ইংরেজ বিচারপতির যুগ শেষ হওয়ায় বাঙালি বিচারপতির যুগ শুরু হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। আর সেটা সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন ছাত্র ফণীভূষণ চক্রবর্তীর মাধ্যমেই পূরণ করা হয়। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। তিনি শুধু প্রথম বাঙালি প্রধান বিচারপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় স্থায়ী প্রধান বিচারপতি।
নরসিংদীর ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সাহিত্য-সংস্কৃতি কতোটা সমৃদ্ধ, সেটা বোধহয় আমরা এখনো অনুভব করতে পারিনি। চিন্তা চর্চার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি বলেই সেই বোধশক্তিটা কাজ করছে না। মাথা উঁচু করে কথা বলতে পারছি না। বিক্রমপুর, সোনারগাঁও আর ভাওয়ালের মতো বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক জনপদ হলো মহেশ্বরদী পরগণা তথা আজকের আধুনিক নরসিংদী। নামকরণে সিংহের ন্যায় প্রতাপশালী মানুষের জনপদ নির্দেশিত হলেও সেটা আমরা খুঁজে বেড়াই না।
ভারতবর্ষের প্রথম উচ্চতর আদালত বা হাইকোর্ট কলকাতায় গড়ে ওঠেছে। সেই হাইকোর্টে একজন বাঙালি প্রথম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হলে বাঙালিরা আবেগে তাড়িত হয়। কিন্তু সেই বাঙালি প্রধান বিচারপতি ফণীভূষণ চক্রবর্তী (১৮৯৮- ১৯৮১) যখন নরসিংদীর শিবপুর উপজেলাধীন জয়মঙ্গল গ্রামের বাসিন্দা, তখন গর্বে তো আমাদের মাথা আকাশে স্পর্শ করার কথা। কিন্তু সিংহভাগ মানুষ তাঁর নাম জানলেও তিনি কোথাকার মানুষ, সেটার খবর জানে না।

তিনি শুধু নরসিংদীতে জন্মগ্রহণই করেননি, তাঁর শিক্ষাজীবন কেটেছে সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনে। ইনস্টিটিউশনের টালিঘরের বোর্ডিংয়ে থেকে মেট্রিক পাশ করেছেন। প্রখ্যাত লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) একবার বেড়াতে এসে সেই টালিঘরে কয়েকদিন রাত্রিযাপন করেছিলেন। এই টালিঘরে থাকার সময় ফণীভূষণ চক্রবর্তীর জীবনে একটি হাস্যকর ঘটনা ঘটেছিলো। বোর্ডিংয়ে হিন্দু ছাত্রদের জন্যে মুরগীর মাংস নিষিদ্ধ ছিলো। ফণীভূষণ শুধু হিন্দু ছিলেন না, ঠাকুর বংশের লোক ছিলেন। কিন্তু তিনি এসব ধর্মীয় কুসংস্কার মানতেন না। নিয়মিত মুরগীর মাংস খেতেন। এতে একসময় স্থানীয় গোঁড়া হিন্দুদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এবং এই কারণে তাঁকে নিরুপায় হয়ে গয়াকাশী গিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিলো।

সেই প্রায়শ্চিত্ত করা ফণীভূষণ অনেক কুসংস্কার মাড়িয়ে প্রথম জীবনে একজন শিক্ষাবিদ ও পরে একজন আইনবিদ হিসেবে ঢাকা-কলকাতা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। কলকাতা হাইকোর্টের প্রথম বাঙালি প্রধান বিচারপতি ও রাজ্যপাল হয়ে বাঙালির গর্ব হয়ে ওঠেছিলেন। তাঁর সম্পর্কে জানার আগে কলকাতা হাইকোর্ট সম্পর্কে যৎসামান্য আলাপ করা দরকার।
১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন ভারতবর্ষের প্রথম হাইকোর্ট কলকাতা হাইকোর্টকে মঞ্জুরি প্রধান করেন রাণী ভিক্টোরিয়া। এর আগে ফোর্ট উইলিয়ামে বিচারিক আদালতের কাজ চলতো। হাইকোর্টের প্রথম প্রধান বিচারপতি ছিলেন স্যার বার্নস ময়ূর। তিনি ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দে নিযুক্ত হয়ে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ ৮ বছর প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন। এরপর একে একে স্যার রিচার্ড কাউচ (১৮৭০-১৮৭৫), স্যার রিচার্ড গার্থ (১৮৭৫-১৮৮৫), স্যার উইলিয়াম কমার পেথেরাম (১৮৮৬-১৮৯৬), স্যার ফ্রান্সিস উইলিয়াম ম্যাকলিয়ান (১৮৯৬-১৯০৯), স্যার লরেন্স হিউ জেনকিন্স (১৯০৯-১৯১৫), স্যার ল্যানস্লট স্যান্ডারসন (১৯১৫-১৯২৬), স্যার জর্জ ক্রুজ র্যাঙ্কিন (১৯২৬-১৯৩৪), স্যার হ্যারল্ড ডার্বিশায়ার (১৯৩৪-১৯৪৬) ও স্যার আর্থার ট্রেভর হ্যারি (১৯৪৬-১৯৫২) প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থাৎ ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশ স্বাধীন হলেও হাইকোর্টে তাদের রাজস্ব শেষ হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। এর কারণ হলো, এদেশ থেকে ব্রিটিশ বিতাড়নের ঠিক আগের বছর অর্থাৎ ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ স্যার হ্যারি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তার মেয়াদ শেষ হয়েছিলো ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। সাংবিধানিক ও বড়লাটের প্রতি সম্মান জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির চাকুরির মেয়াদ পূর্ণ করা হয়েছিলো।
ইংরেজ বিচারপতির যুগ শেষ হওয়ায় বাঙালি বিচারপতির যুগ শুরু হয় ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে। আর সেটা সাটিরপাড়া কালী কুমার ইনস্টিটিউশনের প্রাক্তন ছাত্র ফণীভূষণ চক্রবর্তীর মাধ্যমেই পূরণ করা হয়। তিনি ১৯৫২ থেকে ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে যান। তিনি শুধু প্রথম বাঙালি প্রধান বিচারপতিই ছিলেন না, তিনি ছিলেন প্রথম ভারতীয় স্থায়ী প্রধান বিচারপতি।
ফণীভূষণ চক্রবর্তী শিক্ষাবিদ হিসেবে ঢাকায় নিজের জীবন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। জগন্নাথ কলেজের খ্যাতিমান অধ্যাপক হিসেবে তাঁর সুনাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিলো। তিনি যখন ক্লাশে শেক্সপিয়ার পড়াতেন, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক ছাত্র তা শোনার জন্যে জগন্নাথ কলেজে চলে আসতেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বেড়াতে আসলে ফণীভূষণ চক্রবর্তী ছিলেন তাঁর নিত্য সহচর। নানা অনুষ্ঠানের সংগঠক হিসেবে তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। সংবর্ধনা কমিটির সম্পাদক হিসেবে তাঁর কর্মকাণ্ড সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছিলো।
কিন্তু এই মহান শিক্ষাবিদ ঢাকায় বেশিদিন থাকতে পারেননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর মতো বহু গুণী অধ্যাপককে ঢুকতে দেয়া হয়নি। এই কারণে জগন্নাথ কলেজ থেকে কলকাতার রিপন কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। একই সঙ্গে ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে আইনজীবী হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টে প্র্যাক্টিস শুরু করেন। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে বিচারপতি নিযুক্ত হন। অল্পদিনেই পেশার ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেন। নিখুঁত বিচারকার্য পরিচালনা করে ইংরেজদের কাছেও শ্রদ্ধা পেয়েছিলেন। যার কারণে কলকাতা হাইকোর্টের সর্বশেষ ব্রিটিশ প্রধান বিচারপতি স্যার আর্থার ট্রেভর হ্যারির সময়সীমা পূর্ণ হওয়ার পর বিচারপতি ফণীভূষণ চক্রবর্তীকে সর্বমহল থেকে প্রধান বিচারপতি মনোনীত করা হয়। একজন বাঙালির এমন সাফল্য ছিলো নজিরবিহীন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, এ কে ফজলুল হক আর দেশপ্রিয় যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তর পাশে ফণীভূষণ চক্রবর্তীর নামও লেখা হয়।
১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হরেন্দ্র কুমার মুখোপাধ্যায় মারা গেলে পদটি শূন্য হয়ে যায়। তখন প্রধান বিচারপতি ফণীভূষণ অস্থায়ী রাজ্যপাল হিসেবে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ আগস্ট থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কাছ থেকে রাজ্যপালের দায়িত্ব নেন পদ্মজা নাইডু। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে সরকারি দায়িত্ব থেকে তিনি অবসর গ্রহণ করেন।
জয়মঙ্গলের চক্রবর্তী বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ঠাকুরবাড়ি হিসেবে পরিচিত। বাড়িটি বাঘাব ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল গণির পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। তাদের দাবি, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বসুধারঞ্জন চক্রবর্তী ভারত থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে জয়মঙ্গলে এসেছিলেন। তখন নাকি বাড়িটি তিনি গণি চেয়ারম্যানের কাছে বিক্রি করে গেছেন। কিন্তু এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তলিয়ে দেখা হলে হয়তো প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। যে-পরিবারের তিন ভাই ও এক বোন শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সমাজ সংস্কারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে এরকম ধোঁয়াশা কাম্য নয়।
নরসিংদী জেলার শিবপুর উপজেলার বাঘাব ইউনিয়নের জয়মঙ্গল গ্রামের ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন ফণীভূষণ চক্রবর্তী। তাঁর ছোটো ভাই বসুধারঞ্জন চক্রবর্তী। তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চা করতেন বলে জানা গেছে। তিনি ‘ভগিনী নিবেদিতা’, ‘কাজী নজরুল ইসলাম’ ও ‘মানবতাবাদ’ প্রভৃতি গ্রন্থ লিখে খ্যাতিমান হয়েছেন। জয়মঙ্গল গ্রামের প্রধান ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফণীভূষণ চক্রবর্তীরা তিন ভাই ও এক বোন ছিলেন। অপর ভাইয়ের নাম রনদা চক্রবর্তী। বোনের নাম ইন্দুবালা চক্রবর্তী। তাঁরা সবাই অকৃতদার ছিলেন বলে কোনো বংশধর অবশিষ্ট নেই।

জয়মঙ্গলের চক্রবর্তী বাড়িটি স্থানীয়ভাবে ঠাকুরবাড়ি হিসেবে পরিচিত। বাড়িটি বাঘাব ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল গণির পরিবারের নিয়ন্ত্রণে। তাদের দাবি, ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বসুধারঞ্জন চক্রবর্তী ভারত থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে জয়মঙ্গলে এসেছিলেন। তখন নাকি বাড়িটি তিনি গণি চেয়ারম্যানের কাছে বিক্রি করে গেছেন। কিন্তু এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। তলিয়ে দেখা হলে হয়তো প্রকৃত ঘটনা জানা যাবে। যে-পরিবারের তিন ভাই ও এক বোন শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সমাজ সংস্কারে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাঁদের পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে এরকম ধোঁয়াশা কাম্য নয়।
ফণীভূষণ চক্রবর্তী কলকাতায় যে-বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটির নামকরণ করেছিলেন ‘জয়মঙ্গল হাউস’। নিজ জন্মস্থান জয়মঙ্গল গ্রামকে তিনি কোনোদিন ভুলতে পারেননি। কলকাতা প্রবাসী হয়েও বাড়ির নাম গ্রামের নামে করে সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করেন।
কলকাতায় অধ্যাপনা, ওকালতি ও বিচারকের কাজ করলেও ফণীভূষণ নিজ এলাকার লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। বিশেষ করে, তিনি যে-স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করেছিলেন, সেই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা, জমিদার ও আইনজীবী ললিতমোহন রায়ের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রাখতেন। কলকাতায় যখন প্রথম আসেন, তখন ললিত বাবুকে স্থানীয় অভিভাবক বানিয়েছিলেন। ললিত বাবুর মেয়ে ছায়া দেবী ও নাতনি কৃষ্ণা বসুর পরিবারের সঙ্গে ফণীভূষণ যোগাযোগ রাখতেন। কলকাতার শিক্ষাবিদ ও সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর স্মৃতিচারণে সে-কথা বলেছেন। ফণীভূষণ চক্রবর্তী ‘মর্নিং ব্লসমস’ নামে একটি বইও লিখেছিলেন।
কলকাতায় শিক্ষকতা ও আইনপেশায় কিংবদন্তীতুল্য হয়ে ওঠেছিলেন তিনি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। বিশেষ করে, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর অনুগামী হিসেবে কাজ করতেন। এর একটি কারণও ছিলো অবশ্য। নেতাজির আত্মীয় ও রাজনৈতিক সহকর্মী ছিলেন সাটিরপাড়ার জমিদার ললিতমোহন রায় বিএবিএল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত স্কুলে পড়াশোনার সময় ফণীভূষণের মেধায় মুগ্ধ ছিলেন তিনি। আশীর্বাদ করেছিলেন, দেশ-দশের জন্যে তিনি ভবিষ্যতে বড়ো কিছু করতে পারবেন। তাঁর সেই আশীর্বাদ ফলেছিলো ফণীভূষণের জীবনে। তাই কলকাতা জীবনে ললিতমোহনের মেয়ে ছায়া দেবী, মেয়ের জামাই চারু চন্দ্র চৌধুরী (নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর ভাই) ও তাঁদের মেয়ে কৃষ্ণা বসুর খুব কাছের মানুষ হয়ে ওঠেছিলেন ফণীভূষণ চক্রবর্তী। অকৃতদার ছিলেন বলে তাঁদেরকেই পরিবারের সদস্য মনে করতেন তিনি। কৃষ্ণা বসুর লেখা ‘হারানো ঠিকানা’ গ্রন্থ থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। স্মৃতিচারণামূলক এই বইয়ে তিনি ফণীভূষণ চক্রবর্তী সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য সংযোজন করেছেন। তিনি সময় পেলেই তাঁর শ্বশুর শরৎ চন্দ্র বসু ও নেতাজির সঙ্গ নিতে আসতেন। কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করা যায়, সেই বিষয়ে গোপনে আলাপ করতেন। বিচারপতি হওয়ার আগে তিনি ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে কাজ শুরু করেন। আইনজীবী হিসেবে তিনি ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলায় রাণীর পক্ষে লড়েছিলেন। এই মামলার ভূত-ভবিষ্যত নিয়ে বসু পরিবারের সঙ্গে তাঁর অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলাপ-আলোচনা হয়েছিলো। তখন বাঙালি পরিবারগুলোর কেউ কেউ ভাওয়াল সন্ন্যাসীর পক্ষ আবার কেউ কেউ রাণীর পক্ষ নিয়ে তর্কে জড়িয়ে পড়তেন।

ফণীভূষণ চক্রবর্তীর একটি ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়, ব্রিটিশরা ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো মূলত নেতাজি ও তাঁর সহকর্মীদের সশস্ত্র বিপ্লবের ভয়ে। সশস্ত্র পন্থা না আসলে তারা মহাত্মা গান্ধীর অহিংসার সঙ্গে লড়াই করে আরো অনেকদিন ভারতবর্ষ শাসন করতেন। ফণীভূষণ যখন ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের অস্থায়ী রাজ্যপাল, তখন ক্লিমেন্ট এটলি ভারত সফরে এসে কলকাতা রাজভবনে দু’দিন ছিলেন। সেখানে এটলির সঙ্গে ফণীভূষণের দীর্ঘ আলোচনা হয়। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী এটলিকে প্রশ্ন করেছিলেন, “গান্ধীর ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন ১৯৪৭ সালের অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিলো। তাহলে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এমন কী ঘটেছিলো, যাতে ব্রিটিশদের ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিলো?” ক্লিমেন্ট এটলি জবাব দিয়েছিলেন, “সুভাষ চন্দ্র বসু এর প্রধান কারণ। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আজাদ হিন্দ বাহিনীর মরণপণ লড়াইয়ের পর ভারতের সেনাবাহিনীর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি আনুকূল্য শিথিল হয়ে গেছে। এই সেনাবাহিনীর উপর ভর করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দুর্গ রক্ষা করা সম্ভব ছিলো না।” এরপর ফণীভূষণ চক্রবর্তী এটলিকে আরেকটি প্রশ্ন করেছিলেন, “ইংরেজদের ভারত ছাড়ার পিছনে গান্ধীর ভূমিকা কতোটা?” ক্লিমেন্ট এটলি তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে একটাই শব্দ বলেছিলেন, “মিনিমেল।” অর্থাৎ সর্বনিম্ন। ফণীভূষণের এই বিবরণ প্রকাশ পেলে রীতিমতো হৈ চৈ পড়ে যায়।
আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

