বায়ু দূষণ | প্রেক্ষাপট : নরসিংদী

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এনার্জি পলিসি ইনস্টিটিউট (ইপিআইসি)-র গবেষকরা দেখিয়েছেন, বায়ু দূষণ সূচকের হিসাবে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দূষণের শিকার পাঁচটি দেশের চারটিই দক্ষিণ এশিয়ায়। এদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর এই বায়ু দূষণ জীবনকাল সূচক অনুযায়ী, বাংলাদেশের সবচেয়ে দূষিত শহর ঢাকার বাসিন্দারা গড়ে ৮ বছর করে আয়ু হারাচ্ছেন। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের ৬৪ জেলার সবগুলোতে বাতাসে দূষণকারী কণার উপস্থিতি ডব্লিউএইচও-র সহনীয় সীমার চেয়ে অনেক বেশি। এটা প্রমাণ করে যে, দূষণের মাত্রা বাংলাদেশে প্রকট। ফলে জেলা শহরগুলোতেও এর হিংস্র থাবা লক্ষণীয়ভাবে দৃশ্যমান।

২০২১ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ৪০ হাজার শিশুর মৃত্যু সরাসরি পিএম ২.৫ জনিত বায়ু দূষণের সঙ্গে জড়িত। এছাড়াও বায়ুতে থাকা দূষণের মাত্রা বাড়ার ফলে ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতি ঘণ্টায় ৮০০ জন মানুষ। এই ভয়াবহ চিত্র গত কয়েক বছর ধরে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন ‘আ ব্রেথ অব চেঞ্জ : সলিউশনস ফর ক্লিনার এয়ার ইন দ্য ইন্দো-গাঙ্গেয় প্লেইনস অ্যান্ড হিমালয়ান ফুটহিলস’-এ এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ প্রতিদিন অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিচ্ছে। যার ফলে এ-অঞ্চলে প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ মানুষের অকালমৃত্যু হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ-অঞ্চলের পাঁচ দেশের বায়ু দূষণের মূল উৎস পাঁচটি। এগুলো হলো :
১. রান্না ও গরমের জন্যে ঘরে কঠিন জ্বালানি পোড়ানো;
২. যথাযথ ফিল্টার প্রযুক্তি ছাড়াই শিল্প কারখানায় জীবাশ্ম জ্বালানি ও বায়োমাসের অদক্ষ ব্যবহার;
৩. অকার্যকর অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিনচালিত যানবাহনের ব্যবহার;
৪. কৃষিতে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো এবং সার ও পশুবর্জ্য অদক্ষভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং
৫. ঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য পোড়ানো।

দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে এই অঞ্চলের গড় আয়ু হ্রাসের পরিমাণ বিশ্বের মোট আয়ুষ্কালের ৫২ শতাংশ এবং এটা হচ্ছে, কারণ, এখানকার বাতাসে ডব্লিউএইচও-র নির্দেশিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে দূষণকারী কণার উপস্থিতি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিশ্বের প্রায় ৯৯ শতাংশ মানুষই অত্যন্ত দূষিত বায়ুতে শ্বাস নেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের ৯৭ শতাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে বায়ু দূষণের মাত্রা সহনীয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। আর তা মানুষের গড় আয়ু কমার ক্ষেত্রে যে-ভূমিকা রাখছে, তা ধূমপান, এইডস কিংবা সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যুর চেয়েও অনেক বেশি।

উপরের তথ্যের আলোকে ক্রমবর্ধমান জেলা হিসেবে বায়ু দূষণের তালিকায় শীর্ষে থাকা নরসিংদী জেলা নিয়ে দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বায়ু দূষণের দিক থেকে অত্যন্ত নাজুক পরিস্থিতিতে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে নরসিংদী অন্যতম। জাতীয় বায়ু সূচক দেখলে দেখা যায়, অপরিকল্পিত নগরী হিসেবে অন্যান্য জেলার মতো নরসিংদীও অনেকটা এগিয়ে থাকে। কারণ, শিল্পোন্নত জেলাগুলোর মধ্যে নরসিংদী নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের পরেই অবস্থান করে। এখানে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে মনুষ্য বস্ত্র উৎপাদিত হয়, যা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। আর এজন্যে অসংখ্য কলকারখানা গড়ে ওঠেছে জেলা জুড়ে। ফলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ জীবিকার তাগিদে এখানে আসে। চাপ সৃষ্টি হয় শহরের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে। রাজধানীর পাদদেশে হওয়ায় নরসিংদীর গুরুত্ব অপেক্ষাকৃত অন্যান্য জেলার তুলনায় অধিক। ফলে বিভিন্ন জেলার বিনিয়োগকারীগণ সুবিধাজনক স্থানে কারখানা স্থাপন করছে অনায়াসেই। বৈধ-অবৈধ অনেক বিদেশি ফ্যাক্টরি যেমন আছে, তেমনি অসংখ্য দেশি কারখানাও সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রভাবশালী মহলের পেশি শক্তির বলে গড়ে ওঠেছে। আর এসব কারণে এখানে বিশাল কর্মযজ্ঞ যেমন বেড়ে গেছে, তেমনি দূষণের মাত্রাও মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ইটভাটা, সাইজিং মিল, ব্যাটারি ফ্যাক্টরি এবং বিভিন্ন উপায়ে নানা ধরনের দ্রব্যাদি পুড়িয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যকে অসুস্থ করা হচ্ছে। অধিক মানুষ মানেই অধিক চাপ। সেটা হোক খাদ্য কিংবা বায়ু অথবা যাতায়াতে। বিশ্বব্যাপী প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জনই শ্বাসের মাধ্যমে দূষিত বায়ু গ্রহণ করছে। এটা কেবল দুশ্চিন্তারই নয়, ভয়ঙ্করও বটে। সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘আইকিউএয়ার’-এর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বাতাসে প্রতি ঘনমিটারে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৭৬.৯। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মান অনুযায়ী, প্রতি ঘনমিটারে যেটা থাকার কথা ১০-এর কম। এবারের এই পর্যবেক্ষণে কীভাবে নরসিংদী জেলা বায়ু দূষণের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এর ক্ষয়ক্ষতির একটা হাইপোথিসিস দেখানোর চেষ্টা করবো।

ইটভাটা
যেহেতু কর্মসূত্রে বিভিন্ন জেলার প্রচুর লোকজন নরসিংদীতে বসবাস করে, সেটার জন্যে বাসস্থান একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অঞ্চলটিতে অনেক কারখানা গড়ে ওঠায় বাসা ভাড়ার ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনোমতে ইট আর টিন দিয়ে রুম তৈরি করতে পারলেই ভাড়া থেকে মাস শেষে ভালো একটা পরিমাণ অর্থ হাতে আসে। ফলে বসে বসে অনেকেই বাসা ভাড়ার টাকায় সংসার চালান। আর প্রচুর চাহিদার কারণেই ছোটো-বড়ো অসংখ্য বিল্ডিং মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে। মাধবদীর পৌর এলাকা, নরসিংদী শহর, পলাশের ঘোড়াশালের মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে হাজার হাজার বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে। আর বিল্ডিং তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ হচ্ছে ইট, যা ছাড়া বিল্ডিং নির্মাণ অসম্ভব। ইট তৈরির জন্যে লাগে ইটভাটা। ঢাকার ৬০ শতাংশ বায়ু দূষণের জন্যে এসব ইটভাটাই দায়ী। দূষণ প্রশ্নে সারা দেশের চিত্রটাও ঢাকার সাথে তুলনা করা যৌক্তিক হবে। কারণ, নতুন করে গড়ে ওঠা শহরের আবাসন প্রকল্পেরই অংশ এটি। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, নরসিংদী জেলায় ইটভাটার সংখ্যা বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ১৮৫ টি। সংখ্যাটা অনেক বেশি। মূলত কয়লা পোড়ানোর মাধ্যমে ইট পোড়ানো হয়। আর কয়লা থেকে প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া বের হয়ে আসে। এসব বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নানাভাবে পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে থাকে। জানা মতে, এসব ইটভাটায় দিনে প্রচুর পরিমাণে কয়লা, বাঁশ, কাঠ এবং পোড়ানোর মতো জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। ১৮৫ টি ইটভাটার খুব কম সংখ্যকই আছে, যেগুলোর পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র আছে। যেগুলোর ছাড়পত্র আছে, সেগুলোও নামেমাত্র। তারা ঝামেলা থেকে বাঁচতে কেবলমাত্র ছাড়পত্রটি অফিসে ম্যানেজারের মাথার উপর ঝুলিয়ে রাখেন। এটা একটা বড়ো ধরনের বৈধ প্রতারণা। ১৮৫ টি ইটভাটা থেকে দৈনিক কী পরিমাণ কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে, সেটার পরিসংখ্যান জরুরি। দৈনিকের পরিমাণটা বের করতে পারলে বের হবে মাস এবং বছরেরটা। তখন একটা জেলা থেকে কী পরিমাণ কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে, সেটার একটা হিসাব পাওয়া যাবে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণও সহজ হবে। চারপাশে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এসব কালো ধোঁয়ার ফলে ফসলের পরিমাণ কমে যাচ্ছে দিন দিন। এসব ধোঁয়া সরাসরি মুকুলে প্রভাব ফেলে। ফলে ফল ও ফসল বৃদ্ধিতে প্রভাব পড়ে। গাছে গাছে অনেক উপকারী কীটপতঙ্গ থাকে, যেগুলো বিভিন্ন উপায়ে ফসলের উপকার সাধন করে থাকে। অতি মাত্রায় ধোঁয়ার ফলে এসব কীটপতঙ্গের বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ায় গাছের ডাল-পাতা আঠালো হলে এদের চলাফেরা করতে বেগ পেতে হয় এবং বংশবৃদ্ধি থেমে যায়। ফলে ফুলের পরাগায়নে সমস্যা দেখা দেয়। আর এভাবেই ফসল কমে আসে। অন্যদিকে, পাখির প্রধান খাদ্যের মধ্যে পড়ে এসব কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড়। পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গের পরিমাণ কমে আসার ফলে পাখিরাও সেই অঞ্চল ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয় এবং সরাসরি এটিও ফসলের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে, প্রভাব পড়ে ইকোসিস্টেমে।

কয়লা পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর গ্যাসসমূহের উপাদানগুলোর মারাত্মক ক্ষতিকর দিক নিচে তুলে ধরা হলো :

১. কার্বন-ডাই-অক্সাইড (এটি একটি গ্রিনহাউজ গ্যাস, যা বিশ্ব উষ্ণায়ন বা গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রধান কারণ);
২. কার্বন মনোক্সাইড (কয়লার অসম্পূর্ণ দহনের ফলে এই বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়, যা রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ কমিয়ে দেয়);
৩. সালফার-ডাই-অক্সাইড (এটি বায়ু দূষণ করে এবং বৃষ্টির পানির সাথে মিশে এসিড বৃষ্টি তৈরি করে);
৪. নাইট্রোজেন অক্সাইড [এটি ধোঁয়াশা (ংসড়ম) তৈরি করে এবং ফুসফুসের রোগের কারণ হয়]।

কয়লার মধ্যে প্রাকৃতিকভাবে কিছু ভারি ধাতু থাকে, যা পোড়ানোর সময় বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো হলো :

১. পারদ (গবৎপঁৎু) : এটি স্নায়ুতন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করে।
২. সীসা (খবধফ) : শিশুদের মানসিক বিকাশে বাধা দেয়।
৩. আর্সেনিক ও ক্যাডমিয়াম : এগুলো ক্যান্সার সৃষ্টি করতে পারে।

কয়লা পোড়ালে ছাই এবং ধোঁয়ার সাথে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা (চগ ২.৫ এবং চগ ১০) নির্গত হয়। এই কণাগুলো বাতাসের মাধ্যমে আমাদের ফুসফুসে এবং রক্তে প্রবেশ করে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং হার্টের সমস্যার সৃষ্টি করে।

তারপর কয়লা পোড়ানোর পর যে-অবশিষ্টাংশ বা ছাই রয়ে যায়, তাকে ফ্লাই অ্যাশ বলে। এতে আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত উপাদান থাকে, যা মাটি ও পানিকে দূষিত করে।

অনেকে ইটভাটার চিমনির মাধ্যমে রাতের আধারে কালো ধোঁয়া বাতাসে ছেড়ে দেয়। ফলে মানুষ ও পরিবেশ ঘুমের মধ্যেই ক্ষতির শিকার হচ্ছে। ইটভাটার মালিকগণ জানেন যে, তারা যেটা করছে, সেটা সম্পূর্ণ বেআইনি। কিন্তু সেটা জানার পরও তারা এই অপরাধটা করছে, কারণ শক্তি হিসেবে তাদের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের হাত এবং জনগণের সাথে পরিবেশ অধিদপ্তরের বেইমানি।

সাংবাদিক মহলের ব্যাপারেও অহরহ অর্থ এনে রিপোর্ট না করার মতো বহু খবর শোনা যায়। আবার অনেকে কোনোমতে কোনো-একটা গণমাধ্যম, হোক সেটা অজ্ঞাত, কার্ড নিয়ে এসে সাংবাদিকতা শুরু করেন। যদিও বেশিরভাগেরই সাংবাদিকতাই মূল উদ্দেশ্য নয় এবং সাংবাদিকতার নিয়ম-কানুন থোরাই জানেন তারা।

যেহেতু বাংলাদেশে প্রতি ঘনমিটারে বাতাসের পিএম ২.৫-এর মাত্রা ৭৬.৯, তাই নরসিংদী জেলাও এর আশেপাশেই থাকার কথা। জেলার ১৮৫ টি ইটভাটা থেকে যে-পরিমাণ কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে, এতে ইটভাটার আশপাশের এলাকার সবজি চাষে ব্যাপকভাবে প্রভাব পড়ছে। ফসলের পাশাপাশি গাছের ফল উৎপাদনেও এটি সরাসরি ক্ষতি করছে। শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এসবের এখনো কোনো গবেষণা হয়নি এবং কী পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তারও কোনো পরিসংখ্যান চোখে পড়েনি।
চিমনির কালো ধোঁয়া বের হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের চোখে পড়ে। তাই রাতের আঁধারে ইট পোড়ানো হয়, যেখানে কয়লার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে আর ইটভাটায় তাপমাত্রা সারাদিন অল্প অল্প করে রাখা হয়, যা দিনের বেলায় এতোটা বোঝা যায় না। ফলে মনে হয়, ইটভাটা পরিবেশের তেমন ক্ষতি করে না। আসলে এখানেই থেকে যায় শুভঙ্করের ফাঁকি।

সাইজিং মিল
আগেই বলা হয়েছে যে, নরসিংদী একটি ‘এ’ গ্রেডের জনবহুল এলাকা। শিল্পায়নের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে অনেক আগে থেকেই। কাপড় বুননের প্রাক্কালে সুতাকে সাইজিং মিল থেকে তানা করে নিয়ে আসতে হয়, যা দিয়ে কাপড় বুনন করা হয়। আর নরসিংদী ও মাধবদী এলাকায় হাজার হাজার পাওয়ারলুম থাকায় সাইজিং মিলের গুরুত্বও ব্যাপক। এটা ব্যতিত কাপড় বুননের চিন্তা করা অসম্ভব। নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নরসিংদীতে আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ টি সাইজিং মিল রয়েছে। এটা তারা আনঅফিসিয়ালি বলেছেন। তবে এর বেশি হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন। কয়টি সাইজিং মিলের বৈধ কাগজপত্র রয়েছে, এটারও সঠিক তথ্য তারা জানাননি। তবে বলে রাখা ভালো যে, বৈধ কাগজপত্র থাকলেও কেউই নিয়ম-কানুন মেনে কারখানা পরিচালনা করেন না। মূলত খরচ বৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে অনেকেই বলেন যে, নিয়ম মানতে গেলে ব্যবসায় পোষায় না। তাই তারা অধিক লাভের চিন্তা করে যেসব জ্বালানিতে কালো ধোঁয়া সৃষ্টি হয়, সস্তা দামে সেগুলো কিনে এনে সাইজিং মিলে ব্যবহার করেন। ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি কারখানায় পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি, সেখানে ধুনা, কর্কশিট ও চামড়া পোড়ানো হচ্ছে। যেহেতু জেলায় হাজার হাজার পাওয়ালুম রয়েছে, সেগুলো চালানোর পর প্রতি সপ্তাহে কারিগর কর্তৃক মোছা হয়। আর একটা পাওয়ালুম ফ্যাক্টরি মোছার ফলে এক থেকে দুই মণ কিংবা বড়ো কারখানার বেলায় আরো বেশি পরিমাণ ধুনা বের হয়। মূলত কাপড় বুননের সময় তানা থেকে আসা সুতা ও নলি থেকে আসা মাক্কুর ঘর্ষণে এসব ধুনার সৃষ্টি হয়। পরে মালিক পক্ষ সেগুলো কম দামে বিক্রি করে দেয় জ্বালানি হিসেবে। আর এগুলোই সাইজিং মিলে চলে আসে। অন্যদিকে, নষ্ট ও জুট হওয়া চামড়াও একইভাবে পোড়ানো হচ্ছে কিছু সাইজিং মিলে। আর এসব চামড়া নামেমাত্র মূল্যে কিনে নিয়ে আসা হয়। খবর নিয়ে জানা যায়, যখন এসব চামড়া পোড়ানো হয় তখন লোকালয়ে দুর্গন্ধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু মালিকপক্ষ প্রভাবশালী হওয়ায় কেউই কিছু বলতে পারেন না। আর চামড়া পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া বাতাসকে দূষিত করে মারাত্মকভাবে। বাতাসে সিসার উপস্থিতি বেড়ে গেলে চারপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ঝুঁকিতে পড়ে। এই স্বাস্থ্যঝুঁকি যেমন মানুষের জন্যে, তেমনি গাছপালা-পশুপাখি এবং কীটপতঙ্গের জন্যেও। বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক, যখন প্রতিনিয়ত সাইজিং মিলগুলো থেকে প্রচুর পরিমাণে কালো ধোঁয়া বের হতে থাকে, এর ফলে আশপাশের গাছপালার ডালগুলো আঠালো হয়ে আসে। আর আঠালো হওয়ার ফলে কীটপতঙ্গ ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারে না। আঠালো হওয়ার কারণে অনেক কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় মারাও যায়। ফলে পাখি বঞ্চিত হয় খাবার থেকে। আর পোকামাকড় ও পাখির পদচারণা ফুলে পরাগায়ন সৃষ্টি হতে সাহায্য করে, বায়ু দূষণের কারণে যা বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। ফলে সমস্যা দেখা দেয় বাস্তুতন্ত্রে।

পুরাতন গাড়ির ধোঁয়া
রিকন্ডিশনড গাড়ি আমদানির আঁতুড়ঘর হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতি বছর বৈধ-অবৈধভাবে অনেক গাড়ি দেশে ঢুকছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। আর গতিশীল জেলা হিসেবে নরসিংদী হচ্ছে এর অন্যতম ব্যবহারকারী জেলা, যেখানে রয়েছে প্রচুর পুরোনো ও ভাঙাচোরা গাড়ি। শিল্প এলাকা হওয়ায় পণ্য আনা-নেয়ার কাজে বিভিন্ন ধরনের লোকাল যানবাহন, যেমন : নসিমন, করিমন, হলার ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়। আর জেলার এসব ভাঙাচোরা শত শত গাড়ি প্রতিদিন কী পরিমাণ ধোঁয়া নির্গত করছে, সেটার হিসাব পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে নেই। ফলে আমাদের জানার সুযোগ নেই, জেলায় চলমান মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন থেকে কী পরিমাণ ক্ষতিকর বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে দৈনিক, মাস এবং বাৎসরিক ভিত্তিতে। তবে এটার আনুমানিক একটা হিসাব ধরে এগোনো যেতে পারে। তাহলে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। ধরা যাক, পুরো জেলায় বিভিন্ন ধরনের পুরাতন ও ভাঙাচোরা প্রায় পাঁচ হাজার (সংখ্যাটা আরো বেশি হওয়ার সম্ভবনা আছে) গাড়ি চলাচল করে। এখানে নসিমন-করিমন, ট্রাক, বাস, মিনি বাস, হলার এবং ট্রাক্টর ইত্যাদি হিসাবে আনতে হবে। পুরোনো সকল গাড়িই তেলে চলে। তাই প্রতিটি গাড়ি যদি দৈনিক গড়ে ৫ লিটার করে তেল ব্যবহার করে, তাহলে এর পরিমাণ দাঁড়াবে ২৫,০০০ লিটার। এখন এটাকে মাসে রূপান্তর করলে হবে প্রায় ৭,৫০,০০০ লিটার। আর ১ লিটার তেল পোড়ালে ২.৫ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত হলে বাতাসে দিনে ৬২,৫০০ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড মিশে যাচ্ছে। ফলে মাসে ১৮,৭৫,০০০ কেজি কার্বন-ডাই-অক্সাইড বাতাসে মিশে যাচ্ছে। বছরে হিসাবটা আরো বেশি। কিন্তু এসব দূষিত ধোঁয়া শোষণের জন্যে সেই পরিমাণ পর্যাপ্ত গাছপালা আছে কি না, এই তথ্যও নাই পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে।

যত্রতত্র বাজারের ময়লা পোড়ানো
জেলার ছোটো-বড়ো অন্তত ৫০০ জায়গায় প্রতিদিন ময়লা পোড়ানো হচ্ছে। মূলত, বাজারের উচ্ছিষ্ট আবর্জনা পুড়িয়ে বাজার পরিষ্কারের কাজে এমনটি করা হয়। যদিও পরিষ্কারের নামে আরো নোংরা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। বাজারে খুচরা বিক্রি হওয়া বিভিন্ন ধরনের পণ্যদ্রব্যের ফেলে দেয়া প্যাকেট, পলিথিন, দড়ি এবং পুরোনো কাপড়চোপড় দিনের শেষে প্রতিটি দোকানের কোণায় বা সামনে জড়োসড়ো করে রাখা হয়। তারপর সেগুলো রাতে কিংবা সকালে আগুন জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়। ফলে প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট ছোটো ছোটো কণা, যেগুলো চোখে দেখা যায় না, মার্কেট বা বাজারগুলোতে খোলা বাতাসে বিরাজ করে। ফলে ক্রেতারা যখন বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন, নানাভাবে এসব ক্ষুদ্র কণা তাদের শরীরে প্রবেশ করে রোগবালাই সৃষ্টি করে ফেলে। তাছাড়াও ছোটো-বড়ো ময়লার ভাগাড়গুলোতেও প্রতিদিন আগুন জ্বালিয়ে ময়লা পোড়ানো হয়। এমনও ঘটনা দেখা গেছে যে, আগুন জ্বালিয়ে ময়লা পোড়ানোর সময় ধোঁয়া সৃষ্টি হয়ে চারদিকে সাদা হয়ে গেছে। ফলে যানবাহন রাস্তা দিয়ে চলাচল করার সময় সামনে-পেছনে কিছুই দেখে না। যার দরুণ প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। উল্লেখ্য, এমন কিছু ঘটনা নরসিংদী নতুন বাসস্ট্যান্ড এলাকা ও মাধবদীর ফায়ার সার্ভিসের কাছে বড়ো দুটি ময়লার ভাগাড়ে ময়লা পোড়ানোর ফলে ঘটেছে। কিন্তু কোনো মিডিয়ায় এসব তথ্য উঠে আসেনি। এবং দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হলেও বিষয়টি মিডিয়ার নজর এড়িয়ে যায়। আর রাস্তার পাশে ধোঁয়া সৃষ্টির ফলে হাজার হাজার যাত্রীর শরীরে অতি ক্ষুদ্র মাইক্রোপ্লাস্টিক সহজেই শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে প্রবেশ করছে। যদিও এটা একটা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, কিন্তু যখন এটি শরীরে প্রবেশ করে, তখন এটি রোগের সংক্রমণের দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। আর এই রোগ কোনোভাবেই অল্প সময়ে ধরা পড়ে না কিংবা বোঝার উপায়ও থাকে না। ফলে এটাকে নীরব ঘাতক বলা অযৌক্তিক হবে না।

ব্যাটারি ফ্যাক্টরি ও একটি কেস স্টাডি
নরসিংদীর ব্যাটারি ফ্যাক্টরি এবং এর ক্ষতিকর দিক নিয়ে এর আগে কোথাও কোনো প্রিন্ট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খুব বেশি আলোচনা হয়নি। এমন সেনসিটিভ একটি বিষয় সবার নজর এড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক তো বটেই, দুশ্চিন্তার কারণও। ইদানিং হলুদ সাংবাদিকতা বেড়ে যাওয়ার ফলে বিষয়টি আরো জটিল হয়ে ওঠেছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, নরসিংদীতে ছোটো-বড়ো ১২ টি ব্যাটারি ফ্যাক্টরি রয়েছে। যদিও কয়েক মাস আগে নরসিংদীর পলাশে জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে জেলার সবচেয়ে বড়ো ব্যাটারি ফ্যাক্টরিটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জনগণের জোরালো দাবির কারণে। সেই ফ্যাক্টরির আশেপাশের এলাকার মানুষজনের আপত্তির মুখে কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়। জানা যায়, প্রতি মাসে এই অবৈধ চাইনিজ ফ্যাক্টরিটি থেকে প্রায় ১,২০০ কোটি টাকা মূল্যের ব্যাটারি প্রতি মাসে উৎপাদিত হতো। স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জানা যায়, এই অবৈধ ব্যাটারি ফ্যাক্টরিতে কাজ করে ইতোমধ্যে দূষণের কারণে আক্রান্ত হয়ে দুজন লোক মারা যান এবং অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ঘটনাটি এলাকায় বেশ চাঞ্চল্যকর অবস্থা তৈরি করে। সরেজমিনে গিয়ে যখন ফ্যাক্টরির ভেতরে প্রবেশ করি, তখন এর ভেতরে তীব্র ঝাঁঝালো সালফারের গন্ধ নাকে আসলে একটা অস্থিরতার অনুভূতি কাজ করে। আর এর ক্ষতিকর দিকটা জানা থাকার ফলে কখন এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবো, সেই তাড়না কাজ করতে থাকে। তারপর ফ্যাক্টরি থেকে বের হয়ে আসি এবং আশেপাশের গাছপালার দিকে তাকাই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, কিন্তু কোথাও কোনো পাখির কিচিরমিচির শব্দ শোনা যায়নি। যদিও এলাকায় প্রচুর পরিমাণে গাছপালা রয়েছে, কিন্তু পশু-পাখির কলরব না থাকাটা একটু চিন্তার বিষয়, অদ্ভুতও বটে! কারণ এতো গাছপালা রয়েছে, অথচ পাখি নেইÑ এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। হয়তো এমনটা হতে পারে যে, সালফারের ঝাঁঝালো গন্ধে গাছে কোনো পোকামাকড়ের উপস্থিতি নাই। ফলে পাখি খাদ্য না পেয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর সাথে জড়িয়ে আছে ফুল ও ফলের পরাগায়নের বিষয়টিও। দেখতে পেলাম ফ্যাক্টরির আশেপাশের গাছপালার পাতা হলুদ হয়ে গেছে। ফলে সহজেই অনুমেয় যে, অতিমাত্রায় সালফারের উপস্থিতির কারণেই এমন ঘটেছে। আর ১২ টি ফ্যাক্টরির প্রত্যেকটি এলাকায়ই এমন পরিস্থিতি। অন্যদিকে, নরসিংদীতে থাকা ১২ টি ফ্যাক্টরির সবগুলোই অবৈধ। কিন্তু প্রশ্ন হলো অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও এগুলোর কার্যক্রম চলছে কীভাবে? প্রশ্নটি সরল হলেও উত্তরটি বেশ জটিল। কারণ এর পেছনে রয়েছে বড়ো একটি চক্র, যারা প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা খেয়ে তাদের শেল্টার দিচ্ছে। আর এসব ঘটানো হচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকজন এবং রাজনৈতিক মহলের যোগসাজশে। এই ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড ঘটানোর মধ্য দিয়ে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের যে বিপন্ন অবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহতা ক্রমাগত বেড়েই চলবে।

শহরের ধুলোবালি
আগেও বলা হয়েছে যে, নরসিংদী একটা উদীয়মান জেলা, যেখানে লাখো মানুষের বসবাস। অপরিচ্ছন্ন জেলা শহরের তালিকা করলে এটি প্রথম হয়ে থাকবে বলে মনে করি। শহরের রাস্তাগুলোর পাশে পড়ে থাকা টনের টন ধুলো গাড়ি চলাচলের সময় সৃষ্ট বাতাসে যেভাবে উড়াউড়ি করে, তা খালি চোখেই দেখা যায়। এসব ধুলোবালি আর ক্ষুদ্র কণা ফুসফুস ও চোখে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি করছে। শরীরে নানাবিধ রোগবালাই সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ এসব ধুলোবালি। ভেলানগর থেকে সরকারি কলেজ হয়ে পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের দিকে যাওয়ার সময় রাস্তার কিনারে পড়ে থাকা ধুলোবালির দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কী জঘন্য অবস্থা! এ তো গেলো মূল সড়কের অবস্থা, শহরের অলিগলিগুলোর অবস্থাও একই রকম। এই অবস্থা মাধবদী আর নরসিংদী শহরেই বেশি, অন্যান্য উপজেলার তুলনায়। শহর দুটিতে অসংখ্য বড়ো বড়ো ভবন নির্মাণের কারণে রাস্তার পাশে ইট-কাঠ-বালি এবং সিমেন্ট ফেলে রাখা হয় কনস্ট্রাকশনের জন্যে। ফলে রাস্তার পিচ নষ্ট হয়ে কণা-মাটি বের হয়ে আসে। আর যখন গাড়ি চলাচল করে, তখন বাতাসের চাপে সেই ধুলোবালি মানুষের চোখে-মুখে প্রবেশ করে। অন্যদিকে, ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের কাজও চলমান। মূলত জেলখানার মোড় এবং ঢাকা বাসস্ট্যান্ড এলাকা দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শহরে ঢোকে। যেহেতু এখানে কোর্ট এবং অনেক স্কুল-কলেজ রয়েছে, তাই এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা পার হয়ে সবাইকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। আর যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, বিশেষ করে, শিক্ষার্থী এবং নানা শ্রেণিপেশার মানুষÑ এই ধুলোবালি তাদের জন্যে নিত্যকার ঘটনা। মাধবদী এবং নরসিংদী মিলিয়ে প্রতিদিন পঞ্চাশ হাজার মানুষ যাতায়াত করলে মাসে হিসাবটি দাঁড়ায় পনেরো লাখ। চোখ কপালে উঠার মতো ঘটনা! এতো মানুষ ধুলোবালির শিকার! ভেলানগর এলাকার কথাই যদি হিসবি করি, তাহলে এর পরিমাণ অগণিত। কারণ লাখ লাখ মানুষ ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ব্যবহার করেন, যার বেশিরভাগই ধুলোয় আক্রান্ত হন। আর এসব ঘটনায় লাভবান হচ্ছে বিভিন্ন ঔষধ কোম্পানি এবং ডাক্তারগণ। কারণ, রোগী বাড়লে ডাক্তার এবং ঔষধ কোম্পানির আয় বাড়বে আর পকেট ফাঁকা হবে নিম্ন এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণিপেশার মানুষের ।

কর্কশিট ও চামড়া
নরসিংদী যেহেতু শিল্পোন্নত জেলা (উন্নত শব্দটি অধিক কলকারখানা থাকা অর্থে), তাই কাপড় উৎপাদনে সুতা এবং তানাÑ দুটিই অপরিহার্য উপাদান। ফলে সুতা থেকে কাপড় বুননের তানা তৈরির জন্যে মালিকদের সাইজিং মিলের দ্বারস্থ হতে হয়। নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, নরসিংদীতে এমন ৩০ থেকে ৩৫ টি সাইজিং মিল রয়েছে, যেগুলো প্রতিদিন বিশাল পরিমাণে কালো ধোঁয়া ত্যাগ করছে। সারা দেশের প্রায় সব কাপড়ই নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী এবং গাজীপুরে উৎপাদিত হয়। এদের মধ্যে নরসিংদী এগিয়ে সেই প্রাচীন আমল থেকেই। ফলে অসংখ্য সাইজিং মিল গড়ে ওঠেছে এই জেলাকে কেন্দ্র করে। মূলত মাধবদীকে এর হাব বলা যেতে পারে। বার্লি দিয়ে সুতা মার করার জন্যে সাইজিং মিলে প্রচুর জ্বালানির প্রয়োজন পড়ে। তাই এসব মিলে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন কারখানার তথ্য নিয়ে জানা যায়, যেসব জ্বালানি এসব সাইজিং মিলে ব্যবহার করা হয়, এদের মধ্যে ফেলে দেয়া কর্কশিট ও চামড়া অন্যতম। এসব নষ্ট কর্কশিট ও ফেলে দেয়া চামড়া স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়ে আসা হয় ফ্যাক্টরিগুলোতে। যখন এসব কর্কশিট ও চামড়া পোড়ানো হয়, তখন খুবই বাজে দুর্গন্ধ এবং প্রচুর ধোঁয়া তৈরি হয়, যা পরিবেশের জন্যে তো বটেই, স্বাস্থ্যের জন্যেও মারাত্মক ক্ষতিকর। অনেকের অভিযোগ যে, তারা এসব চামড়া আর কর্কশিট দিনের বেলায় পোড়ান না। কারণ, দিনের বেলা মানুষের নাক আর চোখ ফাঁকি দেয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। লোকজন প্রতিবাদ করবে। ফলে মানুষের ঘুমের মধ্যেই অর্থাৎ রাতের বেলায় পরিবেশ দূষণের ঘটনাটি ঘটানো হয়। আর এসব এলাকায় শ্রমিকদের ডিউটি যেহেতু শিফট আকারে হয়, অর্থাৎ চব্বিশ ঘণ্টাই কাজ চলমান থাকে, ফলে রাতের আঁধারে চামড়া ও কর্কশিট পোড়ানোর কাজটিও সহজ হয় এবং রাতের ঘটনাটির যৌক্তিকতা ও সত্যতার বিষয়টি ঘটনাস্থলে গিয়েও দেখা গেছে।

ট্যানারি বা কারখানায় চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সময় এতে প্রচুর রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হয়। ফলে এটি পোড়ালে বিষাক্ত গ্যাস হাইড্রোজেন সায়ানাইড, বেনজিন এবং ক্লোরোবেনজিনের মতো মারাত্মক গ্যাস নির্গত হয়, যা শ্বাসে গ্রহণ করলে শরীরে বিষক্রিয়া হতে পারে। এতে রয়েছে ক্যান্সারের ঝুঁকিও। তারপর চামড়ায় ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক এবং ফর্মালডিহাইড আগুনের সংস্পর্শে এসে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী (ঈধৎপরহড়মবহরপ) ধোঁয়ায় রূপান্তরিত হয়। ফলে এই ধোঁয়া ফুসফুসে প্রদাহ সৃষ্টি করে হাঁপানি বা ব্রঙ্কাইটিসের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও ধোঁয়ার সংস্পর্শে এলে চোখ জ্বালাপোড়া, নাক ও গলায় অস্বস্তি এবং ত্বকে এলার্জি দেখা দিতে পারে।

অন্যদিকে, কর্কশিট পোড়ানোর ফলেও পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হয়। কর্কশিট মূলত পলিস্টাইরিন নামক প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, যা পোড়ালে ভয়াবহ বায়ু দূষণ ঘটে। কর্কশিট পোড়ালে স্টাইরিন নামক বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হয়, যা স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং মাথা ঘোরা বা ক্লান্তিবোধ তৈরি করে। তারপর এটি পোড়ানোর ফলে ডাইঅক্সিন নামক আরেকটি পদার্থ উৎপন্ন হয়, যা মানুষের হরমোন ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে এবং প্রজনন ক্ষমতার ক্ষতি করতে পারে। কর্কশিট একটি অবিয়োজনযোগ্য পদার্থ (ঘড়হ- নরড়ফবমৎধফধনষব)। এটি সরাসরি পোড়ালে ছাই ও ধোঁয়া, মাটি ও পানির গুণাগুণ নষ্ট করে এবং জলাবদ্ধতা তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

মাইক্রোপ্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা
পলিথিনসহ অন্যান্য বর্জ্য পোড়ানোর ঘটনাটি দেখার জন্যে একদিন সন্ধ্যা থেকে রাত দশটা অবধি নরসিংদী শহরের বিভিন্ন এলাকা পর্যবেক্ষণ করি। পর্যবেক্ষণ করে দেখতে পেলাম, কী পরিমাণ বর্জ্য প্রতিদিন পোড়ানো হয়! এটা শুধু অবিশ্বাস্যই নয়, অবাক করার মতো ঘটনা যে, এসব তুচ্ছ ছোটো ছোটো আগুনে পোড়ানোর কাজটি কীভাবে পুরো জেলায় একটা বড়ো ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে ওঠতে পারে। যেমন : শিক্ষা চত্বর এলাকার কথাই ধরা যাকÑ প্রতিদিন প্রচুর দোকান থেকে সারাদিন দোকানিদের পণ্য বিক্রি শেষে নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে দেয়া হয়। কোনো কোনো জায়গায় স্তূপাকারে জমানো থাকে। দিনের শেষে এগুলো একত্রে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পলিব্যাগ, পেপার এবং ওয়ানটাইম চা-কফির গ্লাস এবং চটপটি-ফুচকার দোকানের ওয়ানটাম প্লেট। কেবলমাত্র নরসিংদীর পৌরপার্কেই প্রতিদিন ছয় থেকে সাতটি জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে এসব বর্জ্য পোড়ানো হয়। মানে শুধু শিক্ষা চত্বর এলাকায়ই মাসের গড় হিসাব করলে নিঃসন্দেহে একটা ভয়ঙ্কর চিত্র বেরিয়ে আসবে। এসব বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়ার সাথে ছড়িয়ে পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিকসহ নানা ক্ষুদ্র কণা, যেগুলোতে স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে এবং যা আশেপাশের এলাকায় বিরাজ করছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় দূষিত বায়ু গ্রহণ করে অজান্তেই আক্রান্ত হচ্ছেন। আমার চার ঘণ্টার ঘোরাঘুরিতে যতোটুকু পর্যবেক্ষণ করেছি, শুধু শিক্ষা চত্বর থেকে কালীবাজার পর্যন্তই ৩৫ টি জায়গায় আগুন জ্বালাতে দেখেছি। পর্যবেক্ষণের রাস্তাটি শিক্ষা চত্বর টু ইনডেক্স প্লাজা হয়ে কালীবাজার এবং আরশীনগর সিএনজি স্টেশন থেকে নদীর পাড় হয়ে কালীবাজার পর্যন্ত। এই যদি হয় স্বাভাবিক চিত্র, তাহলে পুরো জেলায় কতোটি জায়গায় কী পরিমাণ বর্জ্য প্রতিদিন পোড়ানো হচ্ছে, তা অনুধাবনেরই বাইরে। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পারি, মাধবদী এলাকায়ও প্রতিদিন অসংখ্য জায়গায় আগুন জ্বালিয়ে এসব বর্জ্য পোড়ানো হয়, যা কোনো অংশেই নরসিংদীর চেয়ে কম নয়।

এগুলো এভাবে হিসাব করা কষ্টকর। তারপর বড়ো বড়ো যেসব ময়লার ভাগাড় রয়েছে, সেগুলোতেও প্রতিদিন আগুন জ্বালিয়ে ময়লা পোড়ানো হয়। রাস্তার পাশে থাকা এসব ময়লা পোড়ানোর ফলে প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হয়। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, সৃষ্ট ধোঁয়ার ফলে চারদিকে সাদা হয়ে আসে। ফলে যানবাহনকে সামনের রাস্তা ধরে যাওয়ার সময় প্রায়শই দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, এই ধরনের ঘটনা ঘটার পরও কোনো সংবাদ মাধ্যমে এসব নিউজ নিয়ে কাজ করা হয়নি। ফলে সচেতনতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা কতোটুকু বাড়বে, সেটা নিয়েও সন্দেহের প্রবণতা রয়ে যায়।

প্লাস্টিক পোড়ানো
জীবনযাত্রার মানের সাথে সাথে বিভিন্ন ধরনের দ্রব্যের ব্যবহারও বেড়ে গেছে। আর এটার সাথে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষ ঘটানোর দূষিত পণ্য প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের তৈরি নানা তৈজসপত্র ব্যবহারের পর ফেলে দেয়া হয়। তখন এগুলোর জায়গা হয় শহরতলীর বড়ো কোনো ভাগাড়ে, ড্রেন কিংবা ডোবায়, যদিও এর একটি অংশ কুড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় রিসাইকেলের জন্যে। তারপরও প্লাস্টিকের প্রায় পুরো অংশটিই জমা হয় বড়ো ভাগাড়গুলোতে। ফলে বায়ু দূষণের আরেকটি বড়ো কারণ হচ্ছে এসব প্লাস্টিকের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। বড়ো বড়ো ভাগাড়গুলোর পাহাড়সম উচ্চতা কমানোর নিমিত্তে প্রতিদিন এগুলোতে আগুন লাগিয়ে পোড়ানো হয়। এতে প্রচুর ধোঁয়া তৈরি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তা ধোঁয়ায় ছেয়ে গেলে যানবাহন চলাচলে বাঁধা সৃষ্টি হয়। ব্যাহত হয় জনজীবন। দুর্ভোগের শিকার হয়ে মানুষজন অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে। আর এসব সৃষ্ট ধোঁয়া থেকে নির্গত হওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক বাতাসে মিশে গিয়ে হাজার হাজার মানুষের ফুসফুসে স্থান করে নেয়। ফলে ধীরে ধীরে মানব শরীরে ছড়িয়ে পড়ে নানা ধরনের দীর্ঘমেয়াদী রোগবালাই। নরসিংদীর বড়ো ময়লার ভাগাড়গুলো থেকে প্রতিদিন প্রচুর ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। এমনটা দেখা যায় মাধবদী ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন ময়লার ভাগাড়েও।

ভবন নির্মাণ
নরসিংদী ও মাধবদী— দুটি শহরেই সমানতালে শত শত ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আনুমানিক শহরের প্রতি ১৮০ থেকে ২০০ মিটারের মধ্যে একটি করে স্থাপনার নির্মাণ কাজ চলছে, যেগুলোর বেশিরভাগই রাস্তার পাশে। ফলে বায়ু দূষণের মাত্রাটা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। এসব ভবন নির্মাণের জন্যে হাজার হাজার টন উপকরণ প্রয়োজন। যেহেতু শহর এলাকা, তাই প্রয়োজনীয় উপকরণ রাখার পর্যাপ্ত স্থান স্বল্পতার কারণে এসব রাস্তার পাশে দিনের পর দিন ফেলে রেখে কাজ চালানো হয়। বিভিন্ন ধরনের উপকরণ রাখার ফলে রাস্তার উপর চাপ পড়লে রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পিচ উঠে গিয়ে মাটি থেকে কংক্রিট বেরিয়ে আসে। ফলে যানবাহন চলাচলের সময় প্রচুর ধুলা উৎপন্ন হয়।

নরসিংদী শহরের মূল সড়কগুলো ধরে যদি সমস্যাটি সম্পর্কে বলা হয়, তাহলে ভেলানগর জেলখানার মোড় থেকে শিক্ষা চত্বর এবং সংগীতা থেকে একেবারে পৌরসভার মোড় পর্যন্ত সংকীর্ণ রাস্তার পাশে যত্রতত্র ইট, বালি এবং রডের মতো নির্মাণ সামগ্রী ফেলে রাখা হয়। এছাড়াও ছোটো ছোটো অলিগলিও দূষণের আওতায় আনা যাবে, যেখানে দিনের পর দিন টনের টন ধুলোবালি ছোটো ছোটো যানবাহন চলাচলের সময় উড়াউড়ি করে। রাস্তায় একফোঁটা পানিও ছিটানো হয় না। এতে ব্যাপকভাবে মানুষের স্বাস্থ্যহানি ঘটছে। অন্যদিকে, মাধবদীর গরুর হাট থেকে স্কুল মার্কেটের রাস্তাটি ব্যতিত পুরো শহরের চিত্রই ধুলো-ময়লার। ভাঙাচোরা রাস্তায় চলতে গিয়ে মানুষের যেমন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, সেই সাথে প্রতিদিন প্রচুর ধুলাবালি ফুসফুসে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি করছে এলাকায় বসবাসরত মানুষের। শহরের দক্ষিণ অঞ্চলের সবগুলো রাস্তার দশাই বেহাল। চলাচলের অনুপযোগী। গাড়ি চলাচলের সময় ধুলা উড়ে রাস্তা সাদা হয়ে যায়। শীতকালে আবহাওয়া শুষ্ক থাকার ফলে ধুলার পরিমাণ বেশি হয়। তখন নরসিংদীর আইকিউএয়ারের মান ২০০-র অধিক হয়ে থাকে, যা কোনো যন্ত্র ব্যবহার না করেই বলা যায়। তবে এটি যখন টানা তিনদিন থাকে, তখনই স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে থাকে এবং মহামারী আকার ধারণ করে। আর এতে মানুষজন আক্রান্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। রাস্তার এমন দশার জন্যে পৌর কর্তৃপক্ষই দায়ী। যথাযথ পদক্ষেপ নিলে ধুলায় সৃষ্ট রোগবালাই থেকে মানুষ মুক্তি পেতো এবং পরিবেশ দূষণ কমলে অনেক সমস্যা থেকেই চারপাশ সুস্থ থাকতো।

রাস্তা মেরামত
রাস্তা মেরামতের সময় বায়ু দূষণ হবে না, এমন কোনো পদক্ষেপ কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে, জেলার কোনো জায়গায় এমন নজির দেখানো যাবে না। অথচ শিক্ষিত মানুষ হিসেবে অন্তত তাদের বায়ু দূষণের কথা জানার কথা এবং এর ভয়াবহতার বিষয়টি নিয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি ছিলো।এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের উচিত ছিলো সড়ক বিভাগের সাথে বসে দূষণের বিষয়টি মীমাংসা করা। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এমনটা হয়নি এবং খবর নিয়ে জানা গেছে, এ ধরনের সমন্বয়ের চিন্তাই তারা করেনি। সাহেপ্রতাপ টু ঢাকা বাসস্ট্যান্ডের দূষণের ভয়াবহ চিত্রটা কর্তৃপক্ষের পরিবেশ দূষণ নিয়ে দুর্বল জ্ঞান সম্পর্কে ধারণা দেয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর পানি ছিটানো হলে কিন্তু এই সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। অর্থও যে খুব বেশি খরচ হতো, তেমনটা নয়। অভাব শুধু সদিচ্ছার। অন্যদিকে, রাস্তায় অ্যাসফল্ট বা বিটুমিনাস ব্যবহারের সময় যেভাবে কালো ধোঁয়া নির্গত হয়, সেটা ভয়ঙ্কর। নানা রকম ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ এসব ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যে-ক্ষতি করতে অন্যগুলোর লাগে এক মাস, সেটা বিটুমিনাসে হয় একদিনেই। বিটুমিন গরম করলে বেনজিন, টলুইন এবং জাইলিনের মতো ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয়। এগুলো বাতাসে দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকতে পারে এবং লিউকেমিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা যেতে পারে।

ক্ষয়ক্ষতি ও রোগবালাই
বায়ু দূষণের ভয়াবহ চিত্র লুকিয়ে আছে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির মধ্যেও। প্রচণ্ড মাত্রার বায়ু দূষণের ফলে ক্ষতির শিকার হচ্ছেন মূলত শিশু-কিশোর, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং প্রতিদিন অফিসে আসা-যাওয়া করা লোকজন। আর এর ফলে লাভবান হচ্ছেন ডাক্তারগণ এবং ঔষধ কোম্পানির মালিকেরা। বায়ু দূষণের ফলে সকল বয়েসী মানুষের নানা ধরনের জটিল রোগ হয়ে থাকে। ডায়বেটিস, ক্যান্সার, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যার মতো নানাবিধ জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন লোকজন। ডাক্তারদের তথ্যানুসারে, বছর পাঁচেক আগেও দৈনিক ১৫ থেকে ২০ জন রোগী শ্বাসকষ্ট নিয়ে আসতেন হাসপাতালগুলোতে, কিন্তু এখন সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৮০ জনে। বায়ুমান সূচক ২০০-র আশেপাশে থাকার ফলেই এমনটি ঘটছে। একটি অঞ্চলে বসবাসরত অধিবাসীগণ সেই অঞ্চলের আবহাওয়া, বায়ু এবং জলবায়ু দ্বারা প্রভাবিত। ফলে দীর্ঘমেয়াদী দূষণের কারণে বড়ো ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়, যেটা সেই অঞ্চলের জন্যে মহামারী হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। মানুষের স্বাস্থ্য ছাড়াও প্রাণী এবং গাছেরও বড়ো ধরনের ক্ষতি সাধন হচ্ছে, যা মানুষের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বায়ু দূষণের ফলে গাছের যে স্বাস্থ্যহানি ঘটছে, এটা ভয়ঙ্কর পরিণতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যেমন : রাস্তার পাশের কনস্ট্রাকশন এবং ভাঙাচোরা রাস্তার ধুলোবালি গাছের পাতায় জমা হলে গাছে পোকামাকড় জন্মাতে বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে পাখির খাবারের শৃঙ্খল ভেঙে পড়ে। পাখিরা অন্যত্র চলে যায় এবং অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে একটা বিপর্যয় ঘটে যায়। কারণ, পাখিসহ অন্যান্য কীটপতঙ্গ না থাকলে পরাগায়নে সমস্যা সৃষ্টি হয়। ফল ও ফুলে একটা প্রভাব পড়ে। এছাড়াও পাতায় যখন ধুলোর মোটা আস্তরণ পড়ে, তখন অক্সিজেন বায়ুতে প্রবেশে বাঁধা পায়।

নরসিংদী জেলায় জীবিকার অন্বেষণে আসা নানা জেলার মানুষের বসবাস। জনবহুল জেলার গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে নরসিংদী শহর এবং মাধবদীতে ব্যাপক পরিসরে বায়ু দূষণ হচ্ছে। রাস্তার চিত্রটা বোঝার জন্যে আমাদেরকে এর ক্রিটিক্যালি হিসেব করে দেখাতে হবে। তাহলে বুঝতে সহজ হবে, কীভাবে ধুলোবালি ক্ষতি করছে। গত মাসে নরসিংদী শহরের অটো রেজিস্ট্রেশন করানোর জন্যে তাগিদ দিলে শত শত অটো, বিভাটেক পৌরপার্কে অপেক্ষমান থাকতে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে অটো ড্রাইভারদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা শহরে আনুমানিক ছয় থেকে সাত হাজার অটো চলাচলের কথা জানান। এবং তাদের তথ্যানুযায়ী শহরে তিন ধরনের ড্রাইভারের দেখা মেলে। এক ধরনের ড্রাইভার আছেন, যারা সকাল সকাল গাড়ি নিয়ে বের হয়ে দুপুর পর্যন্ত গাড়ি চালান। আরেক দল আছে, যারা বের হতে হতেই এগারোটা-বারোটা বেজে যায়। আবার আরেক দল আছে, যারা অধিক ভাড়া পাওয়ার আশায় রাতে বের হন। হিসাবটা এজন্যে করছি, যেন শহরে এতো গাড়ি থাকার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য হয়। আর বিষয়টি জরিপের মাধ্যমে করা। ত্রিশ থেকে পয়ত্রিশজন অটো চালকের কাছ থেকে তথ্য জানার ফলে বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাই। তাহলে এবার আসা যাক ক্ষতির প্রক্রিয়া বোঝার রাস্তাটিতে। যখন রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলাচল করে, কতো সেকেন্ড পরপর একটি গাড়ি একটি নির্দিষ্ট এলাকা অতিক্রম করে, সেটা হিসাবে নিতে হবে। কারণ অধিক গাড়ি চলাচলের কারণে ধুলোবালির উড়াউড়ি বেড়ে যায়। অর্থাৎ একটি গাড়ি যাওয়ার ফলে যে-ধুলো উড়ে আসে, সেই ধুলো মাটিতে পড়ার আগেই যখন আরেকটি গাড়ি সেই এলাকা অতিক্রম করে, তখন বাতাসে থাকা ধুলোবালি নিচে পড়ার সুযোগ পায় না। ফলে রাস্তায় ব্যাপক ধুলো উড়তে থাকে এবং সহজেই মানুষের ফুসফুসে ঢুকে যায়। এছাড়াও খালি চোখে ধুলোসহ অনেক কণা চোখে ঢুকে চোখের ক্ষতি করে। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। এছাড়াও বাতাসে বিষাক্ত পদার্থ, যেমন : মিথেন, ক্লোরোফর্ম এগুলো থাকলে গাছের সালোকসংশ্লেষণে বাধাগ্রস্ত হয়, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখে।

গাছে গাছে আঠালো পদার্থ
নরসিংদী এবং মাধবদীতে ইটভাটা, সাইজিং মিল এবং এই জাতীয় আরো নানা ধরনের কারখানা রয়েছে, যেগুলো থেকে প্রতিদিন অনবরত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে নরসিংদীতে ১৮৫ টি ইটভাটা এবং আনুমানিক ৩০ থেকে ৩৫ টি সাইজিং মিল রয়েছে। এগুলো থেকে প্রচুর কালো ক্ষতিকর ধোঁয়া নির্গত হয়। বেশিরভাগ কারখানার পরিবেশের ছাড়পত্র থাকলেও কার্যত সবগুলোই অকেজো। ফলে সার্বক্ষণিক ধোঁয়া নির্গত হতে থাকে। এসব কারখানার ধোঁয়া বাতাসের মাধ্যমে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ার পর যে-ঘটনাটি ঘটে, তা হলো গাছের পাতা এবং শাখা-প্রশাখাগুলো আঠালো হয়ে আসে। ফলে গাছে থাকা উপকারি কীটপতঙ্গের আঠালো পদার্থের কারণে চলাচলে সমস্যা হয় এবং কীটপতঙ্গ জন্মাতেও বাধাগ্রস্ত হয়। এতে কীটপতঙ্গ কমে যায়, যার ফলে পাখির খাবারে সংকট দেখা দেয়। খাবারের সংকটের ফলে পাখি অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয় এবং প্রভাব পড়ে পরিবেশের ভারসাম্যে। পাখি কমার ফলে পরাগায়নেও সমস্যা দেখা দেয়। এতে ভেঙে পড়ছে খাদ্যশৃঙ্খল। গাছে ফুল ফুটতেও দেরি হয়। উদ্ভিদের জীবনচক্র দিন দিন বদলে যাচ্ছে মূলত বায়ু দূষণের কারণে। গাছে গাছে ফুল ফুটতে দেরি হচ্ছে। দিন দিন ফল ও ফসল— দুটিরই উৎপাদন কমে আসছে। এমনটা যতো দীর্ঘ হবে, পরিবেশের ভারসাম্য ততোই নষ্ট হবে।

রাস্তায় পানি ছিটানো
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ। বাস থেকে কলকাতায় নামলাম। নিউমার্কেট এলাকায় যাওয়ার জন্যে ট্যাক্সিতে উঠে বসলাম। তারপর ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তা এতো ভেজা, আকাশ তো পরিষ্কার, বৃষ্টি হলো কখন, দেখলাম না তো? উত্তরে তিনি বললেন, “দাদা, বৃষ্টি হয়নি তো। আমাদের কলকাতা সিটিতে প্রতিদিন পানি ছিটিয়ে থাকে কলকাতা সিটি কর্পোরেশন।”

বিদেশে কেন, আমাদের দেশেই রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন পরিষ্কার নগরী হিসেবে বিশ্বে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সেখানকার বায়ুমান সকল দিক থেকে উত্তীর্ণ। তাহলে নরসিংদীর মতো শহর কিংবা মাধবদীর মতো জনবহুল এলাকায় পৌর কর্তৃপক্ষ এমন ব্যবস্থা কেন নিচ্ছে না, সেটা একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসেবে থেকে যায়, যার সাথে জড়িয়ে আছে লাখ লাখ মানুষের স্বাস্থ্য। দৈনিক তিনবার পানি ছিটানো হলে রাস্তায় ধুলোবালির পরিমাণ কমে আসবে। তারপর রাস্তার ধারে কিংবা ডিভাইডারের মাঝে গাছ লাগানোর ব্যবস্থা রাখলেও বাতাসে থাকা ক্ষতিকর বিষাক্ত পদার্থ গাছপালা শুষে নিতে পারে। এতে শহরের মানুষের রোগবালাই পঞ্চাশ শতাংশ কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে একটি স্বাস্থ্যকর নগরী গড়ে তোলা সম্ভব। এসব করতে অর্থ যে খুব বেশি লাগবে, এমনটাও নয়।

রাজনৈতিক উদ্যোগ
নগরীর সবকিছুই আরোপিত হয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত দ্বারা। সামাজিক ইস্যুগুলোও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের বাইরে নয়। তাই নগরের ভাবনাগুলো রাজনৈতিক প্লাটফর্মের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়ে তৃণমূল পর্যায়ে আসবে এবং সেটা বাস্তবায়নের দিকে এেিয় যাবে, এমনটাই হওয়ার কথা। কিন্তু এটা এখন কথার কথা। নগরের জটিল বিষয়গুলোর মধ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। গ্রামগুলোতে বায়ু দূষণের মাত্রা কম এবং সেখানে শহর ও নগরীর মতো এতো সমস্যা থাকার কথা নয়। কিন্তু সেখানেও সাইজিং মিল এবং ইটভাটা ব্যাপক ক্ষতি সাধন করছে। শহরে তা আরো ব্যাপক। এটা একটা গুরুতর সমস্যা হওয়া সত্ত্বেও পৌর কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে গড়িমসি করে। তাদের কাছে সমস্যা নিয়ে কথা বললেই তাদের পক্ষ থেকে উত্তর আসে যে, তাদের লোকবল কম, ফান্ডিং ক্রাইসিস ইত্যাদি। মূলত সমস্যার জায়গাটা তাদের সদিচ্ছার। শহরের বায়ু দূষণ রোধে শত শত লোকবল লাগবে এমনটাও নয়। কার্যত সদিচ্ছা থাকলে একটি সুন্দর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করলে দশ থেকে পনেরো জনের একটি টিম নরসিংদী কিংবা মাধবদীর মতো শহরে যথেষ্ট। আর এটার জন্যে যারা এসব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, তাদেরও মতামত নেয়া যেতে পারে। নরসিংদীতে দেখা গেছে, বিগত বছরগুলোতে যারাই শাসনভার নিয়েছেন, তারাই জনগণকে প্রতারিত করেছেন প্রতিবার। ক্ষমতায় আসার আগে পরিবেশ নিয়ে তাদের বৈজ্ঞানিক ইশতিহার থাকে না, যা-ও থাকে, সেখানেও গলদ। মোট কথা, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে ন্যায্যতা আদায়ের চেষ্টা করে বিভিন্ন ধরনের চটকদার কথাবার্তা বলে। জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়ে পুরো শহর ধুলোয় মিশে গেলেও এতে তাদের কর্ণদ্বারে শব্দ পৌঁছায় না। স্থানীয় সরকার পরিচালনার মূল কাজটিই যদি তারা ভালোভাবে না বুঝে বা না করে, তাহলে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির দিকটা সামনের দিনগুলোতে প্রকট আকারে দেখা দিবে। ফলে রাজনৈতিক মহলের এই দায় এড়ানোর কোনো সুযোগই থাকবে না।

সামাজিক আন্দোলন
বিদ্যমান কোনো সমস্যাকে সামনে রেখে আন্দোলনের ন্যায্যতাকে গতিশীল করাই সামাজিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। রাজনৈতিক দৃষ্টিকে আটকে ফেলতে হলে ছোটো ছোটো সামাজিক আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। অনিবার্য বিষয়ে সামাজিক আন্দোলনের সফলতা অর্জন নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট এলাকার জনশক্তি দ্বারা। সেই হিসেবে নরসিংদী কিংবা মাধবদীর মতো জনবহুল এলাকায় সামাজিক আন্দোলনের একটা হাব হওয়া জরুরি। কারণ আন্দোলন ছাড়া বাংলাদেশের মতো জায়গায় কোনোকিছু আদায় করা মানে মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতোন। এখানে যেভাবে রাস্তায় ধুলোবালি উড়াউড়ি করে, সেটা পৌরসভা চাইলেই সমাধান করে ফেলতে পারে। কারণ জনগণের ট্যাক্স দেয়ার পরিমাণ কম, এটা কোনোভাবেই বলা চলে না। অন্যদিকে, সাইজিং মিলসহ অন্যান্য কারখানা থেকে যেভাবে বিষাক্ত কালো ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ না থাকলে এগুলো বন্ধ করা দুষ্কর। এলাকার মানুষজনের উচিত বায়ু দূষণের মতো এমন সেনসিটিভ বিষয় নিয়ে আলাপ তোলা। কারণ, এসব বিষয় নিয়ে যতোই আওয়াজ তোলা হবে, দূষণসন্ত্রাসীরা ততোই সজাগ থাকবে। আর জনশক্তি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে প্রশাসনও বাধ্য হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। তাই অবিলম্বে তরুণদের সামাজিক আন্দোলন গতিশীল করতে এগিয়ে আসা উচিত।

সরকারি কর্মকর্তাদের দায়
পরিবেশ অধিদপ্তর নামে সরকারের একটা বিভাগ রয়েছে, যাদের দায়িত্ব পরিবেশ নিয়ে কাজ করা। কিন্তু আদৌ তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে কি না, সেটা সন্দেহের সৃষ্টি করে। পরিবেশ বিষয়ে তথ্য চাওয়ার জন্যে কয়েকদিন যেতে হয়েছিলো নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরে। তৎকালীন প্রধান ওয়েবসাইটে যাবতীয় ডাটা রয়েছে বলে তিনি তার দায়িত্ব সেরেছেন। বাসায় এসে তিন-চার ঘণ্টায়ও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে আবার তাদের অফিসের দ্বারস্থ হতে হয়। এমন মিথ্যা বলে হয়রানির মানে কী, জিজ্ঞেস করতেই তৎকালীন প্রধান বলেন, “ওখানে তথ্য নাই, কী বলেন এসব!” নাটকটি ভালো লাগেনি। এমন বক্তব্য যে শুধু বিভ্রান্তিকর, তা-ই নয়, তথ্য পাওয়ার জন্যে যে কঠিন রাস্তা তারা তৈরি করে রেখেছেন, সেটারও একটি ইঙ্গিত। পরে সব অফিসার ডেকে নিয়ে এসে তিনি তাদের ধমকালেন আর বললেন যে, তিনি গবেষণার কাজে তথ্য চেয়েছেন, যা যা লাগবে, দিয়ে দিন। এখানে তিনি আরো জানালেন যে, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের সাংবাদিক এসে তথ্য চান আর সেই তথ্য নিয়ে তারা ফ্যাক্টরি থেকে অবৈধ অর্থ গ্রহণ করেন। তাই তারা এসব তথ্য সবাইকে দিতে চান না।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সিসি ক্যামেরার বিষয়টিও যথেষ্ট সন্দেহের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। পরিবেশ নিয়ে কাজ করতে তিনদিন তাদের অফিসে যেতে হয়েছিলো। তিনদিনই প্রধানের কক্ষে থাকা সিসি ক্যামেরা বন্ধ পেয়েছি। মূলত জেলার সব মিল-কারখানা পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের আওতায় নিয়ে আসতেই এমন উদ্যোগ নেয়া হয়। এই সিসি ক্যামেরা কারখানার চারপাশে এমনভাবে বসানো হয়, যাতে এর আশেপাশে কোনো পোকামাকড়ও যদি নড়াচড়া করে, তবে সেটা সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়বে। এটা দপ্তর থেকে একেবারে মন্ত্রণালয় পর্যন্ত বিস্তৃতÑ এমনটাই তারা জানায়। ফলে কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া এবং বিষাক্ত পদার্থ বের হলে সেটা সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে থাকা এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের কথা। কিন্তু তাদের সাক্ষীগোপাল হয়ে বসে থেকে অফিসে ঝালমুড়ি আর সমুচা-সিঙ্গারা খাওয়ার মৌজ-মাস্তি বলে অন্য কথা। রাষ্ট্র যাদের বেতন দিয়ে একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিলো, আর তারা সেটা না করে নিষ্ক্রিয় হয়ে সব খবরাখবর রাখবে, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেবে না, এমনটা হলে তো সন্দেহ আরো বেড়ে যাবে, এটা বলাই বাহুল্য। জনগণের প্রশ্ন করা উচিত যে, পরিবেশ অধিদপ্তরের কাজটা কী এবং তারা সপ্তাহে এবং মাসে কয়টি মিশন পরিচালনা করেছে। আর এসব মিশন পরিচালনা না করে থাকলে তার পেছনের মূল্য রহস্য কোথায়? কারণ, ইতোমধ্যে খামের সংস্কৃতির কথা দেশব্যাপী সকলের নজরে এসেছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তরকে শক্ত হয়ে কাজ করার জন্যে তাগিদটা জনগণকেই দিতে হবে।


বালাক রাসেল  সম্পাদক, ঢেঁকি

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ