নরসিংদীর প্রথম পত্রিকা ‘পল্লীবাণী’ সমাচার

দক্ষিণধুরু গ্রামের নিভৃত উঠোন থেকে শিবপুর হাই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির বেঞ্চ— নরসিংদী জেলার প্রথম সংবাদপত্র নিয়ে যে-ঐতিহাসিক বিতর্ক, তার সুলুক-সন্ধান করতে গেলে ঠিক এই দুটো জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াতে হয়। প্রতিষ্ঠিত ধারণা অনুযায়ী, নরসিংদীর প্রথম পত্রিকা ‘সবুজ পল্লী’। স্থানীয় গবেষক, সাংবাদিক ও সুধী সমাজের বড়ো অংশ বরাবরই ‘সবুজ পল্লী’কে এই স্থান দিয়ে এসেছেন। আবার ইতিহাসের সূক্ষ্ম সুতো ধরে এগোলে নরসিংদীর প্রথম পত্রিকার আসন দাবি করার মতো আরেকটি কাগজের খোঁজ পাওয়া যায়, যার নাম ‘পল্লীবাণী’। কোনো অঞ্চলের প্রথম পত্রিকার ইতিহাস জানা বলতে শুধু পত্রিকার জন্মকথা জানাটাই নয়, বরং সেই অঞ্চলের চিন্তার বিকাশ, জনজীবন ও গণমাধ্যমের বিকাশের ইতিহাসের সাথেও পরিচিত হওয়া। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি জেলার প্রথম পত্রিকার গল্পই জড়িয়ে আছে ঔপনিবেশিক আমলের সামাজিক জাগরণ, শিক্ষার বিস্তার আর জাতীয়তাবাদী চেতনার উত্থানের সঙ্গে। নরসিংদীর এই দুই পত্রিকার গল্পও তার ব্যতিক্রম নয়। দুই পত্রিকার ওপর এই আলোকপাত একদিকে যেমন ঐতিহাসিক তথ্য-সংশোধনীর চেষ্টা; আবার পত্রিকাগুলো সম্পর্কে আহরিত নানা তথ্যের নিরিখে আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে এই প্রান্তিক জনপদে সাহিত্য-সাংবাদিকতার সূচনার সমৃদ্ধি ও বহুমাত্রিকতা নিরুপণের প্রয়াসও বটে।

সবুজ পল্লী : ছাপাখানার আলোয় পল্লী উন্নয়নের স্বপ্ন
নরসিংদী জেলার ছাপাকৃত প্রথম পত্রিকা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে ‘সবুজ পল্লী’। ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের ১৩ আশ্বিন (খ্রিস্টীয় ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯২৬) বেলাব থানার দক্ষিণধুরু গ্রামে স্থানীয় কয়েকজন উদ্যমী তরুণ মিলে গড়ে তোলেন ‘পল্লী গঠন সমিতি’। এই সমিতির মুখপত্র হিসেবেই একই বছরের অগ্রহায়ণ মাসে মাসিক পত্রিকা ‘সবুজ পল্লী’ আত্মপ্রকাশ করে।

পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন মোহাম্মদ জাফর আলী, আর ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন পল্লী গঠন সমিতির সেক্রেটারি মোহাম্মদ হানীফ পাঠান, যিনি উয়ারী-বটেশ্বর সভ্যতা আবিষ্কার করে বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার ইতিহাসেও স্মরণীয় হয়ে আছেন। দ্বিতীয় বর্ষ থেকে সম্পাদকমণ্ডলীতে যুক্ত হন সাহিত্যানুরাগী চিকিৎসক ডা. বিপিনচন্দ্র পাল। তখন থেকে প্রকাশিত প্রতিটি সংখ্যায় জাফর আলীর পাশাপাশি তাঁর নামও সম্পাদক হিসেবে ছাপা হয়। ‘সবুজ পল্লী’র মূল প্রতিপাদ্য ছিলো পল্লী অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন। ‘সবুজ পল্লী’র লেখাগুলোতে তাই উঠে আসে দেশের উন্নতির জন্যে পল্লীর অন্ধকার দূরীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা, আর তরুণ প্রজন্মকে সেই সাধনায় শামিল হওয়ার আহ্বান। ষোলো পাতার এই পত্রিকার দাম ছিলো প্রতি সংখ্যা দুই আনা, বার্ষিক চাঁদা এক টাকা ছয় আনা। পাতলা সবুজ কাগজে ছাপা প্রচ্ছদ, ঢাকার আরমানীটোলার আহমদীয়া প্রেস থেকে মুদ্রণ— সব মিলিয়ে সেকালের গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে এ ছিলো রীতিমতো এক সাংস্কৃতিক দুঃসাহস।

‘সবুজ পল্লী’র সম্পাদক জাফর আলীর পরিচয়ও কম চমকপ্রদ নয়। ব্যতিক্রমধর্মী এই গবেষক আন্তর্জাতিক একটি ভাষা উদ্ভাবনের জন্যে দীর্ঘদিন পরিশ্রম করেছেন। মাত্র সতেরোটি বর্ণ বা ধ্বনি দিয়ে বিশ্বের একাধিক ভাষা রপ্ত করার একটি কৌশল আবিষ্কার করে তিনি সাড়া ফেলে দিয়েছিলেন। ১৯৫০ সালে প্রকাশিত তাঁর সেই গবেষণাগ্রন্থের ভূমিকা লিখেছিলেন প্রখ্যাত লোকবিজ্ঞানী ড. মনসুর উদ্দীন। যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির স্বপ্ন তাঁর পূরণ হয়নি, তবু অজপাড়াগাঁয়ে বসে এমন উচ্চাভিলাষী গবেষণার চেষ্টা নিঃসন্দেহে মনন ও সাহসের একটি অনন্য উদাহরণ।

‘সবুজ পল্লী’র মাধ্যমেই লেখালেখির হাতেখড়ি হয়েছিলো আরেক প্রখ্যাত কবি-সাংবাদিক আজিজুল হাকিমের। পরবর্তী জীবনে তিনি নারায়ণগঞ্জের ‘সবুজ বাংলা’ ও কবি বে-নজীর আহমদের ‘নওরোজ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করে খ্যাতি অর্জন করেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী নার্গিস আশার খানমকে বিয়ে করার সূত্রেও তিনি পরিচিত। ‘ভোরের সানাই’, ‘মরুমেলা’, ‘ঘরহারা’, ‘পথহারা’সহ একাধিক কাব্যগ্রন্থ এবং হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের অনুবাদ রেখে গেছেন তিনি। একটি প্রান্তিক পত্রিকার হাত ধরে জাতীয় পর্যায়ের এমন সাহিত্যিক প্রতিভার উত্থান প্রমাণ করে, ‘সবুজ পল্লী’ নিছক একটি পত্রিকা ছিলো না, ছিলো একটি প্রজন্মের মেধা বিকাশের সূতিকাগার।

সেকালের বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, ‘সবুজ পল্লী’ যে-মানের লেখক তালিকা জুটিয়েছিলো, তা যেকোনো প্রতিষ্ঠিত পত্রিকার জন্যেও ঈর্ষণীয়। দ্বিতীয় বর্ষের একটি সংখ্যাতেই একসঙ্গে পাওয়া যায় অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদের চিঠি, আবুল ফজলের গল্প, ওমর খৈয়ামের ভাষান্তর, মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের প্রবন্ধ, তুর্গেনিভের অনূদিত রচনা, কবি জসীম উদ্দীন, হুমায়ুন কবির ও বন্দে আলী মিয়ার কবিতা। স্পষ্টতই বোঝা যায়, এই পত্রিকাটি কীভাবে জাতীয় পর্যায়ের সাহিত্যিকদেরও আকৃষ্ট করেছিলো। একটি অখ্যাত গ্রাম থেকে প্রকাশিত মাসিক পত্রিকায় এমন খ্যাতিমান লেখকদের নিয়মিত লেখা পাঠানো তৎকালীন সাহিত্য সমাজে ‘সবুজ পল্লী’ ও এর পেছনের মানুষদের সুদৃঢ় যোগাযোগ এবং গ্রহণযোগ্যতারও প্রমাণ।

আরো একটি কারণে ‘সবুজ পল্লী’ বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে সাম্প্রদায়িকতা যখন চরমে, স্বার্থান্বেষী মহল ধর্মের ধুয়া তুলে যখন মানুষকে বিভাজিত করছিলো আর লেলিয়ে দিচ্ছিলো পরস্পরের বিরুদ্ধে, তখন ‘সবুজ পল্লী’ হয়ে উঠেছিলো হিন্দু-মুসলিম মিলন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা প্রচারের এক অনন্যসাধারণ প্ল্যাটফর্ম। পত্রিকাটির বহু লেখাতেই সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে এবং হিন্দু-মুসলিম ভ্রাতৃত্বের পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। মোহাম্মদ হানীফ পাঠান এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘মসজিদ মন্দির ভিন্ন কিসে? উপাসনার ঘর জানি/এ নিয়ে দাঙ্গাটা কি? কেনই বা এ প্রাণহানি?’, ডা. বিপিনচন্দ্র পাল লিখেছিলেন, ‘আয়রে প্রবীণ! আয়রে নবীন জাতিভেদের ভুল ভুলে/মন্দির মসজিদ আজ যে রে ভাই মাপতে হবে এক তুলে’। আজিজুল হাকিমসহ অনেক লেখকের কলমেও উঠে এসেছিলো সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ঝেড়ে ফেলার আহ্বান। সে-কালের বাংলায়, বিশেষ করে একটি প্রত্যন্ত গ্রামীণ পত্রিকায়, এমন সচেতন অসাম্প্রদায়িক চেতনার চর্চা নরসিংদীর জন্যে আজো দৃষ্টান্ত হতে পারে। ঠিক একশো বছর পেরিয়ে এসে আমাদের সমাজ আজো সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে যখন বহুধাবিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন আমরা আদৌ ‘সবুজ পল্লী’র সময়কাল থেকে আধুনিক হতে পেরেছি কি না— এই প্রশ্ন তোলাই যায়।

আজো ‘সবুজ পল্লী’র সবক’টি সংখ্যা সংরক্ষিত আছে। এই বিরল কৃতিত্বের দাবিদার মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের পুত্র, গবেষক মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠান, যিনি এই মহামূল্যবান দলিলগুলোকে সযত্নে আগলে রেখেছেন। তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ও সংকলন গ্রন্থ রচনার কারণেই আজ নরসিংদীবাসী এই সমৃদ্ধ ইতিহাসের বিস্তারিত পাঠ নিতে পারছেন। এটি জেলার ইতিহাসচর্চার জন্যে নিঃসন্দেহে একটি বড়ো প্রাপ্তি।

পল্লীবাণী : কতিপয় কিশোরের কলমে রচিত বিপ্লব
‘সবুজ পল্লী’ প্রকাশের বছর আটেক আগেকার কথা। ১৯১৮ সাল। সেই বছরই যাত্রা শুরু করে শিবপুর ইংরেজি হাই স্কুল। প্রতিষ্ঠার বছরেই সপ্তম শ্রেণিতে সদ্য ভর্তি হওয়া দুই কিশোর তাঁদের সাহিত্যানুরাগী এক শিক্ষকের পৃষ্ঠপোষকতায় হাতে লিখে প্রকাশ করে ফেললেন চল্লিশ পৃষ্ঠার একটি সাহিত্য পত্রিকা, যার নাম হয় ‘পল্লীবাণী’।

এই দুই কিশোরের একজন ছিলেন বিপ্লবী ও কবি বে-নজীর আহমদ (১৯০৩-১৯৮৩), বন্ধুমহলে যিনি পরিচিত ছিলেন ‘বেনু মিয়া’ নামে। আর অন্যজন হলেন মৌলভী আবু তাহের— যিনি পরিচিত ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদের পিতা হিসেবে। তাঁদের প্রেরণাদাতা ছিলেন সপ্তম শ্রেণির শ্রদ্ধেয় শ্রেণি শিক্ষক সুরেশ বাবু। তাঁর উৎসাহেই এই দুই কিশোর সাহিত্যচর্চা ও পত্রিকা প্রকাশের মতো দুঃসাহসী কাজে হাত দিতে পেরেছিলেন।

কবি ও বিপ্লবী বে-নজীর আহমদ

বে-নজীর ও আবু তাহেরের বন্ধুত্বের গল্পটি বেশ আকর্ষণীয়। ১৯১৪ সালে নিজ গ্রাম আড়াইহাজারের ইলুমদী ছেড়ে বে-নজীরকে চলে আসতে হয়েছিলো মামাবাড়ি শিবপুরের ধানুয়া গ্রামে। ডাবল প্রমোশন নিয়ে ভর্তি হন একদুয়ারী নরমাল স্কুলের চতুর্থ শ্রেণিতে। এখানেই আবু তাহেরের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্ব। ১৯১৮ সালে শিবপুর হাই স্কুল প্রতিষ্ঠিত হলে দুজনই ভর্তি হন সপ্তম শ্রেণিতে, মোট ৭১ জন সহপাঠীর সঙ্গে। প্রথম ত্রৈমাসিক পরীক্ষায় ৯৫ গড় নম্বর পেয়ে শ্রেণিতে প্রথম হন বে-নজীর, আর কিছু কম নম্বর নিয়ে দ্বিতীয় হন আবু তাহের। পড়াশোনায় দুজন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও মাঠে ফুটবল খেলতে নামতেন একই দলের হয়ে। বে-নজীরের পজিশন ছিলো রাইট উইং আর আবু তাহের খেলতেন লেফট উইংয়ে। বে-নজীর ছিলেন দলের অধিনায়ক, আবু তাহের সহ-অধিনায়ক। তাঁদের নেতৃত্বে শিবপুর হাই স্কুল একের পর এক টুর্নামেন্ট জিতেছিলো। মেধা, বন্ধুত্ব আর ক্রীড়াশৈলীর এমন সহাবস্থান আজকের দিনেও এক আদর্শ উদাহরণ হতে পারে। প্রসঙ্গত, একশো বছরেরও বেশি আগে গ্রামীণ বাংলার একটি স্কুলে পড়াশোনা, খেলাধুলা আর সাহিত্যচর্চা— সবরকম চর্চার এই অবারিত সুযোগ এবং একইসাথে তিনটি ক্ষেত্রেই সমান পারদর্শী দুই কিশোরের এই সহাবস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়, তখনকার শিক্ষাব্যবস্থায় সামগ্রিক মানুষ গড়ে তোলার যে-প্রয়াসটা ছিলো, তা আজ শিক্ষার ‘শিল্পায়নে’র ডামাডোলে হারিয়ে গেছে।

মৌলভী আবু তাহের

‘পল্লীবাণী’ পত্রিকাটির আকার ছিলো ডবল ডিমাই, নিয়মিত পৃষ্ঠাসংখ্যা চল্লিশ, প্রয়োজনে যা বেড়ে গিয়ে ঠেকতো আটচল্লিশে। হাতে লিখে এতো বিশাল কলেবরের একটি সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করা মোটেও সহজ কাজ ছিলো না। পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নাম যেতো বে-নজীর আহমদ বেনু মিয়ার, প্রকাশক ছিলেন মোহাম্মদ আবু তাহের, আর প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের প্রিয় শিক্ষক সুরেশ বাবু। পত্রিকার শুরুতে থাকতো সম্পাদকীয়, তারপর মূল প্রবন্ধ ও কবিতা, যার অধিকাংশ লিখতেন বে-নজীর নিজেই। আবু তাহের নিয়মিত লিখতেন প্রকাশকের কথা, পাশাপাশি প্রবন্ধ-কবিতাও। ইতিহাসের এক পরিহাসই বলা যায়, শহীদ আসাদের পিতা হিসেবে যিনি সুবিদিত, সেই আবু তাহেরের একজন দক্ষ কবি ও সমাজসেবক পরিচয় কালের প্রবাহে অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে।

‘পল্লীবাণী’কে ঘিরে শিবপুর হাই স্কুলে গড়ে উঠেছিলো একটি পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যচক্র। বিখ্যাত সাংবাদিক ও লেখক আবুল কালাম শামসুদ্দীনের স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, স্কুলের বহু ছাত্র-শিক্ষক এই চক্রের সদস্য ছিলেন, তাঁরা লিখতেন, কেউ কেউ পৃষ্ঠপোষকতা করতেন, আর সবকিছুর যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনার ভার একাই সামলাতেন বে-নজীর। এই সাফল্য দেখে তাঁর শিক্ষক সুরেশ বাবু একদিন বলেছিলেন, “বেনু, কলম ছাড়বি নে, তোর কলম একদিন আমাদের মুখোজ্জ্বল করবে।” ইতিহাস সাক্ষী, শিক্ষকের সেই আশীর্বাদ বৃথা যায়নি। একটি সাধারণ গ্রামীণ স্কুলে পড়া একদল কিশোর-তরুণ যখন নিজেদের উদ্যোগে একটি সাহিত্যচক্র গড়ে তোলে, নিজেরাই লেখে, সম্পাদনা করে, নিজেরাই তা বিলি-বণ্টন করে— তখন বোঝা যায়, প্রত্যন্ত গ্রামে বসে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সহায়তা বা অর্থবিত্ত ছাড়াই কেবল আগ্রহ আর নিষ্ঠা দিয়ে কতো বড়ো সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব।

তবে ‘পল্লীবাণী’কে শুধু একটি সাহিত্য পত্রিকা বললে এর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই কাগজে সাহিত্য-সংস্কৃতির পাশাপাশি নিয়মিত ছাপা হতো ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন সংক্রান্ত প্রবন্ধ ও কবিতা। শিবপুর স্কুলে পড়ার সময় বে-নজীর ও আবু তাহের মিলে গড়ে তুলেছিলেন ‘আজাদ মুসলিম ছাত্র সমিতি’ নামে একটি সংগঠন, যাঁদের আদর্শ ছিলেন বিপ্লবী লেখক ইসমাইল হোসেন সিরাজী। প্রতি বছর তাঁকে প্রধান অতিথি করে শিবপুরে আনতেন এই কিশোরের দল। তাঁর অনলবর্ষী বক্তৃতা শুনেই বে-নজীরের ভেতর অঙ্কুরিত হয় বিপ্লবী চেতনার বীজ। মেট্রিক পাশ করার পরই বে-নজীর বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে যোগ দেন কলকাতার বিপ্লবী মহলে। পরিবার তাঁকে ফিরিয়ে এনে ঢাকা জগন্নাথ কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়, কিন্তু ততোদিনে তিনি সর্বান্তকরণে হয়ে উঠেছেন বিপ্লবী। একে একে তিনি যুক্ত হন ‘যুগান্তর’ ও ‘অনুশীলন’-এর মতো সংগঠনে, শেষে ১৯২৫ সালে ফজলুল হক সেলবর্ষীর সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন ‘আজাদ পার্টি’, যার পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় ছিলেন কবি নজরুল ইসলাম, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো ব্যক্তিরা। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই যাত্রার শুরুটা কোনো রাজনৈতিক দলের ছাতার নিচে হয়নি, হয়েছিলো ‘পল্লীবাণী’কেন্দ্রিক চর্চার অভ্যাস থেকে। কৈশোরের সেই অভ্যাসই ধীরে ধীরে বে-নজীরকে তৈরি করেছিলো একজন সংগঠক, একজন নেতা এবং শেষ পর্যন্ত একজন বিপ্লবী হিসেবে।

বে-নজীর শিবপুর ছেড়ে চলে গেলে ‘পল্লীবাণী’র দায়িত্ব নেন তাঁর ছোটো ভাই গোলাম রব্বানী রবু মিয়া। ভাইয়ের মতো দক্ষ না হলেও পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রাখেন তিনি। কিন্তু স্থানীয় জমিদার-জোতদারদের অত্যাচার-নিপীড়নের চিত্র নিয়মিত তুলে ধরার কারণে পত্রিকাটি ক্রমেই হয়ে ওঠে ক্ষমতাসীনদের চোখের কাঁটা। শেষ পর্যন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে সিআইডি এসে পত্রিকার ছয়টি সংখ্যা বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে যায়। সেই ঘটনার পর আর প্রকাশিত হয়নি ‘পল্লীবাণী’। একটি স্কুল-পত্রিকা রাষ্ট্রযন্ত্রের নজরে এতোটাই প্রভাবশালী বিবেচিত হয়েছিলো যে, সেটা বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ এসেছিলো স্বয়ং জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে— এই একটি ব্যাপারই প্রমাণ করে, ‘পল্লীবাণী’ নেহাত একটি দেয়ালিকা বা শখের রচনা ছিলো না, বরং ছিলো পূর্ণাঙ্গ একটি পত্রিকা।

পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হওয়ার পরও বে-নজীর থেমে থাকেননি। শিবপুর থানার সাধারচর গ্রামে অত্যাচারী জোতদারের বাড়িতে অভিযান পরিচালনা থেকে শুরু করে কালীগঞ্জ, কলকাতা, নোয়াখালীসহ একাধিক স্থানে সাহসী অভিযান চালিয়ে বে-নজীর হয়ে ওঠেন কিংবদন্তী বিপ্লবী। দুঃসাহসী এক কিশোর—  সম্পাদকের কলাম থেকে শুরু হওয়া যার যাত্রা মিশে গিয়েছিলো জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনের স্রোতধারায়— ইতিহাসে এমন অনুপ্রেরণাদায়ী দৃষ্টান্ত বিরল।

‘সবুজ পল্লী’ বনাম ‘পল্লীবাণী’ : বিতর্কের ঊর্ধ্বে সমাজের আলোকবর্তিকা
প্রশ্ন করা যেতে পারে, ‘সবুজ পল্লী’ আর ‘পল্লীবাণী’র মধ্যে পার্থক্যটা ঠিক কোথায়? সহজ চোখে দেখলে, একটি ছাপা পত্রিকা, আরেকটি হাতে লেখা। অনেকে হাতে লেখা পত্রিকাকে সাধারণভাবে দেয়াল পত্রিকা বলেও চিহ্নিত করে থাকেন। কিন্তু ‘পল্লীবাণী’র বেলায় এই সংজ্ঞা খাটে না। এর প্রতিটি সংখ্যায় ছিলো সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, কবিতা, সংবাদ— অর্থাৎ একটি পূর্ণাঙ্গ পত্রিকার সবরকম বৈশিষ্ট্যই ছিলো তাতে। স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি, সিআইডির তদন্ত আর শেষ পর্যন্ত পত্রিকা বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, প্রকাশের মাধ্যম হাতে লেখা হলেও এর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব একটি প্রকৃত পত্রিকার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বরং বেশিই ছিলো।

সংবাদপত্র বিষয়ক গবেষণায় হাতে লেখা বা দেয়াল পত্রিকাগুলোকে অনেক সময় হিসাবের বাইরে রাখা হয়, কারণ সেগুলোর সংরক্ষণ ও নথিভুক্তি তুলনামূলক দুর্বল। কিন্তু ‘পল্লীবাণী’ নিছক হাতে লেখা হওয়ার কারণে উপেক্ষিত থাকার মতো প্রকাশনা ছিলো না। বরং বিষয়বস্তুর গুরুত্ব ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাবকে পত্রিকার মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করলে ‘পল্লীবাণী’ সেখানে চোখ বন্ধ করেই উত্তীর্ণ হয়।

প্রকাশকাল বিচারে তাই নরসিংদী জেলার প্রথম পত্রিকার মর্যাদা  ‘পল্লীবাণী’ই দাবী করতে পারে। সেক্ষেত্রে ‘সবুজ পল্লী’ থেকে যাবে জেলার প্রথম ছাপাকৃত পত্রিকা হিসেবে। এই ঐতিহাসিক বিতর্কের সমাধান পুরোপুরিই পাঠক ও গবেষকদের হাতে। তবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে দুটো পত্রিকাই আসলে একই সত্যের দুটি দিক তুলে ধরে, যা হলো— নরসিংদীর মাটি সেই বিশ শতকের গোড়াতেই ছিলো চিন্তার বিকাশ, সাহিত্যচর্চা, সাংবাদিকতা ও সমাজ-সচেতনতার এক উর্বর ক্ষেত্র। একদিকে পল্লী উন্নয়নের স্বপ্নে বিভোর তরুণদের ‘সবুজ পল্লী’, অন্যদিকে কতিপয় কিশোরের দুঃসাহসী কলমে জন্ম নেওয়া ‘পল্লীবাণী’— দুটোই আসলে একই গ্রন্থের দুই অধ্যায়ের মতো, যা মূলত একে অন্যের পরিপূরক, প্রতিদ্বন্দ্বী নয়।

ইতিহাস কখনো একবারেই পুরোপুরি লিখে ফেলা সম্ভব নয়, বরং এটি ক্রমাগত সংশোধিত ও সমৃদ্ধ হতে থাকে নতুন নতুন গবেষণা ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে। মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের মতো গবেষকদের নিষ্ঠাবান পরিশ্রমে যেমন ‘সবুজ পল্লী’র সম্পূর্ণ ইতিহাস আজ সংরক্ষিত ও সহজলভ্য, তেমনি নতুন প্রজন্মের গবেষকদের কাছেও এখন খোলা রয়েছে ‘পল্লীবাণী’ সংক্রান্ত আরো তথ্য উদ্ধারের সুযোগ। কবি বে-নজীর বা আবু তাহেরের বংশধরদের কাছে যদি এই পত্রিকার কোনো সংখ্যা এখনো সংরক্ষিত থেকে থাকে, তা আবিষ্কার করা গেলে নরসিংদীর সাহিত্য-সাংবাদিকতার ইতিহাসে আরেকটি পালক যুক্ত হবে।

দুই পত্রিকার এই ইতিহাস নরসিংদীর গণমাধ্যমচর্চার শিকড়ের সৃজনশীলতা ও শক্তিমত্তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলায় প্রান্তিক জনপদগুলোও কীভাবে নিজেদের মতপ্রকাশ, সাহিত্যচর্চা ও সমাজ-সংস্কারের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিয়েছিলো— তার জীবন্ত উদাহরণ এই দুই পত্রিকা। ঢাকা বা কলকাতার মতো কেন্দ্রীয় শহরের ছায়ায় নয়, বরং এই অজপাড়াগাঁয়ে নিজেদের সীমিত সামর্থ্য নিয়েই নরসিংদীর মানুষের সাহিত্য ও সাংবাদিকতার এরকম দুঃসাহসী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করাটা নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ ও চিন্তাউদ্দীপক।

এই দুই পত্রিকার তুলনামূলক পাঠ থেকে আরো যে-চিত্রটি স্পষ্ট হয়, তা হলো, সেকালের নরসিংদীতে সময় ও সমাজের প্রয়োজন অনুধাবন করে বয়স নির্বিশেষে মানুষ সংগঠিত হতে জানতো। যেখানে ‘সবুজ পল্লী’ গড়ে উঠেছিলো পূর্ণবয়স্ক সমাজকর্মী ও শিক্ষিত মানুষের সচেতন প্রয়াসে, সেখানে ‘পল্লীবাণী’ প্রমাণ করেছে, নেতৃত্ব ও সৃজনশীলতার জন্যে বয়স কোনো বাধা নয়। সপ্তম শ্রেণির একজন কিশোর যদি প্রশাসনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সত্য তুলে ধরার দুঃসাহস দেখাতে পারে, তবে তা আজকের কিশোর-কিশোরীদের জন্যেও এক জোরালো বার্তা বহন করে। আজকের নরসিংদী তার এই সমৃদ্ধ অতীতকে যতো বেশি সামনে নিয়ে আসবে, ততোই নতুন প্রজন্মের কাছে তা হয়ে উঠবে অনুপ্রেরণার উৎস।

নরসিংদীর প্রথম পত্রিকা কোনটি— এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর যা-ই হোক না কেনো, আসল প্রাপ্তি হলো এই দুটো পত্রিকার মধ্য দিয়ে উন্মোচিত হওয়া নরসিংদীর সেই গৌরবোজ্জ্বল অতীত, যেখানে মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলো পল্লীর অন্ধকার দূর করে দেশের উন্নতির, যেখানে কতিপয় দুঃসাহসী কিশোর স্বপ্ন দেখেছিলো কলম দিয়ে সমাজ বদলানোর, আর এইসব স্বপ্নের পথ ধরেই একদিন জন্ম নিয়েছিলো জাতীয় পর্যায়ের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, বিপ্লবী। এই ঐতিহ্যকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ, গবেষণা ও উদযাপন করা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা জেলা প্রশাসন উদ্যোগী হলে ‘পল্লীবাণী’ ও ‘সবুজ পল্লী’ নিয়ে আরো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা, প্রদর্শনী, আলোচনা বা সেমিনার আয়োজন করা সম্ভব, যা এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরো প্রাণবন্তভাবে পৌঁছে দেবে। তা করা গেলে নরসিংদী শুধু একটি জেলা নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেও দাবি করতে পারবে তার প্রাপ্য গৌরবের আসন।


তথ্যসূত্র
সাংবাদিক ও গবেষক আপেল মাহমুদের রচনা।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ