নরসিংদীর অপরিকল্পিত আবাসন ব্যবস্থা

নরসিংদী ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা। ব্যবসায়িক কেন্দ্র ও শিল্পাঞ্চল হওয়ার পাশাপাশি ঢাকা-সিলেট হাইওয়ে ও রেল যোগাযোগ অনুকূলে হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় দ্রুত যাতায়াত করা যায়। এ-সকল কারণে এই জেলার জনসংখ্যা বেড়ে গেছে দ্রুত ও অপরিকল্পিতভাবে। জেলার অন্যান্য অংশের চেয়ে সবচেয়ে দ্রুত জনসংখ্যা বেড়েছে নরসিংদী পৌরসভার। সময়ের চাহিদায় উন্নয়ন হয়েছে রাস্তাঘাটসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর। এই উন্নত অবকাঠামোর দুই পাশে গড়ে ওঠেছে বহুতল বিপণী বিতান, অফিস, ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট ও অন্যান্য সুবিধা সম্বলিত প্রতিষ্ঠান। এতোসব সুবিধা সহজেই লব্ধ হওয়ার কারণে এই পৌরসভার ভেতরেই মানুষের বসবাস করার আগ্রহ থাকে। আর এই আগ্রহকেই চাহিদা হিসেবে ব্যবহার করে সামনে এগিয়ে এসেছে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো। গড়ে তুলেছে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বহুতল আবাসিক ভবন। আর এই আবাসিক ভবন ফ্ল্যাট আকারে কিনে বসবাস করে জেলার এবং জেলার বাইরে থেকে আসা মানুষজন; সপরিবার। কিছু কিছু ভবন পুরোটাই আবাসিক, আবার কিছু কিছু ভবন নিচের কয়েক তলা বাণিজ্যিক, বাকিটা আবাসিক।

এই ধরনের ভবনগুলোর বেশিরভাগই গড়ে ওঠেছে পৌরসভার ভেতরের ব্রাহ্মন্দী ও এর আশপাশের এলাকায়। এদিকে উপজেলা মোড় থেকে শুরু করে ওদিকের গাবতলী মোড় পর্যন্ত দুই কিলোমিটারের চেয়ে কম এলাকায় প্রায় পনেরোটির উপরে বহুতল আবাসিক ভবন গড়ে তুলেছে ও তুলছে ডেভেলপার কোম্পানিগুলো। আরো কিছু প্রজেক্ট তাদের পরিকল্পাধীন আছে। আর ওদিকে শহরের নতুন বাজার থেকে শুরু করে পৌরসভা মোড় পর্যন্ত নয়টার মতো এই ধরনের ভবন আছে। একেকটি ভবনের প্রতি তলায় সাধারণত থাকে চার থেকে ছয়টি ফ্ল্যাট। সেখানে পরিবার প্রতি গড়ে ৪-৫ জন বাস করে। সেই হিসেবে একেকটি ভবনে প্রায় গড়ে দুইশো থেকে আড়াইশো বা তার বেশি মানুষ বসবাস করে। এখন প্রশ্ন হলো, হুট করে ভবনগুলোর বাসিন্দা হয়ে যাওয়া ও তার আশেপাশের নাগরিকদের বসবাসের আনুষঙ্গিক সুবিধাদি দেয়ার জন্যে কতোটা প্রস্তুতি আছে বিদ্যমান পৌরসভা কর্তৃপক্ষের?

সর্বপ্রথম যে-কথাটি চলে আসে, তা হলো অবকাঠামোগত চাপ। এই অল্প এলাকায় এতো মানুষের বসবাসের ফলে দরকার হয় বিপুল পরিমাণ পানির। প্রয়োজনীয় এই পানি তোলা হয় মাটির গভীর থেকে শক্তিশালী পাম্পের সাহায্য। এতে দ্রুতই নেমে যাচ্ছে এই এলাকার পানির স্তর, যা ভোগান্তির সৃষ্টি করছে এলাকার আদি বাসিন্দাদের। তারা নরমাল পাম্প ব্যবহার করে আর পানি পাচ্ছে না। ফলে তারাও বাধ্য হচ্ছে ব্যয়বহুল সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করতে, যা পানির স্তরকে আরো নিচে নামিয়ে দিচ্ছে। আর যারা এই অঞ্চলে তুলনামূলক দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যাদের ব্যয়বহুল মেশিন কেনার সামর্থ্যে কুলাচ্ছে না, তারা পোহাচ্ছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ। বিশুদ্ধ পানির মতো এই অমূল্য সম্পদের ব্যবহারের এই অব্যবস্থাপনা তৈরি করছে এক বিশাল মানবিক বিপর্যয়ের এবং গভীর অনিশ্চয়তার ভেতর ফেলে দিচ্ছে ভবিষ্যত প্রজন্মকে। শঙ্কিত করে তুলছে এই অঞ্চলের ভবিষ্যত।

এছাড়া এক জায়গায় বিদ্যুতের বিপুল চাহিদা থাকায় তৈরি হচ্ছে বিদ্যুৎ বিতরণ অব্যবস্থাপনা, যাকে বলে লোডশেডিং বা ভোল্টেজ ইনস্ট্যাবিলিটি। শহরের ভেতর এতো মানুষের চলাচলের সুবিধার জন্যে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে ব্যাটারি চালিত মিশুকের সংখ্যা। এতে যেমন বিদ্যুতের উপর চাপ বাড়ছে, তেমনি চাপ বাড়ছে রাস্তাঘাটের উপর। তীব্র যানজট এই শহরের নিত্যসঙ্গী। শহরের জেলাখানার মোড়, মালাকার মোড়, সংগীতা, আরশীনগর ও পৌরসভা মোড়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় প্রায় সবসময়ই লেগে থাকছে তীব্র যানজট। এতে যেমন অপচয় হচ্ছে মানুষের মূল্যবান সময়ের, তেমনি কমে যাচ্ছে কর্মদক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা। প্রায়ই এমন হচ্ছে যে, যানজটের শিকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবার যানবাহনগুলোকেও।

অন্যতম শঙ্কার বিষয় হলো, এই অতিরিক্ত জনংখ্যার প্রয়োজনের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে চাপ পড়ছে সবুজায়নের উপর। বহুতল ভবনগুলো নির্মাণের সময় স্বাভাবিভাবেই খালি করতে হচ্ছে জমি, যেখানে আগে ছিলো সবুজ গাছপালা। এছাড়া এই অতিরিক্ত জনংখ্যার জন্যে বিভিন্ন সুবিধাদি নির্মাণ করতে নির্বিচারে কাটা হচ্ছে সবুজ বৃক্ষরাজি, যা তৈরি করছে পরিবেশ বিপর্যয়। তাছাড়া বিশাল বিশাল এসব কংক্রিটের দালান ধরে রাখছে সূর্য থেকে আসা তাপ। ফলে উত্তপ্ত হয়ে ওঠছে এই অঞ্চলের পরিবেশ। এছাড়া এসব ফ্ল্যাট তুলনামূলক সচ্ছল জনগোষ্ঠীর কেনা এবং প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাটের বাসিন্দারা ব্যবহার করছে একের অধিক এয়ার কন্ডিশনার, যেগুলো নির্গত করছে গরম বাতাস। ফলে পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ-সকল সমস্যার পরে আসে সামাজিক ও জীবনযাত্রাগত সমস্যা। এই হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়া জনগোষ্ঠীর সাথে হঠাৎ করে বাড়ে না সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি। স্বাস্থ্যসেবা, স্কুল-কলেজ ও আরো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে বা সেবার পরিধি বাড়াতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা, বাজেট ইত্যাদির প্রয়োজন হয়, যা সময় সাপেক্ষ। চাইলেই এই ধরনের সেবা সরকারের পক্ষে রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব হয় না। তাই গোঁজামিলের সুযোগে দ্রুত বিভিন্ন ভবন ভাড়া নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে বিভিন্ন হাসপাতাল। এসব হাসপাতালের না আছে কোনো কাঠামো, না আছে পরিবেশ, না আছে দক্ষ-প্রশিক্ষিত ডাক্তার-নার্স। উদাহরণস্বরূপ : শহরের সদর হাসপাতালের পাশে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলা হয়েছে, যা পূর্বে ছিলো একটি আবাসিক হোটেল। হোটেল ব্যবসা মন্দা হওয়ায় মালিক সেটিকে হাসপাতালে রূপান্তর করেছেন, যা হাসপাতালের ধারণার সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যহীন ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক ধারণার অবমাননা। পুরো শহর এই ধরনের হাসপাতালে সয়লাব। অস্বাস্থ্যকর ও জোড়াতালি দেয়া এসব হাসপাতাল চলছে স্বাস্থ্যপ্রশাসনের নাকের ডগায়। জেলার স্বাস্থ্যবিভাগ যেন চোখের রোগে আক্রান্ত!

এ তো গেলো স্বাস্থ্যবিভাগের বন্দনা। এবার আসা যাক শহরের শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে। আমরা দেখতে পাবো এর করুণ বেহাল দশা! শহরে একটি বালক উচ্চ বিদ্যালয় ও একটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় আছে; সরকারি। এখানে প্রাথমিক থেকে এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষালাভের সুযোগ আছে। এছাড়া আছে ২১ টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১ টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। এই পরিমাণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এই বিপুল জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্যমান শিক্ষার্থীর জন্যে খুবই অপ্রতুল। তাই শিক্ষার চাহিদা মেটাতে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠেছে অসংখ্য স্কুল-কলেজ, যাদের বেশিরভাগই অবকাঠামোগতভাবে মানহীন বা নিম্নমানের। হাসপাতালের মতো এসব স্কুল-কলেজের নেই সঠিক অবকাঠামো। ফ্ল্যাট-বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এসব স্কুল-কলেজ। শহরের পশ্চিম ব্রাহ্মন্দীর বালুরচর এলাকার প্রায় প্রতিটি ভবন ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে এ-ধরনের প্রচুর নিম্নমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের সংকীর্ণ ক্লাশরুমে রয়েছে পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব, তেমনি নেই কোনো ক্যাম্পাস বা আঙিনা, রয়েছে মানসম্পন্ন নিজস্ব শিক্ষকের অভাব। আবার শিল্পপতিরা টাকা-পয়সা খরচ করে পর্যাপ্ত সুবিধাদিসহ নির্মাণ করেছেন যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, তা যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সেসব প্রতিষ্ঠানে চলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা ও কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা। শিক্ষার এই অব্যবস্থাপনার কারণে যেমন ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সঠিক শিক্ষা, তেমনি জাতি পরিণত হচ্ছে এক দিশেহারা জনগোষ্ঠীতে, যাদের মানসিক বিকাশ প্রশ্নসাপেক্ষ।

এই ধরনের অপরিকল্পিত ফ্ল্যাট নির্মাণের ফলে আশেপাশের জমির দাম বাড়লেও কমে গিয়েছে স্থানীয় লোকেদের জীবনযাত্রার মান। জমির দাম বাড়লে তা হয়তো স্থানীয় লোকেদের জমি বিক্রি করার সময় কাজে আসে, কিন্তু তাদের জমি বিক্রি না করার আগ পর্যন্ত কোনো কাজে আসে না। বরং জমির দাম বাড়ায় বিভিন্ন স্থান থেকে সচ্ছল মানুষ গাবতলী-পুরাণপাড়া এলাকার কৃষিজমি কিনে পর্যন্ত বাড়িঘর করে ফেলেছে। যার ফলে একদিকে যেমন কমেছে মূল্যবান কৃষিজমি, তেমনি আশেপাশে নতুনভাবে আগত সচ্ছল মানুষদের সাথে প্রতিযোগিতা করে থাকতে হচ্ছে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর। ফলে স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি, চাকুরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে এলাকার জনগণ। তাছাড়া এই ধরনের ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে অনেক মানুষ ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে আসায় মানুষের মাঝে সামাজিক সংহতি দুর্বল থাকে, যার ফলে এই ধরনের মানুষের বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে আন্দোলনের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ কম থাকে। দেখা যাচ্ছে, আগে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে যেভাবে স্থানীয় জনগণের মাঝে প্রতিবাদ, প্রতিক্রিয়া, আন্দোলন দেখা যেতো, এখন তা নেই বললেই চলে। ফলে দুর্বল হয়ে গেছে স্থানীয় জনগণের অধিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া, পক্ষান্তরে বেড়েছে বিভিন্ন পক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা।

এই ২০২৬ সাল ভূমিকম্পের বছর। একদিকে মাঝারি মানের ভূমিকম্প আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়ে গেছে যে, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আমাদের কী পরিমাণ ঘাটতি আছে। বড়ো ধরনের কোনো ভূমিকম্প হলে এই ধরনের বড়ো বড়ো ভবনে উদ্ধারকার্য চালানো স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে। অগ্নিকাণ্ড হলে তা মোকাবেলা করাও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। উদাহরণস্বরূপ গাবতলী বা পশ্চিম ব্রাহ্মন্দীতে বহুতল এসব ভবনে পৌঁছানোর এসব রাস্তা যে-পরিমাণ আঁকাবাঁকা আর সরু, তাতে সেখানে এসব সেবা পৌঁছানোর আগে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

এখন প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা না থাকার পড়েও কীভাবে এসব বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতি পেলো ডেভেলপার কোম্পানিগুলো? এই অঞ্চলের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্থানীয় সরকার বিভাগের— পৌরসভা-ইউনিয়ন পরিষদের। এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। তারা কি আদৌ এই ধরনের ঝুঁকির বিষয়ে ওয়াকিবহাল, তা নিয়ে প্রশ্ন করা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। আর যদি তারা এই বিষয়ে যথেষ্ট জ্ঞান রেখেই থাকেন, তাহলে তাদের নাকের ডগায় এই ধরনের অপরিকল্পিত স্থাপনাগুলো হলো কী করে? ডেভেলপার কোম্পানিগুলো সবসময়ই নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ দেখেছে এবং দেখবে। তারা যেভাবে পারবে, সেভাবেই এখানে বিল্ডিং করে তাদের ব্যবসায়িক কর্ম করে সটকে পড়বে। সেক্ষেত্রে আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে নিজেদের এলাকা রক্ষা করার ক্ষেত্রে, গড়ে তুলতে হবে সামাজিক আন্দোলন, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই। কেবল আমাদের সচেতনতাই পারে এই অঞ্চলকে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যে বসবাস উপযোগী করে তুলতে।

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ