মতিউর রহমান চৌধুরী। সঙ্গীতকার, অভিনয়শিল্পী। ‘নজরুল একাডেমি, নরসিংদী’র আহ্বায়ক। ৪০ বছর ধরে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখাচ্ছেন। গত ২৩ জুন ২০২৬ (মঙ্গলবার) ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র সাথে তিনি আলাপ করেন নানা বিষয়ে। সাক্ষাতকার গ্রহণ করেছেন সম্পাদক সুমন ইউসুফ। সঙ্গে ছিলেন সহযোগী সম্পাদক মাহফুজ আহাম্মদ।
এ-বছর ‘নজরুল একাডেমি, নরসিংদী’ ২৫ বছর পূর্ণ করলো। আপনারা রজতজয়ন্তী সেলিব্রেশনও করেছেন নরসিংদী প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে। তো, আমাদের জানার ইচ্ছা যে, এই একাডেমির শুরুটা কীভাবে হয়েছিলো?
মতিউর রহমান চৌধুরী : শুরুটা হয়েছিলো ২০০১ সালে। এর আগেও আমি নরসিংদীতে ‘নজরুল একাডেমি’ নামে একাডেমি করেছিলাম। সেটা ছিলো বাংলাদেশ ধ্রুব পরিষদের অধীনে। সেটার প্রেসিডেন্ট ছিলেন জগদানন্দ বড়ুয়া। মিহির লাল, গোপাল দত্ত, রুনু বিশ্বাসদের মতো বড়ো বড়ো আর্টিস্টরা ছিলেন। চিটাগাংয়ের যারা প্রতিষ্ঠিত আর্টিস্ট, তাঁদের গুরু তাঁরা। তাঁদের কাছ থেকে অনুমোদন এনে আমি এখানে ‘নজরুল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। পরবর্তীতে ২০০১ সালে আমি কেন্দ্রীয় নজরুল একাডেমি থেকে অনুমোদন নিয়ে নরসিংদী শাখা চালু করি। তখন আসহাব সাহেব ছিলেন নরসিংদীর এডিসি (রেভিনিউ)। তার কাছ থেকে ব্রাহ্মন্দী গার্লস স্কুলের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের লিখিত নির্দেশনা পাই। শ্রদ্ধেয় হাসিম বিএসসি সাহেব তখন আমাকে ব্যবহারের জন্যে একটি শ্রেণিকক্ষ এবং অফিসের জন্যে ছোটো একটি রুম দিলেন। তখন আমি কেন্দ্রীয় সম্পাদক মহোদয়, বিখ্যাত তবলানেওয়াজ ওস্তাদ কামরুজ্জামান মণি স্যার, নরসিংদী সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষক প্রণব চক্রবর্তী প্রমুখদের নিয়ে একাডেমির উদ্বোধন করি। তখন এর সভাপতি হন পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক রহমান সাহেব। হেডমাস্টার সাহেব আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। তাঁর চিন্তা ছিলো, স্কুলে আমাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দিলে তাঁর স্কুলের মেয়েরাও এখানে শেখার সুযোগ পাবে।
এর আগে আপনি কী করতেন? আপনার সঙ্গীতশিক্ষা কীভাবে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : ছোটো থেকেই আমার মিউজিকের সাথেই বড়ো হওয়া। মিউজিক শিক্ষাটা ছিলো আমার ঘরের মধ্যেই। আমার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর থানার উজানচর গ্রামে। সেখানেই আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা। আমার বাবা ছিলেন পাকিস্তান আর্মিতে চাকরিরত। আমারও জন্মের আগে মাত্র ৬০ টাকায় তিনি একটা হারমোনিয়াম কিনে আনেন। আব্বার সঙ্গীত করার শখ ছিলো। বড়ো ভাইও বাড়িতে গান শিখতেন। সেই থেকে আমার সঙ্গীতচর্চার শুরু। পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে আমি নরসিংদী এলাম। এখানকার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তখন চরম দৈন্যদশা। সঙ্গীতের ভিত হলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত। ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক না জানা কেউ ভালো গায়ক হতে পারবে না। এই ধারাটাতেই আমার বড়ো হওয়া। ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিকের শিক্ষা নিই। তখন আমি আমার গুরু নরসিংদীর ওস্তাদ মফিজুল ইসলামকে পাই। তাঁর কারণেই এখন নরসিংদীতে সঙ্গীতের এতোটা প্রসার। আমার ক্ল্যাসিক্যালের ভিত গড়া ছিলো বাঞ্ছারামপুর থেকেই। এখানে এসে আবার আমি তাঁর কাছে ১৯ বছর ধরে শিখি। আমার চিন্তা ছিলো নরসিংদীতে কীভাবে পরিবর্তন ঘটানো যায়। তখন আমি ঢাকায় একটা একাডেমিতে প্রধান শিক্ষক। সেখানে দেখলাম, কারা যেন অ্যাকুস্টিক গিটার বাজাচ্ছে। মনে হলো, এখান থেকে আমি যদি একজন গুরু নিতে পারি, তাহলে আমার এলাকায় গিটারের পরিপূর্ণতা আসবে। তখন আমি বাপ্পা মজুমদারের বন্ধু কিবোর্ডিস্ট ও গিটারিস্ট টিটু ভাইকে নিয়ে এলাম। তাঁর কাছে ইমন দীর্ঘদিন গিটার শিখেছে। নরসিংদীতে আমি ড্রিমল্যান্ড গিটার শিক্ষালয় নামে একটা গিটারের ক্লাশ খুলি। সঞ্চয়রা এখানকার স্টুডেন্ট হলো। পরে ইমনও সেখানে যোগ দেয়। এরা যখন শিখে ফেললো, টিচারও চলে গেলো। আমি অবশ্য ইমনকে ঢাকায় নিয়েও শেখাতাম।
এরপর সঙ্গীতের ওস্তাদ আনলাম। ওস্তাদ মফিজুল ইসলাম স্যারকে। তারপর আনলাম ওস্তাদ কামরুজ্জামান মণি স্যারকে। তবলাও অনেকেই ভালো শিখলো। এই ওস্তাদদের অবদানের কারণেই আজ এতো মানুষ সঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত।
নরসিংদীতে গত ২৫ বছরে কী রকম ছেলেমেয়ে সঙ্গীত শিখেছে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : সেটা তো গুনে কুলানো যাবে না। নরসিংদীতে ৩২ টার মতো ব্যান্ড হয়েছিলো। নজরুল একাডেমিতে যারা তবলা শিখেছে, তারাও অনেকে এখন গুণীদের কাতারে।
এখানে ওস্তাদ যারা ছিলেন, শিক্ষক যারা ছিলেন, তারা কি এখন নরসিংদীতেই আছেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : আমি যে-ধারায় শিখে এসেছি, সেটা তাঁরা যে-ধারায় শেখাতেন, তার সাথে মিলতো না। তাই আমি কারো কাছে শিখিনি। তাঁরা এখন আর এখানে নেই।
নরসিংদীতে শিক্ষার্থী যারা, তাদের সঙ্গীত শিক্ষায় আগ্রহ কেমন? তারা প্রকৃত অর্থেই শিখতে চায়, নাকি সার্টিফিকেটটাই বিভিন্ন জায়গায় কাজে লাগাতে চায় শুধু? সঙ্গীতের উপলব্ধি তাদের মধ্যে কতোটুকু হয়?
মতিউর রহমান চৌধুরী : আমাদের এখানে আছে নজরুল একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমির নরসিংদী জেলা শাখা। শুধু শাখা থাকলেই তো হবে না, দেখতে হবে, যিনি প্রশিক্ষক, তার মেধা কতোটুকু। আমি দাবি করে বলতে পারি, নজরুল একাডেমি থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে যেসব ছেলেমেয়েরা বের হয়েছে, তারা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, ক্যাডেটে গেছে, কেউ কেউ শান্তিনিকেতনে গেছে, যারাই নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তারা প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত। কেউ আমার এখান থেকে সিলেবাস কমপ্লিট করলো, কিন্তু একটা গান গাইতে পারলো না, একটা রাগ গাইতে পারলো না, তার মূল্য কী? সার্টিফিকেট বড়ো কথা নয়, আমি কী শিখলাম, সেটাই বড়ো কথা। সেদিনও নজরুল একাডেমির প্রোগ্রামে কতো ছেলেমেয়ে গান গাইলো। সত্যি কথা বলতে, আমার এতো এতো ছেলেমেয়ে যে, তারা যদি গান গাইতে আসে, তাহলে স্টেডিয়াম লাগবে। এক ইমন গান গাইতে এলেই স্টেডিয়াম লাগবে। ইমন আমার ছেলে বলে বলছি না। সে নরসিংদীর সন্তান। তাছাড়া আমার অনেক স্টুডেন্ট আছে, যারা অনেক প্রতিষ্ঠিত।
তারা কারা?
মতিউর রহমান চৌধুরী : ইমন তো আছেই। শাম্মী আক্তার সিমি, ইতি, পিংকি, রাইসা, বৈশাখী একাডেমির পরিচালক আসাদ, তানসেন একাডেমির পরিচালক খোকন— এমন অনেকেই আছে, যারা এখন প্রতিষ্ঠিত। আমার এক স্টুডেন্ট কুড়াইতলীতে একাডেমি করেছে। তারও প্রচুর স্টুডেন্ট। অনামিকা আছে। মাধবদীতে প্রচুর স্টুডেন্ট তার। হেমন্ত আছে ঘোড়াশালের দিকে। তারও প্রচুর স্টুডেন্ট। তাদের স্টুডেন্টরাও নজরুল একাডেমির সিলেবাস অনুযায়ী শিখে এখানেই পরীক্ষা দেয়।
আপনাদের মূল্যায়ন পদ্ধতি কী? পরীক্ষা কারা নেয়?
মতিউর রহমান চৌধুরী : পরীক্ষা আমরা নিই না। পরীক্ষা চলাকালে আমরা যারা শেখাই, তারা কেউ কাছে থাকতে পারি না। সেটা ফেয়ার হবে না। এখান থেকে বাইরে গিয়ে কেউ না পারলে তখন বদনাম তো আমার হবে। তাই এই ব্যাপারে আমি ছাড় দিই না।
শুধু নজরুলই তো শেখানো হয় না। রবীন্দ্র সঙ্গীত, পঞ্চকবিসহ বিভিন্ন ধরনের সঙ্গীতও তো শেখানো হয়, নাকি?
মতিউর রহমান চৌধুরী : পঞ্চকবি বা আরো যারা আছেন, সবার মূলই হলো ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক। ভয়েস তৈরি করার জন্যে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত মাস্ট।
কিন্তু একাডেমির নাম তো নজরুল একাডেমি। সেদিন রজত জয়ন্তীর অনুষ্ঠানেও সবাই নজরুলবন্দনাই করলেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী : নজরুলের গান আমাদের প্রায়োরিটি। কিন্তু একাডেমিকে ধরে রাখতে হলে একচেটিয়া এক ধরনের গান, যেমন রবীন্দ্রনাথ শেখালে হবে না, স্টুডেন্ট থাকবে না। এটা পারবে ছায়ানট বা ঢাকার ওরা। আর যারা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত গাইতে পারে, তারা নজরুল সঙ্গীত ভালো গাইতে পারবে। যারা নজরুল সঙ্গীত ভালো গাইতে পারবে, তারা সব ধরনের গানই ভালো গাইতে পারবে। যেমন কোক স্টুডিওর ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই’ গানটাতেই ভয়েসের কী সুন্দর কারুকাজ। এটা আসে ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক থেকে। রাগ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে ভালো গান গাওয়া দুষ্কর।
কোক স্টুডিও তো ফিউশন করে। তাহলে আপনার মতে, কোক স্টুডিওর নজরুল সঙ্গীত ভালো হয়েছে?
মতিউর রহমান চৌধুরী : শুধু আমার মতেই না, খিলখিল কাজীও এই কথা বলেন। তিনি বলেন, “এই গান দিয়ে আমার দাদাকে বিশ্ব চিনেছে।” অনেকে অবশ্য অনেক কথা বলেছে। তা বলতেই পারে। কিন্তু তারা যেভাবে গানটাকে তৈরি করেছে, সেটা বিশ্বমানের। রেকর্ড থেকে একটু ডেভেলপ করেছে বটে, কিন্তু সেটা দোষের কিছু না। কাজী নজরুল ইসলাম বলেননি, আমার গান সূত্র ধরে বসে থাকো। কাজেই স্বাধীনতা আছে। রবীন্দ্রনাথের বেলায় সেই স্বাধীনতা নেই, নোট ধরেই গাইতে হবে। আর সেটা করলে অনেকেই ধরবে। তো নজরুলের গান করতে হলে তোমাকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিখতে হবে। আমাদের এখানে প্রক্রিয়াটা হলো উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত— পাশাপাশি নজরুলসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত, পল্লী, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া।
আপনি বললেন, নরসিংদীতে সঙ্গীতের জয়জয়কার। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাথমিকে সঙ্গীত বিষয়টি বাদ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগে তো ছিলোই না, মাঝখানে সিদ্ধান্ত হয়েও আবার বন্ধ হচ্ছে। এই ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখেন? আপনাদের কোনো তৎপরতা আছে? আপনাদের গত প্রোগ্রামে এই বিষয়টি উত্থাপন করা হয়নি…
মতিউর রহমান চৌধুরী : সংস্কৃতি তো বেচে খাওয়ার জিনিস না। সংস্কৃতি হলো নিজের সত্তা। সংস্কৃতি আপনার জাতিগত পরিচয় তুলে ধরে। পৃথিবীর কাছে যখন আমি দেশকে প্রেজেন্ট করবো, তখন নিশ্চয়ই ইংলিশ গান দিয়ে করবো না। আমাদের গাইতে হবে আমাদের ফোক গান, বান্দরবানে যেসব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আছে, তাদের গান, যেটা আমাদের শেকড়, যেটা থেকে আমরা তৈরি হয়েছি। আমাদের দেশীয় সম্পদকেই তো আমরা সেখানে প্রকাশ করি। যে-দেশের সংস্কৃতি পরিপূর্ণ না, সেই দেশ ভালো থাকতে পারবে না। সেখানে ক্রাইম ঢুকবে। সঙ্গীতশিল্পীকে কেউ অনাদর করে না। ধর্মীয় অনুভূতিশীল মানুষেরা সঙ্গীত করেন না? আমরা তো হামদ-নাতও শেখাই, আমাদের ছেলেমেয়েরা হামদ-নাতে প্রথম পুরস্কার নিয়ে আসে। নজরুলের গান, আধুনিক গানেও প্রথম পুরস্কার পায়। এখন কেউ যদি বলে আধুনিক গানের স্রষ্টা কে, আধুনিক গানের স্রষ্টা তো নজরুল। নজরুলের রচনায় সব ধরনের গানই পাওয়া যায়। শ্যামা বলো, কীর্তন বলো, ফোক বলো, প্রেমভিত্তিক গান বলো, প্রকৃতি পর্যায়ের গান বলো, দেশের গান বলো— সবই আছে। তাঁর কতো দেশাত্মবোধক গানে, জাগরণী গানে যুদ্ধের সময় মানুষ উজ্জীবিত হয়েছে। তখন গানে উজ্জীবিত হয়ে যদি দেশ স্বাধীন হয়, তাহলে আজ গান গাইলে অসুবিধাটা কোথায়? গানের প্রতি এতো খেদ কেন? কামরুজ্জামান মণি স্যারের ‘তবলাবিজ্ঞান’ বইটা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, ইউনিভার্সিটিতে সঙ্গীত বিভাগ, নৃত্য বিভাগ চালু হওয়াটা খুশির খবর। কিন্তু এটা যদি রোড হয়ে যেতো, মানে, প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে এগুতো, তাহলে এটা প্রকৃত ডিসিপ্লিন হতো। এখন ইউনিভার্সিটিতে অন্য বিষয়ে চান্স না পেয়ে অনেকে সঙ্গীতে ভর্তি হচ্ছে। আমার স্টুডেন্ট, কারারচর স্কুলের হেডমাস্টার রঞ্জিত কুমার সাহার মেয়ে নেলী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলো। তিনি আমাকে বললেন, আমার মেয়েকে যেকোনোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হবে। গানের কোটা আছে, আপনি গান শিখান। আমি শেখালাম। মেয়েটাও চান্স পেলো। আমার শেখানো, মেয়েটার ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া— এটাই রোড হয়ে যাওয়া। এই কাজটা যদি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই করানো হয়, তাহলে দোষ কোথায়?
আপনি জানেন গত দুই বছর বাউলদের উপর হামলা হয়েছে। বিভিন্ন মাজারে হামলা হয়েছে। বাউলদের উপর হামলাও তো সঙ্গীত বন্ধ করতে চাওয়া থেকেই। এই যে এরকম মব হচ্ছে, এগুলো নিয়ে আপনারা শঙ্কিত?
মতিউর রহমান চৌধুরী : যারা বন্ধ করতে চায়, সবসময় তারা বন্ধই করতে চায়। আমরা চাই, সবসময় এই চর্চা চলুক। আমি মনে করি, সাংস্কৃতিক অঙ্গন সচল থাকলে ছেলেমেয়েরা নষ্ট হবে না। একটা ছেলে বা মেয়ের কাঁধে যদি গিটার থাকে, তাকে আমি স্মার্ট মনে করি। ধর্মকর্ম হলো ভিন্ন ব্যাপার। আমি সঙ্গীতশিল্পী। আবার নামাজও পড়ি। কারণ, স্রষ্টার কাছে আমাকে জবাব দিতে হবে। সঙ্গীত করলেই কেউ মন্দ হয়ে যাবে, তা তো না।
২৫ বছর পার করলেন, এটা একটা অর্জন। আপনাদের তো একটা কমিটি আছে মনে হয়…
মতিউর রহমান চৌধুরী : হ্যাঁ, আমাদের এখন ১১ সদস্যবিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটি রয়েছে। এটার আহ্বায়ক আমি। সিনিয়র সদস্যদের মধ্যে আছে এম এ কাদের সঞ্চয়। আমাদের কমিটির অনেকেই জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কৃত এবং বেশ সুনাম কুড়িয়েছে।
আপনাদের কমিটিতে তো ১১ জন আছেন। আপনি আহ্বায়ক। যতোদূর জানি, ২ বছর আগে ২০২৪ সালেও আপনারা একটা কমিটি গঠন করেছিলেন। সেক্রেটারি সম্ভবত ছিলেন মোহাম্মদ শাহীনুর মিয়া। এই কমিটিতে তিনি নেই কেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : জুলাই আন্দোলন চলাকালে একদিন আমি ঢাকা থেকে ফিরছিলাম। ফেরার পথে দেখি জুলাইয়ের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে তারা জমায়েত করছে, শ্লোগান দিচ্ছে। তখন এখানে আমরা কমিটির সবাই বসে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই কমিটি বাদ। ঢাকা থেকে আমরা কমিটির অনুমোদন নিয়েছিলাম। কেন্দ্রে জানানোর পর কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি মিন্টু রহমান সাহেবও বললেন সাথে সাথে কমিটি বাতিল করে দিতে। কারণ, আমরা অরাজনৈতিক সংগঠন। রাজনৈতিক কাউকেই আমরা রাখবো না।
কিন্তু তিনি যে রাজনৈতিক লোক, তা আপনি জেনেই সেক্রেটারি বানিয়েছিলেন। আপনাকে আরেকটু স্মরণ করিয়ে দিই, তৎকালীন এমপি সাহেবের স্ত্রী, যিনি আপনাদের উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন, তিনিও রাজনীতিতে জড়িত। আর শাহীনুর মিয়া খুবই পরিচিত রাজনীতিবিদ। এমনকি জুলাইয়ের শেষেও আপনাদের খুব বড়ো একটা প্রোগ্রাম করার কথা ছিলো, যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আরো রাজনীতিবিদরা অতিথি হিসেবে ছিলেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী : আসলে শাহীনুর ভাইয়ের সাথে পরিচয় আমাদের বইমেলায়। আমাদের অনুষ্ঠান দেখে মুগ্ধ হয়ে তিনি আমাদের সাথে চলাফেরা শুরু করেন। তিনি কোনো মন্দ লোক নন। তিনি আমাকে অনেকগুলো রাস্তা দেখিয়েছিলেন। তিনি আমাকে ডিসি বদিউল আলমের সান্নিধ্যে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি নজরুল একাডেমির জন্যে একটা স্থান চাইছিলাম। সবাই আমাকে সম্মান করে, কিন্তু স্থান তো কেউ দিবে না। সবার সম্মতিক্রমেই আমরা চাইলাম, কোনো উছিলায় একাডেমির জন্যে যদি একটা জায়গা, একটা ভবনের বন্দোবস্ত হয়। ডিসির মতো মানুষদের কাছে যেতে না পারলে সেটা তো আর হয় না। পৌরপার্কে আমাদের একটা জায়গা দেয়ার কথা হয়েছিলো। স্টেডিয়ামের পাশে, শিল্পকলার আশেপাশে কিছু খাস জায়গাও দেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, আমার জীবন তো শেষপ্রান্তে, একটা কিছু করতে পারলাম না। একটা উছিলায় যদি আমরা নজরুল একাডেমির একটা জায়গা, একটা ভবন আমরা পাই। আমার চাওয়া ছিলো, সেখানে শুধু নজরুল একাডেমিই না, নরসিংদীর যতো সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, সবাই যেন প্রতিনিয়ত সেখানে অনুষ্ঠান করতে পারে। তাহলে মেধার বিকাশ হতো, ছেলেমেয়েরা উদ্বুদ্ধ হতো। এই চিন্তা থেকেই শাহীনুর ভাইকে যুক্ত করা। জুলাইয়ে আন্দোলনকারী ছেলেমেয়েদের বিরুদ্ধে যখন তিনি তৎপরতা চালাচ্ছিলেন, সাথে সাথেই তাকে আমরা বাদ দিই। এটা তাকেও জানানো হয়। তিনি তো খারাপ মানুষ না। আর তিনি আমাকে ভালো ভালো কিছু পথ দেখিয়েছিলেন যে, এভাবে করলে একটা ভবন হতে পারে। আর এমপি সাহেবের স্ত্রীকে নেয়া নজরুলসঙ্গীতশিল্পী হিসেবে, রাজনীতিবিদ হিসেবে না।
তিনি আপনাকে পথ দেখিয়েছেন, এটা যেমন একটা ব্যাপার, আবার সেটার বিনিময়ে আপনাদের তাকে সেক্রেটারির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দিতে হয়েছে, এটাও চাট্টিখানি কথা নয়। নজরুল একাডেমি দীর্ঘকালের ঐতিহ্য ধারণ করা সংগঠন। শাহীনুর মিয়া একজন রাজনীতিবিদ, যার সঙ্গীত কিংবা নজরুলের সাথে কোনো যোগসূত্র নেই। তাকে এমন জায়গায় বসানোটা কি আপোষ করা নয়?
মতিউর রহমান চৌধুরী : দেখো, সেদিনও এমপি মহোদয় আমাদের যথেষ্ট আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু নজরুল একাডেমিটা যে-বাসায় এখন আছে, সেটাও তারা ভাড়া দিয়ে দিয়েছে। আমার এক মাসের মধ্যে এই বাড়িটা ছেড়ে দিতে হবে। এখন আমি কোথায় যাবো?
তাহলে আপনি বলছেন, মাঝে মাঝে একাডেমির স্বার্থেই এরকম রাজনীতিবিদদের শরণাপন্ন হতে হয়?
মতিউর রহমান চৌধুরী : শুধু এই একবারই এই কাজটা হয়েছে।
এবারও তো আপনি মঞ্জুর এলাহীর কাছ থেকে সহযোগিতা নিচ্ছেন।
মতিউর রহমান চৌধুরী : তিনি এখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে আমাদের সাহায্য করছেন।
এখন আপনার কী মনে হয়? সঙ্গীতকার হিসেবে রাজনীতিবিদদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলা ভালো? নাকি ত্যাগ করে নিজের মতো পথ দেখা উচিত?
মতিউর রহমান চৌধুরী : আসলে রাজনীতিবিদদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলাটা ঠিক না। কিন্তু উনাকে আনার উদ্দেশ্য কী? আমাদের তো অভাব-অনটন আছে। সেগুলো তুলে ধরাই আনার উদ্দেশ্য। উনার মাধ্যমে নজরুল একাডেমির জন্যে ভালো একটা স্থানের ব্যবস্থা যদি হয়…
কিন্তু সঙ্গীত বা সংস্কৃতির সাথে কোনো সম্পর্ক না থাকা একটা লোককে সেক্রেটারি করা একাডেমির ইতিহাসে একটা দাগ তৈরি করলো। এটা আপনি মনে করেন?
মতিউর রহমান চৌধুরী : হ্যাঁ, সেটা হয়েছিলো ঐ একটা কারণেই। আর কিছু না। এটাকে তুমি অন্যভাবে নিয়ো না। সেই সময়টায় ওদের জয়জয়কার ছিলো। যেখানে বলতো, সেখানে সোনা ফলতো। আমি শুধু একটা আশ্রয়স্থল চেয়েছিলাম। নজরুল একাডেমির একটা ভিত্তি হোক, সেটা চেয়েছিলাম। আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম, শুধু নজরুল একাডেমি এখানে কাজ করবে, এমনটা না। ডিসি স্যারকে বলেছিলাম, নরসিংদীতে যেসব সক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে, তারা সবাই প্রতিদিন এখানে প্রোগ্রাম করবে। নিয়মিত পারফরম্যান্স করার সুযোগ পেলে ছেলেমেয়েরা উজ্জীবিত হবে।
আপনি গত ২৫ বছর ধরে এখানে নজরুল একাডেমি নিয়ে কাজ করছেন। নরসিংদীকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো অনেক অনেক ছেলেমেয়ে আপনার হাত ধরে বের হয়েছে। এমন একজন মানুষ হয়েও আপনার কেন রাজনীতিবিদ বা অন্য লোকের দ্বারস্থ হতে হবে? বরং অনেকেই তো নিজ উদ্যোগে আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দেবার কথা। এই পথটা কেন আমরা তৈরি করতে পারি না?
মতিউর রহমান চৌধুরী : সত্যি বলতে, যতোই হাহাকার করলাম, কেউই আমার খোঁজ নিলো না। একটা সংগঠনকে দাঁড় করাতে দীর্ঘ পঁচিশটা বছর এখানে দিয়েছি। আমি দীর্ঘ ১২ বছর জেলার সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি ছিলাম। মৌসুমী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ছিলাম। উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সেক্রেটারি ছিলাম ১২ বছর। কিছুই ধরে রাখতে পারলাম না। কল্লোল নাট্যগোষ্ঠীতে আমি অভিনয় করেছি, সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলাম। মিউজিক ডিরেক্টর ছিলাম। অনেক চড়াই-উতরাই পার হওয়ার পর দেখি, আমার ডাকে কেউ আর সাড়া দেয় না। আমি আমার কাজ চালিয়ে গেছি। যদি কখনো সূর্য ওঠে, তাহলে মানুষ তো দেখবেই। আমার অনেক বড়ো একটা আক্ষেপ, যতোই চেষ্টা করলাম, আমি পারলাম না। আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদের এদেশে মূল্যায়ন নেই। এমনিতে অনেকেই ‘গুরু গুরু’ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। কিন্তু আমার খোঁজ কেউ নিয়েছে কোনোদিন? নেয়নি।

