীশ পাকড়াশীর অনুসারী ছিলেন। মাধবদী এলাকায় কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কাজী আবদুল ওহাব। তাঁর সহযোগিতায় পাকড়াশী বাড়িতে গিয়ে সতীশ পাকড়াশীর চাচাতো ভাই চানু চন্দ্র পাকড়াশীর সঙ্গে পরিচিত হই।

চানু পাকড়াশী তাঁর ভাই সতীশ পাকড়াশী সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক তথ্য দেন, কোনো বই-পুস্তকে যেসবের উল্লেখও হয়নি। তিনি সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে পড়ার সময় মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তীর (১৮৮৯-১৯৭০) সংশ্রবে এসে ঢাকা অনুশীলন সমিতির সদস্য হিসেবে বিপ্লবী জীবন শুরু করেন। সমিতির নেতা নরেন সেনের (১৮৮৭-১৯৬১) নির্দেশে পিস্তল ও কার্তুজ সংগ্রহ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গিয়েছিলেন। মূলত তখন থেকেই তাঁর বিপ্লবী জীবনের মোড় শুরু হয়। ঢাকা অনুশীলন সমিতি, পলাতক জীবন, জেল জীবনের ঘানি টানতে টানতে তাঁর আর ঘরে ফেরা হয়নি। তবে যেখানেই থাকতেন, তিনি আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। অনেক সময় মৃত আত্মীয়ের মুখ শেষবারের মতো দেখার জন্যে ও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে মাধবদীর বাড়িতে আসতেন।

এমন স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তন্ময় হয়ে পড়েছিলেন চানু পাকড়াশী। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, দাদা তো জেল থেকে আমাকেও চিঠি লিখেছিলেন। সেচিঠিতে এক এক করে সব আত্মীয়স্বজনের খোঁজখবর নিতেন। কথা বলেই বেড়ার আঁড়া থেকে একটি পুরোনো চিঠির ফোল্ডার বের করে আনলেন। ধুলোয় একাকার হয়ে গেছে চিঠিগুলো। সেখান থেকে অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটি চিঠি বের করে আমার হাতে তুলে দিলেন। বললেন, আমি কখন দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাই, তার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। তাই সতীশ দাদার চিঠিটি আপনার হাতে তুলে দিতে চাই। কোনো গবেষণায় কাজে লাগাবেন।

চানু পাকড়াশীকে লেখা সতীশ পাকড়াশীর চিঠি

চিঠির দিকে চোখ রেখে আমার সে কী খুশি লেগেছিলো, সেটা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়। কলকাতা প্রেসিডেন্সি জেল থেকে লেখা ঐতিহাসিক চিঠিতে সতীশ পাকড়াশী তাঁর চাচাতো ভাইকে ‘ভাই চানু’ হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন। সুন্দর হাতের লেখা চিঠিটি আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে রয়েছে। তাঁর মতো দ্যুতিময় একজন দেশপ্রেমিক বিপ্লবীর একটি অতি মূল্যবান চিঠির সংগ্রাহক হিসেবে নিজেকে ধন্য মনে করছি। মাধবদীর পাকড়াশী বাড়িতে কিছুদিন পরে গেলে হয়তো চিঠিটি আমার হাতে আসতো না। কারণ, এর কিছুদিন পরই চানু পাকড়াশী সপরিবারে ভারতে চলে গিয়েছিলেন।

অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে, তাঁত অধ্যুষিত মাধবদীর একটি সম্ভ্রান্ত হিন্দু পরিবার থেকে আসা বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর পারিবারিক ঐতিহ্য কী? সব ভোগ-বিলাস আর সংসার-ধর্ম ত্যাগ করে কেন তিনি দেশপ্রেমে নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে তাঁর পরিবার সম্পর্কে অনেক চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি। সতীশ পাকড়াশী এমনিতেই ‘আত্মত্যাগী সতীশ পাকড়াশী’ হয়ে ওঠেননি। তাঁর ঠাকুরদা’ আনন্দচন্দ্র পাকড়াশী ছিলেন একজন জাঁদরেল আইনজীবী এবং কংগ্রেস নেতা। মহাত্মা গান্ধী, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পন্থা হিসেবে বিপ্লবী ভাবধারার রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। ঢাকা অনুশীলন সমিতির পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে সাটিরপাড়ার জমিদার ললিতমোহন রায়, ঢাকার স্বামীবাগ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা স্বামী শ্রীরুদ্র ত্রিদণ্ডী ত্রিপুরলিঙ্গ, আইনজীবী শ্রীশচন্দ্র দাস, ঢাকা পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত মেয়র আনন্দচন্দ্র রায়ের সংস্পর্শে এসেছিলেন। তাঁরা ব্রিটিশ বিতাড়নের জন্যে স্বামীবাগ আশ্রমে গোপন সভায় মিলিত হতেন। ব্রিটিশ মনে করে সেখানে তাঁরা শ্বেতছাগল বলি দিতেন।

এই আনন্দচন্দ্র পাকড়াশীর ছেলে প্রকাশচন্দ্র পাকড়াশী একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। অনেক আলোচিত মামলা জিতে তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও এস আর (সবিতারঞ্জন) পালের সঙ্গে মিলে আইন পেশায় নেতৃত্ব দিতেন তিনি। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় হাইকোর্ট স্থানান্তরিত হলে তখন তাঁদের প্রচেষ্টায় ঢাকায় একটি শক্তিশালী আইনজীবী ফোরাম প্রতিষ্ঠা পায়। এমনকি হাইকোর্টের আইনজীবী সমিতি তাঁদের হাতেই প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা হাইকোর্টের পুরোনো নথিপত্র ঘাঁটলে নানা স্থানে প্রকাশচন্দ্র পাকড়াশীর নাম পাওয়া যায়। অনেক চাঞ্চল্যকর মামলার রায়ে আইনজীবী হিসেবে তাঁর নাম রয়েছে।

সঙ্গত কারণে বিপ্লবী নায়ক সতীশ পাকড়াশীর রক্তে তাঁর বংশধরদের সাফল্য প্রবাহিত হয়েছে। তিনি রাজনৈতিক কারণে ভারতবর্ষের নানা স্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন। আন্দামানসহ নানা জেলখানায় জীবন কাটিয়েছেন। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হাতকড়া ও পায়ে পাঁচসেরী বেড়ি পরা অবস্থায় ভারতের হাজারীবাগ জেলখানা থেকে আন্দামান দ্বীপে নির্বাসিত হয়েছিলেন। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন। আমৃত্যু এই সর্বহারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তিনি।

কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের পর তিনি তাঁর রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র হিসেবে জন্মভূমি বাংলাদেশের ঢাকা, মাধবদী, রায়পুরা, চালাকচর, বেলাব প্রভৃতি অঞ্চল বেছে নিয়েছিলেন। বিশেষ করে, কমিউনিস্ট পার্টির কৃষক সমিতির জন্যে তিনি কাজ করেছিলেন। জ্ঞান চক্রবর্তী তাঁর ‘ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ বইয়ে সতীশ পাকড়াশীর কৃষক আন্দোলন নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। নরসিংদী জেলার যেসব এলাকা কৃষক আন্দোলনের জন্যে খ্যাতিমান ছিলো, সেসব অঞ্চলে সতীশ পাকড়াশীর ছায়া পড়েছিলো। তিনি জ্ঞান চক্রবর্তী, সত্যেন সেন, রমেন মিত্র, হাতেম আলী খান, ফয়েজ মাস্টার ও রহমান মাস্টারকে সঙ্গে নিয়ে কৃষক সমিতির কর্মকাণ্ড জোরদার করেছিলেন। তাঁর জন্মভূমি মাধবদী এলাকায় কাজী ওহাবের নেতৃত্বে যে-কৃষক আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠেছিলো, সেটার কৃতিত্ব ছিলো পাকড়াশীর। তিনি রায়পুরা, চালাকচর, বেলাব, মাধবদী প্রভৃতি এলাকায় সশরীরে উপস্থিত থেকে অনেক সভা-সমিতি করেছিলেন। তাঁর মতো এতো বড়ো বিপ্লবীকে কাছে পেয়ে সাধারণ কৃষকেরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠতেন। নেতাকর্মীরা কাজে উৎসাহ পেতেন।

মাধবদীর আরেক মহিয়সী নারী প্রিয়বালা গুপ্তার পরিবারের সঙ্গে সতীশ পাকড়াশীর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিলো। তাঁদের বাড়িতে নিয়মিত যোগাযোগ ছিলো তাঁর। চিঠি চালাচালি হতো নিয়মিত। তেমন বেশ কিছু চিঠি স্থান পেয়েছে প্রিয়বালা গুপ্তার স্মৃতিকথা ‘স্মৃতিমঞ্জুষা’ গ্রন্থে। স্মৃতিকথায় তিনি পাকড়াশীর দেশপ্রেম ও ত্যাগী জীবন সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেছেন। প্রিয়বালা মাধবদীতে নারী শিক্ষার জন্যে যে-ত্যাগ-তিতিক্ষা করেছেন, তার সঙ্গে সতীশ পাকড়াশীর উৎসাহ ও সহযোগিতা ছিলো উল্লেখযোগ্য। জন্মস্থানের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিলো নিখাদ। রাজনৈতিক বৃহৎ পরিসরে কাজ করার জন্যে তিনি হয়তো নিয়মিত মাধবদীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। কিন্তু তাঁর মনে সবসময় জন্মভূমির টান বসবাস করতো।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা হিসেবে দলের নির্দেশে সতীশ পাকড়াশী ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় আসেন। তখন তিনি ঢাকা জেলার সদস্য হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। তখন ঢাকায় তরুণ কর্মী সোমেন চন্দ (১৯২০-১৯৪২) ও রনেশ দাশগুপ্ত (১৯২১-১৯৯৭) কাজ করছিলেন। তাঁদের সহযোগিতায় পাকড়াশী ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘ গঠন করেন। সবচেয়ে জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও সোমেন চন্দ ছিলেন এই সংঘের প্রাণপুরুষ। সাহিত্যে ছিলো তাঁর ব্যাপক অনুরাগ। কিন্তু ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলনে লাল পতাকা হাতে শ্রমিকদের শোভাযাত্রা নিয়ে ধুপখোলা মাঠে যাওয়ার সময় পুরান ঢাকার হৃষিকেশ দাস রোডে প্রতিক্রিয়াশীল আততায়ীর আক্রমণে তিনি নিহত হন। সেই সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন কমরেড জ্যোতি বসু, বঙ্কিমচন্দ্র সেনসহ অনেক বিখ্যাত কমিউনিস্ট। সোমেন হত্যার ঘটনায় কমরেড সতীশ পাকড়াশী অত্যন্ত মর্মাহত হন, যার প্রতিবাদ করতে তিনি ঢাকার রাজপথে নামেন।

১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে সতীশ পাকড়াশীর উদ্যোগে ঢাকা জেলা কংগ্রেস কর্মী সম্মেলন হয়। যুদ্ধের সময় সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে সভাপতিমণ্ডলীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে উক্ত সম্মেলন পরিচালনা করার অপরাধে তাঁকে ৬ মাসের কারাদণ্ড দেয়া হয়। এই মামলায় ঢাকার বিখ্যাত কমিউনিস্ট গোপাল বসাক, নেপাল নাগ, ব্রজেন্দ্র দাস ও জ্ঞান চক্রবর্তীসহ ১৬/১৭ জনের কারাদণ্ড হয়। ৬ মাস জেল খাটার পর সতীশ পাকড়াশীকে তাঁর মাধবদীর বাড়িতে নজরবন্দী করে রাখা হয়। এর আগেও আরেকবার তিনি নিজ বাড়িতে অন্তরীণ ছিলেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মোট ৬ বার জেল খাটার ঘটনা ঘটে তাঁর জীবনে। বাড়িতে আটক থাকার সময় তিনি নিজ বোনকে বিয়ে দেন আরেক বিপ্লবী কৃষ্ণপদ চক্রবর্তীর সঙ্গে। বরযাত্রীদের মধ্যে কোন কোন বিপ্লবী রয়েছে, তা দেখার জন্যে বাড়ি ঘেরাও করেছিলো পুলিশ গুপ্তচররা। এমনকি বরের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে হাজির হয় পুলিশ। এ নিয়ে মাধবদীতে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতে বিয়ে হয়। সেই সঙ্গে বর, বধূ ও বরযাত্রীদের বাড়িতে পৌঁছে দেয় পুলিশ। বর কৃষ্ণপদকেও বাড়িতে অন্তরীণ করা হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর সতীশ পাকড়াশী নিজ বাড়ি থেকে মুক্ত হন।

ঢাকার জীবন সম্পর্কে ‘সোমেন চন্দ’ প্রবন্ধে সতীশ পাকড়াশী অনেক তথ্য উল্লেখ করেন, যা সোমেন চন্দ মারা যাওয়ার পর কলকাতায় এক প্রতিবাদ সভায় পঠিত হয়। উক্ত প্রবন্ধটি ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিলো। সেখানে বলা হয়, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে সতীশ পাকড়াশীর নেতৃত্বে দক্ষিণ মৈশণ্ডির এক বাড়িতে কমিউনিস্ট পাঠচক্র হতো। গোপনে সেখানে ক্লাশ হতো। কৃষক-শ্রমিকের কথা, দরিদ্র মানুষের মর্মব্যথা ও মার্কস-লেনিনবাদ নিয়ে আলোচনা হতো। তেমন এক ক্লাশ শেষে পাকড়াশী একদিন সোমেনের বাসায় যান। সোমেনকে জিঞ্জেস করলেন, নতুন কী লিখছেন? তখন সোমেন চন্দ তাঁকে একটি ছোটো গল্প পড়ে শোনালেন। সেই গল্পে পাঠচক্রের পুরো ছায়া পড়েছিলো। তাঁর বেশ ভালো লাগলো সোমেনকে। শান্ত স্বভাব, সহজ-সরল ও গভীরভাবে উদ্দীপ্ত তরুণ। সোমেন চন্দ দক্ষিণ মৈশণ্ডি প্রগতি পাঠাগার পরিচালনার দায়িত্ব পান। অমায়িক ব্যবহারে সোমেনের উপর পাড়ার লোকজন বেশ মুগ্ধ। পাঠাগারে সাপ্তাহিক সাহিত্যের বৈঠক বসে। প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা পড়া হয়। এদের মধ্যে সোমেন চন্দের লেখা সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো। সোমেন সাধারণত গল্প লিখতেন। ঢাকার সাপ্তাহিক, মাসিক ও কলকাতার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হতো তাঁর লেখা গল্প। শুধু কমিউনিস্ট হিসেবেই নয়, অনুশীলন সমিতির বিপ্লবী হিসেবে তিনি নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা জেলায় কাজ করেছেন। সেটা জানা যায় সতীশ পাকড়াশীর ‘অগ্নিদিনের কথা’ বই থেকে। তিনি লেখেন, ঢাকা জেলায় বাড়ি হলেও ঢাকার সঙ্গে আমার পরিচয় খুব কম। ছোটবেলায় রাজনীতির শিক্ষা কর্মসাধনা মহেশ্বরদী পরগণার মাধবদী, সাটিরপাড়া, নরসিংদী প্রভৃতি গ্রামেই সীমাবদ্ধ ছিল। স্বদেশী আন্দোলনের দিনে সকল স্থানের মধ্যবিত্তদের ভিতরে প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল।

১৬ বছর জেল ও ফেরারী জীবন শেষে ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি অনুশীলন সমিতির কাজে ঢাকায় আসেন। তখন বিপ্লবীদের পীঠস্থান ছিলো ঢাকা। পুলিন দাসের পরিচালিত অনুশীলন সমিতির কেন্দ্র এবং বিপ্লবী বীর নলিনী ও তারিনীর রক্তরঞ্জিত এই ঢাকায় এসে নিজেকে গর্বিত মনে করলেন তিনি। তখন ঢাকায় প্রায় ১০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করতো। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মেস, ছাত্রাবাস, আখড়া ও অলিগলিতে সমিতির অনেক শাখা গড়ে ওঠে। কলকাতার চেয়ে ঢাকা অনেক এগিয়ে যায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। যার কারণে শুধু ঢাকার লোক বলে অনেক ছাত্র চাকুরি পেতো না। ব্রিটিশরা মনে করতো, ঢাকার যুবশ্রেণি সবচেয়ে মারাত্মক বিপ্লবী। তারা ঢাকা থেকে বেরিয়ে গিয়ে ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহর-বন্দরে অনুশীলন সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

সতীশ পাকড়াশী ঢাকার যুবকদের মধ্যমনি হয়ে ওঠেন। তিনি পরিকল্পনা করেন, আইরিশ ইস্টার বিদ্রোহের মতো একটি বিদ্রোহ করবেন। এতে ঢাকার যুবশ্রেণি অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করে। ফলে সতীশ পাকড়াশী তাদের প্রাণভোমরা হয়ে ওঠেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র বিপ্লবের পক্ষে মত দেয়। তারা এসে পরিকল্পনা করতে থাকে। অনেক যুবক ও ছাত্র সতীশ পাকড়াশীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করলে বিষয়টি ঢাকা অনুশীলন সমিতির কতিপয় নেতার পছন্দ হয়নি। তারা নিজেদের কর্তৃত্ব কমে যাওয়ার ভয়ে ঢাকা শহরের পরিবর্তে জেলার দায়িত্ব অর্পণ করেন তাঁর উপর। ফলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বড়ো একটি বিপ্লবের সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। তা না হলে মাস্টারদা’ সূর্যসেনের আগেই সতীশ পাকড়াশী ঢাকায় বিপ্লব সংঘটিত করে ফেলতেন। এতে যুবক-ছাত্ররা সেসব নেতার বিরুদ্ধে উত্তেজিত হয়ে ওঠেছিলো। কতিপয় নেতাদের ইংরেজদের দালাল বলেও অভিহিত করা হয়। ঢাকা জেলা অনুশীলন সমিতির নেতাদের নিষেধ সত্ত্বেও অনেক যুবক-ছাত্র সতীশ পাকড়াশীর সংস্পর্শ ত্যাগ করেনি।

কিন্তু বিপ্লবের পথ বন্ধ হয়ে গেলে সতীশ পাকড়াশী সরাসরি বলেন, এভাবে বসে থাকলে দেশ স্বাধীন হবে না। দর কষাকষি করলে ইংরেজরা মোয়ার মতো শাসন হাতে তুলে দিবে না। সে-সময় ঢাকা অনুশীলন সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন নরেন্দ্রমোহন সেন। তিনি সোনারগাঁওয়ের এক জমিদার পরিবারের সন্তান ছিলেন। পরে রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। তিনি সরাসরি বিপ্লবের বিরোধিতা করেন।

একদিন নরেন সেন বললেন, কি হে সতীশ, তোমরা নাকি দলের ভিতর একট গণ্ডগোল পাকিয়ে তুলেছ? এতে কোন কাজ হবে না। যদি কিছু করতে চাও, সকলে মিলে একসঙ্গে করলেই তা কার্যকরী হবে।
জবাবে সতীশ পাকড়াশী বলেন, আমরা তো তাই চাই, কিন্তু তা হয় কই? নেতারা তো কোন কাজে এগুতে চান না। আর আমরা চাই বলে আমাদের প্রতি তাদের ক্রোধ।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

আধুনিক নরসিংদীর রূপকার জমিদার ললিতমোহন রায়

1

বস্ত্রশিল্পের প্রাণকেন্দ্র হলো নরসিংদী। দেশের অন্যতম ধনাঢ্য জেলার তালিকায় বিশেষ স্থান করে নিয়েছে জনপদটি। মসলিন-জামদানির ঐতিহ্য বুকে ধারণ করা নরসিংদী আধুনিককালে বস্ত্রশিল্পে নেতৃত্ব দিচ্ছে। মেঘনা, হাড়িধোয়া, প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, বানার, কয়রা, কলাগাছিয়া ও শীতলক্ষ্যা নদ-নদী বিধৌত জেলাটির পথচলা শুরু হয়েছিলো সামান্য একটি গঞ্জ হিসেবে। পরবর্তীতে একটি ঐতিহাসিক ও সমৃদ্ধ নদীবন্দরে পরিণত হয় গঞ্জটি। আর এর নেপথ্য কারিগর হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন সাটিরপাড়ার জমিদার, বিদ্যোৎসাহী, প্রজাহিতৈষী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী ললিতমোহন রায় বিএবিএল। মূলত এই মনীষীতুল্য জমিদারের সমৃদ্ধির সাথে সাথে হেঁটেছে নরসিংদী। তাঁর উন্নয়নের হাত ধরেই এলাকার যতো সাফল্য। আজকে জেলার অবকাঠামো নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে যে-নরসিংদী এগিয়ে যাচ্ছে, তার প্রকৃত রূপকার হলেন ললিতমোহন রায়। কীর্তিগাঁথার হিসেবে নরসিংদীর নামকরণ হওয়া উচিত ছিলো ‘ললিতনগর’। আজকের জেলা শহরটি, তৎসময়ের নদীর তীরবর্তী গ্রামটি নানা পাড়ায় বিভক্ত ছিলো। পাড়াগুলোর নাম ছিলো সাটিরপাড়া, ব্রাহ্মণপাড়া, কৈবর্তপাড়া প্রভৃতি। আর গ্রামটির নাম ছিলো নরসিংহদী। কালের বিবর্তনে নরসিংহদী শব্দ থেকে ‘হ’ হরফটি বিচ্ছিন্ন হয়ে নাম হয়েছে নরসিংদী।

ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে নরসিংদীর খ্যাতি সর্বত্র। বস্ত্রশিল্পের সবচেয়ে বড়ো মোকাম বাবুরহাটের কারণে জেলাটি প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এর শুরুটা কিন্তু হয়েছিলো একটি ছোটো গঞ্জ হিসেবে। মেঘনা-হাড়িধোয়ার মিলনস্থলের কাছে জেলে-মাঝিতে আনাগোনা হতো। সেখানে সীমিত আকারে মাছ, তরি-তরকারি, পেঁয়াজ-রসুন, চাল-ডাল বেচাকেনা হতো। মাঝে-মধ্যে মালবোঝাই নৌকা ভিড়তো সেই গঞ্জে। তা থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্যে নদীর তীরে ছোটো একটি রাজস্ব আদায় কেন্দ্র (কোতঘর) স্থাপন করা হয়। লোক-সমাগম বৃদ্ধি হওয়ায় সেখানে একটি পুলিশ ক্যাম্প স্থাপিত হয়। তখন উক্ত এলাকার জমিদারির বন্দোবস্ত নিয়েছিলেন কৃষ্ণকুমার পাল। তিনি ছোটো-খাটো জমিদার হিসেবে নরসিংদী এলাকা থেকে খাজনা আদায় করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছেলে কালী কুমার পাল জমিদারি বন্দোবস্ত নেন। তিনিই সাটিরপাড়ায় জমিদার বাড়ি নির্মাণ করেন। তখন নরসিংদী পশ্চিমের এলাকাটি ঝোপ-জঙ্গলে ভরপুর ছিলো। জমিদার বাড়ির প্রয়োজনে আশেপাশে ধোপা, নাপিত, দাস, কৈবর্তদের জন্যে ৬০ টি বাড়ির জন্যে নিষ্কর ভূমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়। যার মাধ্যমে সেখানে ‘ষাটেরপাড়া’ গড়ে ওঠে। এই ‘ষাট’ শব্দটি পরবর্তীতে সাটিরপাড়া হয়ে যায়। এখনো জমিদার বাড়ির পাশে শীল বাড়ি, দাস বাড়ির অস্তিত্ব রয়েছে। মূলত জমিদার বাড়ি গড়ে ওঠার পরই নরসিংদী জনপদ চারদিকে প্রশস্ত হতে থাকে। এই পাল জমিদার বংশের কীর্তিমান পুরুষ হলেন ললিতমোহন রায়।

জমিদার কালী কুমার পাল তাঁর সন্তানকে ঢাকা-কলকাতা থেকে সর্বোচ্চ শিক্ষিত করার সব রকম চেষ্টা-তদবীর করেন। সফলও হন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন ললিতমোহন। তিনি নিজ যোগ্যতায় জমিদারি এস্টেট বৃদ্ধিসহ অনেক জনহিতকর কাজ করেন। একজন প্রজাহিতৈষী জমিদাররূপে তিনি আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হন। নিজ জমিদারিকে গড়ে তোলার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রজাদের জীবনমান  উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্যে তিনি নরসিংদীকে একটি পূর্ণাঙ্গ গঞ্জ বা বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা হাতে নেন। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে বাবা কালী কুমারকে সঙ্গে নিয়ে মেঘনা-হাড়িধোয়ার পাড়ের ছোটো হাটটিকে ‘গঞ্জ’ হিসেবে ঘোষণা করেন। কালী কুমার তার নামকরণ করেন ‘কৃষ্ণগঞ্জ বাজার’। মূলত তখন থেকেই এলাকাটির সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পথচলা শুরু হয়। যেখানে পরবর্তীতে বিশাল বাজার ও নরসিংদী নদীবন্দর গড়ে ওঠে। তখন কৃষ্ণগঞ্জ বাজার দ্রুত প্রসার লাভ করলেও তা ছিলো ৪০ মাইল দূরবর্তী রূপগঞ্জ থানার অধীনে। মেঘনা নদীর পূর্ব তীরের এলাকা ছিলো ত্রিপুরার বরদাখাল পরগণার আওতাধীন। তাই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্যে জমিদার ললিতমোহন রায় নদীর তীরে একটি পুলিশ ফাঁড়ি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। উপর মহলে তদবির করে তিনি ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সফল হন। বর্তমান নৌ-পুলিশ কার্যালয় ছিলো নরসিংদীর পুলিশ ফাঁড়ি। তখনো থানার কার্যক্রম পরিচালিত হতো রূপগঞ্জ থেকে। অপরদিকে পলাশ-ঘোড়াশাল ছিলো কালীগঞ্জ থানার অধীনে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ছিলো রূপগঞ্জ ও কালীগঞ্জ। এতে প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি হতো। নরসিংদীর লোকজনদের প্রশাসনিক কাজে নানা স্থানে দৌড়াদৌড়ি করতে হতো। এটি অনুভব করে ললিতবাবু ফাঁড়িটি থানা হিসেবে উত্তীর্ণকরণের জন্যে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলে জোর প্রচেষ্টা চালান। অবশেষে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে নরসিংদীকে একটি থানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটান। এরই ধারাবাহিকতায় থানা শহরটি ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে মহকুমা এবং ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

ললিতমোহন রায় কর্তৃক মেঘনা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত পুলিশ ফাঁড়ি, যা এখনো বিদ্যমান

বাংলাদেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে বর্তমানে নরসিংদী জেলা একটি গুরত্বপূর্ণ জনপদে পরিণত হয়েছে। বস্ত্রশিল্প ও খাদ্য-শস্য উৎপাদনে শীর্ষ জেলা হিসেবে নরসিংদী এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় নৌ-পথ ছাড়া যোগাযোগের বিকল্প মাধ্যম ছিলো না। শুধু নরসিংদীরই নয়, পার্শ্ববর্তী নবীনগর, বাঞ্ছারামপুর প্রভৃতি এলাকার লোকজন নৌ-যানে নরসিংদী এসে কেনাকাটা করতেন। অনেকে রেলপথে ঢাকা-কলকাতা যেতেন। ঠিক তখনই জমিদার ললিতমোহন রায় নরসিংদীর সঙ্গে স্থলপথে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের চিন্তা-ভাবনা করলেন। তৈরি করলেন নরসিংদী-পাঁচদোনা-মাধবদী-পুরিন্দা-পাচরুখী-ভূলতা-ডেমরা কাঁচা সড়ক, যার উপর পরবর্তীতে ঢাকা-নরসিংদী পাকা সড়ক প্রতিষ্ঠিত হয়। চল্লিশের দশকে সেই ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের কাঁচা রাস্তা ভাড়া নিয়ে ঢাকার মোমিন মটরস কোম্পানি ইটের পাকা রাস্তা তৈরি করে নরসিংদী থেকে বাবুরহাট হয়ে তারাব পর্যন্ত বাস সার্ভিস চালু করে, যা ছিলো এ-অঞ্চলের প্রথম বাস সার্ভিস। অবশ্য জমিদার ললিতমোহন রায় এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি।

নরসিংদী বর্তমানে শিল্পনগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ললিতবাবু যখন জমিদার, তখন নরসিংদী হ্যান্ডলুম বা ঠকঠকি তাঁতের কাপড়ের জন্যে বিখ্যাত হলেও তা ছিলো কুটির শিল্প পর্যায়ে। তবে এর আধিক্য ছিলো পাঁচদোনা, আমদিয়া, ডাঙ্গা, মেহেরপাড়া, শেখেরচর, মাধবদী, বালুসাইর, আলগী প্রভৃতি এলাকায়। এই হ্যান্ডলুম তাঁতশিল্প ঘিরে প্রথমে মাধবদী এবং পরে বাবুরহাট কাপড়ের হাট প্রতিষ্ঠা লাভ করে। স্থানীয় লোকজন কৃষিকাজের পাশাপাশি তাঁত বোনার কাজ করতেন। শাড়ি, লুঙি, চাদর, গামছা ও থান কাপড়ের মধ্যেই তাঁতীদের কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ থাকতো। কৃষকেরা বসতঘরের পাশে  ছোটো করে একটি তাঁতঘর গড়ে তুলতেন।

এখন নরসিংদী অঞ্চলে অসংখ্য শিল্প-কারখানা ও মিল-ফ্যাক্টরি গড়ে ওঠেছে। কিন্তু যদি প্রশ্ন করা হয়, নরসিংদীর প্রথম মিল-কারখানার জনক কে? এই প্রশ্নের অনুসন্ধান করতে গিয়েও পাওয়া গেছে জমিদার ললিতমোহন রায়ের নাম। তিনি সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের পূর্বপাশে একটি চিনির মিল প্রতিষ্ঠা করেন তিরিশের দশকে। তা পরিচালনার ভার দিয়েছিলেন বড়ো ছেলে নৃপেন্দ্রচন্দ্র রায়কে। তিনি জমিদারি পরিচালনার পাশাপাশি চিনিকলের দেখাশোনাও করতেন। এই কারণে অনেকে মনে করতেন, মিলটির মালিক নৃপেন্দ্র রায়। আসলে সাটিরপাড়ার জমিদার পরিবারের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন ললিতবাবু। তিনি যেহেতু পেশাগত কারণে ঢাকা-কলকাতায় ব্যস্ত থাকতেন, তাই জমিদারি বলেন আর সুগার মিল বলেন, তা নৃপেন্দ্র ওরফে বঙ্গবাবু পরিচালনা করতেন। মূলত ব্রিটিশদের কারখানায় উৎপাদিত চিনি বর্জনের জন্যেই তিনি চিনিকলটি নরসিংদীতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চিনিকল প্রতিষ্ঠার আরেকটি কারণ ছিলো। সে-সময় নরসিংদী অঞ্চল তথা মহেশ্বরদী পরগণা আখ চাষের জন্যে বিখ্যাত ছিলো। এখানকার আখের তৈরি গুড় ছিলো বিশ্ববিখ্যাত। তাই সুস্বাদু ও স্বাস্থ্যসম্মত চিনি উৎপাদনের জন্যে তিনি নিজ জমিদারি এস্টেটে মিলটি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, কয়েক বছর চলার পর মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। তখন পরিত্যক্ত মিলের জায়গায় ললিতবাবু তাঁর মা কমল কামিনী দেবীর নামে একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে। উক্ত স্কুল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নরসিংদীতে নারী শিক্ষার পথ প্রশস্ত হয়।

ললিতমোহন রায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘কমল কামিনী গার্লস হাই স্কুল’, যা এখনো ‘নরসিংদী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে চলমান

স্বদেশি উদ্যোগ শুধু এটাই প্রথম ছিলো না। তিনি জাহাজ কোম্পানি খুলেছিলেন। মানুষ যাতে ব্রিটিশ বেনিয়াদের স্টিমার ব্যবহার না করে, সেজন্যে প্রচারণাও চালাতেন। আর ভারতবর্ষের প্রথম বৈদ্যুতিক ল্যাম্প কোম্পানি খুলে ললিতমোহন অমরত্ব লাভ করেছেন। বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছিলেন ললিতমোহন রায়ের ঘনিষ্ঠজন। তাই তিনি একদিন আলোচনা প্রসঙ্গে বললেন, “আমাদের দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা কবে স্বদেশি মিল-ফ্যাক্টরি তৈরি করবে?” সঙ্গে সঙ্গে ললিতবাবু বললেন, তিনি এই উদ্যোগ নেবেন। আমেরিকা ও জার্মান থেকে পাশ করে আসা দুই ইঞ্জিনিয়ার পুত্রকে বেঙ্গল ল্যাম্পস নামে কারখানা প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দেন। তখন ইউরোপের মালিকানাধীন ফিলিপস বাল্বে সারা ভারতবর্ষ ছেয়ে গিয়েছে। সেই বাল্বকে পেছনে ফেলে একচ্ছত্র বাজার দখল করে নেয় স্বদেশি বেঙ্গল ল্যাম্পস। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে নরসিংদীর স্বদেশি জমিদার ললিতবাবুর নাম-যশ।

আজকের যুগে মিথ্যা হিসেবে প্রচারিত হয়, অতীতে প্রজারা জমিদার বাড়ির সামনে দিয়ে জুতা পায়ে দিয়ে কিংবা ছাতা মাথায় দিয়ে চলাফেরা করতে পারতো না। খাজনা অনাদায়ে প্রজাদের ধরে এনে শারীরিক নির্যাতন করতো। বাইজি নৃত্য, মদ্যপান, গান-বাজনার জলসা তো জমিদারদের জীবনের সঙ্গে মিশে আছে। কিন্তু সাটিরপাড়ার রায় জমিদারেরা ছিলেন সম্পূর্ণ বিপরীত। বাইজি নাচ বা গান-বাজনার পরিবর্তে সেখানে বিদ্যাশিক্ষার চর্চা হতো। প্রজা নিপীড়নের জায়গায় বিধবা বিবাহ ও জাতপাত বিরোধী কর্মকাণ্ড চলতো। খাজনা দিতে না পারলে প্রজাদের নির্যাতন তো করা হতোই না, বরং অসহায় প্রজাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা হতো। একটি ঘটনা উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক মনে করছি, যা ‘নরসিংদীর গুণীজন’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

আনুমানিক ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ঘটনা। মনোহরদীতে খাজনা অপরিশোধের জন্যে এক বিধবা নারীর জমি নিলামে তোলা হয় স্থানীয় নায়েবের কারসাজিতে। তখন সেই বিধবা দুই শিশুপুত্র নিয়ে মনোহরদী থেকে হেঁটে ২২ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে সাটিরপাড়ার রায় জমিদার বাড়িতে হাজির হয়। তাদের কান্নাকাটি দেখে জমিদার বাড়ির মেয়েরা বাইরে এসে তাদের ভেতরে নিয়ে সান্ত্বনা দেন এবং আদর করে খাওয়া-দাওয়া করান। জমিদারবাবু বাড়িতে এসে তাদেরকে বুঝিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। পরে বিধবার পক্ষে জমিদারবাবু নিলামের বিপক্ষে আপিল করেন নিজ খরচে। তখন সেই বিধবা জমি ফেরত পান। এমন প্রজাদরদী এবং মানবিক জমিদার ছিলেন তারা। জমিদার বাড়ির এমন আরো অনেক দৃষ্টান্ত ছিলো। বিধবাদের প্রতি জমিদারেরা অত্যন্ত সহায় ছিলেন। অনেকেই অল্প বয়সে বিধবা হতো। সমাজে তারা ছিলো অপয়া। নানা অপবাদ ও অপমান সহ্য করে জীবনযাপন করতো। পুনর্বিবাহ করার অনুমতি পেতো না। কিন্তু ললিতমোহন রায় বিভিন্ন গ্রাম থেকে বাল্যবিধবাদের এনে জমিদার বাড়িতে ভরণপোষণের ব্যবস্থা করতেন। এরপর পর্যায়ক্রমে বিয়ে দিয়ে তাদের সুখী-সুন্দর জীবন উপহার দিতেন। তিনি এমন জমিদার ছিলেন, যিনি নিজ এলকার মেথর, মুচি, কৈবর্ত, দাসদের সঙ্গে এক থালায় খেয়ে প্রমাণ করতেন, মানুষের মধ্যে কোনো জাত-পাত নেই। সবাই ঈশ্বরের কাছে সমান। সমাজে জাত-পাত সৃষ্টি করেছে একশ্রেণির স্বার্থান্বেষী মহল।

অতীতে নরসিংদীর চরাঞ্চল ও রায়পুরা সদর থানার কিয়দংশ অপরাধপ্রবণ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিলো। মারামারি,  লুটপাট, অগ্নিসংযোগ এমনকি খুনোখুনিতে নিত্যদিন লেগেই থাকতো। এ-কারণে জেল-জরিমানা ও মামলা-মোকদ্দমায় সাধারণ মানুষ নিষ্পেষিত হতো সবসময়। তা দেখে জমিদার ললিতমোহন রায় বেশ ব্যথিত হতেন। লেখাপড়া না জানা গ্রাম্য মানুষ মামলায় পড়ে সর্বশান্ত হতো। কীভাবে তাদের রক্ষা করা যায়, সেই চিন্তা-ভাবনা করতেন। তার চেম্বারে নরসিংদীর তথা মহেশ্বরদী পরগণার অনেক মক্কেল যেতো। ললিতবাবু তাদের মামলা করার জন্যে নিরুৎসাহিত করতেন। অনেক মামলা দুই পক্ষের অনুমতি নিয়ে মীমাংসা করে দিতেন। গরীব-অসহায় মক্কেলদের সুবিচারের জন্যে বিনা পয়সায় মামলা লড়ে যেতেন। আইনজীবী পেশার বিরোধী আদর্শ হলেও শুধুমাত্র মানবিক কারণে তিনি এসব পদক্ষেপ নিতেন। তিনি যখন দেখতেন, অনেক গরীব মক্কেল ফি দিতে না পেরে তাঁর  কাছে হাঁস-মুরগী কিংবা শাক-সবজি নিয়ে এসেছে, তখন তাঁর মন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠতো।

মহকুমা শহর হিসেবে নারায়ণগঞ্জ ও জেলা শহর হিসেবে ঢাকায় চেম্বার ছিলো ললিতবাবুর। এসব চেম্বার মক্কেলে ভরে যেতো। সৎ, উপস্থিত বুদ্ধিসম্পন্ন ও তাত্ত্বিক জ্ঞান দিয়ে তিনি মক্কেলদের জিতিয়ে আনতেন। তাঁর প্রতি মক্কেলদের অগাধ বিশ্বাস জন্মেছিলো। তারা মনে করতো, ললিতবাবু যখন কেস হাতে নিয়েছেন, তখন অবশ্যই জিতবেন। অনেক মক্কেলেরই ঢাকায় থাকার জায়গা ছিলো না। তখন আবাসিক হোটেলের আইডিয়া আসেনি। মেস বা সরাইখানায় থাকার ব্যবস্থা ছিলো। এমনসব মক্কেলদের রাত্রি যাপনের জন্যে তিনি নিজ চেম্বার ছেড়ে দিতেন। ঘনিষ্ঠ মক্কেলদের তিনি লক্ষ্মীবাজারের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করতেন। তিনি এমন প্রজাহিতৈষী স্বভাবটা পেয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের কাছ থেকে। অনেক মামলায় দেশবন্ধুর সঙ্গে মামলা পরিচালনা করে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, শুধু অর্থের জন্যে উকালতি করলে মানবতা হারিয়ে যাবে। সাধারণ মক্কেলরা সুবিচার পাবে না। এজন্যে তিনি অন্তত ৪০ ভাগ মামলা পরিচালনা করতেন সহযোগিতা আর মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, আইন পেশার মাধ্যমেও দেশসেবা করা যায়, এটা প্রমাণের জন্যে তিনি কলকাতা থেকে বিএবিএল পাশ করেও কলকাতা হাইকোর্টে থিতু হননি। জন্মভূমির মক্কেলদের আইনি সহযোগিতা দেয়ার জন্যে ঢাকায় ফিরে এসেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত জন্মভূমিতেই মানুষের সেবা করে গেছেন। তাঁর কাছে এসে সহযোগিতা পাননি, এমন নজির ছিলো না। তাঁর মতো নিঃস্বার্থ ও দরদী একজন প্রশাসক ও মানুষ অন্তত নরসিংদীর ইতিহাসে খুব কমই এসেছে।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃখের জারি এবং প্রাসঙ্গিক কথা

যেকথা নানাভাবে বলা হয়েছে
এই শতাব্দীর গোড়া থেকে কিংবা আরো আগে থেকেই পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়ে আসছিলো, ‘নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয় চাই’। বর্তমান শতকের গোড়ায় সংসদে দেশে ১২ টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা প্রস্তাবিত হলে তার মধ্যে একটি নরসিংদীতে হবে— এই প্রত্যাশা করা হয়েছিলো। তদুপরি ঢাকার অদূরে পূর্বাচলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস করার প্রস্তাব উঠলে অগত্যা সেটিও যাতে নরসিংদীতে করা হয়, সে-দাবিও রাখা হয় এবং তজ্জন্যে নরসিংদীর অদূরে বিশ্ববিদ্যালয় করার উপযোগী একটি পতিত জমিদার বাড়ি ও তার খাসজমি (পতিত)-র কথাও উল্লেখ করে দেখানো হয় (দ্রষ্টব্য : নরসিংদী জেলা কর্তৃপক্ষের নিকট সরকারি নজরে আনার জন্যে উক্ত বিষয়ক পেশকৃত পত্র, তারিখ— ১২.১১.২০০৮)। পরবৎসর পুনরায় এ-ব্যাপারে ‘নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’-এর পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সাথে সাক্ষাত করে তাঁর বরাবরও আবেদন করা হয় এবং তাতেও বিস্তৃত করে বলা হয় যে, “প্রাচ্যের ম্যানচেস্টার খ্যাত মাধবদী (বাবুরহাট) বাজার সংলগ্ন ঐতিহাসিক বালাপুর জমিদার বাড়িটি ও তৎসংলগ্ন প্রায় ২ (দুই) হাজার বিঘা খাসজমি অব্যবহৃত হয়ে পড়ে আছে প্রায় তিন শতাব্দী ধরে। এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণের সকল প্রকার অবকাঠামো বিদ্যমান। এই ঐতিহাসিক বাড়িটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২য় ক্যাম্পাস নির্মাণের সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান; এখানে তা করা হলে ভূমি ক্রয় করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হবে না। বরং তা সাশ্রয় হবে। অপরদিকে অন্যভাবে জমি অধিকৃত করতে গেলে বহু মূল্যবান আবাদী জমির ও কৃষকের ঘরবাড়ির ক্ষতি সাধন অবশ্যম্ভাবী।” (আবেদনের তারিখ : ১৯.০১.২০০৯)

আবেদন প্রয়াসের ধারা
বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি যেমন রাজনৈতিক দাবি, তেমনি যথাকর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনারও বিষয়। কিন্তু প্রথম থেকেই আমরা যারা এই দাবি নিয়ে লেখালেখি করছি বা দাবিটা তুলতে বা দেশবাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করছি, তারা কেউ সক্রিয় রাজনীতিক নই। পেশাগতভাবে আমাদের কেউ শিক্ষক, কেউ চিকিৎসক, কেউ ছাত্র, কেউ ব্যবসায়ী এবং অনেকে হয়তো চাকুরিজীবী হয়েও লেখক মাত্র। একটা সাধারণ চিন্তা, দেশপ্রীতি ও দায়িত্ববোধ থেকে অনুভূত কিছু অসুবিধার কারণেই আমরা প্রথমে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে একত্র হই ’৮০-র দশকের দিকে। তারপর থেকেই বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন জনের সাথে দেখা করে, করণীয় বিষয়ে সকলের বুদ্ধি, পরামর্শ ও উপদেশমতো উপযুক্ত স্থানে যথাপ্রয়োজনীয় কাগজপত্র উপস্থিত করতে থাকি এবং পত্র-পত্রিকায়ও নরসিংদীর মতো স্থানের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক গুরুত্বের কথা এবং বিশেষভাবে এখানকার ছাত্রদের সমস্যার কথা উল্লেখ করে নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্যে আবেদন জানাতে উদ্যোগী হই। এভাবেই আমরা আমাদের নতুন জেলার দরিদ্র ছাত্র ও অভিভাবকদের দুঃখ ও কষ্টগুলি সকলের গোচর করার বা জানাবার উদ্দেশ্যে অদ্যাবধি চেষ্টা করে আসছি।

এসব ছাড়াও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংদীর ছাত্রদের নিয়ে আমরা বিভিন্ন সভা-সম্মেলনে এর প্রয়োজনীয়তার কথা বহু শতবার আলোচনা করেছি। নরসিংদীতেও এ নিয়ে সংবাদ-সম্মেলন করেছি একাধিকবার। এসব সংবাদ বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় পত্র-পত্রিকায় এবং প্রচারিত পত্রে ও পোস্টারে হয়তো অনেকেই লক্ষ্য করে থাকতে পারেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নরসিংদী ছাত্র সমিতি
’৮০-র দশক থেকে এই চিন্তাটা বিশেষভাবে কাজ করলেও নবসৃষ্ট নরসিংদী জেলার শিক্ষার্থীদের সমস্যার প্রতিকার ও দৃষ্টিপাত ঘটাতে এই আবেদনটিকে শেষে একটা আন্দোলনের পর্যায়ে গ্রহণ করার উদ্যোগ নেয়া শুরু হয়। এর পেছনে যেসব বাস্তব কারণ ছিলো, সেগুলো হলো : ১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বেশ দুরূহ হয়ে ওঠছিলো; ২. ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ সাধারণ ছাত্রদের জন্যে আর্থিক ও সার্বিক ব্যবস্থার দিক থেকে ছিলো বহুগুণ কষ্টের বা দুর্বহ বিশেষ এবং ৩. একইভাবে কষ্টের মাত্রা বেড়ে ওঠছিলো ঢাকার বাইরে (চট্টগ্রাম) যারা যেতে বাধ্য হচ্ছিলো, তাদের।

১৯৭৭ সালে আমি পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরলেও সেই সময় নরসিংদী থানা প্রথম মহকুমায় উন্নীত হয়েছিলো বলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংদীর ছাত্রদের শিক্ষাকষ্ট দূর করার বিষয়ে কিছু করার জন্যে ব্যক্তিগতভাবে আমার মধ্যে একটা চিন্তা কাজ করতে থাকে। এর আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে CURDP বা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের শিক্ষা পরিচালক হিসেবে এবং নরসিংদীতে আমার নিজ গ্রামেও বেশ কিছু সামাজিক কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো। এসব কারণে ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নরসিংদী ছাত্র সমিতি’ গড়ে ওঠলে তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে আমি নরসিংদী থেকে আগত ছাত্রদের সমস্যাগুলি নিয়ে কাজ করার কথা ভাবি। তার মধ্যে অন্যতম তাদের চট্টগ্রাম আসা, থাকা ও ভর্তির বিষয়গুলি নিশ্চিত করা। ক্রমে তার সাথে যুক্ত হয় নরসিংদীতে চিটাগাং মেইল ট্রেনের স্টপেজ করার দাবিও, যাতে ছাত্রদের চিটাগাং আসা-যাওয়ার কষ্টটা লাঘব হয়। এসবের সমাধান দুঃসাধ্য না হলেও যথেষ্ট ব্যয়বহুল, কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ ছিলো। শেষে স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চিন্তাটাই প্রধান হয়ে ওঠে। ইতোমধ্যে নরসিংদী জেলায় পরিণত হয় (১৯৮৪ সালে) এবং আমাদের আশা-স্বপ্নও বৃদ্ধি পায়। পরে বিশেষত অনুষদের ডিন থাকাকালেও নরসিংদীর ছাত্রদের কষ্টটাকে আরো কাছ থেকে ও স্পষ্ট করে বুঝতে সক্ষম হই। এবং বিষয়টি নিয়ে আরো নানা জনের সঙ্গে মিলে বৃহত্তর পরিসরে কাজের বাস্তবায়নে এগিয়ে আসি।

বাস্তব পরিস্থিতির কারণেই এইভাবে অচিরে আমাকে উপদেষ্টা করে ডাক্তার হাসান এবং শ্রীক্ষণরঞ্জন রায় ‘নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ’ গঠন করে এবং নরসিংদীতে প্রেস কনফারেন্স আহ্বান করে।

এছাড়াও এই পরিষদ বার্ষিক সম্মেলন করে স্বাক্ষরতা গ্রহণসহ রক্তদান, চক্ষুশিবির, দন্তপরীক্ষা ও সেবা প্রভৃতি নানা সামাজিক কার্যক্রম নিয়মিত পরিচালনা করতে থাকে। উদ্দেশ্য ছিলো আমাদের দাবিটিকে সাধারণের মধ্যে ছড়ানো ও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। এসব অনুষ্ঠানে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন জনপ্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে যেমন নরসিংদীর শিক্ষাদাবি উপস্থাপন করা হয়েছে, তেমনি অভ্যাগত সকলেই আমাদের দাবির স্বপক্ষে বা অনুকূলে মন্তব্য প্রকাশ ও উপদেশ প্রদানসহ সহায়তা প্রদানের প্রতিশ্রুতিও প্রদান করেছেন।

এভাবে পর্যায়ক্রমে আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সচিবালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, নরসিংদীর জনপ্রতিনিধিদের দপ্তর এবং সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রীবর্গের কার্যালয় তো বটেই, সংশ্লিষ্ট আরো নানা জনের সাথেও দেখা-সাক্ষাত করে ও প্রত্যেকের কাছে আমাদের লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে এবং প্রয়োজনীয় স্মারক পেশ করে নরসিংদীতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা যথাসাধ্য বোঝাবার চেষ্টা করেছি। এ-ব্যাপারে সকলের আন্তরিক সহযোগিতার আশ্বাসে বিগত প্রায় ২৫ বছর ধরে আমরা আমাদের এই প্রয়াস-প্রচেষ্টা অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছি।

আবেদনসমূহে উল্লেখিত বক্তব্য
আমাদের বক্তব্যের মধ্যে আমরা সব সময় এই কথাটাই বলতে চেয়েছি যে, নরসিংদী তার সমৃদ্ধ ইতিহাস সত্ত্বেও শিক্ষাগত দিক থেকে একটি অবহেলিত জনপদ। অনেক আন্দোলন করে এবং স্থানীয় সিনেমা হল, রেলস্টেশন এবং বাজারের তোলা তুলে স্থানীয় নেতৃত্বের সহযোগ-সহায়তায় স্বাধীনতার আগে নরসিংদী কলেজটি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় এবং অনতিকালে সরকারিকরণসহ তার আরো উন্নতি করাও সম্ভব হয়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, এখনো পর্যন্ত এখানকার শিক্ষার পরিস্থিতি এবং চাহিদার বিষয়টি নিয়ে কেউ বিশদভাবে বিবেচনা করে করণীয় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। উচ্চশিক্ষার জন্যে এখানকার ছেলেমেয়েরা কতোটা কষ্ট করছে, সেটি সবার অগোচরেই থেকে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যায়, পূর্বে কিশোরগঞ্জ এবং পূর্ব-দক্ষিণে ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে পশ্চিমে রেলপথে টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় তিন জেলা এবং কোরানের প্রথম অনুবাদক ভাই গিরিশচন্দ্র সেন এবং বাংলা ও আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি জগতের পুরোধা সত্যজিৎ রায়-অতুলপ্রসাদ প্রমুখের মামাবাড়ি-ফুপার বাড়ির এলাকা পাঁচদোনা-রূপগঞ্জ-সোনারগাঁ এলাকা ধরে নিয়ে মেঘনার এপাড়-ওপাড়ব্যাপী ব্রাহ্মণবাড়িয়া- কুমিল্লা-নারায়ণগঞ্জের বহিঃপ্রান্তভাগজুড়ে তথা নরসিংদী সংলগ্ন এক সুবিশাল এলাকার মধ্যে অতীতেও কখনো উচ্চশিক্ষার কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি, এখনো তেমনি তার কোনো ব্যত্যয় ঘটছে না। বর্ণিত এই এলাকার মধ্যস্থান হচ্ছে নরসিংদী। নরসিংদীর স্থানগত গুরুত্ব একাধিক কারণে। এটি একটি প্রাচীন সভ্যতার পীঠস্থান, মসলিনের জন্মভূমি এবং আমধ্যযুগ বিখ্যাত পাটকেন্দ্র ও বাণিজ্যিক এলাকা। মধ্যযুগের কবি গৌরবনরসিং ওঝা এবং পশ্চিমবঙ্গে অভিবাসিত কৃত্তিবাস ও ভারতচন্দ্রের উত্তর বংশধারার চিহ্ন জিনারদীর পুরাণ-অনুবাদক কবি ষষ্ঠীবর শর্মা ও তৎপুত্র গঙ্গাদাসের কথাও এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি। নরসিংদীর বাউল মেলাও এর আরেকটি ঐতিহ্যিক স্মারক।

ঢাকা শহরের পরেই প্রশাসনিক, ঐতিহাসিক এবং সংস্কৃতিগত গুরুত্বে নরসিংদীর অবস্থান। অথচ শিক্ষা-দীক্ষার দিক থেকে এলাকাটি অনেক পেছনে। শুধু কয়েকটি স্কুল-কলেজের বাতাবরণ দিয়ে শিক্ষানগরী বা শিক্ষাএলাকা সৃষ্টি হয় না। ঢাকায় ভর্তি হতে না পেরে এখানকার ছাত্ররা যে-অমানুষিক কষ্ট স্বীকার করে চট্টগ্রামে বা সিলেটে ভর্তি হতে যায় এবং সেখানে যাতায়াত ও থাকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে যে-অমানুষিক, শারীরিক ও আর্থিক কষ্ট মেনে নিতে বাধ্য হয়, সেই অবর্ণনীয়তা কি তাতে স্পষ্ট হয়? এসব কথা বহু বহুবার যথাকর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছাবার চেষ্টা আমরা করেছি, সে-কথা আগে বলা হয়েছে। এক কথা বারবার বলা হলে তা যে কর্ণকুহরের মধু হয়ে ওঠে, অন্তত আমাদের সে-অভিজ্ঞতা হয়নি। নরসিংদীর ভাগ্য যে-তিমিরে ছিলো, সেই তিমিরেই আছে আজো।

সংবাদপত্রে নরসিংদী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মূল বক্তব্য
পত্রিকার মাধ্যমে জোর লেখালেখি শুরু হয় এই শতাব্দী বা সহস্রাব্দ থেকে। তাতে যাঁরা দাবি করছিলেন, তাঁরা সকলেই যে নরসিংদীর, তা নয়। কেউ কেউ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের, কেউবা আরো দূরের। ঢাকার ফরিদাবাদ থেকে এক মহিলা (বা ছাত্রী)-ও লিখেছেন, যা আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। অবশ্য অধিকাংশ লেখাই প্রকাশিত হয়েছে চট্টগ্রামের (আজাদী : ২১ সেপ্টেম্বর ২০০৬, ২১ নভেম্বর ২০০৬, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১, ২৬ জুলাই ও ৯ সেপ্টেম্বর ২০১২; সুপ্রভাত বাংলাদেশ : ২০ সেপটেম্বর ২০০৬; ২১ আগস্ট ২০০৮, ৭ এপ্রিল ২০১১, পূর্বকোণ : ৩০ এপ্রিল ২০১৩; দৈনিক কর্ণফুলী : ১ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৬; ডেসটিনি : ২৪ মে ২০০৮; চট্টগ্রাম মঞ্চ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০০৬ প্রভৃতি) এবং ঢাকার (দৈনিক প্রথম আলো : ৮ আগস্ট ২০০৬, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০০৬, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১১; আজকের কাগজ : ১৮ অক্টোবর ২০০৬; দিনকাল : ২৪ জানুয়ারি ২০০৭; যায়যায়দিন : ২৮ অক্টোবর ২০০৮; ভোরের কাগজ : ২৮ জানুয়ারি ২০১১; দৈনিক জনতা : ১০ অক্টোবর ২০০৬, ১০ মার্চ ২০১১; খবর : ১১ ফাল্গুন ১৪১৭; দৈনিক রূপালী : ৩০ আশ্বিন ১৪১৩; নয়াদিগন্ত : ১৫ জুলাই ২০০৬, ১০ অক্টোবর ২০০৬; মানবজমিন : ৭ অক্টোবর ২০০৬; আমাদের সময় : ৭ অক্টোবর ২০০৬; দৈনিক আল আমীন : ১১ নভেম্বর ২০০৮ প্রভৃতি) পত্রিকাগুলিতে। এসব কাগজে ফিচার-নিবন্ধ আকারে বা দাবিপত্র আকারেও অনেকে লেখেন। নরসিংদীর স্থানীয় কাগজও এ-বিষয়ে পিছিয়ে ছিলো না। তাদের মধ্যে অন্যতম সাপ্তাহিক নরসিংদীর বার্তা, নরসিংদীর কণ্ঠ, নরসিংদীর খবর, নরসিংদীর চোখের আলো, খোঁজ-খবর ও মাটির পুতুল। এছাড়া নরসিংদীর আদিয়াবাদের গবেষণা-প্রতিষ্ঠান ‘আদিয়াবাদ সাহিত্য-ভবন ও ভাষাতত্ত্ব-কেন্দ্র’র মুখপত্র তথা নরসিংদীর তথ্যপত্র ‘নিসর্গ-বার্তা’র একাধিক সংখ্যায় এ-বিষয়ে তথ্য দেয়ার চেষ্টা আছে।

এসব চিঠিপত্র, আবেদন, প্রতিবেদন ও দাবিনামা, যা উল্লিখিত পত্র-পত্রিকাগুলিতে প্রকাশিত হয়েছে এবং অব্যাহতভাবে প্রকাশিত হচ্ছে, সেসবে এই বন্দর বা বাণিজ্যকেন্দ্রের পশ্চাদ্ভূমি (হিন্টারল্যান্ড)-এর বিবরণ এবং তার গুরুত্বের কথাও উঠে এসেছে যথামূল্যায়নসহ। তাতে উল্লেখিত হয়েছে যে, নরসিংদী আবহমানকাল থেকেই যেমন ধান-পাট-কলা-আখ-কাঁঠাল এবং মেঘনার জলশস্য-সমৃদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়-কেন্দ্র, তেমনি বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহাসিক ‘সাইট’ উয়ারী-বটেশ্বরের পশ্চাদ্ভূমি ও প্রাচীন চীন-উপনিবেশ গ্রাম চিনিশপুর ও মাধবদী-বাবুরহাটের নব্য বস্ত্রশিল্পের অতীত রুমাই শহর (রোম), ইতালি ও মিশর-বাইজেন্টাইন নন্দিত মসলিনের ইতিহাস-হারা হতভাগ্য অঞ্চলও। এই প্রাচীন ইতিহাস ও পটভূমি নিয়ে নরসিংদীর মতো স্থান শুধু নতুন জেলা (১৯৮৪ সালে) হওয়ার কারণে আজ তার কোনো দাবির প্রতিই দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বোধ করছে না কেউ। তাছাড়া প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো, ঢাকার শহরতলীরূপে গড়ে ওঠা এই নরসিংদীর বেলায় শিক্ষা ক্ষেত্রে অন্ধকার যেন আরো বিশেষভাবে তার জন্মগত অধিকার ও অর্জন হয়ে ওঠেছে। পত্রিকা কেন, গিল্টি মারা মহাহ্রস্ব কর্ণকুহরের প্রান্তে বসে যদি সারা নরসিংদীবাসী আকাশ কাঁপানো কোনো মহাক্রন্দসী ভেঁপু বাজাতে শুরু করেন, তাহলেও এই অনন্তকালের মহান কুম্ভকর্ণ মহাশয়েরা মহানিদ্রা ভঙ্গ করে জেগে ওঠবেন, এমন ভরসা আছে কি?

‘নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’-এর প্রস্তাবনা কোনো কলুষিত বোধ ও বুদ্ধির উত্তরাধিকারজাত প্রপঞ্চ নয়, বরং প্রকৃত চাহিদার লক্ষ্যে বিকৃতির প্রতিবাদ। বস্তুত নব সৃজনী চিন্তার একটি ধারা প্রতিষ্ঠারই স্বপ্ন নিয়ে এই আন্দোলন শুরু। গলির ধার করা আলো নয়, আবার ঢাকার তলীও নয়, একটা নিজস্বতা নিয়েই যেন শুরু হয় তার চলা। হোক তা স্থানিকতার মূল্যেই। সেই মূল্যেই ধন্য হবে নরসিংদী।

বিশ্বায়নের প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয় : ‘কি ঘর বানাইলি হাসন শূন্যের মাঝার
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু তা কার জন্যে? এককালে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানের প্রবেশদ্বারে লেখা থাকতো ‘ডগস এন্ড ইন্ডিয়ান্স আর নট এলাউড’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও এখন সাধারণের জন্যে নয়। উপরতলার মানুষের জন্যে। সাধারণের জন্যে উপরে উঠার কোনো পথ নেই সেখানে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সিঁড়ি নেই’ উপরে উঠার। আধ্যাত্মিকভাবে না, এলিসের আশ্চর্য দেশের মতো বাস্তব এক শূন্যে ঝুলে আছে এই অনুগমনাগমন পথের শিক্ষা-ইমারতটি। কিছু লোকের জন্যে তাই এখন গলির নিয়ম, মানে গলিতে গলিতে অন্য ব্যবস্থা। যাকে বলেছি ‘গলিলিও’ ধারা। এক শ্রেণির ছাত্র এই বিকল্প মেনে নিয়েছে। তারই ফল যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচুর্য।

বিশ্ববিদ্যালয় সৃষ্টির দিক থেকে বাংলাদেশের যে-রেকর্ডই সৃষ্টি হোক, আমাদের এখন দাঁড়াবার জায়গা চাই, আশ্রয়ের ঘর চাই। শিক্ষার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য দেশের অনুকরণ এখন আর বড়ো আবশ্যক নেই। নিজের মতোন করে নিজেদের ঘর বানানো কঠিন নয়। পশ্চিম দেশে এখন আমাদের হাতই যোগ্যতার প্রমাণ দিচ্ছে। সেখানে পূর্বদেশীয় পণ্ডিতদের অবস্থান লক্ষ্য করলেই তা বোঝা যায়। শুধু তা-ই নয়, এই বিশ্বায়নের দিনে বহু পূর্বদেশ, যেমন জাপান, চীন, ভারত (বিশেষত দক্ষিণ ভারত) যে এখন অনেকটাই এগিয়ে গেছে, এটাও আমাদের কাছে আদর্শযোগ্য। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, পাশ্চাত্য শিক্ষা যদি কেন্দ্র হয়, মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির স্থানিক শিক্ষা তার থেকে স্বাধীন না হোক, সিন্দাবাদের বুড়োর মতো অন্তত তাদের ঘাড়ে আর চেপে নেই সেই কেন্দ্রীয় ধারাটা। এখন যেকোনো দেশেরই কেন্দ্র আর প্রান্ত নিয়ে এই তুলনাটা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলির একসময় সুনাম ছিলো, আন্তর্জাতিক মানের দিক থেকে তা যা-ই হোক না কেন। কিন্তু আজকের যুগশিক্ষা এবং যুগের দাবির বিষয়টি বিশ্বায়নের ডামাডোলে অনেক কিছুর সাথেই মিশে যাচ্ছে। এটা আমাদের বুঝে নিতে হবে। আমরা কোথায় আছি বা ছিলাম, কোথায় চলেছি? আসলে মূল বিষয়টি কী? এই ‘যুগের দাবি’ কার স্বার্থে, কে করে? তার প্রকারই বা কী? তার উপযোগিতা কোথায় এবং কীসে? সে কি কেন্দ্রগত শিক্ষায় না বহুকেন্দ্রিক শিক্ষায়, প্রধান শিক্ষাকেন্দ্রে না শত উপ-শিক্ষাকেন্দ্রে, একতম বিশ্ববিদ্যালয়ে না বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে (ভ্যাট-দ্বন্দ্বসহ)? এরকম বহু প্রশ্নের মুখোমুখী আজ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা। ভাষানীতির মতোই এ-দেশের শিক্ষানীতিও অস্পষ্ট। এই সমস্যা যতোই দিন যাচ্ছে, ততোই অমীমাংসিতভাবে সেই বাদুরঝোলা-ই ঝুলছে। আজ গলিতে গলিতে গড়ে ওঠা নানাবিধ ‘গলিলিও’ মহাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলির অবস্থা দেখে আল মাহমুদের কবিতার কথাই মনে পড়ে যায়। তাতে আছে, ‘জ্ঞানের প্রকোষ্ঠে দেখো ঝুলে আছে বিষণ্ন বাদুর’ কিংবা ‘বানরের চেঁচানিতে ভরে যায় সেগুনের শাখা’। দুটো উপমাই বিদ্যাশিক্ষা বা জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে করুণ চিত্রের দ্যোতক। কে না জানে, মাটির সাথে যোগহীনতায় কোনো কাজের জিনিস জন্মে না। তখন সবই শূন্যে ঝুলে থাকে। অন্যভাবে এই কথাটাই রবীন্দ্রনাথও উল্লিখিত সেই প্রবন্ধেই বলেছেন তাঁর ‘সিঁড়ি-হারা শিক্ষাবিধান’ তত্ত্ব উপস্থিত করে। অনেক মাল-মশলা দিয়ে দোতালা বা বহুতলা বানিয়ে যদি উপরে উঠার সিঁড়ি না থাকে, তবে ঊর্ধ্বপথযাত্রায় সকল প্রয়াসই ব্যর্থ হয়। সিঁড়িহীন বাড়ির প্ল্যানটাকে তাই তিনি এভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, “নিচের তলাটা উপরের তলাকে নিঃস্বার্থ ধৈর্যে শিরোধার্য করে নিয়েছে, তার ভার বহন করেছে কিন্তু সুযোগ গ্রহণ করেনি, দাম জুগিয়েছে, মাল আদায় করে নি।” আমাদের দুঃখটাই যেন তিনি তুলে ধরেছেন এভাবে, “অভ্রভেদী বাড়িটাই আমাদের অভ্যস্ত, তার গৌরবে আমরা অভিভূত, তার বুকের কাছটাতে উপর নিচে সম্বন্ধ স্থাপনের যে সিঁড়ির নিয়মটা ভদ্র নিয়ম সেটাতে আমাদের অভ্যাস হয় নি।” আমরা ঢাকার শিক্ষায় অভ্যস্ত। সেই ঢাকা শুধু নরসিংদী কেন, বাংলাদেশের যেকোনো স্থান থেকে কতোই-বা দূরে। কিন্তু ওই অক্সফোর্ডনামী দালানটা এবং এখন দেখাদেখি গলাগলি করা ‘গলিলিও’ উচ্চশিক্ষার অন্য বাড়িগুলোও যারা নিজেরাই স্বনামে বরহক অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ, স্ট্যামফোর্ড ইত্যাদি নানা বসনে কতোই না অভ্রভেদী এবং তারও বেশি সোপানহীন। সেখানে উঠার সাধ্য কী!

আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি আন্তর্জাতিক নানা নাম নিয়ে, যতোই আরো উপরে উঠছে, ততোই মাটি থেকে সরে যাচ্ছে। তার সিঁড়ি হয়ে ওঠছে অদৃশ্য এবং দূরের (মফস্বলের) ও গরীব ঘরের ছেলেমেয়েদের এবং ইংলিশ মিডিয়ামের ছাত্রদের ছাড়া অন্যদের পক্ষে তার কাছে পৌঁছানো হয়ে ওঠছে দুরূহ। দেশে আজ মেধাবী ছাত্ররা দুর্লক্ষ্য নয়, জিপিএ ফাইভেরও অভাব নেই, কিন্তু সেই জ্ঞানান্বেষী বা অভীপ্সুদের ক’জন উপরতলায় অর্থাৎ ঢাকায় ভর্তি হতে পারছে? উচ্চশিক্ষার নামে তারা কোথায় পড়ছে ছিটকে, কে জানে? অন্যদিকে শিক্ষার ব্যবসায় এবং ব্যবসায়ের প্রতিযোগিতায় ডিগ্রির কাগজ বা সনদ এবং জ্ঞানের পার্থক্য ঘুচে গিয়ে সমতা এসে গেছে এই ফাঁকে। ডিগ্রি নয়, এখন শুধু কাগজ হলেই চলে। প্রকৃত শিক্ষা আজ কাগুজেশিক্ষা বা সনদধন্য শিক্ষারূপে এভাবেই প্রমোশন নিয়ে ছিক্কাতে উঠেছে নির্বিবাদে। যাদের অর্থবিত্ত আছে, তাদের উপরে উঠার সিঁড়ির প্রয়োজন নেই। আর অন্যদের তা নাগালের বাইরে। তাকে হাতের কাছে পাবার সুযোগ কই? মেধাশূন্য শিক্ষা এবং শিক্ষাশূন্য মেধার প্রতিযোগিতায় ছাত্র এবং অভিভাবক উভয়ের লক্ষ্য এবং লভ্য বিষয় এখন একটাই, সেই কাগুজেবিদ্যা তথা সনদ। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি থেকে আশু মুক্তি আবশ্যক। কেন্দ্রীয় শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যতিত এশিয়ার অন্যান্য দেশ আজ সেই শিক্ষার পথেই চলেছে। আমরা আরজ আলী মাতুব্বরের স্বশিক্ষার আশায় বা আর ডি বর্মণের বাঙালির ‘এক তারাটা’ বাজাবার স্বপ্ন নিয়ে আনন্দে আছি। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। তার জন্যে পথ চাই, সিঁড়ি চাই, সাধনা চাই আর চাই সহযোগিতা। কে করবে সহযোগিতা? কে কাকে বোঝাবে শিক্ষার দারিদ্র্য কী ভীষণ অভিশাপ!

হ্যাঁ, আপন শিক্ষায় যারা শিক্ষিত, তাদের বলা হয় স্বশিক্ষিত। তাদের মূল্য প্রাতিষ্ঠানিক তথা পরশিক্ষায় নয়। এই অর্থে ‘শিক্ষা’র মূল্য কী? কিছুই নয়। কথিত উন্নয়নের সিঁড়িও নয়, মাপকাঠিও নয় এবং দারিদ্র্যমোচনের উপায় তো নয়ই। শিক্ষা, উন্নয়ন, দারিদ্র্য এই শব্দগুলিকে আগে পরস্পর সংশ্লিষ্ট মনে করা হতো। ‘লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে।’ কিন্তু দেখা গেছে, সে বড়ো মিথ্যা, কারণ শিক্ষাদাতা স্বয়ং শিক্ষকদেরই দারিদ্র্য ঘোচেনি কোনোদিন। অন্যদিকে জমি-জমা বেচে অশিক্ষিতরাও যারা ‘উন্নতি’ করতে চেয়েছে বিদেশে গিয়ে, তারাও উন্নয়ন বা সৌভাগ্য অর্জন দূরে থাক, বরং নিঃস্ব হয়েই ফিরেছে অনেকে। অতএব এই শব্দগুলি এখন দ্ব্যর্থবোধক কিংবা অতি-তাৎপর্যক। অর্থনীতির লোকেরা আজ স্বীকার করছে যে, কেবল আর্থিক দারিদ্র্যই দারিদ্র্য নয়, আসলে তা একটা দেশের প্রকৃত অভাবকে চিহ্নিত করে না। বাস্তবে ‘অভাব’ অনেক কিছুকেই বোঝায়। অভাব দূর না হলে দারিদ্র্যমোচন হবে না। অভাব সৃষ্টি হয় এবং অদূরীকর হয়, যখন মানুষ আপনাতে হয় নিঃস্ব, নিজস্বতা যখন শূন্য হয়ে ওঠে, অর্জনে হীন হয়। আপনার বলে তার আর কিছুই থাকে না। সেই দারিদ্র্য অমোচনীয়। মধ্যম আয়ে উন্নীত বাংলাদেশ আজ সেই অর্থে বড়োই দরিদ্র। আমরা তা আরো লক্ষ্য করবো নরসিংদীর শিক্ষাচিত্রে। মেঘনার তীরে একটি প্রযুক্তিধর্মী জ্ঞানকেন্দ্র স্থাপনের ব্যর্থতায় সে কী নিদারুণ দরিদ্র! ঘোষিত ডিজিটাল শিক্ষার দেশে ‘গলিলিও’ শিক্ষালয়ে প্রান্তরের বিমুক্ত শিক্ষা, উদার শিক্ষা ও গন্তব্যগামী স্বাধীন শিক্ষার অভাব আজ সকলেই অনুভব করছে। অন্য ব্যাপারে ঘাটতি বাজেট বা লোন করে তা পূরণ করা যায়, কিন্তু শিক্ষার এই দারিদ্র্যমোচনের সে-দাবি পূরণ হবে কবে, আর কে-ইবা করবে তা?

আঞ্চলিক উন্নয়নএকটি শূন্যতা পূরণ অঙ্গীকার
৮ম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষিত হলে সকলেই এবার স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে যে, দেশের চলমান অগ্রগতিই যথেষ্ট নয়, মানুষ আপনার স্বাধীনতায় হয় শক্তিমান ও সবল। এই স্বাধীনতাটুকু তাঁর ক্ষেত্রগত অর্জন। আপন ক্ষেত্র থেকে তাকে তুলে নিলে অপর স্থানে সে অকৃষ্ট, অসৃজ ও নিষ্ফলা হয়। কেননা সৃজনতা বা সৃজনশীলতাই তার আদ্যশক্তি ও স্বকীয়তার পরিচয়। তার ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে তাতেই। ব্যক্তিত্বহীন মানুষ নির্বীর্য এবং অস্তিত্বশূন্য।

আজ দিনের বদল হয়েছে, বিশ্ব কাছে চলে এসেছে। কিন্তু বিশ্বায়নে মানুষের মুক্তি ঘটেনি। দারিদ্র্য-মুক্তি একটা লক্ষ্য হতে পারতো, হয়নি। তাই ‘দারিদ্র্য’র সংজ্ঞা পাল্টানো প্রয়োজন, সেই সাথে দারিদ্র্য মোচনের উপায় বা প্রক্রিয়াও। দারিদ্র্য কোথায় এবং কতোদূর, তার সীমা, তার বিচার বা পুনর্বিচার হয়নি। ‘গরিবী হটাও’ কেবল আর্থিক বা অর্থনৈতিক দারিদ্র্য মোচনে সীমিত থাকায় বিপন্ন মানুষ বিপন্নতর পরিস্থিতিতে গিয়ে পৌঁছাচ্ছে। আদিকাল থেকেই মানুষ গরীব থেকেও জীবনকে গুটিয়ে নিয়ে বেঁচে রয়েছে এবং সংগ্রাম করে আজো এগিয়ে চলেছে। (সাধারণভাবে যে-কারণে বলা হয়, মানুষ না খেয়ে মরে না, খেয়েই মরে— জ্ঞানের অভাবে।) সুতরাং সংগ্রামের হাতিয়ার অর্থ (money) নয়, আত্মশক্তি বা বাঁচতে শেখায়, যার অর্থ বাঁচার জন্যে উপযোগী শিক্ষা, তথ্য এবং জ্ঞান চাই। বিপন্ন ভাষা বা Endangered Language এবং সেই সব ভাষাভাষীর মতোই বিপন্ন জাতি বা গোষ্ঠীরাও (যেমন আমাদের দেশের প্রাচীন রবিদাস, ঋষি, চামার, মুর্দাফরাস, কামার, কুমার, গাইন, নাগারচি, সুইপার, বাইদ্যা, বারুই, বেহারা, চৌদালি, বাওয়ালি প্রভৃতি বহু ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী) আজ বিলীন বা বিলীয়মান অবস্থায় উপনীত। তাদের বলা হচ্ছে ‘হারিয়ে যাওয়া দরিদ্র গোষ্ঠী’ বা সমাজ। সব সমাজ বা গোষ্ঠীরই বেঁচে থাকার মূলে থাকে কিছু সংগ্রামী চেতনা ও জ্ঞান। যারা হারিয়ে যায়, তারা তাদের সেই টেকনোলজি ও যাপিত জীবনের প্রকরণও হারিয়ে ফেলে। জাতি শুধু অনুকরণ করেই উন্নত হয় না। তার অন্তর্গত তপস্যাও তার মূলে কাজ করে। তাকে ইতালীয় নৃ-সাংস্কৃতিক বিচারে বলে ‘সাবস্ট্র্যাটাম’-সম্পদ। (বিজ্ঞানী দীপংকর চট্টোপাধ্যায় যাকে প্রকারান্তরে বুঝিয়েছেন ‘সাবেক সংস্কৃতি’ বলেও) সেটা যেমন প্রকাশ-সত্যের বা ভাষার, তেমনি জ্ঞানার্জন-ক্ষমতার। ফার্দিনান্দ দ্য স্যসুর থেকে নোয়াম চমস্কি পর্যন্ত সকল ঐতিহাসিক ও রূপান্তরশীল তাত্ত্বিকেরাই তা প্রমাণ করেছেন। উত্তর আধুনিক জ্ঞানবাদীরাও তার থেকে বাদ যাননি।

সেই অবতলবস্তুর শক্তি ও প্রেরণাই গোষ্ঠী বা জাতির ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্য এনে দেয়। তার আইডেন্টিটিকে সবল করে। তার পারঙ্গমতার প্রকৃতিকে বুঝতে সহায়তা করে। আজ ছোট্টো সিঙ্গাপুরে যা সম্ভব হয়েছে, মালয়েশিয়ায় যা সহজ এবং স্বাভাবিকভাবে টিংকু আব্দুর রহমান থেকে তাঁর উত্তরাধিকারদের হাতে, বিশেষত মাহাথির মোহাম্মদের স্বপ্নের ঘাটে ঘটে যেতে পারলো, বাংলাদেশে আরো কয়েক যুগেও তা আমরা দেখবো কি না সন্দেহ। বিশ্বায়ন থেকে উদারবাদী বিশ্বায়নে পৃথিবীর নানা কেন্দ্রে (তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও) যেসব পরিবর্তন ঘটছে, তার প্রভাবে স্বপ্রাবল্যে আজ মধ্যপ্রাচ্য থেকে পূর্ব এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিও শিক্ষা-স্বাস্থ্য-খাদ্য-বাসস্থান-যোগাযোগসহ কোথায় না আদর্শতুল্য? কিন্তু সেই তেজ, শক্তি, বীর্য ও সৃজনশীলতা আমাদের মতো হবু (expecting) মধ্যম আয়ের দেশে কোথায়? আমাদের জাতীয়তাবাদী সংগ্রামে জাতিমূলের কোনো শক্তিই কি কাজ করেছে বা করছে? কেন নয়? আমরা তাদের আগে স্বাধীন হয়েও কেন এখনো দাসত্বই করছি, এখনো করে চলেছি উপনিবেশী লিগেসি অনুসরণ, এখনো অমানবিক ধর্মের অস্ত্রোপসনাকেই মনে করছি আমাদের শক্তি? আমাদের মধ্যে কোনো পরিবর্তনই কাজ করেনি, এ কেমন দুর্ভাগ্য আমাদের!

আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয় : প্রসঙ্গ নরসিংদী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
এবার আবার শুরুতে ফিরে যাওয়া যাক। আমরা শুরু করেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি নিয়ে। সেখান থেকে আবারো বলি, ‘আর কত খাণ্ডব পোড়াতে হবে’, আর কতোবার বলতে হবে এ-কথা, কতোবার বোঝাতে হবে যে, বস্তুসম্পদে এবং কারুজ্ঞানে আমরা একসময় পিছিয়ে ছিলাম না, কিন্তু আজ আমরা শিক্ষা-দারিদ্র্যে জগত-ভিখারি। এ-দারিদ্র্য মোচনের জন্যে পাশ্চাত্য ঋণ-বিলাসে ভুগতে চাই না। দারিদ্র্য মোচনের মূল চাবিকাঠি শুধু অর্থঋণ নয়, সে-কথা প্রমাণিত হয়ে গেছে। তাই আর পরঅনুকরণ নয়, নিজের শক্তিতে দাঁড়াতে চাই। প্রযুক্তিজ্ঞান ব্যতিত আজকের পৃথিবীতে তা সম্ভব নয়। শিক্ষার দারিদ্র্য থেকে মুক্তি চাই। নরসিংদী বড়ো দরিদ্র। তার খাদ্যের অভাব নেই, তার মৃত্তিকাশস্য, জলশস্য সবই পরিপূর্ণভাবে আছে, আছে বস্ত্রও। কিন্তু দারিদ্র্যের শেষ নেই। এককথায় আমাদের মনে পড়বে যুক্ত বাংলায় হক সাহেবের মন্ত্রীত্বের কালে দেশে খাদ্যের অভাব ছিলো না, কিন্তু জয়নুলের তুলি এবং ‘অন্নদাতা’র কৃষাণ চন্দরদের কলম বলছে, তখন রাজধানীতে দুর্ভিক্ষ ছিলো। এ এক ভয়াবহ পরিস্থিতি।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাইট আছে বাংলাদেশে। নরসিংদীতেই এর প্রথম দাবি উঠেছিলো প্রতিষ্ঠার। আজো জানি না, তা হবে কি হবে না। আমাদের দাবির ভিত্তি একটি বিশেষ শিক্ষাদর্শন। কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্থক্য থাকবে, সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও তা হবে পৃথক, এর প্রতিষ্ঠা হবে আধুনিক চিন্তা ও দারিদ্র্যমোচন-সম্ভব জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং স্থানীয় পরিবেশের মধ্যেই থাকবে তার সাধনার মৌল উপাদান। নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তার আপন উপলব্ধ ও পরীক্ষিত জ্ঞানেই ফিরিয়ে আনবে তার ঋদ্ধ অতীত ও লোকবিশ্রুত ঐতিহ্য।


. মনিরুজ্জামান
ভাষাবিজ্ঞানী, প্রাবন্ধিক
সাবেক অধ্যাপক ও ডিন, কলা অনুষদ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা একাডেমি ও একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক

প্রিয়বালা গুপ্তা : নারী জাগরণ ও সমাজ সংস্কারে ব্রতী এক মহীয়সীর জীবনপাঠ

0

প্রিয়বালা গুপ্তা একজন সমাজহিতৈষী। তিনি সমাজ সংস্কারে ব্রতী ছিলেন জীবদ্দশা জুড়ে। একটা বদ্ধ কুসংস্কারাচ্ছন্ন গ্রামে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। বিশেষত, নারীশিক্ষার প্রতি তাঁর পক্ষপাতিত্ব ছিলো মারাত্মক।

প্রিয়বালা গুপ্তা যে-সময় ও সমাজে ছিলেন, সেই সমাজে ছেলেদের শিক্ষার ব্যবস্থাও এতোটা সহজসাধ্য ছিলো না। চার-পাঁচ মাইলের মধ্যে বালকদের একেকটা স্কুল গড়ে ওঠছিলো তখন, কিন্তু মেয়েদের শিক্ষার কোনো ব্যবস্থাই ছিলো না। আবার সময় ও সমাজ ছিলো ভয়ানক প্রতিকূল। নিজে তেমন পড়াশোনা করতে পারেননি। কিন্তু দুর্নিবার তৃষ্ণা ছিলো তাঁর পড়ালেখার।

প্রিয়বালা গুপ্তা (১৮৯৯-১৯৭৩)

জন্ম বেড়ে ওঠা
প্রিয়বালা গুপ্তা জন্মেছেন ১৮৯৯ সালে, ভাগলপুরে। পৈতৃক বাড়ি পাঁচদোনায়। বাবা ইন্দুভূষণ সেন ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের ভ্রাতুষ্পুত্র। সরকারি চাকরিসূত্রে নানান জায়গায় ঘুরেছেন। শৈশবের প্রিয়বালাও পিতার কর্মস্থলগুলিতে তাঁর পড়াশোনা চালিয়েছেন। তাঁর অনুভূতির ডালপালা বিস্তৃত হয়েছিলো সেসব অঞ্চলে। ভাগলপুর, কটক, কোন্নগড়, কলকাতা, রাঁচি ইত্যাদি নানা স্থানে বাস করেছেন পিতার কর্মসূত্রে। পড়াশোনায় এতোটাই মেধাবী ছিলেন যে, স্কুল-কর্তৃপক্ষ তাঁকে সম্পূর্ণ  অবৈতনিকভাবে হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করার সুযোগ দিয়েছিলো। কিন্তু পিতা ১০ বছরের পর আর তাঁকে পড়াশোনা করানোর ইচ্ছে পোষণ করেননি। বাড়িতে বসিয়ে পাত্রস্থ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। কিন্তু প্রিয়বালার ঐকান্তিক ইচ্ছে ছিলো পড়াশোনা করে অনেকদূর যাবার। অবশেষে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাধবদীর সম্ভ্রান্ত বনেদি রায় পরিবারে বিয়ে করে বালিকাবধূ হয়ে প্রবেশ করেন প্রিয়বালা।

শ্বশুরবাড়ি মাধবদীতে
মাধবদী গ্রাম তখন অন্ধকারাচ্ছন্ন এক অজপাড়াগাঁ। বধূ হয়ে এ-গ্রামে এসেই তিনি দেখেন, এখানে পড়াশোনার কোনো বালাই নেই। তবে স্বামী যতীন্দ্রমোহন গুপ্ত ঢাকা কলেজ পড়ুয়া শিক্ষিত ভদ্রলোক ছিলেন। তাঁর শ্বশুর তারিণী গুপ্ত রায় ও বড়ো শ্বশুর কাশীকান্ত গুপ্ত রায় মাধবদী গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। এই গ্রামের গোড়াপত্তন করেছিলো এই পরিবারটি। আঠারো শতকের মাঝামাঝি যশোর থেকে নানা জায়গায় বসতি স্থাপন করে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত রায় এইখানে এসে তিনঘর জ্ঞাতি সঙ্গে নিয়ে ব্রহ্মপুত্র খালের পশ্চিম পাড়ে বসতি স্থাপন করেন। এককালে জায়গাটা যে নদীগর্ভ থেকে চর হিসেবে জেগে ওঠেছিলো, তার প্রমাণ হিসেবে বাড়ির ভিত কাটার সময় কিছু ভাঙা নৌকার খোল, বৈঠা, মাস্তুলের পচা অংশ, ভাঙা ঝিনুক ইত্যাদি নাকি উঠে এসেছিলো জল-কাদার সঙ্গে।

প্রিয়বালা গুপ্তা যখন এ-বাড়িতে বউ হয়ে আসেন, তখন রায়বাড়িটি পড়তির দিকে। একসময় বিশাল জমিদারি ছিলো। তাদের তিন জ্ঞাতির এক জ্ঞাতি প্রচুর মুন্সিয়ানা, টাকা-পয়সা কামিয়ে জমিদারি স্থাপন করেছে। বাড়িটাও মুন্সি বাড়ি এবং পরে জমিদার বাড়ি বা বাবুর বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলো।

মূলত মাধবদী ছোটো একটা গ্রাম ছিলো। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদেরই প্রাধান্য ছিলো। আশেপাশের গ্রামগুলো ছিলো বিরামপুর, নওপাড়া, কাশীপুর, কোতোয়ালির চর ইত্যাদি। এবং গ্রামগুলো মুসলমান অধ্যুষিত ছিলো। মাধবদীসহ আশেপাশের সব অঞ্চলই একটা কুসংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধকারে ঢেকে ছিলো।

কাব্যচর্চা, মনের জানালায় দূর দেখা
রায়বাড়িতে তাঁর মনের কথা বলার বা শোনার কেউ নেই। বিশাল একান্নবর্তী পরিবারে কাজ করার লোকের অভাব নেই। একা একা সংবেদনশীল এই নারী মাঝে মাঝে ভাবতেন, হয়তো তিনি পাগল হয়ে যাবেন। তবে তিনি শেষপর্যন্ত পাগল হয়ে যাননি। বাঁচার জন্যে, আত্মরক্ষার প্রয়োজনে তিনি নিজের মনের গভীরে সৃষ্টি করলেন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র এক জগত— তাঁর কাব্যচর্চা, লেখাপড়া, ভাবনা-চিন্তার জগত। সেখানে বাইরের কারো প্রবেশাধিকার নেই। অবশ্য কাব্যচর্চার অভ্যাস তাঁর বিয়ের আগেও ছিলো। সাত-আট বছর বয়সে বাবার উৎসাহে অক্ষর মিলিয়ে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন। ‘ভ্রাতৃদ্বিতীয়া’ নামে তাঁর একটা কবিতা সে-কালের ‘মহিলা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো। কবি দেবেন্দ্রনাথ সেন খুশি হয়ে একটা প্রশংসাপত্র পাঠিয়েছিলেন। মাঝে অনেকদিন বন্ধ ছিলো। এখন আবার তাঁর চর্চা শুরু হলো। সারাদিন ও রাত নয়টা পর্যন্ত সংসারের কাজ করতেন, তারপর নিজের ঘরে এসে ঢুকে যেতেন নিজের জগতে। কামিনী রায়, গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী, মানকুমারী বসুর কিছু কবিতার বই তাঁর নিজের কাছে ছিলো। বারবার সেগুলো পড়তে লাগলেন। এই কবিতা পড়া ও লেখা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হলো এখন। অভ্যাস এবং আনন্দের উৎস— দুটোই। না পাওয়ার যন্ত্রণাকে ভুলে থাকার, নিজের আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকার এর চেয়ে বড়ো উপায় আর নেই।

রবিবারের আসর মেয়েদের স্কুল প্রতিষ্ঠার বীজ
গ্রামের অশিক্ষিত কূলবধূরা আসতো তাঁর কাছে। স্বামী বিদেশে চাকুরি করে, তাদের কাছে চিঠি পাঠায়, কিন্তু তারা চিঠি পড়তে ও লিখতে পারতো না। প্রিয়বালা তা তাদের পড়ে শোনাতেন। কিন্তু অন্যের চিঠি পড়তে তাঁর বিব্রতবোধ হতো। প্রিয়বালা এসব অশিক্ষিত মেয়েদের পড়াশোনার কথা বলতেন। কিন্তু তাদের পড়াশোনার সুযোগ কই! প্রায়ই গ্রামের নানা বয়সী মহিলারা আসতো, অনেক কিছু জানতে চাইতো। প্রিয়বালা ঠিক করলেন, তাদের সবাইকে নিয়ে বসবেন। কথা বলবেন। সুখ-দুঃখের গল্প শুনবেন তাদের। ঠিক হলো, প্রতি রবিবার তারা বসবেন দুপুরবেলা, ঘরকন্নার কাজ সমাপ্ত করে।

গ্রামের বউ-শাশুড়িদের বাড়িতে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করতেন, “দিনরাত সংসারের কাজ করতে করতে, ভাবতে ভাবতে একঘেয়েমি এসে যায় না? তার চেয়ে বরং মাঝে মাঝে সবাই মিলে বসে একটু হাসি-ঠাট্টা, গল্পগুজব করলে মন্দ কি? দেশের ও দশের কত কথা আমাদের অজানা, কত বইতে ছড়িয়ে আছে কত সুন্দর সুন্দর গল্প আর কাহিনি। জানতে ইচ্ছা করে না আপনাদের?”

তারপর প্রতি রবিবার দুপুরের খাওয়া সেরে মেয়েদের বৈঠক বসতো। গল্পচ্ছলে প্রিয়বালা নিজেদের থানার কথা, জেলার কথা, বাংলা ও ভারতবর্ষের কথা বলতেন, ছেলেদের ভূ-চিত্রাবলির বই এনে দেখাতেন, কোনটা আমাদের দেশ, কোথায় নিজেদের জেলা ও থানার অবস্থান। কোনোদিন বিজ্ঞান প্রসঙ্গে বলতেন পৃথিবীর জন্মের কথা, মানুষ সৃষ্টির রহস্য। মহিলারা মন্ত্রমুগ্ধ। একটা আশ্চর্য আলোকোজ্জ্বল অজ্ঞাত জগতের জানালা যেন ঈষৎ ফাঁক হচ্ছিলো তাদের চোখের সামনে। রবিবারের আসর জমে গেলো। এভাবে শিখতে আর শেখানোর ইচ্ছায় মেয়েদের পড়াশোনার একটা গোপন ইচ্ছে পুষতে লাগলেন। মেয়েদের বিদ্যালয় করার মনোবাসনা জাগ্রত হচ্ছিলো তাঁর।

স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায়
এর মধ্যে পঞ্চাশের মন্বন্তর এসে গেলো। সারা বাংলায় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলো। মাধবদী গ্রামেও এর ভয়াবহ থাবা বিস্তার লাভ করলো। চারদিকে লঙ্গরখানা খোলা হলো। লঙ্গরখানাগুলোতে গ্রামের লোক ঝাঁপিয়ে পড়লো।

‘মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি’ নামে একটা সংগঠন সক্রিয় ছিলো এ-সময়। এই সমিতির নরসিংদী থানার সম্পাদক হিরণবালা রায়। মাধবদী গ্রামের দুই মাইল উত্তরে আটপাইকা গ্রাম। আটপাইকার অনুশীলন পার্টির কর্মী সতীন্দ্র রায়, মনীন্দ্র রায়। বিশাল জায়গা-জমি নিয়ে তালুকদারি তাদের। কিন্তু এই দুই ভাই মানুষের জন্যে রাজনীতি করেন। কৃষক আন্দোলন করেন। পরে তাঁরা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হয়েছিলেন। তাঁদের বিধবা বোন হিরণবালা দেবী মহিলা সংগঠকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে এই দুর্ভিক্ষের দিনে রিলিফ বিতরণের কাজ শুরু করলেন। তিনি এসে ধরেন প্রিয়বালা গুপ্তাকে। প্রিয়বালার পরিচয় তিনি আগেই পেয়েছিলেন। মাধবদীতে তাঁরা দুধ বিতরণের কাজ শুরু করেন। আর এই দুধ বিতরণের সেন্টার খোলার আহ্বান জানালেন প্রিয়বালাকে, তাঁর বাড়িতে। কিছুটা সংকোচ থাকলেও প্রথমে, পরে একজন নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবী হয়ে গ্রামে ছোটো ছোটো বাচ্চাদের দুধ বিতরণ শুরু করলেন তিনি। গরীব মায়েদের ভিড়ে উঠোন ভরে যেতো। কাজটা ভালো লেগেছিলো প্রিয়বালার। এই প্রথম বাইরের সঙ্গে জনসংযোগ, সমাজসেবা। পরে স্কুল করার সময় এই সংযোগ কাজে লেগেছিলো। শুধু দুগ্ধ বিতরণ নয়, পরে এই সমিতির পক্ষ থেকে প্রিয়বালা নিয়মিত কম্বলও বিতরণ করতেন।

স্বপ্ন সফল, মাধবদী শিশু সদন বিদ্যানিকেতনের যাত্রা
১৯৪৪ সাল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা চারদিকে। যুদ্ধ,  মন্বন্তর এবং পূর্ব ও পরবর্তী ঘটনাবলি দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা সঞ্চারে যথেষ্ট সহায়তা করেছিলো। এদিকে প্রিয়বালা গুপ্তা চিন্তিত তাঁর সন্তানদের নিয়ে। তাঁর আট সন্তানের মধ্যে ছেলেরা ইতোমধ্যে পড়াশোনার ভেতর দিয়েই যাচ্ছে। ছোটো দুই মেয়েকে নিয়ে পড়লেন পড়াশোনা-সংক্রান্ত দুশ্চিন্তায়। মেয়েদের কোনো পড়াশোনার স্কুল নেই। এমন সময় অভাবনীয় সুযোগ এসে গেলো। পাশের গ্রাম কাশীপুর থেকে এক ব্যবসায়ী পরিবারের গৃহিণী বাড়িতে বেড়াতে এলেন। এ-কথা সে-কথার পর বললেন, প্রিয়বালা যদি বাড়িতে একটা স্কুল খোলেন, তাহলে তিনি তার মেয়েকে এখানে দেবেন। নিজে নিরক্ষর, তার বড়ো ইচ্ছে, ছোটো মেয়ে শৈল কিছু লেখাপড়া শিখুক। সময় পাল্টেছে, বিয়ে দেয়ার আগে মেয়েদের কিছুটা লেখাপড়া জানা থাকা দরকার। প্রিয়বালার কাছে এটি ছিলো তাঁর দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন পূরণের এক অযাচিত সুযোগ। তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন।

তিনি উঠে-পড়ে লেগে গেলেন স্কুল প্রতিষ্ঠার কাজে। স্কুলের জন্যে ছাত্রী চাই। সুতরাং গ্রামের মহিলাদের বাড়িতে ডেকে শৈল’র মায়ের প্রস্তাব ও নিজের সমস্ত পরিকল্পনার কথা খুলে বললেন। এখানে বলে রাখা ভালো, মাধবদী এবং আশেপাশের অঞ্চলে নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা, আলোড়ন-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সমাজের একাংশের ভেতর কিছুটা অন্তত চেতনার সঞ্চার হয়েছিলো। শিক্ষার, বিশেষত, স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা তারা ভাবতে শুরু করেছিলো। তাছাড়া প্রিয়বালার সৎ প্রয়াসের কথা জানতো তারা। ফলে সবাই মোটামুটি রাজি হয়ে গেলো। স্কুলে মেয়ে পাঠাবে তারা।

এবার প্রথমেই চাই ঘর। বলা মাত্রই রায়পরিবারের কর্তা স্বামী যতীন্দ্রমোহন রায় তাঁর বৈঠকখানা ছেড়ে দিলেন। মাধবদী হাই স্কুলের হেডমাস্টার শচীনন্দন সাহা তিনটি মেরামতযোগ্য বেঞ্চ দিলেন। এইভাবে মাত্র দুটি মেয়ে— নিজের কন্যা আরতি ও কাশীপুরের শৈল সাহাকে নিয়ে শুরু হলো মাধবদী অঞ্চলে মেয়েদের পড়াশোনার দ্বার উন্মুক্ত করা প্রতিষ্ঠান ‘মাধবদী শিশু সদন বিদ্যানিকেতন’।

দুই-চারদিনের মধ্যে ভর্তি হলো কাশীপুরের স্বদেশী মালাকার এবং মাধবদীর সতী পাকড়াশী ও ননী পাকড়াশী। সময়টা সম্ভবত ১৯৪৪ সালের মার্চ কি এপ্রিল। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত খোলার প্রস্তাব থাকলেও যাত্রা শুরু হলো শিশু শ্রেণি ও প্রথম শ্রেণি দিয়ে, ওই পাঁচ মেয়েকে নিয়ে। পরের বছর থেকে ছাত্রীসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একটি করে নতুন শ্রেণির সংযোজন হতো। এইভাবে একে একে প্রস্তাবিত চারটি শ্রেণিই খুলে যায়। স্কুলটা তৈরি হয়েছিলো কেবল মেয়েদের জন্যে। কিন্তু দ্বিতীয় বছর থেকে অভিভাবকেরা মেয়ের সঙ্গে তাদের ছেলেটিকেও এনে ভর্তি করতে চায়। এটি মেয়েদের স্কুল, ছেলেরা যাক তাদের পাঠশালায়। তা যতোই বলুন, যতোই বোঝান, ওরা কিছুতেই কানে তুলতে চায় না। তারা শুনেছেন, এখানে খুব ভালো পড়াশোনা হয়। শেষকালে বাচ্চা ছেলেটাই জুড়ে দেয় তারস্বরে কান্না। বাধ্য হয়ে তাই ছেলেদেরও প্রবেশাধিকার দিতে হয়। কিন্তু ছেলেরা পড়তে পারতো চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত। পাশ করে তারা পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি হতো মাধবদী স্কুলে। অবশ্যই ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে। চতুর্থ শ্রেণির প্রথম বার্ষিক পরীক্ষার আগেই কান্নাকাটি শুরু হয় মেয়েদের, “এবার আমরা কোথায় যাব দিদিমণি। আমাদের পড়া যে বন্ধ হবে।” লেখাপড়ার মজা তারা পেয়েছে, সহজে তা ছাড়তে চায় না। শেষে মেয়েদের মায়েরাও এসে পীড়াপীড়ি করতে থাকে। এইভাবে স্কুলে চালু হয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। পাঁচটি মেয়ে নিয়ে শুরু হয়েছিলো, সংখ্যাটি দেড়শো ছাড়িয়ে যায়। স্কুলঘর ভর্তি হয়ে বারান্দা ভরে, তারপর ছেলেমেয়ের ঢল নেমে উঠোনে আসে। বসার জায়গা নেই, ছোটো ছোটো বাচ্চাদের কেউ হোগলা চাটাইয়ের একটি ছেঁড়া খণ্ড নিয়ে আসে, কেউ-বা এক টুকরো চট এনে তাতেই বসে পড়ে। ছেলেমেয়েদের আগ্রহ ও উপচে-পড়া আনন্দ দেখে প্রিয়বালার চোখে জল এসে যেতো। বলতেন, “আমি এদের মনের কথা খুব বুঝতে পারি। কোনদিন পড়াশোনার সুযোগ পায়নি ত! সামান্য একটু পেয়েছে, তাতেই দ্যাখ, বন্যার মত সব ছুটে এসেছে এখানে।”

মাধবদী ছাড়া ছাত্রীরা প্রধানত এসেছিলো আটপাইকা, কোতোয়ালির চর, কাশীপুর, আলগী, নওপাড়া, বিরামপুর, ভগীরথপুর, শেখেরচর ও আনন্দী থেকে। স্কুল থেকে এসব গ্রামের দূরত্ব এক থেকে দেড় মাইলের মধ্যে। উত্তর ও দক্ষিণের গ্রামগুলোর সঙ্গে মাধবদীর সড়কপথে যোগাযোগ ছিলো না। অধিকাংশেরই আলপথ একমাত্র ভরসা, বর্ষায় যেখানে হাঁটু পরিমাণ জল-কাদা। উচ্চ-মধ্যবর্গের হিন্দু ছাত্রীরা ছিলো বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ। বৈশ্য সাহারা আর্থিক দিক থেকে উন্নত হলেও শিক্ষাক্ষেত্রে ছিলো পশ্চাদপদ। এদের একটি অংশের মধ্যে মায়েদের বিশেষ উৎসাহে তাদের মেয়েরা স্কুলে ভর্তি হয়। প্রথম ‘পঞ্চকন্যা’র মধ্যে একজন ছিলো বৈশ্যকন্যা, অপরজন ছিলো পিছিয়ে থাকা মালাকার পরিবারের। অচ্ছুৎ ও হতদরিদ্র ঋষিদের কথা দূরে থাকুক, কোনো কৈবর্ত মেয়ে স্কুলে আসেনি। পাকিস্তান জন্মের আগে-পরে মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক চাঞ্চল্য ও চেতনা বিশেষভাবে আত্মপ্রকাশ করে। মুসলিম লীগের প্রভাবে সাম্প্রদায়িকতা এর মূল সুর হলেও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, সীমাবদ্ধভাবে যদিও, ঘুমভাঙা নবজাগরণের কিছু লক্ষণ দেখা গিয়েছিলো তাদের মধ্যে। মাধবদী একটি নির্ভেজাল হিন্দু গ্রাম, কিন্তু সংলগ্ন গ্রামগুলোতে মুসলমানদেরই সংখ্যাধিক্য। অথচ স্কুলের স্বর্ণযুগে পড়ুয়াদের তালিকায় তাদের সংখ্যা ছিলো মাত্র ১০ (১৫০ জনের ভেতর); ৬ টি ছেলে, ৪ টি মেয়ে। তারা এসেছিলো মুসলিম সমাজের দুই বিপরীত মেরু থেকে। মেয়েদের শিক্ষা সম্পর্কে এদের অভিভাবকদের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো বিস্ময়করভাবে ভিন্ন। পুরোপুরি মুসলিম গ্রাম কলুপাড়া থেকে একদিন সুলতান মিঞা তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে এলো স্কুলে ভর্তি করানোর জন্যে। মেয়েটির বয়স ১০, ছেলেটির ৬। প্রিয়বালা মেয়েটিকে শিশু শ্রেণিতে সঙ্গে সঙ্গে ভর্তি করে নেন, আর ছেলেটি সম্পর্কে বলেন, এখানে হবে না। কারণ এটি মেয়েদের স্কুল। অন্যদিকে খালেদা আখতার খানম এসেছিলো মিশ্র-গ্রাম নওপাড়ার ভূঁইয়াবাড়ি নামে খ্যাত এক অবস্থাপন্ন আশরাফ পরিবার থেকে। বাবা ডাক্তার, কাকা বা জ্যাঠা ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট, প্রচুর জায়গা-জমি, ছেলেরা মাধবদী হাই স্কুলে উঁচু ক্লাশের ছাত্র, নবযুগের আলোয় কিছুটা আলোকিত। একদিন খালেদার এক দাদা বোনকে সঙ্গে করে এনে স্কুলে ভর্তি করে দিয়ে যায়। মেয়েটির বয়স প্রায় দশ। সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সূর্যের আলো দেখার অধিকার থেকে অনেক আগেই বঞ্চিত হবার কথা। শোনা যায়, বাবা এবং বাড়ির বয়স্ক পুরুষদের প্রবল আপত্তি ছিলো খালেদার স্কুলে ভর্তি হবার ব্যাপারে। একমাত্র মা ও দাদাদের আগ্রহে সে স্কুলে আসতে পেরেছে। আসা বেশ অসুবিধাজনক, সত্যি। প্রায় এক-দেড় মাইল দূরত্ব, ধান-পাট-আখ ক্ষেতের আলপথ পেরিয়ে আসতে হয় বাবুরহাটের ভেতর দিয়ে। বাড়ির বড়োদের আপত্তি, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশিদের নিন্দার রসনাকে অগ্রাহ্য করে খালেদা সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত এখানে পড়েছিলো। বাবা ছেলেদের কলেজে পড়াশোনার জন্যে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে দেন। খালেদাও সেখানে চলে যায়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এমএ পাশ করে ঢাকা ইডেন গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি।

রেডিওতে গীতিনাট্য রচনা সাহিত্যভারতী উপাধি লাভ
১৯৪৭ সালে বিশ্বভারতী লোকশিক্ষা সংসদের একটি কেন্দ্র স্থাপিত হয় মাধবদী গ্রামে। স্কুল-কলেজের কোনো ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা না থাকা প্রিয়বালাকে পীড়া দিতো। তাই পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে সেই কেন্দ্রের অধীনে যথাক্রমে আদ্য, মধ্য ও অন্ত পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি ‘সাহিত্যভারতী’ উপাধি পান। তার আগে ১৯৪২ সালে সাধন তপাদারের উদ্যোগে ও অনুপ্রেরণায় প্রিয়বালা ঢাকা রেডিওতে ‘শকুন্তলা’ নামে একটি গীতিনাট্য পাঠান। গীতিনাট্যটি যথারীতি গৃহীত ও সম্প্রচারিত হয়। তার পরের বছর সম্প্রচারিত হয় ‘শবরীর প্রতীক্ষা’ ও ‘উর্মিলা’ নামে আরো দুটি গীতিনাট্য।

শিশু প্রসূতি পরিচর্যা এবং ধাত্রীবিদ্যায় পারদর্শিতা
আজকে এই আধুনিক চিকিৎসাযুগে এসে এটা কল্পনা করা খুবই কঠিন যে, তখনকার শিশু জন্ম দেয়া, বাচ্চা ও মায়ের পরিচর্যা কতোটা ভয়াবহ কঠিন ছিলো! আঁতুড়ঘর মানেই নোংরা কিছু। আর প্রসূতি হলো মূর্তিময়ী অশুচি। একটা নতুন প্রাণকে পৃথিবীর আলো দেখাতে গিয়ে প্রাণ এবং প্রাণদাত্রী উভয়ের যেখানে জীবনের আশঙ্কা, সেখানে গোটা প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকতো অক্ষর-পরিচয়হীন, অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন পোশাক ও আচার-আচরণের কোনো স্ত্রীলোক, যার স্বাস্থ্যবিধি ও চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কে কোনো ধারণাই নেই। যুগ-যুগান্তের এটাই রীতি, এটাই বদ্ধমূল সংস্কার। এই রীতি মানতে গিয়ে কতো নবজাতক ও মায়ের প্রাণ যে বিপন্ন হয়েছে, তার ইয়ত্তা নাই।

প্রিয়বালা গুপ্তা নিজের জীবন দিয়ে এগুলো উপলব্ধি করেছিলেন। তাই সম্ভ্রান্ত পরিবারের গৃহিণী হয়েও তখনকার সমাজের অভিজাতদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আত্মনিয়োগ করেছিলেন প্রসূতি পরিচর্যায়। আর তাই ধাত্রীবিদ্যায় পড়াশোনা করে নিয়মিত জাতপাতহীন মনোভাব নিয়ে সমাজের এই মহৎ কাজে শামিল হয়েছিলেন। তারপর সমাজ খুব ধীরে ধীরে অনুধাবন করতে শিখেছে এই অশুচির মর্যাদা ও প্রিয়বালাকে।

সঙ্গীত রচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সাহিত্য পত্রিকা
প্রিয়বালা গুপ্তা তখনকার মাধবদীর বদ্ধ অন্ধ সমাজে শুধু স্কুল খুলেই ক্ষান্ত হননি। ছাত্রীদের মনোগঠন নির্মাণ করতে, মনের অফুরান আবেগকে প্রকাশের ও বিকাশের ব্যবস্থাও করেছিলেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। আজো এটা ভাবা কঠিন যে, মাধবদীতে তখন রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকী পালিত হতো। ২৫শে বৈশাখ ঘটা করে পালিত হতো প্রিয়বালার বাড়িতে ও স্কুলে। নিয়মিত নাচ-গানের আসর বসতো। কবিতা আবৃত্তি ও মূকাভিনয় হতো। শুধু তাই নয়, ‘কিশলয়’ নামে হাতে লেখা একটা সাহিত্য পত্রিকাও বের হতো। তিন বছরে তিনটি সংখ্যা বেরিয়েছিলো সেই পত্রিকার। পত্রিকায় লিখতেন সতীশ পাকড়াশী, হিরণবালা রায়, প্রিয়বালা গুপ্তা, অজিত গুপ্ত রায়, সাধন তপাদার প্রমুখ। স্বাধীনতা আন্দোলন, স্ত্রীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, বাচ্চাদের উপযোগী ছড়া, শিকার কাহিনি ইত্যাদি নিয়ে লেখা হতো সেই কাগজে।

প্রিয়বালা গুপ্তার আরো একটি গুপ্ত প্রতিভা ছিলো। তিনি গান লিখতেন। এই অঞ্চলের যারা সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন, তারা তাঁর কাছে আসতেন গান লিখে দেয়ার জন্যে। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা বিয়ে-শাদি হলেই গান লিখে দেয়ার জন্যে তাঁর ডাক পড়তো।

স্বদেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ
মাধবদী গ্রামের বিখ্যাত সর্বভারতীয় বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশীর সঙ্গে তিনি নিয়মিত পত্র বিনিময় করতেন প্রিয়বালা গুপ্তা। সমাজের নানামুখী সংস্কারে প্রিয়বালা তাঁর পরামর্শ চাইতেন। একবার সতীশ পাকড়াশী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে মাধবদী এসেছিলেন। তখন দেখা হলে প্রিয়বালা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “আপনি আমাকে পথ দেখিয়ে দিন, কীভাবে কাজ করলে আমি সাফল্য অর্জন করতে পারব।” জবাবে সতীশ তিক্তভাবে উত্তর দিয়েছিলেন, “এ-গ্রাম যেদিন আগুনে পুড়ে ভস্ম হয়ে যাবে এবং সে ছাই যাঁর দ্বারা নিশ্চিহ্ন হয়ে নতুন গ্রামের গোড়াপত্তন হবে, তাঁর হাতেই হবে এ-গ্রামের নবজীবনের প্রাণপ্রতিষ্ঠা।”

সতীশ পাকড়াশীর রাজনৈতিক অনুসারী ছিলেন আটপাইকার সতীন্দ্র রায়, মনীন্দ্র রায়, হিরণবালা রায়— তাদের সাথে নানা কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন প্রিয়বালা গুপ্তাও।

স্বাধীনতা, দেশভাগ আর ছিন্নমূল জীবনের পথে
১৯৪৭, ১৫ আগস্ট। ধর্মের ভিত্তিতে দুটি দেশের জন্মলাভের মধ্য দিয়ে যে-স্বাধীনতা পাওয়া হলো, তাতে জীবন হয়ে পড়লো প্রত্যেক মানুষের জন্যে অনিশ্চিত। বাড়লো অনিরাপত্তা। ধর্মীয় জোশে মানুষ প্রতিবেশির রক্ত আর মাংস খাওয়া শুরু করলো। প্রিয়বালা গুপ্তার মতো মহীয়সী সমাজ সংস্কারক হয়ে গেলো এক নিমিষেই শত্রু।

দেশভাগ হবার পরপরই মাধবদী অঞ্চলে মৃদুভাবে দেশত্যাগ শুরু হয়ে গেলো। পরে জোরালোভাবে। চলে গেলো নিজের দেশ, সম্পত্তি, সাজানো বাগান ছেড়ে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত এক অন্ধকারে।

প্রিয়বালা গুপ্তা কখনো যেতে চাননি এই মাটি ছেড়ে কোথাও। যানওনি। পড়াশোনার জন্যে পুত্র-কন্যাদের তিনি ওপারে পাঠিয়ে নিজে স্বামী ও এক পুত্রকে নিয়ে এখানেই থাকেন। ১৯৫৪ সালে স্বামী মারা গেলেন। প্রিয়বালা গুপ্তা মাধবদীর মানুষের ভালোবাসায় ধন্য হয়ে জীবনের অনেক গ্লানি বহন করে মাধবদী বালিকা বিদ্যালয়ের দিদিমণি হয়ে রয়ে গেলেন। কিন্তু ওপারে ছেলেমেয়েদের দেখতে ক’দিনের জন্যে বেড়াতে গিয়ে আর ফিরে আসা হলো না তাঁর প্রিয় স্কুল আর মাধবদী গ্রামে। স্কুলের ছাত্রীরা বারবার চিঠি লিখে অনুরোধ জানাতো ফিরে আসার জন্যে। কিন্তু পাসপোর্ট জটিলতা আর পুত্র-কন্যাদের বহুমুখী জটিল সমস্যার সমাধান করতে আর ফেরা হলো না। পশ্চিমবঙ্গের সিঁউরিতে পুত্রের বাসস্থানে থেকে গেলেন। সেখানেই হাঁপানি আর শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হয়ে সমাজ সংস্কারক ও মহীয়সী প্রিয়বালা গুপ্তা ১৯৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

মৃত্যুর পূর্বে ১৯৬৩ সাল থেকে তিনি তাঁর আত্মজীবনী লিখতে শুরু করলেন। ‘স্মৃতিমঞ্জুষা’ নামের এই আত্মজৈবনিক গ্রন্থ কেবল তাঁর জীবনীই ছিলো না, মাধবদী ও তার আশেপাশের মানুষ-সমাজ-পরিবেশ ইত্যাদি বহুমুখী বিষয়ে ইতিহাসের আঁকর হয়ে রইলো এই গ্রন্থ। এই গ্রন্থ প্রিয়বালার মৃত্যুর অনেক পরে তাঁর পুত্র রঞ্জন গুপ্ত’র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়।

সহায়তা
১. স্মৃতিমঞ্জুষা, প্রিয়বালা গুপ্তা;
২. আলোর অভিমুখে : প্রিয়বালা গুপ্তার জীবন ও সময়, রঞ্জন গুপ্ত।

নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী ‘হিমকবরী কেশ তৈল’

0

নানা কারণে নরসিংদীর যশ-খ্যাতি-সুনাম দেশব্যাপী ব্যাপ্ত। প্রাচীনকাল থেকে মসলিন, মিহি সুতি কাপড়, জামদানি, শাড়ি-লুঙ্গি, চাদর-গামছা প্রভৃতি বস্ত্র উৎপাদন ও বিপণন ক্ষেত্র হিসেবে নরসিংদী অঞ্চল খ্যাতির শীর্ষে ছিলো। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে শুরু করে মৌর্য, গুপ্ত, সেন, পাল, সুলতানী ও মুঘল আমলে প্রাচীন নৌ-বন্দর উয়ারী-বটেশ্বর, বেলাব, মরজাল, পারুলিয়া, আনন্দী ও নরসিংদী বাজার ছিলো পণ্যদ্রব্য বেচাকেনা আর ক্রেতা-বিক্রেতা-ব্যবসায়ী-বণিকদের আনাগোনায় মুখরিত। ব্রিটিশ আমলের শেষদিকে উক্ত অঞ্চল ছিলো হস্তচালিত তাঁত, কুমারদের মাটির তৈজসপত্র, কৃষিপণ্যের মধ্যে নানা তরকারি, ফলমূলের মধ্যে, বিশেষ করে, অমৃতসাগর কলার একচ্ছত্র উৎপাদনস্থল। এর মধ্যে আয়ুর্বেদ পণ্য হিসেবে ‘হিমকবরী কেশ তৈল’ নরসিংদীর ঐতিহ্যবাহী পণ্যের পরিধি বৃদ্ধি করেছে। ব্রিটিশ আমলের শেষদিক থেকে শুরু করে আজ অবধি সারা বাংলাদেশ, ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে সমান জনপ্রিয় এই তৈল। মাথা ঠাণ্ডা রাখা, চুল কালো করা, খুশকি মুক্ত রাখা এবং বায়ুরোগের মহৌষধ হিসেবে ‘হিমকবরী’ বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

জানা যায়, হিমকবরী তৈলের প্রতিষ্ঠাতা হলেন মধুসূদন সাহা। তিনি সর্বত্র এম. সাহা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। একজন খ্যাতিমান আয়ুর্বেদশাস্ত্রী কবিরাজ হিসেবে সফল ফর্মুলায় তৈলটি তৈরি করে বাজারজাত করার সাথে সাথে জনপ্রিয়তা লাভ করে। এতে তাঁর সুখ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। কালী কুমার হাই স্কুল থেকে এম. সাহা ১৯৩৭ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করে কলকাতা আয়ুর্বেদ কলেজে ভর্তি হন। অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে কবিরাজী পরীক্ষায় পাশ করে তিনি জন্মভূমি নরসিংদীতে চলে আসেন। তখন ঢাকা শহর ছিলো পূর্ববঙ্গবাসীর ভাগ্য বদলের একমাত্র অবলম্বন। সঙ্গত কারণে সবার প্রত্যাশা ছিলো, এম. সাহা ঢাকা শহরেই আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন। কিন্তু তিনি সেই প্রত্যাশা পায়ে ঠেলে নরসিংদীতে চলে আসেন এবং প্রতিষ্ঠা করেন আয়ুর্বেদ রিসার্চ সোসাইটি নামে একটি প্রতিষ্ঠান। তবে এম. সাহা তাঁর আয়ুর্বেদ ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন চর্মের ছত্রাকনাশক ক্রিম ‘পদ্ম মলম’ দিয়ে। উক্ত মলমটি এতোই কার্যকর ছিলো যে, তা দ্বিতীয়বার ব্যবহারের প্রয়োজন হতো না। খোসপাঁচড়া, দাউদ-একজিমা, ছুলি-ঘা যেকোনো রোগের অব্যর্থ ঔষধ ছিলো পদ্ম মলম।

এম. সাহার প্রতিভা ছিলো ব্যতিক্রমধর্মী। পদ্ম মলমের পাশাপাশি তিনি লেমন জাতীয় একটি কোল্ড ড্রিংকসের ফর্মুলা তৈরি করেন এবং তা উৎপাদন করে বাজারজাতও করেন। তৎসময়ে নরসিংদীর মতো একটি থানা সদরে এ-ধরনের আধুনিক পানীয়  উৎপাদন ও বাজারজাত করা ছিলো অকল্পনীয় ব্যাপার। এজন্যে তিনি কলকাতা থেকে যন্ত্রপাতি আমদানি করে নরসিংদীতে কারখানা নির্মাণ করেছিলেন। কোল্ড ড্রিংকসের কাঁচামাল, কেমিক্যাল প্রভৃতি কলকাতা থেকে আনা হতো। পদ্ম মলমের মতো কোল্ড ড্রিংকসটিও জনপ্রিয়তা পায়। গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে এম. সাহার কোল্ড ড্রিংকস ছিলো স্বপ্নের পানীয়। এরপর উৎপাদন শুরু করেন ‘কান্তা কেশ তৈল’ আর ‘হিমকবরী কেশ তৈল’। এম. সাহার নিজস্ব ফর্মুলা আর অভিজ্ঞতার মাধ্যমে প্রতিটি পণ্যই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যায়।

এম. সাহার পিতার নাম ছিলো শশীমোহন সাহা। তিনি ছিলেন উক্ত আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী। তাঁর অপর ভাই ছিলেন মিহির লাল সাহা, চুনি লাল সাহা ও যদু লাল সাহা। তারা সবাই কারখানা ও ব্যবসা পরিচালনা করতেন যৌথ উদ্যোগে। বর্তমানে নরসিংদীর সদর রোডস্থ প্রধান ডাকঘরের পাশে ‘হিমকবরী হাউস’ই হলো তাদের আদি বাড়ি, কারখানা ও বিক্রয় কেন্দ্র। তাদের আরেকটি বাড়ি ছিলো ডাক্তার হেমেন্দ্র সাহার মোড়স্থ মসজিদের সম্মুখে। অভিরাম মণ্ডল বাড়িটি এম. সাহার কাছ থেকে কিনে নিয়েছিলেন।

জানা যায়, ভ্রাতৃ কলহের কারণে পাক আমলে তাদের আয়ুর্বেদ ব্যবসাটি দু’ভাগ হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠাতা এম. সাহা পদ্ম মলম, কান্তা কেশ তৈল ও লেমন কোল্ড ড্রিংকস নিজের কাছে রেখে শুধুমাত্র হিমকবরী কেশ তৈলটি তিন ভাইকে ভাগ করে দেন। কিন্তু শেষাবধি শুধুমাত্র হিমকবরী তৈলের খ্যাতিই বজায় থাকে।

এম. সাহা একজন ব্যতিক্রমধর্মী প্রতিভাবান লোক হলেও তাঁর চিন্তাধারা ছিলো একটু অস্থির ধরনের। কোনো-একটা চিন্তাধারায় তিনি বেশি সময় নিবদ্ধ থাকতে পারেননি। তাছাড়া তিনি আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে সফল হলেও মার্কেটিং সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। ফলে তাঁর উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের ব্যর্থতার কারণে ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। অপরদিকে হিমকবরী তৈলের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বিতে গিয়ে পৌঁছে। অপর তিন ভাইয়ের একটি গুণ ছিলো, তারা হিমকবরীর বদৌলতে প্রচুর অর্থ-যশ অর্জন করলেও আর দ্বিতীয় কোনো পণ্য উৎপাদনের কথা ভাবেননি। এর মধ্যে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন এম. সাহা পরিবারটি ভারতে চলে যান। যুদ্ধ শেষে অন্যরা ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাস করার পরিকল্পনা করলেও যদু লাল সাহা নরসিংদীতে ফিরে আসেন। প্রোপ্রাইটর হিসেবে তিনি হিমকবরী কেশ তৈলের বাজার ধরে রাখেন। পরবর্তীতে তৈলের লেবেলে নিজেকে স্বত্বাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করেন। কিন্তু রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, অসাধু ব্যবসায়ীদের দাপটের মুখে তিনি ব্যবসাটা আগের মতো ধরে রাখতে পারেননি। ধর্মীয় উন্মাদনা আর সাম্প্রদায়িকতার হুঙ্কারের কারণে হতাশাগ্রস্ত যদু লাল সাহা সপরিবারে ২০০৩ সালে জোট সরকারের আমলে নীরবে-নিঃশব্দে প্রিয় জন্মভূমি ছেড়ে ভারতের বিরাটীতে পরবাসী হন। অবশ্য হিমকবরীর প্রতিষ্ঠাতা এম. সাহা অনেক আগেই সপরিবারে ভারতবাসী হয়েছিলেন।

এম. সাহার খ্যাতির নক্ষত্র মাটিতে পতিত হলেও তাঁর ছেলে  ডা. মাখন লাল সাহা গোল্ড মেডেল নিয়ে এমবিবিএস পাশ করে বর্তমানে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের কৃতী সার্জন। তিনি ১৯৬৮ সালে সাটিরপাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে পাশ করেই কলকাতা প্রবাসী হয়েছিলেন। এই প্রতিভাবান হিন্দুদের দেশত্যাগ সত্যি মর্মান্তিক। এতে একদিকে এদেশে মেধাশূন্যতা দেখা দিচ্ছে, অপরদিকে আমাদের মানবিকতা প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একশ্রেণির মানুষের মানসিক, সামাজিক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শারীরিক নিপীড়নের কারণে আরেক শ্রেণির মানুষ তার পিতৃভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

যদু লাল সাহা সপরিবারে দেশত্যাগ করার আগে হিমকবরী হাউস, বসতবাড়ি, তৈল উৎপাদনের ফর্মুলা, লাইসেন্স তথা গুডউইল সবকিছু নরসিংদীর স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী সরোজ কুমার সাহার কাছে বিক্রি করে গেছেন। মালিকানা পরিবর্তিত হলেও ‘হিমকবরী’ এখনো উৎপাদিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে। দিনাজপুর, রংপুর ও সিলেট অঞ্চলে বর্তমানে বাজারজাত করা হচ্ছে একসময়ের বাজার কাঁপানো এই তৈল।

কৃতজ্ঞতা
সাটিরপাড়া কালী কুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক প্রয়াত সত্যেন্দ্রনাথ মোদক


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক