‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকার শতবর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’র আলোচনাসভা

আজ ১৫ মে ২০২৬ (শুক্রবার) ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’ ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকা প্রকাশের শতবর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আলোচনাসভা আয়োজন করে। ‘সবুজ পল্লী’ প্রকাশিত হওয়াতে সমাজ-রাষ্ট্র-মানুষের কী লাভ হলো? না হলে কী ক্ষতি হতো?— এই বিষয়কে সামনে রেখে আলোচনাসভা শুরু হয়। নরসিংদী সার্কিট হাউজ সংলগ্ন পিনাকল চার্টার্ড স্কুল এন্ড কলেজ মিলনায়তনে সভাটি বিকেল সাড়ে তিনটা থেকে শুরু হয়। নরসিংদীর বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষক-লেখক-কবি-সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মীরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। সঞ্চালনা ও সভাপতিত্ব করেন ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, কেন্দ্রীয় কমিটি’র সাংগঠনিক সম্পাদক ও ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’র সভাপতি নাজমুল আলম সোহাগ। মিডিয়া পার্টনার হিসেবে ছিলো নরসিংদী জেলার কাগজ গঙ্গাঋদ্ধি এবং সাপ্তাহিক মাটির পুতুল।

শুরুতেই ১৯২৬ সালে প্রকাশিত ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকার প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয় পাঠ করে শোনান ‘বাঙলাদেশ লেখক শিবির, নরসিংদী’র সদস্য রফিকুল ইসলাম রফিক। তারপর শুরু হয় মূল আলোচনা অনুষ্ঠান। দর্শক-শ্রোতারা আগ্রহভরে আলোচকদের বক্তব্য শোনেন। আলোচনায় ‘সবুজ পল্লী’ পত্রিকা প্রকাশের ইতিহাসসহ তৎসময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থাও তুলে ধরা হয়।

আমজাদ হোসেন
নরসিংদী প্রতিনিধি, দৈনিক যায়যায়দিন ও সম্পাদক, সাপ্তাহিক মাটির পুতুল
তিনি মনে করেন, “এই সবুজ পল্লী পত্রিকার সাথে যারা যুক্ত ছিলো, তারা সাহসী মানুষ। আর পৃথিবী সাহসী মানুষের। তারা অন্যায়, অত্যাচার, ধর্মের নামে অধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তারাই এই পৃথিবীর স্বপ্নদ্রষ্টা।”

কিবিরিয়া লিপন
সম্পাদক, পইঠা
কিবিরিয়া রিপন বাংলা সাহিত্যের আদি পত্রিকার ইতিহাস তুলে ধরেন— সবুজপত্র থেকে শিখা পর্যন্ত। সবুজ পল্লী পুনরায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হওয়ায় ধন্যবাদ দেন সম্পাদককে। তিনি বেদে, মুচি, তাঁতী ইত্যাদি সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থার কথা সবুজ পল্লীতে তুলে ধরার আহ্বান জানান। তিনি আরো মনে করেন, “সবুজ পল্লীতে নরসিংদীর প্রান্তিক গ্রাম বাংলার কথা তুলে ধরার কাজটি অতীতে হয়েছে। এই ধরনের কাজ যদি ওখানে প্রকাশ না হতো, তাহলে ইতিহাস ওই সময়ের অভিজ্ঞতা হারাতো “

দয়াল ফারুক
সম্পাদক, সবুজ পল্লী
দয়াল ফারুক প্রথমে বাঙলাদেশ লেখক শিবিরকে ধন্যবাদ জানান এই আয়োজনের জন্য। তিনি ধারাবাহিকভাবে এই পত্রিকার এবং সংশ্লিষ্ট পূর্বপুরুষদের প্রাসঙ্গিক ইতিহাস তুলে ধরেন। ২০২২ সালে মুহাম্মদ হাবিবুল্লা পাঠানের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে পুনরায় চালু করার বৃত্তান্ত তুলে ধরেন। সম্পাদক সবুজ পল্লীকে নিয়মিত করার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেন। এই পত্রিকা প্রকাশিত হওয়াতে লাভ বা ক্ষতির দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পাদক একে দেখতে চান না। সামাজিক আন্দোলন বিষয়ে তিনি লেখা আহ্বান করেও জোরালো তেমন কোনো লেখা না পাওয়ার আক্ষেপ করেন তিনি। তিনি বলেন, “প্রচুর লেখা পাচ্ছি, কিন্তু নরসিংদী কেন্দ্রিক লেখা পাচ্ছি না। নরসিংদীর অনেক কিছু হারিয়ে যাচ্ছে, এবং তা ধারণ করতে পারছি না আমরা।” কী লাভ হলো বা কী ক্ষতি হলো, তা পাঠকের উপর ছেড়ে দেন তিনি এবং সেই সাথে সবার পরামর্শও চান তিনি।

মইনুল ইসলাম মিরু
সভাপতি, নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলন
এই অঞ্চলের এমন একটি প্রাচীন পত্রিকার নাম আমরা কেন জানলাম না, এই প্রশ্ন করেন তিনি। তিনি বলেন, “এখানকার পল্লীর ইতিহাস তুলে ধরেছে এই পত্রিকা। অতীতে আর্থিক অবস্থার কারণে থেমে গিয়েছিলো, যা ভবিষ্যতে যেন না হয়, তাই আরো প্রচারের বিষয়ে সবার উদ্যোগ কামনা করি।”

সুমন ইউসুফ
সম্পাদক, গঙ্গাঋদ্ধি
তিনি শুরুতেই ‘পল্লীগঠন সমিতি’র ইতিহাস তুলে ধরেন। সেই সমিতির মুখপত্র হিসেবে জাফর আলী ও মোহাম্মদ হানীফ পাঠান সাহিত্য পত্রিকা বের করার সিদ্ধান্ত নেন। তখনকার কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্যের বলয় থেকে বের হয়ে তারা ‘সবুজ পল্লী’ প্রকাশ করেন। তারা এতো সীমাবদ্ধতার মাঝেও কীভাবে এই পত্রিকা বের করেন, তা স্মরণ করেন। তুলে ধরেন কল্লোলসহ এই অঞ্চলের আদি সাহিত্য পত্রিকার ইতিহাস। তিনি বলেন, “সবুজ পল্লী পত্রিকার মান এতো উঁচুতে ছিলো বলেই আবুল ফজল, আবদুল কাদির, জসীম উদ্দীনের মতো সাহিত্যিকরা এখানে লিখেছেন। পত্রিকা সংশ্লিষ্টরা তখন স্থানীয় সমাজের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন এর মাধ্যমে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, দুই বছর চলার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।” বর্তমানে এই পত্রিকার লেখার মান অতীতের তুলনায় ম্লান হয়ে গিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। একই সাথে বর্তমানে ‘সবুজ পল্লী’ নামে পুনরায় এটিকে প্রকাশ করা উচিত হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

খলিলুল্লাহ পাঠান
মোহাম্মদ হানীফ পাঠানের ছেলে
তিনি এই পত্রিকার ইতিহাস তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা কীভাবে সামাজিক প্রতিকূলতার বিপক্ষে, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন, তার উল্লেখ করেন। এটি মেয়েদের শিক্ষা, জমিদারদের অত্যাচারসহ অনেক সামাজিক ইস্যুতে কীভাবে লড়াই চালিয়ে টিকেছিলো, সেই কথা বলেন। তিনি আরো বলেন, “এই পত্রিকাটি প্রগতিশীলতার পক্ষে কথা বলার কারণে অনেক কীর্তিমান লেখক-কবি এখানে লিখতে আগ্রহী হন। এই পত্রিকার লেখা তরুণদের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিলো। এই পত্রিকার সাথে সংশ্লিষ্টরা পরিণাম না ভেবেই কাজ করেছেন নিজেদের দায়বদ্ধতা থেকে।”

জহির মৃধা
সভাপতি, মুক্তধারা নাট্য সম্প্রদায়
তিনি বলেন, “সৃজনশীল কাজ ধারণ করার জন্য এই ধরনের পত্রিকা দরকার। এই পত্রিকা যদি দীর্ঘদিন মানসম্পন্ন প্রকাশনা চালিয়ে যেতে পারে, তবেই তা কালোত্তীর্ণ হবে। এই ধরনের পত্রিকা প্রকাশ না হলে এই অঞ্চলের লেখা-চিন্তা হারিয়ে যাবে এবং এটি একটি দলিল, যা এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি প্রকাশ করে।”

গোলাম মোস্তাফা মিয়া
সাবেক অধ্যক্ষ, নরসিংদী সরকারি কলেজ
তিনি মনে করেন, “সবুজ পল্লী প্রকাশ হওয়ায় লাভ হয়েছে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসের, তা না হলে বাংলা সাহিত্যের ক্ষতি হতো। ভবিষ্যতে সমৃদ্ধ হতে হলে আমাদের অতীতের দিকে যেতে হবে। বর্তমান সমাজ নানাভাবে পশ্চাদপদ। বর্তমানে সৃজনশীল পাঠকের খুব অভাব।” তাছাড়া ভবিষ্যত প্রজন্মের সৃজনশীলতা নিয়ে আশঙ্কা তুলে ধরেন তিনি। তিনি আরো বলেন, “এটি বাংলা সাহিত্যের অংশ, যা বের হতো নরসিংদীর পল্লী অঞ্চল থেকে। বাংলা সাহিত্যের অন্যান্য বিষয় না জানলে আমরা সবুজ পল্লী পত্রিকার সাথে সংযোগ স্থাপন করতে পারবো না। এই পত্রিকা অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা তুলে ধরেছিলো। তাছাড়া এই পত্রিকার বৈচিত্র‌্যও ছিলো উল্লেখযোগ্য। বর্তমান সবুজ পল্লী যদি তার মান ধরে রাখতে না পারে, তাহলে তা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।”

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ