রিপন ইউসুফ : এক সৌম্য শিল্পসাধকের অন্তর্ধান

রিপন ইউসুফের বঙ্গ-অঞ্চলকেন্দ্রিক এই দর্শনের ছাপ পড়তে থাকে তাঁর গল্প ও কবিতায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোকে যেন তিনি রূপায়িত করতে চাইতেন বাঙলার সেই ধূলির আস্তরণে ঢেকে যাওয়া বৈশিষ্ট্যের ভেতর। কবিতার পঙক্তিগুলোতে আঁকতে চেষ্টা করতেন আবহমান নন্দনের ঘাত-প্রতিঘাত। সেই সাথে সমকালীনতার স্পষ্ট বয়ান তাঁর লেখালেখিকে আলাদা করে তুলেছিলো নিশ্চিতভাবেই।

রিপন ইউসুফকে স্মরণ করবো কীভাবে? সত্যিকার অর্থে তাঁকে স্মরণ করা আমার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন। কেননা সবসময়ই তিনি আমার মাথার ভেতর ক্রিয়াশীল থাকেন। আমরা কথা বলি, দুপুরের উজ্জ্বল আর ক্লান্ত চায়ের দোকানে বসি, রাস্তা ধরে হেঁটে চলি চিরচেনা জনপদের গভীরে, এখনো। ঠিক এক বছর আগেও যেমন আমরা আলাপে মশগুল ছিলাম, নতুন কোনো সিনেমা বা বইয়ের পাতায় ডুবে ছিলাম সারা বিকেল অথবা কোনো কথা ছাড়াই একটি কবিতা লিখতে লিখতে কাটিয়ে ছিলাম সারাটা দিন। অথচ মনেই হয় না যে, তিনি চলে গেলেন। তাঁকে ছাড়াই আমরা কাটিয়ে দিলাম একটি বছর। ১৯ জুলাই তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।

রিপন ইউসুফ নরসিংদীর টাওয়াদীতে বসবাস করতেন। জন্মও নরসিংদী শহরেই। ছিলেন মারাত্মক স্বপ্নবাজ। ৩৭ বছরের জীবনে তাঁর লক্ষ্য ছিলো দুইটি— সিনেমা বানানো আর লেখালেখি। এসব নিয়ে ছিলো বিস্তর পরিকল্পনা। জীবনের বাকি সমস্ত কিছু বাদ দিয়ে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করছিলেন কেবল এই দুটি কাজের জন্যেই। দিনের শুরু থেকে শেষরাত— সারাক্ষণ তাঁর চৈতন্যে সিনেমা আর সাহিত্য। বলতেন, দানব হওয়া ছাড়া উপায় নেই, মাঝামাঝি কোনো অবস্থান নেয়ার সুযোগ নেই। আমার সাথে পরিচয়ের সূত্রটা এখানেই। ২০১৩ সালের দিকে আমি ও আমার বন্ধু জহির জোনায়েত— দুজনের কিছু কবিতা নিয়ে ‘কবিবৈঠক’ নামে একটি ছোটো পুস্তিকা বের করি। তখন নরসিংদী শহরে শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি এবং আড্ডা-আলোচনার কেন্দ্র হিসেবে খালপাড়ের ‘বই-পুস্তক’ খুব জনপ্রিয়। শিক্ষক ও রাজনীতিক নাজমুল আলম সোহাগ (আমরা সোহাগ স্যার বলেই ডাকি) ছিলেন বই-পুস্তকের কর্ণধার। ফলে আমরাও সেখানে আমাদের পুস্তিকাটি পৌঁছাই। সেখান থেকেই রিপন ইউসুফের হাতে পড়ে ‘কবিবৈঠক’।

তাঁর সাথে দেখা হবার স্মৃতিটি মনে পড়ছে। সোহাগ স্যার একদিন আমাদের ডেকে বললেন, “শোনো, নরসিংদীর চার তরুণ ছেলে সিনেমা আর লেখালেখি নিয়ে বিশাল কাজ করতেছে, অথচ তাদের সাথে তোমাদের পরিচয় নাই, কী লেখালেখি করবা তোমরা?” আমরা অবাক হলাম। তাদের সম্পর্কে জানতে চাইলাম। স্যার বললেন, একদিন পরিচয় করিয়ে দেবেন। তার কয়েকদিন পরে বই-পুস্তকেই দেখা হলো। রিপন ইউসুফ, ইফতেখার, মমিন আফ্রাদ আর নাজমুল শাহরিয়ার— তারা চার বন্ধু। রিপন ইউসুফ অবশ্য সবার সিনিয়র। কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা হলো তাদের সাথে। তারপর ২০১৪ সালের শুরুর দিকে ‘ত্রিকাল’ নামে একটি সাহিত্য আড্ডায় আবার দেখা। এর মধ্যে পরিচয় ঘটে গেলো মাধবদীতে বসবাস করা কবি সুমন ইউসুফের সাথেও। সুমন ইউসুফ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সম্পাদনা শুরু করেন স্থানীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যভিত্তিক ফিচার কাগজ ‘ব্রহ্মপুত্র’। ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত হতে থাকে ভাঁজপত্র ‘কবিতাজংশন’ এবং শুরু হয় নিয়মিত আড্ডা। কবিতাজংশনের এই আড্ডা থেকে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রিপন ইউসুফের সাথে আমার সখ্য গড়ে ওঠতে থাকে। তিনি নিজেও ‘খাঁকারি’ নামে একটি গল্পের পত্রিকা বের করছিলেন। আড্ডা আলোচনা বইপড়া সিনেমাদেখা কবিতালেখা, মাঝে-মধ্যে ব্রহ্মপুত্র পত্রিকার জন্যে রিপোর্টিং— সব সমানতালে চলতে থাকে, দুজনের একসাথে।

আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, রিপন ভাই ছিলেন স্ট্যামফোর্ডে। ধানমণ্ডি থাকতেন। ক্লাশ বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শেষ করেই চলে আসতেন আমার এখানে। আমরা আড্ডা মারতাম টিএসসিতে, হাকিম চত্বরে, সোশ্যাল সাইন্সের সিঁড়িতে; একদম রাত পর্যন্ত। আড্ডার বিষয় থাকতো সাহিত্য আর সিনেমা।

রিপন ভাইয়ের সাথে দেখা হবার পর প্রথম প্রশ্নই থাকতো, নতুন কী পড়লাম বা নতুন কোন সিনেমা দেখলাম। প্রতিদিন একই প্রশ্ন। তিনি খুব দৃঢ়ভাবে একটা কথা বলতেন, প্রতিদিন নতুন কোনো চিন্তা বা বিষয়ের সাথে পরিচিত হতে না পারলে,  নিজেকে উন্নত করতে না পারলে এসব শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করে কোনো লাভ নাই। তিনি মনে করতেন, এর সবচে’ কার্যকরী মাধ্যম হলো সাহিত্য আর সিনেমা। এবং নিয়ম করে তিনি প্রতিদিন নতুন সিনেমা এবং নতুন বইয়ের খোঁজ করতেন, সংগ্রহ করতেন, পড়তেন এবং দেখতেন। সেই সাথে খুব গুরুত্ব দিয়ে সেসব নিয়ে আলোচনা করতেন। প্রচুর ফিকশন পড়তেন, উৎসাহও দিতেন আশেপাশের সবাইকে, প্রয়োজনে বইও দিতেন তাঁর বিশাল সংগ্রহ থেকে। আমাদের যতো প্রশ্ন, সব জমিয়ে রাখতাম তাঁর জন্যে। তিনিও সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতেন সময় নিয়ে। চিন্তাচর্চায় তাঁর মতো এমন নিবেদিতপ্রাণ খুব কমই দেখা যায়।

এভাবেই দীর্ঘদিনের চর্চায় তাঁর মনন গঠিত হতে থাকে। সাহিত্য আর সিনেমার প্রগাঢ় আবেশের ভেতর তিনি খুঁজে পান নিজের গতিপথ। আমাদের এই বঙ্গ অঞ্চলের প্রকৃত স্বরূপ তাঁর চিন্তায় ধরা দেয়। তিনি মনে করতেন, আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষের বৈশিষ্ট্যকে ধারণ না করেই। বাইরের মত ও পথের রেপ্লিকা তৈরি করে আমাদের জাতীয় উন্নতি কখনোই সম্ভব নয়। কেবল নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আর সংস্কৃতি নির্মাণের মধ্য দিয়েই বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করা সম্ভব। কিন্তু কোথায় সেই বৈশিষ্ট্য আর সংস্কৃতি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদ তিনি অনুভব করেন দৃঢ়ভাবে। বঙ্গভূমির হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের ঘোলা জলে ডুব দেন তিনি। এই অঞ্চলের মাটি আর মানুষের ভেতরেই যে লুকিয়ে আছে সেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কৃতি নির্মাণের ভিত। ধীরে ধীরে চিহ্নিত করতে থাকেন সেসব। একই সাথে প্রকাশও করতে থাকেন আড্ডা-আলোচনা আর লেখাপত্রে। বিভিন্ন পত্রিকায় তাঁর প্রবন্ধ ছাপা হতে থাকে। সীমিত পরিসরে হলেও সেসব প্রবন্ধ নিয়ে আলাপ চলতে থাকে চারপাশে।

রিপন ইউসুফের বঙ্গ-অঞ্চলকেন্দ্রিক এই দর্শনের ছাপ পড়তে থাকে তাঁর গল্প ও কবিতায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলোকে যেন তিনি রূপায়িত করতে চাইতেন বাঙলার সেই ধূলির আস্তরণে ঢেকে যাওয়া বৈশিষ্ট্যের ভেতর। কবিতার পঙক্তিগুলোতে আঁকতে চেষ্টা করতেন আবহমান নন্দনের ঘাত-প্রতিঘাত। সেই সাথে সমকালীনতার স্পষ্ট বয়ান তাঁর লেখালেখিকে আলাদা করে তুলেছিলো নিশ্চিতভাবেই। গল্পের ব্যাপারে তিনি খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। নিয়মিতই লিখতে শুরু করেছিলেন পত্র-পত্রিকায়। মৃত্যুর মাস তিনেক আগে আমাকে সাতটি গল্পের একটি পাণ্ডুলিপিও দিয়েছিলেন গুছিয়ে দেয়ার জন্যে। দ্রুতই প্রথম বই প্রকাশ করবেন বলে স্থির সিদ্ধান্তে এসেছিলেন। কিন্তু সুযোগ আর পেলেন না। তাঁর সেই পাণ্ডুলিপি আর অন্যান্য নির্বাচিত রচনা নিয়ে তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর দিনেই প্রকাশিত হয়েছে ‘অশ্ব ও অশ্বত্থপুরাণ’ নামক গ্রন্থ। প্রকাশ করেছে ‘প্রত্ন’। সম্পাদনা করেছেন সুমন ইউসুফ।

রিপন ইউসুফের লেখালেখির অন্যতম আলোচ্য বিষয় তাঁর ভাষা। দীর্ঘদিনের চর্চা আর প্রচেষ্টায় তিনি একদম নিজস্ব এক ভাষাভঙ্গি দাঁড় করাতে পেরেছিলেন। তাঁর শেষদিকের রচনাগুলোতে সেই ভাষার শক্তি বিশেষভাবে নজরে পড়ছিলো। কিন্তু এখানেও আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই ভাষা বহুমাত্রিক লেখালেখিতে প্রয়োগ হয়ে পরিণত রূপে যাবার আগেই আমরা তাঁকে হারিয়ে ফেললাম।

একটি জনপদে সৃষ্টিশীলতা ও শিল্প-সাহিত্যের প্রকৃত চর্চার জন্যে এমনসব মানুষের প্রয়োজন হয়, মফস্বলে বসেও যাদের চিন্তাজগত আবর্তিত হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শিল্পস্বরূপের নিরিখে, মাফস্বলিকতার অন্ধ গহ্বর যাদের স্পর্শ করতে পারে না। রিপন ইউসুফ ছিলেন সেই বিরলদেরই একজন। সমাজ রাষ্ট্র ইতিহাস চিন্তা দর্শন সাহিত্য বিষয়ে তাঁর বোঝাপড়া আশেপাশের মানুষদের প্রভাবিত করতো নিশ্চিতভাবেই।

এসব বোঝাপড়া আর চর্চার ভেতর তাঁর লেখালেখি চলছিলো এক সম্ভাবনার দিকে। বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে তাঁর নিজস্ব চিন্তা কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেয়ার তাগিদও অনুভব করতে শুরু করেন তিনি। তাঁকে ঘিরে আমরাও নানাবিধ পরিকল্পনা সাজাতে থাকি। সভা-সেমিনার-পত্রিকা-ভিজ্যুয়াল— কোনোকিছুই বাদ ছিলো না। ধীরে ধীরে বাস্তবায়নের পথেও এগিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু বিরল এক রোগ (সিআইডিপি) থামিয়ে দিলো আমাদের সবকিছু। দীর্ঘ আটমাস এই রোগের সাথে লড়াই করে পেরে ওঠেননি তিনি। নবীপুর কবরস্থানের আধভেজা মাটিতে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো দেখেছিলাম সৌম্য এই শিল্পসাধকের উদ্ভাসিত মুখখানি।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ