নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডু। ১২তম মাউন্ট এভারেস্ট আন্তর্জাতিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপ ২০২৬। নেপালে প্রতি বছরই আসর বসে এই প্রতিযোগিতার। এবারের আসরের ব্যাপ্তিকাল ছিলো গত ২৯ থেকে ৩১ মে। স্বাগতিক নেপালসহ অংশ নেয় মোট ৮ টি দেশ। ভারত, জাপান, কাতার, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও ভূটানের সাথে বাংলাদেশ। আর বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছিলো নরসিংদী জেলা কারাতে এসোসিয়েশনের দলটি। অংশগ্রহণ করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, জিতেছে ৩ টি স্বর্ণসহ মোট ৭ টি পদক; দেশকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক সাফল্য।
সিনিয়র বিভাগে কাতা ও কুমিতেতে একাই দুটো স্বর্ণপদক জেতেন নাছরিন আক্তার তামান্না। স্বীকৃতি পান প্রতিযোগিতার ‘সেরা নারী খেলোয়াড়’ হিসেবে। দুটো পদক জেতেন আরেক কন্যা নাছরিন আক্তারও। তার অর্জন সিনিয়র বিভাগ কাতায় স্বর্ণ এবং কুমিতেতে রৌপ্য। জুনিয়র বিভাগ কাতায় পৃথক ক্যাটাগরিতে ব্রোঞ্জ পদক জয়ী হন সৌমিলি রায় ও সৌম দীপ রায়। আর জুনিয়র কুমিতেতে ব্রোঞ্জ জেতেন নাফিজ সরকার। তাদের এই অর্জন ৮ দেশের মাঝে বাংলাদেশকে সামগ্রিকভাবে পৌঁছে দেয় তৃতীয় স্থানে, যা নরসিংদী তো বটেই সমগ্র দেশের জন্যেই বিশেষ গর্বের।
আমার স্বপ্ন নরসিংদীর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কারাতেতে অলিম্পিক স্বর্ণপদক নিয়ে আসা।
নরসিংদীর কাঁধে ভর দিয়ে কারাতেতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাফল্য অবশ্য এবারই প্রথম নয়। জেলা কারাতে এসোসিয়েশনের দল এর আগেও নেপালের একাধিক আন্তর্জাতিক ইভেন্ট, দুবাই, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইভেন্টে অংশগ্রহণ করে এবং অর্জন করে দক্ষিণ এশীয়, মহাদেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পদক-পুরস্কার। সাফল্যের এই যাত্রার প্রধান রূপকার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান প্রশিক্ষক সেন্সি রুপু আহমেদ, যিনি একজন ৫ম ডেন ব্ল্যাকবেল্ট ও এশিয়ান কারাতে ফেডারেশন স্বীকৃত বাংলাদেশের স্বল্পসংখ্যক কোচের একজন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশ কারাতে ফেডারেশনের আওতায় ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার নিয়ন্ত্রণে ২০০৩ সালে পথচলা শুরু করে নরসিংদী জেলা কারাতে এসোসিয়েশন। ‘গঙ্গাঋদ্ধি’র সাথে আলাপনে তিনি এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা, সম্ভাবনা ও সংকট নিয়ে অনেক কথা তুলে ধরেন।

তার জবানি থেকে জানা যায়, এই যাত্রার শুরুর দিকটা মোটেও মসৃণ ছিলো না। প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়ে গেলেও প্রশিক্ষণার্থী পেতে বেশ বেগ পেতে হয়। কারাতে সম্পর্কে জনমনে ইতিবাচক ধারণা ছিলো না। সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো, এইসব অহেতুক মারামারি, উগ্রতা চর্চা বা কোনো ব্যবহারিক উপকার এসবের নেই। সেই সময়টায় এসোসিয়েশন ফোকাস করে অর্থনৈতিকভাবে অস্বাবলম্বী পরিবার থেকে আসা বাচ্চাদের প্রতি। কারাতে প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করলে তাদের জামা কিনে দেয়া, স্কুলের বেতন পরিশোধ করে দেয়া, জীবনধারণের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন উপকরণ দেয়া হতো। একটা পর্যায়ে গিয়ে এই প্রশিক্ষণার্থীরা সাফল্য পেলে এবং মেয়েদের আত্মরক্ষায় কারাতের গুরুত্ব বিভিন্নভাবে প্রচারে এলে ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয় এবং কারাতে সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হতে থাকে। তখন সমাজের সব শ্রেণি থেকেই আসতে থাকে প্রশিক্ষণার্থী। এই মুহূর্তে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে এক শতাধিক প্রশিক্ষণার্থী। এর বাইরে প্রতিষ্ঠানটির আওতায় কারাতে শিখছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী।
বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত স্পোর্টস ইভেন্টগুলোর মধ্যে অন্যতম কারাতে। অর্থাৎ জনপ্রিয়তায় পিছিয়ে থাকলেও কারাতে সারা পৃথিবীতে ফুটবল ক্রিকেট ব্যাডমিন্টন কিংবা অন্য যেকোনো স্পোর্টসের সমমর্যাদার খেলা হিসেবেই স্বীকৃত। নরসিংদী জেলায়ও কারাতে বিশেষ জনপ্রিয় নয়। কিন্তু সাফল্যের বিচারে ক্রিকেট ফুটবল কিংবা অন্য যেকোনো জনপ্রিয় খেলার চেয়ে কারাতে অনেকটাই এগিয়ে। জাতীয় কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আর কোনো স্পোর্টসেই নরসিংদীর এমন সাফল্য নেই। আর এর পেছনে মূল অবদান জেলা কারাতে এসোসিয়েশনের।
আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোয় খেলোয়াড় নির্বাচনপ্রক্রিয়া নিয়ে রুপু আহমেদ বলেন, “বিদেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমরা প্রথমে এক্সপার্টাইজের ভিত্তিতে স্টুডেন্টদের নির্বাচন করি। দুটো প্রক্রিয়ায় বাচ্চারা বিদেশে যেতে পারে। একটা হচ্ছে পুরোপুরি সরকারিভাবে। অর্থাৎ ট্যুরের পুরো ব্যয় সরকার বহন করে। অন্যটা ব্যক্তিগতভাবে। ব্যয়ভার নিজের বহন করতে হয়। স্টুডেন্টদের যারা নির্বাচিত হয়, তাদের মধ্যে আগ্রহীদেরই আমরা নিয়ে যাই।”
সারা দেশে জেলা পর্যায়ের কারাতে এসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে গুণমানের বিচারে নরসিংদী প্রথম সারিতে জায়গা করে নিয়েছে। উচ্চমানের প্রশিক্ষণ, আধুনিক ইকুইপমেন্ট, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা সাফল্যে নরসিংদীর সমকক্ষ আর কেউই নেই বলা চলে। নরসিংদী জেলা কারাতে এসোসিয়েশন সারা দেশে একটি রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। জাতীয় পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিতে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রশিক্ষণার্থীরা ভিড় জমাচ্ছে নরসিংদী জেলা কারাতে এসোসিয়েশনে।
সাধারণভাবে স্পোর্টস ইভেন্ট হিসেবে কিংবা আত্মরক্ষা বা ফিটনেসের জন্যেই অনেকে কারাতে শিখতে এলেও এটা প্রশিক্ষণার্থীদের ক্যারিয়ার গড়তেও বিভিন্নভাবে সাহায্য করছে। এসোসিয়েশনের প্রশিক্ষণার্থী রায়পুরার সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা তামান্না, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরপরই বিমান বাহিনীতে নিয়োগ পান এবং বর্তমানে কর্মরত আছেন পাইলট হিসেবে। আরেক প্রশিক্ষণার্থী ভরতেরকান্দি গ্রামের মার্জিয়া ২০ বছর যাবৎ কর্মরত আছেন সেনাবাহিনীতে। এছাড়াও প্যারামিলিটারি, প্রতিরক্ষার বিভিন্ন সেক্টরে, বিকেএসপিতে কর্মরত বা প্রশিক্ষণরত আছেন আরো অনেকে যাদের বিশেষভাবে সাহায্য করেছে এই কারাতে প্রশিক্ষণ।
এসোসিয়েশনের অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক মানের একটি কারাতে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করছে এবং ইতোমধ্যে অনেকদূর এগিয়েও গেছে। উচ্চ মানসম্পন্ন কারাতে ম্যাট, মিরর, অত্যাধুনিক ইকুইপমেন্ট ও প্রশিক্ষণ সামগ্রী ইতোমধ্যেই আনা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিন্তু এসবের প্রায় সবটাই হচ্ছে ব্যক্তি উদ্যোগে। সরকারি বা বেসরকারি প্রণোদনা নেই বললেই চলে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা এসোসিয়েশনের আধুনিকীকরণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের আশ্বাস দিলেও তার বাস্তব প্রতিফলন কমই ঘটেছে বলে জানান রুপু আহমেদ।
নরসিংদী শুধু নয়, সারা বাংলাদেশেই প্রণোদনার যথেষ্ট অভাব। সরকারিভাবে যেটুকু পাওয়া যায়, তা জাতীয় পর্যায়ের ইভেন্টগুলোতে অংশগ্রহণের পেছনেই ব্যয় হয়ে যায়। বিদেশ সফরগুলোতে বিপুল ব্যয়ের অর্থ সংস্থান করতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হলে তাদেরও বিশেষ উৎসাহ দেখা যায় না। অর্থসংগ্রহ যা হয়, তা প্রয়োজনের তুলনায় নিতান্তই অপ্রতুল। তাই ক্রমাগত সাফল্য আসা ইভেন্টগুলোয় অংশগ্রহণ ব্যয় নিয়েও ভাবনায় থাকতে হয়, করতে হয় নানা পরিকল্পনা। রুপু আহমেদ বলেন, “সাফল্য আনছে মূলত অসচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরাই। আমার এখানে সচ্ছল পরিবারের বাচ্চারা থাকলেও তারা তেমন রেজাল্ট আনতে পারছে না। দিন এনে দিন খাওয়া পরিবারের সন্তানদের মাঝেই দেখা যায়— ক্ষিপ্রতা আছে, ক্ষুধা আছে। তাদেরই বিদেশের ইভেন্টগুলোয় নিয়ে যাওয়া যায়। তখন আমি যেটা করি, কিছু সচ্ছল পরিবারের বাচ্চাদের নিই, কিছু অসচ্ছল পরিবারের নিই। সচ্ছলদের বলি, এই বাচ্চারা সম্ভাবমাময়, এদের সাপোর্ট দেন। তারাও রাজি হয়। এরকম আরো নানা কৌশল অবলম্বন করতে হয়।”
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কারাতেতে বাংলাদেশ সাফল্য পেলেও এই ধরনের সংকটের কারণে সেই সাফল্য দক্ষিণ এশিয়ার গণ্ডির বাইরে খুব একটা যেতে পারেনি। দক্ষিণ এশীয় ইভেন্টগুলোয় বাংলাদেশ অনেকটাই সফল। কিন্তু মহাদেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলোয় বাংলাদেশ পদক জিতলেও সাফল্য খুব বেশি বলা চলে না। কারাতেতে সাফল্যের জন্যে উচ্চমানের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন যথাযথ অবকাঠামোর, প্রয়োজন মানসম্মত ইকুইপমেন্টের। আর প্রয়োজন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলোয়াড়দের প্রচুর ম্যাচ খেলার, হার-জিতের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের-শেখার। আর এই সবকিছুর জন্যেই প্রয়োজন অর্থের, প্রণোদনার। সামর্থ্যরে স্বাক্ষর রাখলেও দিনশেষে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের বাঁধা পড়ে যেতে হচ্ছে এখানটায়।
রুপু আহমেদ বলেন, “আমার স্বপ্ন নরসিংদীর ছেলেমেয়েদের নিয়ে কারাতেতে অলিম্পিক স্বর্ণপদক নিয়ে আসা।” এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি নিবেদিতপ্রাণ। আর নরসিংদীর সন্তানেরাও আন্তর্জাতিক সাফল্য এনে ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছেন, তারা সামর্থ্য রাখেন বিশ্বজয়ের। সরকারি-বেসরকারি প্রণোদনা পেলে নরসিংদীর হাতে বাংলাদেশের চির অধরা অলিম্পিক পদক জয় হয়তো আর অসম্ভবও ঠেকবে না।

