ব্যথার চাপে পাংশু বিবর্ণ নিরীহ পল্লীর বুকে পূর্ণ যৌবনশ্রী ও সবুজ সজীবতা ফিরাইয়া আনিবার জন্যই আমাদের পল্লী গঠন সমিতির প্রতিষ্ঠা ও ‘সবুজ পল্লী’র প্রকাশ। আমরা নবীনদের সকল শক্তি, সবখানি প্রাণ এ সাধনায় নিয়োজিত দেখিতে চাই।
একটা অজপাড়াগাঁ; নাম দক্ষিণধুরু। কেমন ছিলো এই গ্রাম বা আশপাশের গ্রামগুলো! বাংলার আরো দশ-বিশটা গ্রামের মতোই কি! হয়তো না। এই গ্রাম খুব বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ছিলো। এখানে এমন কিছু তরুণের আবির্ভাব হয়েছিলো, যারা এই পল্লীগ্রামকে নিয়ে ভাবতো। দেশ-সমাজ নিয়ে তাঁরা চিন্তা করতো। এই পল্লী আর পল্লীর মানুষের আত্মোন্নতির কথা চিন্তা করতো। আর তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলো পল্লীসমিতি গঠন করার। বাংলা ১৩৩৩ সনের আশ্বিন মাসে তারা ‘পল্লী গঠন সমিতি’ নামে একটা সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটান। দক্ষিণধুরু গ্রাম ও আশেপাশের আরো কয়েকটি গ্রামের মানুষজন মিলে এই সমিতি চালান।
তবে এর পরের ঘটনা খুবই বিস্ময়কর। তাঁদের মূল উদ্যোক্তারা, অর্থাৎ দুজন যুবক, যারা ছিলেন এই ‘পল্লী গঠন সমিতি’র সভাপতি আর সেক্রেটারি, তাঁরা এই সমিতির একটা ‘মুখপত্র’ প্রকাশ করবেন বলে ঠিক করেন, তা-ও আবার ‘সাহিত্য পত্রিকা’!
এই গণ্ডগ্রামে কারাই-বা লেখক, কারাই-বা পাঠক, আর কারাই-বা পৃষ্ঠপোষক— এসব কিছুই চিন্তা না করে সেই বছরেরই অগ্রহায়ণ মাসে ‘সবুজ পল্লী’ নামে একটি মাসিক সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশ করে ফেলেন তাঁরা। সম্পাদক ছিলেন এই সমিতির সভাপতি, পাশের গ্রাম বাজনাব’র তরুণ মোহাম্মদ জাফর আলী। ব্যবস্থাপক ছিলেন বটেশ্বর গ্রামের আরেক তরুণ মোহাম্মদ হানীফ পাঠান। পরে যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন চন্দনপুর গ্রামের ডা. বিপিনচন্দ্র পাল। মূলত এই তিনজন নিজেরা ছিলেন সাহিত্যিক, দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সাহিত্যের স্বাদ গ্রহণ, দেশ রাজনীতির খবরাখবর রাখা তুখোড় সচেতন তরুণপ্রাণ। তাঁরাই লিখতেন বেশি এই পত্রিকায়। প্রবন্ধ নিবন্ধ কবিতা— সবকিছুতে তাঁদের পারদর্শিতা।
পল্লী গঠন সমিতির মুখপত্র প্রকাশের উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রথম সংখ্যায়ই সম্পাদক লেখেন :
“দেশের উন্নতি করিতে হইলে পল্লীর আঁধার রাশি অপসারণ করিতে হইবে। কিন্তু এই কাজে বিপুল সাধনার দরকার। হে কর্ম্মীর দল- হে সাধকের দল- আসুন পল্লীর সেবায় আত্মনিয়োগ করুন। যারা তরুণ তাদের সবুজ কচি প্রাণ নূতন সৃষ্টির ব্যথায় ব্যাকুল- যাদের সকল প্রশ্ন আকাশপাতাল তরঙ্গায়িত- সকল জিজ্ঞাসা অন্তরদ্বারে বার বার কষাঘাত করিয়াও কোন মীমাংসা পাইতেছেন না- তারা আস। যারা ক্ষুধার পীড়নে নিদাঘের ফুলের মত শুকায়ে পড়েছে- তাদের মূলে জীবন সিঞ্চন কর। যারা পশুর অজ্ঞতায় ভা’য়ে ভা’য়ে গলা কাটাকাটি করছে- প্রেমের সৌন্দর্যে তাদের বুকে বুক মিলিয়ে দাও- ব্যথার চাপে পাংশু বিবর্ণ নিরীহ পল্লীর বুকে পূর্ণ যৌবনশ্রী ও সবুজ সজীবতা ফিরাইয়া আনিবার জন্যই আমাদের পল্লী গঠন সমিতির প্রতিষ্ঠা ও ‘সবুজ পল্লী’র প্রকাশ। আমরা নবীনদের সকল শক্তি, সবখানি প্রাণ এ সাধনায় নিয়োজিত দেখিতে চাই।”
এই পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন সম্পাদক মোহাম্মদ জাফর আলী, ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ হানীফ পাঠান, ডা. বিপিনচন্দ্র পাল, বাজনাব গ্রামের মোহাম্মদ ওয়াজ উদ্দিন, উয়ারী গ্রামের হোসেন উদ্দিন আফ্রাদ, হাসনাবাদ গ্রামের আজিজুল হাকিম, জয়মঙ্গল গ্রামের আব্দুল গণি, গিলাবের গ্রামের পণ্ডিত আ. কুদ্দুস, ধানুয়া গ্রামের রমিজ উদ্দিন আহাম্মদ, আটাশিয়া গ্রামের মুহাম্মদ শামছুল হক, ধানুয়া গ্রামের এম এ তাহের, লোচনপুর গ্রামের এ কে তায়েব উদ্দিন, সররাবাদ গ্রামের শেখ মো. আবদুল ছোবহান, বেলাব গ্রামের কাজি আবদুছ ছামাদ, লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুল জব্বর, সৃষ্টিগড় গ্রামের আবু আহাম্মদ, চর আমলাব গ্রামের মোছলেহ উদ্দিন আহম্মদ।


‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকার তিনজন নারী লেখক ছিলেন— ডা. বিপিনচন্দ্র পালের স্ত্রী শ্রীমতি তরুলতা পাল (কবিতা, গান), পণ্ডিত রমিজ উদ্দিন আহাম্মদের স্ত্রী জোহরা আক্তার খাতুন (কবিতা) ও ছুটাবন্দ গ্রামের সাহেদা আক্তার খাতুন (প্রবন্ধ)।
বাংলা সাহিত্যের লিটলম্যাগ এবং সাহিত্য পত্রিকার আন্দোলনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এই ব্যাপারটা খুব সহজেই জানা যায় যে, একটা লেখকগোষ্ঠী থাকে, যারা লিটলম্যাগ বা সাহিত্য পত্রিকায় নিয়মিত লেখে তরুণ বয়সে। এর মধ্য থেকে দু’-একজন প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে, আলাদা হয়ে যায় নিজের সাধনা আর পরিশ্রম দ্বারা লেখালেখিতে।
এই ‘সবুজ পল্লী’র লেখকগোষ্ঠী থেকেও এরকম দুজন সাহিত্য-সংস্কৃতির আকাশে নাম করেছিলেন জাতীয়ভাবে। তারা হলেন মোহাম্মদ হানীফ পাঠান ও আজিজুল হাকিম।
মোহাম্মদ হানীফ পাঠান পরবর্তীতে লোকসাহিত্যিক, লোকসংগ্রাহক, গবেষক, প্রত্নসংগ্রাহক ইত্যাদি পরিচয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মোহাম্মদ হানীফ পাঠান ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকায় নিয়মিত গল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা লিখতেন। কিন্তু তিনি তাঁর পরিচয় নির্মাণ করেছিলেন ফোকলোর ও প্রত্নসংগ্রাহক হিসেবে। তাঁর গ্রন্থগুলো একবার দেখে নেয়া যাক : পল্লী সাহিত্যের কুড়ান-মানিক (১৯৩৬), বাংলা প্রবাদ পরিচিতি (প্রথম খণ্ড ১৯৭৬, দ্বিতীয় খণ্ড— প্রথম পর্ব ১৯৮২, দ্বিতীয় পর্ব ১৯৮৫), লোকসাহিত্যে নরসিংদীর ছড়া (১৯৯০), সংখ্যা শিক্ষা সংস্কার (১৯৯০), বায়ান্নর পাণ্ডুলিপি (২০০৫) ইত্যাদি।
আজিজুল হাকিম কবি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনও উজ্জ্বল। আদিয়াবাদ ইসলামিয়া হাই স্কুলে পড়াশোনা করা অবস্থায়ই ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। তিনি ‘সবুজ পল্লী’তে মূলত কবিতাই লিখতেন। তাঁর কবিতাগ্রন্থগুলো হলো : ভোরের সানাই (১৩৪০), মরুসেনা (১৩৪১), বিদগ্ধ দিনের প্রান্তর (১৩৬৩), পথহারা, ঘরহারা, সনেটগুচ্ছ, আজাজিলনামা (১৩৬৩), সঞ্চয়ন (১৩৬১)। এছাড়া তাঁর অনুবাদ গ্রন্থসমূহ হলো : রুবাইয়াত ই ওমর খৈয়াম (১৩৬২), রুবাইয়াত ই হাফিজ (১৩৬২)। একমাত্র গল্পগ্রন্থ : ঝড়ের রাতের যাত্রী। মূলত আজিজুল হাকিমকে নজরুল মানসের কবি বলা হতো। অবশ্য তিনি নজরুলের প্রথম স্ত্রী নার্গিস আসার খানমকে বিয়ে করে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন।
‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকাটি দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করে ১৩৩৪ সালের মাঘ মাসে। একটা অখ্যাত গ্রামের সংগঠনের মুখপত্র সাহিত্য পত্রিকা কীভাবে একবছর চালানোর পর সাহিত্যের আকাশে জ্বলজ্বল করেছিলো, তার প্রমাণ এই বছরে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত লেখকদের এই পত্রিকার সাথে লেখার মাধ্যমে যুক্ত হওয়া। এখানে লিখেছিলেন অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ, হুমায়ুন কবির, আবুল ফজল, আবদুল কাদির, মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন, খান মুহম্মদ আতাউর রহমান, জসীম উদ্দীন, আবুল ফয়েজ খান চৌধুরী, বন্দে আলী মিঞা, আনওয়ার হোসেন, এ জেড নূর আহমদ প্রমুখ।
‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা ছিলো প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে যথাক্রমে ৩০০ ও ৪০০। পত্রিকাটির মুদ্রণ সংখ্যা ছিলো ৫০০। এরকম বিশাল সার্কুলেশনের একটি পত্রিকার স্থায়িত্ব মাত্র দুই বছর হওয়া সাহিত্য পত্রিকার ইতিহাসে লজ্জাজনক।
বড়োই পরিতাপের বিষয় হলো, ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকাটি মাত্র দুই বছর টিকেছিলো। দুই বছর রমরমাভাবে পত্রিকা প্রকাশের পরই কেন এটি বন্ধ হয়ে গেলো, এর কারণ চিহ্নিত করেছেন মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের পুত্র লোকসাহিত্যিক, প্রত্নসংগ্রাহক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান। তিনি লেখেন : “সবুজ পল্লী পত্রিকার আয়ুষ্কাল অল্প। দ্বিতীয় বর্ষে ১৩৩৫ সালের আষাঢ় শ্রাবণ মাসে ষষ্ঠ-সপ্তম যুগ্ম সংখ্যা প্রকাশের পর পত্রিকার প্রকাশনাটি বন্ধ হয়ে যায়। আর্থিক টানাপোড়েন তদুপরি পত্রিকার সম্পাদক ও পরিচালকের পেশাগত কাজে জড়িয়ে পড়ায় এটি চালু রাখা সম্ভব হয়নি।”
অর্থাৎ তরুণদের দ্বারা প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলোর বর্তমানে যা অবস্থা, অতীতেও সেই অবস্থাই ছিলো। গত একশো বছরেও লিটলম্যাগ আন্দোলনসমূহ স্থবির হয়ে যাবার কারণ ও বৈশিষ্ট্য একই রয়ে গেছে। আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাব একটা বড়ো বিষয়।
‘সবুজ পল্লী’ ১৩৩৩ সনের অগ্রহায়ণে প্রথম সংখ্যা প্রকাশ করে। পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিলো ষোলো, মূল্য ছিলো দুই আনা। বার্ষিক চাঁদা এক টাকা ছয় আনা। প্রচ্ছদ পাতলা সবুজ কাগজে মুদ্রিত হতো। এই পত্রিকাটি ঢাকা আরমানিটোলার আহমদিয়া প্রেস থেকে ছাপা হতো।
‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকার গ্রাহক সংখ্যা ছিলো প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষে যথাক্রমে ৩০০ ও ৪০০। পত্রিকাটির মুদ্রণ সংখ্যা ছিলো ৫০০। এরকম বিশাল সার্কুলেশনের একটি পত্রিকার স্থায়িত্ব মাত্র দুই বছর হওয়া সাহিত্য পত্রিকার ইতিহাসে লজ্জাজনক।
‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকায় লেখালেখির প্রধানতম বিষয়বস্তু ছিলো সমাজের উন্নয়ন, দেশের কল্যাণের চিন্তা, ধর্মীয় ভাব জাগ্রত রাখা, স্বদেশের চেতনায় জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণ। এই পত্রিকাটি প্রকাশের সময়কালে ভারতবর্ষ এবং এই বাংলা ব্রিটিশ শাসনাধীনে ছিলো। আর এই গোটা অঞ্চল মহেশ্বরদী পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিলো। সেই অঞ্চল এখন নরসিংদী জেলার অন্তর্গত। সঙ্গত কারণে এই জনপদের লেখক-পাঠকেরা ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকাকে নরসিংদী জেলার প্রথম পত্রিকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আর এ-বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সালে এই সাহিত্য পত্রিকাটি প্রকাশের শতবর্ষ হতে চলেছে।
সহায়ক গ্রন্থ
সেকালের মাসিক সবুজ পল্লী
সংকলক ও সম্পাদক : মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান

