বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর, আমার মতিউর

আমি মতির বউ মিলি। কিন্তু মতি আমাকে কখনো মিলি বলে ডাকেনি। ডেকেছে বউ, বধূয়া আর মিতি বলে। তবে মিতি নামটা ওর সবচেয়ে পছন্দের ছিলো। মিলির ‘মি’ আর মতির ‘তি’ দিয়ে ডাকতো মিতি বলে।

আশ্চর্যরকম গান-পাগল প্রাণোচ্ছল এক মানুষ ছিলো মতি। অনর্গল কথা বলতে পারতো। আওয়াজ না করে ঠোঁট চেপে অদ্ভুতভাবে হাসতো। সারাক্ষণ হৈচৈ করা এক পাগল লোক ছিলো মতি। আমার বিয়ের পরপর আমাদের বাড়ির আমগাছ থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে আম পাড়া দেখে আমার নানি চিৎকার করে বলেছিলেন : এ যে দেখি এক ‘লাফাইন্যা জামাই’ আইলো।

আর আমি মিলি, মিতি হলাম ১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল। যেদিন আমরা প্রথম দুজন দুজনকে দেখেছিলাম, সেদিন চোখাচোখি হতেই সবার অলক্ষ্যে দুজন একই সাথে হেসেছিলাম। সেই ঠোঁট চেপে অদ্ভুত সুন্দর হাসি। এই নিয়ে আমরা পরে কতো হেসেছি।

বিয়ের পর যথাসময়ে পিণ্ডিতে পৌঁছালাম। গাড়ি করে চাকলালায় কুদ্দুস ভাইয়ের ফ্যামিলি মেসে উঠলাম। নতুন বিয়ে করা বউ, তাই প্রায়ই দাওয়াত থাকতো। দাওয়াতে গিয়ে পরিচয় করিয়ে প্রথমেই বলতো, “আমার বউ কিন্তু উর্দু বলতে পারে না। তবে ইংরেজি জানে।” বলেই পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে থাকতো। আমি বলতাম, “আচ্ছা, বন্ধুদের সামনে আমাকে এভাবে অপদস্থ করার মানে কী? আমি তো কাজ চালাবার মতো উর্দু বলতে পারি।” কেননা আমাদের ছোটোবেলায় বাংলার সাথে সাথে উর্দু পড়তে হতো এবং সপ্তাহে তিনদিন উর্দুতে জাতীয় সংগীত গাইতে হতো। তাই আমরা কিছু কিছু উর্দু বলতে পারি। “যদি তা-ই হয়, তবে পশ্চিম পাকিস্তানের স্কুলগুলোতে উর্দুর সাথে কেন বাংলা পড়ানো হয় না ও বাংলায় জাতীয় সংগীত গাওয়ানো হয় না?” কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও যা বললো আমি তো অবাক। “বিয়ের সময় যখন জানলাম তুমি হলিক্রসের ছাত্রী, তখনই বুঝেছিলাম যে, মোটামুটি ভালোই ইংরেজি বলতে পারবে। আর আমি বন্ধুদের সামনে গর্ব করে বলতে পারবো যে, আমার বউ উর্দু জানে না।” আরো বললো, “আমি উর্দু বলা একদম পছন্দ করি না। ওদের মুখে কোনোদিন বাংলা শুনিনি, অথচ আমরা বাঙালিরা সব সমানে উর্দু বলে চলেছি। কিন্তু কেন? আর কতোদিন এভাবে চলবে? তুমি যে আমার কতোখানি শক্তি তুমি তা জানো না।”

যথারীতি ’৭১-এর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে মতি আমাদের সাথে ঢাকায় যোগ দেয়। ইতোমধ্যে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে চলছে প্রচণ্ড চাপা উত্তেজনা। রাজনীতির মোড় কখন কোনদিকে যাবে, তার আলাপ-আলোচনা চলছে। তবে এবার যে বড়ো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, এটা সবাই বুঝতে পারছে।

এলো ২১ ফেব্রুয়ারি। ভাইদের সাথে প্রভাতফেরি করে শহীদ মিনার হয়ে মতি বাড়ি ফিরলো। জিজ্ঞেস করলাম, “কেমন লাগছে?” বললো, “অসম্ভব ভালো। মেয়েরা বড়ো হচ্ছে। আমাদের সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যেন মেয়েরা কোনোভাবেই উর্দু কথা না শিখতে পারে।” বললাম, “ঐ দেশে থাকলে তো শিখবেই। ওরা স্কুলে যাবে না?” ও বললো, “না ওরা ঐ দেশে স্কুলে যাবে না। আমি চেষ্টা তদবির করে তার আগেই ঢাকায় বদলি নিয়ে নেবো। তুমি ওদেরকে হলিক্রস স্কুলে পড়াবে। আর এবার যাবার সময় ছোটো একটা বাঙালি মেয়ে নিয়ে যাবে, যাতে মাহীন-তুহিন বাংলা শিখতে পারে।” “কেন, আমি পারবো না বাংলা শেখাতে?” ও বললো, “অবশ্যই পারবে। তবে ওদের তো খেলার সাথীও দরকার হবে। পাকিস্তানি বাচ্চাদের সাথে খেললেই ওরা উর্দু শিখে ফেলবে। কাজেই বাঙালি বাচ্চার সাথে খেলে পুরোপুরি বাঙালি হোক, এটাই আমি চাই।”

৭ মার্চ ১৯৭১। দলে দলে মানুষ রেসকোর্সের মাঠে জড়ো হতে শুরু করলো। মতিও তার ভাইদের সাথে রওনা হয়ে গেলো। যাওয়ার আগে কানের কাছে এসে বলে গেলো, “আজ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে।” আর আমরা যারা ঘরে রয়ে গেলাম, সবাই টেলিভিশনের সামনে বসে সেই চরম মুহূর্তের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলাম। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে উঠলো শুধু মানুষ আর মানুষ। এতো মানুষের ভিড়ে আমার মানুষটাও কোথাও অধীর আগ্রহে বসে আছে বিশেষ একটা ঘোষণার আশায়।

অবশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্ব নিয়ে মঞ্চে উঠে সবার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লেন। সমস্ত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়লো। ভাবগম্ভীর গলায় তিনি তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ শুরু করলেন। এই এক ঘোষণায় সাত কোটি বাঙালির আত্মা এক হলো, শক্তি এক হলো, চিন্তা এক হলো; সর্বোপরি একই প্রতিজ্ঞায় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো— দেশকে শোষণমুক্ত করে স্বাধীন করতে হবে। সব ভাইসহ মতি শ্লোগান দিতে দিতে বাড়ি ফিরলো।

খুব কাছে এসে শক্ত করে দু’হাতে আমার ঘাড় ধরে ফিসফিস করে বললো, “আমরা আর পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরে যাবো না, যা হবার তা হবে। দেশের এই অবস্থা, আমাদের সবারই সক্রিয়ভাবে কিছু-না-কিছু কাজ করা উচিত।” ঠোঁট টিপে হেসে কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললো, “আমি জানি আমার মিতি আমাকে সহযোগিতা করবে।”

এরপর থেকে দেখি মতি বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়লো নানা কাজে। রোজ বাইরে যায়। নানারকম খবরাখবর নিয়ে চিন্তিত মুখে বাড়ি ফেরে। আমি মাহীন-তুহিনকে নিয়ে প্রায় সময় বাড়িতেই থাকি। মাঝে-মধ্যে মা-ও বাসায় যায়। আসলে দেশের ঐ-পরিস্থিতিতে বাচ্চাদের নিয়ে খুব একটা বেড়াবার ইচ্ছা হতো না।

হঠাৎ একদিন ভোরবেলা মতি বলে উঠলো, “আমি মনস্থির করেছি পশ্চিম পাকিস্তানেই ফিরে যাবো।” বললাম, “দেশের জন্যে কিছু করতে চেয়েছিলে তুমি, তার কী হবে?” সে বললো, “অবশ্যই করবো, তবে সেটা যে এখান থেকেই করতে হবে— এমন তো কোনো কথা নেই। বরং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যদি কিছু করা যায়, তবে ওদের পরাজয় আরো বেশি হবে। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, পশ্চিম পাকিস্তানে যে-সমস্ত বাঙালি আছে, তারা এখানকার কোনো সঠিক খবরও পাচ্ছে না। তাছাড়া তোমাদের সাথে নিয়ে তো আর যুদ্ধ করা যাবে না। আমাদের জন্যে কোনো পরিবার আরো বিপদে পড়ুক— তা-ও নিশ্চয়ই আমাদের চাওয়া উচিত নয়। মানে আমি তোমাদের কীভাবে কোনো পরিবারের সাথে রেখে যাবো— তা ভেবে পাই না। তাই বলছিলাম আমরা চলেই যাই।” মে মাসের ৯ তারিখ রোজী আপাসহ আমরা করাচির উদ্দেশে রওনা হয়ে যাই।

…একদিন দেখি খাবার টেবিলে কবীর ভাইয়ের সাথে ম্যাপ বের করে কাজ করছে। কবীর ভাই ছিলেন ‘নেভিগেটর’। মনে মনে বললাম, এবার বোধহয় কোনো রাস্তা পাওয়া গেলো। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মতি বললো, “ভারত যাচ্ছি। তোমরা দুই বোন মিলে তাড়াতাড়ি লিস্ট তৈরি করো। ঠাট্টা নয়, সত্যি সত্যি ভারত যাচ্ছি।” বললাম, “কীভাবে যাচ্ছো?” বললো, “সেটারই তো প্ল্যান করছি কবীর ভাইয়ের সাথে।” বললাম, “প্লেন পাবে কোথায়?” বললো, “সব হয়ে যাব। শুধু তুমি শক্ত থাকবে। তোমার উপর সব নির্ভর করছে। তোমার সহযোগিতা ছাড়া আমার একার পক্ষে এ-কাজ করা সম্ভব নয়।” আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি, “আমাকে কী করতে হবে?” বললো, “কিছু করতে হবে না। প্রথমে শোনো আমি কী করবো। তুমি জানো, আমি ‘ফ্লাইট সেফটি অফিসার’-এর কাজ করছি। কাজেই প্রথমে পাইলটসহ একটা ট্রেইনার প্লেন হাইজ্যাক করে ভারতে যাবো। যেই আমি চলে যাবো, তখনই তারা মাহীন-তুহিনসহ তোমাকে জেলে দেবে। একটু-আধটু অত্যাচার করবে, কিন্তু মারতে পারবে না। কারণ, আমার কাছে থাকবে পাকিস্তানি পাইলট। সেই পাইলটের পরিবার তখন পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেবে পাইলটকে ফিরিয়ে আনতে। আর তখনই চুক্তি হবেÑ পাকিস্তান থেকে মতিউরের পরিবার যাবে ভারত আর ভারত থেকে ফেরত আসবে পাকিস্তানি পাইলট। তবে এখানে একটা কিন্তু আছে। সেটা হলো— পশ্চিম পাকিস্তান হচ্ছে আমাদের বাঙালিদের জন্যে একটা বিরাট শত্রুশিবির। আর সেই শত্রুশিবিরে আমি তোমাকে মাহীন-তুহিনসহ জেনেশুনে রেখে যাবো— এক কথায়, স্বাধীনতার জন্যে তোমাদের শত্রুর হাতে আমি নিজে তুলে দিয়ে যাবো। তোমরা আমার জীবন— সেই জীবনকেই কিছুদিনের জন্যে বাজি রাখতে হবে আমাকে। এখন শুধু তোমার উত্তর চাই।” বললাম, “তুমি আমাকে এসব কথা না বলেও করতে পারতে। তোমার কষ্ট কম হতো।” বললো, “ভুল কথা, কষ্ট আরো বাড়তো। এই কষ্টের সাথে তোমাকে ধোঁকা দেবার কষ্ট যোগ হতো। আমরা সবসময় একে অপরের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছি, কখনো কোনো কাজ আমরা একে অপরকে ফাঁকি দিয়ে করিনি। তবে আজ এই বিশ্বাস আমি কেমন করে ভাঙবো? আমরা তো কোনো অন্যায় চিন্তা করছি না, দেশের স্বাধীনতার জন্যে আমরা আর কীভাবে কাজে লাগতে পারি, তা-ই চিন্তা করছি।” আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম, “তোমার ভিতরে একটা কিছু করার জন্যে যে-শক্তি কাজ করছে, সেই শক্তিকে বাধা দিতে হলে তারচেয়েও বড়ো শক্তির দরকার। আর আমার শক্তি তো তুমি, তোমাকে বাধা দেবার শক্তি আমি কোথায় পাবো?…”
দিন গড়িয়ে যায়। একদিন পাঁচ হাজার টাকা হাতে দিয়ে বললো, “রেখে দাও, কাজে লাগবে।” ১৪ বা ১৫ তারিখ হবে। ঘুম থেকে উঠে বলছে, “জানো, স্বপ্নে দেখলাম আমি একটা প্লেন পেয়েছি, কিন্তু তা দিয়ে কিছুতেই সামনের দিকে এগোতে পারছি না। সবাই প্লেনের লেজটা টেনে ধরে রেখেছে। অদ্ভুত স্বপ্ন।” বললাম, “আসলে তোমার মাথায় তো একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। কাজেই প্লেন ছাড়া আর কী স্বপ্ন দেখবে?” ও বললো, “তবে স্বপ্ন আমি যা-ই দেখি না কেন, অ্যাক্সিডেন্টে আমার মৃত্যু হবে না— এটা তোমাকে বলে রাখলাম, দেখো।”

খাওয়ার ঘরে একদিন ক্লোরোফরমের একটা ছোটো শিশি দেখলাম। দেখলাম শেখ মুজিবের কিছু ছবি, নানারকম ম্যাপ ইত্যাদি। মতি নতুন ইউনিফর্ম বানালো। বিয়ের ঘড়িটা খুলে রেখে সার্ভিসের ঘড়ি পরা শুরু করলো। লাল ছাপার শাড়ি পরে যে-ছবিটা স্টুডিওতে তুলেছিলাম, একদিন দেখি সেই ছবিটা মানিব্যাগে ঢোকাচ্ছে। দিনে দিনে মতির অস্থিরতা বাড়তে থাকলো, সাথে গান শোনাও বাড়তে থাকলো।

একদিন অফিস থেকে ফিরে এলো মুখ ভার করে। জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?” উত্তর দিলো না। হাত ধরে পাশে বসালো। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছিলো। জগন্ময় মিত্রের চিঠির ওপর একটা গান ছিলো ‘তুমি আজ কতদূরে’— সেই রেকর্ডটা বাজাতে শুরু করলো। গান শেষ হলে যেই আমি উঠতে গেলাম, বললো, “আর একটু বসে থাকো আমার কাছে।” কিছুক্ষণ পর বললো, “চলো, রোজী আপাদের নিয়ে আসি। আমাদের সাথে কিছুদিন থাকবে।”

কেন জানি সেই দিনের পর থেকে ওর কোনো কথায় আর ‘না’ বলতে পারি না। সব কথায় সায় দিই। আসলে মনে মনে দু’জনেই কিছু-একটা ঘটার অপেক্ষায় আছি। বোন-দুলাভাই আসলো। বাচ্চাদের ঘরটা ছেড়ে দিলাম। ১৮ আগস্ট দু’জনে হাঁটতে হাঁটতে মেসে গিয়ে চিঠি চেক করলাম। তারপর বাসার পাশে পার্কে দোলনায় দু’জনে পাশপাশি বসলাম। ও নিজের মনে বলতে থাকলো, “২৬ মার্চ দেশের গ্রামে থাকলাম অথচ ওপারে যেতে পারলাম না। তোমাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি পাঠালাম, সেটা তোমার হাতে পৌঁছালো না। এখানে এলাম কিন্তু একটা প্লেন পাচ্ছি না। কেন বারবার এমন হয়? আল্লাহ কি আমাকে কখনো সুযোগ দেবে না?” ও আমার হাতদুটো ধরে বললো, “তোমাকে তিনটা কথা বলবো। জানি, তুমি আমার কথা ফেলতে পারবে না। প্রথমত, আমার মাকে তুমি দেখো। দ্বিতীয়ত, তুমি কখনো শাদা শাড়ি পরবে না। তৃতীয়ত, খুব সুন্দর দেখে একটা ছেলে বিয়ে করবে। এতে লোকে তোমাকে খারাপ বলবে। লোকের কথা গায়ে মাখবে না। আমরা দু’জন দু’জনকে জানি। আমরা কেউ কাউকে না জানিয়ে কিছু করি না। কাজেই আমি জানলাম, তুমি বিয়ে করবে।”

ভোরবেলা মতি কাছে এসে বললো, “দোয়া করো যেন আজ আকাশে মেঘ না থাকে।” ‘খোদা হাফেজ’ বলে গাড়ি যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে ঘরে ফিরে এলাম। মাথার মধ্যে রাত্রের কথাগুলো ঘুরপাক খেতে লাগলো। মতির আগের কথার সাথে গত সন্ধ্যার কথাগুলো মেলাতে পারছিলাম না। সারাক্ষণ কান খাড়া করে রাখলাম। একটু শব্দেই চমকে উঠছি। এভাবে কখন যে দুটো বেজে গেছে, টেরই পেলাম না। টের পেলাম মতির গাড়ির হর্নের আওয়াজে।

ইতোমধ্যে সমস্ত ব্যাপারটা আমি বুঝে ফেললাম। ততোক্ষণে মতির নির্দেশগুলো একের পর এক মনে মনে হিসেব করে সাজিয়ে নিলাম। মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত করলাম। শেখ মুজিবের ছবি ও অন্যান্য সব কাগজপত্র একে একে পুড়িয়ে ছাইগুলি বাথরুমে নিয়ে কমোডে ফ্ল্যাশ করলাম। পোড়ানোর জায়গাটা ভেজা কাপড় দিয়ে মুছেও দিলাম। এরপর বাচ্চাদের নিয়ে চুপচাপ বসে একমনে আলাহকে ডাকতে থাকলাম। মতি যে শেষপর্যন্ত একটা প্লেন নিয়ে যেতে পেরেছে, সেজন্যে মনে মনে আল্লাহর কাছে শোকর করে বলছিলাম, ‘আল্লাহ, ও যেন ভালোভাবে ভারতে পৌঁছে যায়।’ এমন সময় দুলাভাইয়ের গাড়ি গেটের কাছে আসতেই আমি এক ছুটে গিয়ে চিৎকার করে বলি, “দুলাভাই, মতি এখনো ফিরে নাই। অফিসে একটু খোঁজ নিয়ে আসেন।” দুলাভাই চলে গেলেন খোঁজ নিতে, আর আমি পা বাড়ালাম ঘরের দিকে। হঠাৎ নজরে পড়লো, দূর থেকে ফ্লাইং অফিসার মিজান হাত দিয়ে ইশারা করছে— মতি ভাই চলে গেছে। আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘরে ফিরে নির্দেশমতো রেডিও নিয়ে বসে কাঁটা ঘোরাতে থাকলাম। হাইজ্যাক হওয়া একটি পাকিস্তানি বিমানের ভারতে নিরাপদে অবতরণের ঘোষণাটি কোথাও শুনতে পেলাম না। আমি অস্থিরভাবে হাঁটাহাঁটি করছি আর মনে মনে বলছি— ‘আল্লাহ, মতিকে তাড়াতাড়ি ভারতে পৌঁছে দাও।’ শুকনো মুখে দুলাভাই ফেরত এসে জানালেন, মতি প্লেন নিয়ে চলে গেছে আর আমাদেরও এখনই চলে যেতে হবে। বলে বউ-বাচ্চা নিয়ে তিনি চলে গেলেন।

এমন সময় দেখলাম, গেট দিয়ে ওর কমান্ডিং অফিসার রান্দাভা অন্য দুইজন অফিসারসহ সোজা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। অভিনয়— হ্যাঁ, আমাকে অভিনয় করতে হবে মতির নির্দেশমতো। আপনি-তুমি ভুলে গেলাম। শুধু বললাম, ‘আল্লাহ আমাকে শক্তি দাও, আমি যেন ভয় না পাই।’ রান্দাভা কিছু বলার আগেই আমি চিৎকার করে কেঁদে বললাম, “মতি সকালে অফিসে গিয়ে আর ফিরে আসে নাই কেন? কেন আমার বাড়ির সামনে এতো পুলিশ? কী হয়েছে আমার মতির? উত্তর দাও।” গম্ভীর মুখে সে বললো, “তোমার বেডরুমে চলো।”

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘরের সমস্ত জিনিস তারা পর্যবেক্ষণ করে ধীরে ধীরে বললো, “শোনলাম, তুমি কাল রাতে মতির সাথে ঝগড়া করেছো বলে মতি রাগ করে চলে গেছে। আমরা মতিকে খুঁজতে তোমার কাছে এসেছি।” আমি বললাম, “আমি কোনো ঝগড়া করিনি। তোমরা মতিকে কোথায় লুকিয়ে রেখেছো বলো।” এবার গলার স্বর নরম করে বললো, “দেখো, আমি সি. ও., আমার সব খবর রাখতে হয়। মতিকে আমি ভালোভাবেই চিনি। ও তোমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারে না। কাজেই গতকাল রাতে এমন কিছু ঘটেছে, যার জন্যে মতি রাগ করে কোথাও চলে গেছে। তুমি নিশ্চয়ই জানো, কোথায় যেতে পারে ও। বললে আমিও তোমাকে সাহায্য করতে পারি।” ও যতোখানি নরম হয়ে কথাগুলি বলেছিলো, আমি ততোখানিই চিৎকার করে বলেছিলাম, “তোমরা নিশ্চয়ই মতিকে মেরে ফেলে এখন আমার উপর দোষ চাপাতে এসেছো। প্লিজ তোমরা আমার মতিকে এনে দাও।” রান্দাভা চুপচাপ চলে গেলো। বলে গেলো আবার আসবে। আবার রেডিওর কাছে যেয়ে কাঁটা ঘোরাতে লাগলাম সেই লাইনটা শোনার জন্যে। কিন্তু না— কোনো খবর শোনলাম না।

সন্ধ্যার দিকে রান্দাভা আবার এলো। সাথে দুই-তিনজন অফিসার। এবার এসে আমাকে পাশ কাটিয়ে বেডরুমে ঢুকে সমস্ত জিনিস উল্টেপাল্টে ফেলতে লাগলো। একে একে সবক’টি ঘরে গিয়ে একই কাজ করলো। কোথাও কিছু না পেয়ে প্রচণ্ড নোংরা ভাষায় মতিকে গালি দিতে থাকলো। আমাদের ছবি মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে পা দিয়ে তাতে লাথি মারলো। আমি তুহিনকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছি। মাহীন ভয় পেয়ে আমার পা ধরে কাঁদছে। এবার কিছু না বলেই সবাই চলে গেলো।

২১ তারিখ বারান্দায় যেতেই দেখি, সামনের বারান্দায় নিপুণকে কোলে নিয়ে রোজী আপা জোরে জোরে চিৎকার করে কাঁদছে। আমাকে দেখামাত্রই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমাকে ছুঁতে চেষ্টা করলো, অথচ দুই বারান্দার মাঝে দূরত্ব কম করে হলেও ২৫-৩০ ফিটের মতো হবে। রোজী আপার কান্না দেখে উল্টো আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, “প্লিজ তুমি কেঁদো না। মতি ঠিকই পৌঁছে গেছে, সুযোগ পেলেই আমাদের খবর পাঠাবে। শুনে রোজী আপা আরো জোরে কাঁদতে লাগলো। কতোক্ষণ পর দেখি, রোজী আপা প্লেটে করে খাবার সাজিয়ে নিয়ে আসছে আমার জন্যে। কিন্তু গেটে পুলিশ বাধা দিয়ে বললো, “পারমিশান নেই, উনি কারো দেয়া খাবার খেতে পারবেন না। যদি খাবারের সাথে আপনি কিছু মিশিয়ে থাকেন?” আপা বললেন, “আমার বোনকে আমি মেরে ফেলবো, এটা আপনি কী বলছেন? এই দেখুন, আমি খেয়ে দেখাচ্ছি, এতে কিছু মেশানো নেই।” “তবু উনার বাইরের খাবার খাওয়ার পারমিশান নেই।”

আমার বোন কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্দাভা এসে জানালো, “মতির খবর পাওয়া গেছে। তবে কোথায় গেছে, তা কেউ সঠিকভাবে বলতে পারছে না। তোমাকে কি কিছু বলে গেছে?” আমি বললাম, “আমাকে তো বলে গেছে, অফিসে যাচ্ছি, তাহলে নিশ্চয়ই তোমরাই কোথাও পাঠিয়েছো। তোমার উচিত তাকে তাড়াতাড়ি বাড়িতে পাঠানো। বাচ্চারা অস্থির হয়ে আছে।” তখন রান্দাভা ঘরে ঢুকে আলমারি, ড্রয়ার সবকিছু তছনছ করে খুঁজতে থাকলো যদি কিছু ক্লু পাওয়া যায়। কিছু না পেয়ে গালাগালি করে চলে গেলো।

বিকেলের দিকে দেখলাম, মতির কিছু পাকিস্তানি বন্ধু তাদের বউসহ গেট দিয়ে ঢুকলো। এতোক্ষণে বুঝলাম, কেন রেডিওতে সেই বিশেষ খবরটি শুনতে পাইনি। কেন আমার বোন সকাল থেকে কেঁদে যাচ্ছে। ওর বন্ধুরা বললো, “ভাবী, মতি আর নেই। উনার মৃতদেহ পাওয়া গেছে। চলো দেখতে যাবে।” আমি কাঁদলাম না। কান্না পেলো না। শুধু বললাম, “আমার বোনকে ছাড়া আমি যাবো না।”

ওরা রাজি হলো। রোজী আপার সাথে বড়ো বাসে করে রওনা হলাম। ইচ্ছে করেই বাচ্চাদের সাথে নিলাম না। বাস গিয়ে থামলো মর্গের পাশে। শক্ত করে রোজী আপার হাত ধরে ভেতরে ঢুকলাম। দেখি, একটা কফিনের মধ্যে আমার মতি শুয়ে আছে। বুক পর্যন্ত একটা শাদা চাদরে ঢাকা। কপালের দুই পাশে বড়ো বড়ো সেলাই। চোখদুটো ফাঁক হয়ে আছে। ঘুমালে আমার চোখদুটো ফাঁক হয়ে থাকে বলে মতি সবসময় ঠাট্টা করে বলতো, “তুমি ঘুমিয়েও দেখো তোমার মতি কী করে।” মতি ঘুমালে তো চোখ ফাঁকা থাকতো না, তবে আজ কেন চোখ ফাঁক? মতিও কি তার মিতিকে শেষবার দেখার জন্যে চোখদুটো ফাঁক করে রেখেছে? মতির সামনে কেঁদে আমি তাকে কষ্ট দিতে চাইনি, বরং দেখাতে চেয়েছি ওর মিতি আজ সত্যিই একজন সৈনিকের বউ হবার উপযুক্ত হয়েছে।

বাড়ি ফিরে আসার পর ওরা আমাকে দিয়ে ডেথ সার্টিফিকেট সই করিয়ে নিলো। আমার বোনকে সরিয়ে নিতে চাইলে বললাম, “আজকের রাতটা অন্তত আমার কাছে থাকুক।” ওরা রাজি হলো না। একা থাকবো কেমন করে ভেবে কাঁদতে থাকলাম। রোজী আপা বললো, “ও সারা রাত বারান্দায় থাকবে— আমিও যেন বারান্দায় থাকি, ভয় কম লাগবে। বাবুর্চিটাকে বললাম রাতে আমাদের ঘরে থাকতে। বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বসে ভাবতে লাগলামÑ এবার আমাদের নিয়ে ওরা কী করবে? এখন তো আর কোনো পাকিস্তানি পাইলটের সাথে আমাদের এক্সচেঞ্জ হবে না। তবে আমাদের কি মেরে ফেলবে? যেটাই করুক, আমাকে সবকিছুর জন্যেই মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে।
সকালবেলা রান্দাভা এসে খুব গালাগাল করলো মতির উদ্দেশ্যে। একটাই কথা— মতি হচ্ছে একটা গাদ্দার (বেইমান), মতি হচ্ছে কাফের। তবুও ওর লাশটা আস্ত পাওয়া গেলো। আর রশিদ মিনহাজ, যে নাকি সত্যিকার অর্থে মুসলমান, তার হেলমেট ছাড়া কিছুই পাওয়া গেলো না।

আমি কিন্তু তখনো জানি না আসল ঘটনা। রান্দাভা বলে যাচ্ছে— পাঁচ বোনের একমাত্র ভাইকে কাফের মেরেছে। আল্লাহ মতিকে কোনোদিন মাফ করবে না। তুমি বুঝতে পারছো, মতি কী করেছে? আমরা কোথাও মুখ দেখাতে পারছি না। এতো কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মতি সাহস করলো কী করে? দেশের জন্যে বউ-বাচ্চা ফেলে কেউ এভাবে মরে না। অফিসে যাওয়ার সময় তোমাকে কি কিছু বলে গিয়েছিলো? ইত্যাদি নানা কথা বলে চলে গেলো। দুপুরবেলা এলো একেবারে অন্য মূর্তিতে। কাছে এসে খুব নরম গলায় বললো, “মিসেস মতি, তুমি এখানে একা থাকো, তার ওপর তোমার অল্প বয়স। আর আমিও একা যখন-তখন তোমার কাছে আসি, এটা চারদিকে সবাই দেখে। আমার খুব খারাপ লাগে। যেকোনো সময় একটা বদনাম রটে যেতে পারে। তোমার কথা ভেবে শহরে একটা খুব সুন্দর বাড়ি ঠিক করেছি। ভাবছি আজ রাতেই তোমাকে সাথে করে নিয়ে যাবো। তুমি বাচ্চাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে রেখো। আমি কিন্তু একটু রাত করেই আসবো।” এতোসব কিছুর উত্তরে আমি শুধু একটা কথাই বললাম, “আমার বোনকে সাথে নিতে চাই।” সে বললো, “তোমার বোন তো তার নিজ বাড়িতে চলে গেছে। তুমি এখন শুধু তোমার কথা চিন্তা করো।” বলে চলে গেলো।

স্যুটকেস বের করে বাচ্চাদের জিনিস গুছিয়ে নিলাম। কী মনে করে গয়না আর মতির দেয়া সেই পাঁচ হাজার টাকাও নিলাম। বারান্দায় যেয়ে রোজী আপাকে দেখলাম না। ওকে বলে যেতে পারলাম না বলে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
ঠিক রাত ১১ টায় রান্দাভা এলো। শোবার ঘরদুটো বন্ধ করলাম। গাড়ি চলতে লাগলো। রান্দাভা কোনো কথা বললো না। শক্ত হয়ে বসে আল্লাহকে ডাকতে লাগলাম। সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু রাস্তা আর শেষ হয় না।

বেশ কিছুক্ষণ চলার পর গাড়িটা এক জায়গায় থামার সাথে সাথে প্রায় দশ-বারোটা মোটরসাইকেল এসে গাড়িটাকে চারপাশ দিয়ে ঘিরে ফেললো। মোটরসাইকেল বেষ্টিত অবস্থায় গাড়ি আবার এগিয়ে চললো। প্রায় ঘণ্টাখানেক চলার পর দেখলাম গাড়িটা পাকা রাস্তা ছেড়ে পাশে মাঠের মধ্যে কাঁচা রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করলো। চারদিকে বড়ো বড়ো গাছ দেখতে পেলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আলোর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। এ আমাদের কোথায় নিয়ে চললো?

গাড়ি এসে থামলো একটা বিরাট গেটের সামনে। একজন গার্ড দৌড়ে এসে তার তালা খুলে গেটটা মেলে দিলো। ভাবখানা এমন, ওরা জানতো গাড়িটা এখনই আসবে। ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে মোটরসাইকেলগুলো অন্ধকারে মিলিয়ে গেলো। গাড়ি থেকে নেমে জাহেদাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দুই ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে নিয়ে কেমন যেন আচ্ছন্নের মতো রান্দাভার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে এক বিরাট তালাবদ্ধ দরোজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ভেতরে ঢুকলাম, আলো জ্বালানোর সাথে সাথে ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। সমস্ত ঘরটা কালো রঙে পেইন্ট করা, এমনকি জানালা-দরোজা পর্যন্ত। ঘরের মাঝখানে শুধু দুটো দড়ির খাট পাতা। আমি শুধু বললাম, “এইখানে আমি বাচ্চাদের নিয়ে কীভাবে থাকবো? বিছানাপত্র কিছুই নেই। ওদের শোয়াবো কোথায়?” কর্কশ ভাষায় রান্দাভা বলে উঠলো, “তর্ক করবে না। তাহলে এক্ষুণি খাটদুটোও বের করে ফেলবো। তোমার ঘরের চাবি দাও। আর যদি কিছু চাও, ছোটোখাটো একটা লিস্ট দাও, বাড়ি থেকে এনে দেবো।”

…ঘরের দেয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে হাঁটলাম। পাশেই একটা বাথরুম। শক্ত দড়ির খাটে অবুঝ বাচ্চাগুলি ঘুমিয়ে আছে। বোঝা গেলো, বারান্দায় কোনো গার্ড হেঁটে হেঁটে আমাকে পাহারা দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলাম, তিনজনই কেমন ছটফট করছে। দেখি দড়ির ফাঁকে ফাঁকে ছারপোকা, ওদের কামড়াচ্ছে। মারতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কয়টা মারবো? রক্তে হাত লাল হয়ে গেছে।

লক্ষ্য করলাম, কালো দরোজার মাঝামাঝি এককোণায় একটা ছোটো কালো পর্দা ঝুলছে। আস্তে আস্তে দরোজার কাছে এসে পর্দাটা একটু ফাঁক করে দেখলাম, ভোর হয়ে আসছে। তুহিন আমার কোলে ঘুমিয়ে। পাছে ওর ঘুম ভেঙে যায়, তাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর, হয়তো ঘণ্টাখানেক হবে, আবার তালা খোলার শব্দ শুনতে পেলাম। এবার যে এলো, তাকে আমি চিনি না। এসেই কর্কশ ভাষায় বলে উঠলো, “কোলের থেকে বাচ্চা নামিয়ে এক্ষুণি আমার সাথে এসো।”

আমি জেলে বন্দী। এখানে আমার কোনো অনুরোধ কাজে আসবে না। তাই বিনাবাক্যে তুহিনকে মাহীনের পাশে শুইয়ে ঐ-লোকের পিছনে হাঁটতে লাগলাম। কিন্তু লোকটা ঠিক পাশের ঘরে ঢুকে দরোজা বন্ধ করে দিয়ে আমার সামনে খুব কাছে এসে দাঁড়ালো। মনে মনে বললাম, ‘আল্লাহ, আমাকে শক্তি দাও, যেন ভেঙে না পড়ি।’

লোকটা বেশ কিছুক্ষণ আমার সামনে একইভাবে দাঁড়িয়ে থেকে তারপর একটা চেয়ার দেখিয়ে কঠিন স্বরে আমাকে বসতে বললো। এতোক্ষণে খেয়াল করলাম, সেই একই কালো ঘর, শুধু খাটের বদলে দুটো চেয়ার মুখোমুখি। একটায় সে বসলো, আর একটায় আমি। বসেই সে জিজ্ঞেস করলো, “মিসেস মতি, ১৮ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট— এই তিনদিনের সব ঘটনা একে একে বলে দাও।” আমি কথাটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আসলে কী জানতে চাচ্ছে? আমার দেরি দেখে চিৎকার করে বলে উঠলো, “কী হলো, শুরু করছো না কেন? ১৮ তারিখ মতি ঘুম থেকে উঠে কী করলো বা কী বললো? তারপর কী বলে অফিসে গেলো? তুমি ঘরে কী করলে? অফিস থেকে এসে কী বললো? ইত্যাদি সব বলো। কিছু বাদ দেবে না।”

আমি মনে করে করে বলতে থাকলাম। শুধু বললাম না প্ল্যানের কথা। শুনে বললো, “১৯ তারিখ রাতে ঝগড়ার কথা বললে না কেন?” বললাম, “সবাই জানে, আমাদের কখনো ঝগড়া হয় না।” ও বললো, “তবে বিমান হাইজ্যাক করতে গেলো কেন? কে ছিলো তার পেছনে? গত এক মাস তোমার বাসায় কে সবচেয়ে বেশি এসেছিলো?” এমনি নানাভাবে জেরা করে মাথা খারাপ করে দিতো। একদিন হঠাৎ বলে উঠলো, “মতি তোমাকে পাঁচ হাজার টাকা দিয়ে গেছে, এটা কেন বলোনি?” এই পাঁচ হাজার টাকার জের চললো প্রায় প্রত্যেকদিন। তার উপর বাচ্চাদের চিৎকার, কান্নাকাটি— সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে কেমন যেন মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকি।

পরে একদিন রান্দাভা এলো। বললো, “কী পেলো মতি? শুধু নিজেকে ‘গাদ্দার’ প্রমাণ করে দিয়ে গেলো। এ-বয়সে তোমাকে বিধবা করে দিয়ে গেলো। রোজ খবরের কাগজে আসছে বড়ো বড়ো করে এসব খবর। ঘরের খবর বাইরে গেলো— এটা ভালো করেনি মতি। ওকে আমরা সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম বলেই ও আমাদের ‘ফ্লাইট সেফটি অফিসার’ ছিলো। জানো, মতি আমাদের কতো সর্বনাশ করে দিয়ে গেলো। মতির ছাত্র ছিলো রশিদ মিনহাজ। মিনহাজ ছিলো পাঞ্জাবি, মতি ছিলো বাঙালি। সেই হিসেবে মতির কথায় বিশ্বাস করে বিমানটা না থামানোই উচিত ছিলো। কিন্তু বিমানটি থামালো, মতি কাছে গেলো। ওকে ক্লোরোফরম করে লাফ দিয়ে বিমানে উঠে মাত্র বিশ ফুট উঁচু দিয়ে ফ্লাই করে চলে গেলো। কিন্তু রশিদ মিনহাজ জ্ঞান হারাবার আগে মাইক্রোফোনে জানিয়েছিলো, ‘আই হ্যাভ বিন হাইজ্যাকড’। আমাদের হেলিকপ্টার গেলো, কিন্তু প্লেন খুঁজে পাওয়া গেলো না। ২০ তারিখ বিকেলবেলা জানলাম, প্লেনটা সিন্ধু প্রদেশের জিন্দা গ্রামে ক্র্যাশ করেছে। সিন্ধু এলাকার লোকজন বলেছে, একটা প্লেনকে খুব নিচু দিয়ে ওঠানামা করতে দেখেছে তারা। পরমুহূর্তেই সেটা বালিয়াড়িতে ধাক্কা খেয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। ধারণা করা হচ্ছে, ধাক্কার ফলে ক্যানোপি (উপরের ঢাকনা) খুলে যায়। আর যেহেতু মতির সিটবেল্ট ছিলো না, তাই ছিটকে বাইরে বালির মধ্যে যেয়ে পড়ে।”

এদিকে বন্দী অবস্থায় দুই বেলা ওদের দেয়া নানরুটি আর ডাল খেয়ে দুই বাচ্চার ফুড পয়জনিংয়ের মতো হয়ে গেলো। সারাদিন বমি আর পায়খানা, সারা ঘর একাকার। তার মধ্যে প্রায়ই কারেন্ট অফ রাখতো। বাচ্চারা ভয়ে চিৎকার করে উঠতো। মোমবাতি, ম্যাচ কিছুই দেয়া হতো না। বলতো, আমি নাকি আত্মহত্যা করবো। বাচ্চাদের দিকে আর তাকাতে পারি না। কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে ওরা দিন দিন।

হঠাৎ একদিন রাতের বেলা এক এয়ারফোর্স অফিসার এসে বললো, “ভাবী, তৈরি হয়ে নিন, আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।” নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। ঝটপট বাচ্চাদের নিয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করলো। প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। বেসের কাছাকাছি আসতেই আমার মনে হলো, আমার তো কোনো বাড়ি নেই। তবে আমি কোথায় যাচ্ছি?

এক পাকিস্তানি অফিসারের বাসার করিডোরে আমাকে নামানো হলো। কেন জানি ভিতরে ঢোকার সাহস হলো না। মাটিতে চাদর বিছিয়ে বাচ্চাদের শুইয়ে চুপচাপ মাটিতে বসে রইলাম। বাড়ির মালিক পার্টিতে ছিলেন। রাতে বাড়ি ফিরে আমাকে ঐ-অবস্থায় দেখে বললেন, “অসম্ভব! আমার বাসায় জায়গা হবে না। অন্য কোথাও যাও।” …যা-ই হোক, এমন সময় তাদের বাসারই এক অতিথি এগিয়ে এসে বললো, “চলো, তুমি আমাদের বাসায় থাকবে।” ভাবী বললেন, “শুয়ে পড়ুন, অনেক রাত হয়েছে। সকালে আমার স্বামী গিয়ে আপনাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসবে। কোনো চিন্তা করবেন না।”

পরদিন রান্দাভা এলে বললাম, “আমি আমার বোনের বাড়ি চলে যেতে চাই।” সে বললো, “আমারও মনে হয় তোমার এখানে না থাকাটাই ভালো। কেউ তোমাকে ভালো চোখে দেখবে না।” মতির গাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলাম, বললো খোঁজ নিয়ে জানাবে।

রোজী আপা এলো। দুই বোন প্রথম একসাথে বসে কাঁদলাম। বললাম, “রান্দাভা বলেছে, আমি তোমার সাথে তোমার বাসায় থাকতে পারি।” ভয়ে কোনো বাঙালি আসে না, আর আমাদের তো ঘর থেকে বের হওয়ার প্রশ্নই আসে না।

২৯ সেপ্টেম্বর রোজী আপাসহ ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ৩০ সেপ্টেম্বর ভোরবেলা পৌঁছে বিকেলে গুলশানের বাসায় চল্লিশা করলাম। বাপের বাড়ির, শ্বশুরবাড়ির লোকজন— সবাই জানতে চায় সব ঘটনা। সব বলেও সব বলতে পারি না, কোথায় যেন আটকে যাই। সবাই বলে, কেন আমি বাধা দিইনি? উত্তরে কখনো চুপ করে থাকি, আবার কখনো বলি, “ওকে বাধা দেওয়ার মতো শক্তি আমার ছিলো না।”

মতি কষ্ট পাবে, এরকম কাজ আমি জীবন গেলেও করতাম না। ১৯৫৬ সাল থেকে যে-ছেলেটা মনের গভীরে একটা চাপা ক্ষোভ নিয়ে বড়ো হয়েছে এবং ধীরে ধীরে কর্মক্ষেত্রে এসে সেই ক্ষোভের মাত্রা যখন বিরাট হয়ে একটা কিছু করার আশায় সুযোগ খুঁজছিলো, তখন আমি সব জেনেশুনে তাতে বাধা দেবো, ততোটা স্বার্থপর তো আমি নই! বিশেষ করে, যে-মতিকে আমি জীবন দিয়ে ভালোবেসেছি।

২৩ এপ্রিল ১৯৭১, মতি প্রথম আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, “তুমি চাও না আমি দেশের জন্যে কিছু করি?” ১৮ আগস্ট ১৯৭১, আবারো আমাকে বলেছিলো, “তোমাকে একটু-আধটু কষ্ট দেবে, কিন্তু মারবে না। তুমি পারবে না, আমার জন্যে, দেশের জন্যে এইটুকু কষ্ট করতে?” ও যদি দেশের জন্যে ওর ভালোবাসার পরিবারকে উৎসর্গ করতে পারে, তবে আমার ভালোবাসার জন্যে আমি কেন তা সহ্য করতে পারবো না? এইসব বলবার নয়, বুঝবার।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ