গতকাল (২৭ জুন ২০২৬, শনিবার) ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’ ও ‘মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়, নরসিংদী’র যৌথ উদ্যোগে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এবং কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দ স্মরণে আলোচনা, নাটক ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ‘বাংলাদেশে পশ্চাৎমুখী সংকেত : ভুল মানুষের কাছে নতজানু নই’ শিরোনামে ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, নরসিংদী’র মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এ-আয়োজন। সভাপতিত্ব করেন ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’র সহ-সভাপতি নূরুদ্দীন দরজী।
শুরুতেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’র সাধারণ সম্পাদক মহসিন খোন্দকার সোমেন-সুকান্ত-রুদ্র স্মরণে এ-আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি একটা ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ভবিষ্যত তিমিরে ঘুরপাক খাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তিনজন সাহিত্যিকের রচনাই বর্তমান সময়ের তরুণদের মগজ গঠনে ও বোধবীক্ষণে ভূমিকা রাখবে।”
এরপর অনুষ্ঠানের সভাপতি নূরুদ্দীন দরজীকে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করে নেন প্রগতি লেখক সংঘে সদস্য মনোয়ারা স্মৃতি। একইসাথে ‘বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী’র সভাপতি সুমন ইউসুফ এবং ‘মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়, নরসিংদী’র সভাপতি জহির মৃধাকে উত্তরীয় পরিয়ে বরণ করেন অনুষ্ঠানের সভাপতি।
শুরু হয় মূল আয়োজন। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ছয়টি কবিতা আবৃত্তি করতে ছয়জন আবৃত্তিশিল্পী মঞ্চে আসেন। তারা সুকান্তের ছাড়পত্র, দেশলাই কাঠি, একটি মোরগের আত্মকাহিনী, দুর্মর, প্রার্থী এবং বোধন কবিতা আবৃত্তি করেন।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবন ও সাহিত্যকর্মের ওপর আলোচনা করতে মঞ্চে আসেন রফিকুল ইসলাম মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ। তার আলোচনায় সুকান্তের কবিতা, দর্শন ও সংগ্রামের নানা দিক উঠে আসে। তার মতে, সুকান্তের কবিতাতেই তাঁর দর্শন-তাঁর বক্তব্য আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি সুকান্তের বিভিন্ন কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তাঁর কবিতায় উঠে আসা সাম্প্রদায়িকতা, ফ্যাসিবাদ, শোষণ ও সংগ্রামের কথা স্পষ্ট করেন।
তিনি বলেন, “দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা, গভীর মমতা ছিলো সুকান্তের। আর ছিলো তারুণ্যের তেজোদ্দীপ্ততা। সেজন্যে তার শব্দচয়ন ও কাব্যিক বোধে দেখা যায় তারুণ্যের দীপ্তি। সুকান্ত ছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ, মতাদর্শিক কবিতা ও রাজনীতিতেই তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন।”
তিনি আরো বলেন, “সু-সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও সুকান্তের কবিতা শিল্পোত্তীর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাণিত করেছে সুকান্তের রচনা। কিন্তু জুলাইয়ের মতো অভ্যুত্থানে দেয়াল লিখনে সুকান্তের উঠে না আসাটা শঙ্কার। …যদি আমরা প্রতিবাদী হই, সমাজ পরিবর্তন করতে চাই তাহলে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতার কাছে আমাদের যেতেই হবে।”
অনুষ্ঠানের পরবর্তী ধাপে রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সাতটি কবিতা আবৃত্তি করেন সাতজন আবৃত্তিশিল্পী। তারা আবৃত্তি করেন— কথা ছিলো সুবিনয়, কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প, বাতাসে লাশের গন্ধ, মানুষের মানচিত্র ৪, টাকার রচনা এবং হাড়ের ঘরখানি।
তারপর রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর ওপর আলোচনা করেন নরসিংদী জেলার কাগজ ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র সম্পাদক ও কবি সুমন ইউসুফ। তিনি বলেন, “রুদ্রের কবিতা বিদ্রোহ, বিপ্লব, দেশপ্রেমসহ নানা উৎকর্ষে সমৃদ্ধ। সত্তর-আশির দশকের কবিতার চেয়ে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন ফরম্যাট কবিতায় এনেছেন রুদ্র। তিনি নতুন ভাষা, নতুন ভঙ্গি, নতুন বিষয়বস্তুতে শ্লোগাননির্ভর কবিতা রচনা করেছেন।”
তার আলোচনায় রুদ্রের জীবনের নানা দিক উঠে আসে। বোঁদলেয়ার, র্যাবোসহ সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের পাঠ নিয়েছেন রুদ্র। মেডিক্যালে না পড়ে বাবাকে এবং সমাজ ও সামজিকতাকে অস্বীকার করেছেন। বোহেমিয়ান জীবনের চূড়ান্তটা যাপন করেছেন রুদ্র মুহাম্মদ।
সুমন ইউসুফের আলোচনার বড়ো অংশ জুড়ে ছিলো রুদ্রের কবিতায় সমকালীন সমাজ ও রাজনীতির পাঠ। রুদ্র-র কবিতা থেকে উদ্ধৃত করে তিনি দেখান, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে ব্যর্থতা রুদ্রের কবিতায় উঠে এসেছে। শেখ মুজিবের নেতৃত্বদানে ব্যর্থতা রুদ্র-র কবিতার বিষয়বস্তু হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সময় স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনরুত্থান নিয়ে রুদ্র লিখেছেন ‘জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন’। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন সরব, যুক্ত ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ গঠনে। সুমন ইউসুফ উল্লেখ করেন, “রুদ্রের বন্ধুরা বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রের কাছে নানা সুবিধা নিয়ে দেশ লুটপাট করলেও রুদ্র ছিলেন পুরোপুরি বিপরীত। …পঁয়ত্রিশ বছর পর আজ নতুন রুদ্রের আগমন প্রয়োজন। ভাষা বদলেছে, জীবনের গতিপ্রকৃতি বদলেছে। এ-সময়ের রুদ্র নতুন ভাষায় দ্রোহ, বিপ্লবের কথা বলবে, রাজনীতির মুখোশ উন্মোচনের কাজ করবে।”
এরপর সোমেন চন্দের জীবন ও রচনা নিয়ে আলোচনা করেন বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নারায়ণগঞ্জ’-এর সভাপতি জাকির হোসেন। আলোচনায় তিনি সাহিত্যের দুই ধারা আর্ট ফর আর্টস শেক ও আর্ট ফর লাইফস শেকের উল্লেখ করে বলেন, “তিনজন সাহিত্যিকই আর্ট ফর লাইফস শেক ধারার অনুসারী ছিলেন। সোমেন ছিলেন আজীবন সংগ্রামী এবং কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী। এই সংগ্রামই তার ফ্যাসিস্টদের হাতে হত্যার শিকার হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
সোমেনের রচনা উদ্ধৃত করে তিনি দেখান, কীভাবে তার রচনায় শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, মধ্যবিত্ত জীবনের পোস্টমর্টেম উঠে এসেছে। তিনি উল্লেখ করেন, সংকেত গল্পে সোমেন চন্দ একটা মিলে শ্রমিকদের সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পুঁজির সঙ্গে শ্রমের দ্বন্দ্ব বা শ্রেণিসংগ্রামকে তুলে ধরেছেন। বনস্পতি গল্পে মেটাফোর ব্যবহার করে সামন্তবাদের ক্ষয়িষ্ণু চিত্র তুলে ধরেছেন। ইঁদুর গল্পে মধ্যবিত্ত শ্রেণির চরিত্র উন্মোচন করেছেন। তিনি বলেন, “আজকের সোসাইটিকে বুঝতে চাইলে আজ কেন তাদের মতো এমন প্রতিভাবান লেখক গড়ে উঠছে না, তা বিশ্লেষণ করতে হবে।”

অনুষ্ঠানের একদম শেষভাগে মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়ের পরিবেশনায় সোমেন চন্দের গল্প অনুসারে ‘ইঁদুর’ নাটক মঞ্চস্থ হয়। গল্পটির নাট্যরূপ দেন সুমন আজাদ, নির্দেশনায় ছিলেন হাসান মাহমুদ সনেট। নাটকটিতে অভিনয় করেন রাসেল ওয়ালিদ, প্রীতম দে, সূচনা এবং সুব্রত কুমার দাস।
শেষে সভাপতি নূরুদ্দীন দরজী তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “তিনজন সাহিত্যিকের লেখনীই সমাজকে চলমান অবক্ষয় থেকে রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।” তিনি উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠান সমাপ্ত করেন। নরসিংদীর বিভিন্ন অঙ্গনের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

