স্যার কে জি গুপ্ত : পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএস অফিসার

মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে তিনি ঢাকা-ভৈরব রেলপথ ভাটপাড়া থেকে সরিয়ে ঘোড়াশাল-জিনারদীতে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে টঙ্গী থেকে ভৈরব পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সময় স্যার কে জি গুপ্ত’র অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ব্রিটিশ সরকার রেলপথটি ভাটপাড়া থেকে আধা কিলোমিটার উত্তর দিকে সরিয়ে নিয়েছিলো।

মহেশ্বরদী পরগণা তথা আজকের নরসিংদী জেলার প্রতিভা খুঁজতে গেলে সর্বাগ্রে স্যার কে জি গুপ্ত’র (১৮৫১-১৯২৬) নাম করতে হয়। বাঙালির সাফল্যগাঁথার নিশান তিনি ভারতবর্ষ পেরিয়ে কালাপানি ভেঙে সুদূর বিলাত পর্যন্ত উড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে আইসিএস (ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেশসেবায় নিয়োজিত হন। তাঁর আগে আর পূর্ববঙ্গের কেউ এই ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি, যে-কারণে তিনি পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএস অফিসারের মর্যাদাপ্রাপ্ত হন।

তিনি শুধু পূর্ববঙ্গের প্রথম আইসিএসই হননি, সর্বভারতীয়দের মধ্যে সর্বপ্রথম কেসিএসআই (নাইট কমান্ডার অব দ্য স্টার ইন্ডিয়া) উপাধি লাভ করেন। এটি ছিলো একটি বিরল ঘটনা। ভারতবর্ষের বাঘা বাঘা ব্যক্তিত্বদের পেছনে ফেলে দিয়ে তিনি এই সম্মান অর্জন করেছিলেন। সে-সময় পূর্ববঙ্গের মানুষদের ‘বাঙাল’ হিসেবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হতো। স্যার কে জি গুপ্ত কেসিএসআই অর্জন করে তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাঙালরাও মেধাবী এবং বিশ্ব জয় করতে পারে, সেটা চোখে আঙুল দিয়ে নিন্দুকদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ‘স্যার’ উপাধি অর্জন করেন।

স্যার কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত

বিশ্বের বুকে বাঙালের আসন সর্বোচ্চ মর্যাদায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। একই সঙ্গে বিলাতের লিংকস ইন থেকে বার-এট-ল সম্পন্ন করেন। তাছাড়া তিনি একমাত্র ভারতীয় হিসেবে হাউজ অব কমন্সের দায়িত্ব পালন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ব্রিটিশ ভারতে ভাইসরয়ের ইন্ডিয়ান কাউন্সিলের সম্মানিত সদস্য মনোনীত করেছিলেন। তিনি দীর্ঘ কর্মজীবনে মহকুমা প্রশাসক, জেলা প্রশাসক, আবগারী কমিশনার, বিভাগীয় কমিশনার, বোর্ড অব রেভিনিউয়ের সদস্যসহ সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ে চাকরি করে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি ধর্ম সংস্কারক হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এমন বহুমুখী প্রতিভাবান এই মানুষটিকে নিয়ে সমাজে অনেক মিথ বা কিংবদন্তী ছড়িয়ে পড়েছিলো।

একটি কিংবদন্তী এখনো স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। সেটা হলো তাঁর মা ভক্তি। মায়ের ঘুমের ব্যাঘাত হবে বলে তিনি ঢাকা-ভৈরব রেলপথ ভাটপাড়া থেকে সরিয়ে ঘোড়াশাল-জিনারদীতে সরিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে টঙ্গী থেকে ভৈরব পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সময় স্যার কে জি গুপ্ত’র অনুরোধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ব্রিটিশ সরকার রেলপথটি ভাটপাড়া থেকে আধা কিলোমিটার উত্তর দিকে সরিয়ে নিয়েছিলো। গাজীপুর ও নরসিংদী এলাকায় কে জি গুপ্ত’র মেধার বিষয়ে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে। সেসব এলাকায় কেউ পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করলে তাকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, সে কে জি গুপ্ত’র মাথা পেয়েছে।

ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে স্যার কে জি গুপ্ত’র বাবা কালী নারায়ণ গুপ্ত বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ও কে জি গুপ্ত’র ভাগ্নে ব্যারিস্টার অতুলপ্রসাদ সেন ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা সেই বাড়ির লেনটিকে ‘স্যার কে জি গুপ্ত লেন’ নামে নামকরণ করেন। একই সঙ্গে তাঁর জন্মস্থান ভাটপাড়ার খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ নগেশচন্দ্র গুপ্ত’র প্রচেষ্টায় পাঁচদোনায় ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে স্যার কে জি গুপ্ত হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। পাঁচদোনার উক্ত স্কুল সংলগ্ন স্থানে কে জি গুপ্ত’র দাদার বাড়ি। কোরান শরীফের প্রথম বঙ্গানুবাদকারী গিরিশচন্দ্র সেন তাঁর মামা।

ঢাকার নিকটে নরসিংদী জেলার সদর থানার ভাটপাড়ায় বৈদ্য-ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত ভাটপাড়ার জমিদার এবং স্থানীয় ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর মা অন্নদাসুন্দরী গুপ্তা ছিলেন মাধবচন্দ্র সেনের কন্যা। প্রাথমিক জীবনে তিনি ঢাকার পোগোজ স্কুল, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল ও ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে যোগ দেন। সেখানে তিনি ফাইনাল পরীক্ষার ওপেন কম্পিটেটিভ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের ষষ্ঠ ভারতীয় সদস্য হয়ে শিক্ষানবিশ হিসেবে যোগ দেন এবং ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতে ফিরে আসেন। তাঁকে মিডল টেম্পলের সম্মানিত সমাজ কর্তৃক বারে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তাঁর ভাইদের নাম প্যারীমোহন গুপ্ত, গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত এবং বিনয় চন্দ্র গুপ্ত। তাঁর বোনদের নাম সুবলা গুপ্তা, বিমলা গুপ্তা, হেমন্তশশী সেন, সৌদামিনী দাস, চপলা দত্ত এবং সরলা দাস। প্যারীমোহন গুপ্ত তৎকালীন ভারতের বিখ্যাত সিভিল হয়েছিলেন। ভাই গঙ্গাগোবিন্দ গুপ্ত ছিলেন বিখ্যাত চিত্রকর এবং ঢাকায় হোলিখেলা উৎসবের অন্যতম উদ্যোক্তা। বোন হেমন্তশশী গুপ্তা ছিলেন কবি অতুলপ্রসাদ সেনের মা এবং চপলা গুপ্তা ছিলেন শশীভূষণ গুপ্ত’র সহধর্মিণী। অন্য বোন সৌদামিনী গুপ্তার নাতনি বিজয়া রায় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী।

কে জি গুপ্ত’র চতুর্থ বোন সরলা গুপ্তার মেয়ে সুপ্রভা রায় ছিলেন সুকুমার রায়ের স্ত্রী এবং সত্যজিৎ রায়ের মা। প্রখ্যাত লেখক সুকুমার রায় ও চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় স্যার কে জি গুপ্ত’র ঘনিষ্টজন। কে জি গুপ্ত আড়াইহাজারের দুপ্তারার দাসের কন্যা প্রসন্নতারা গুপ্তার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সন্তানরা হলেন— যতীন্দ্র চন্দ্র গুপ্ত, হেমকুসুম সেন (অতুলপ্রসাদ সেনের সহধর্মিণী), সরযুবালা সেন, ইলা গুপ্ত এবং নলিনী গুপ্ত (অ্যালবিয়ান রাজকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, আইএসসি-র সহধর্মিণী)। প্রসন্নতারা গুপ্তা ‘সখী সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ‘তুফানী গুপ্তা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। স্ত্রী শিক্ষা, বিধবা বিবাহের প্রচলন, সহমরণ প্রথা রোধসহ বিভিন্ন সামাজিক সংস্কারে ভূমিকা রাখা সখী সমিতির অন্যতম সদস্য ছিলেন লাকসামের জমিদার নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী।

ব্রিটিশ অধিকৃত ভারতের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ পদ শুধুমাত্র ব্রিটিশদের জন্যে সংরক্ষিত ছিলো। ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে শুধুমাত্র ভারতীয়দের জন্যে ‘মুন্সেফ’ ও ‘সর্দার আমিন’ পদ সৃষ্টি করা হয়। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর পদ সৃষ্টি করে ভারতীয়দের জন্যে উন্মুক্ত করা হয়। ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে আইএসসি আইন ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দের একটি আইনের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে সাধারণ নাগরিকদের প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনে ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং শিক্ষানবিশি লাভ করেন। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর সহকারী ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে এবং ষষ্ঠ ভারতীয় হিসেবে আইসিএসে যোগ দেন। কে জি গুপ্ত ১৮৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলা ও বিহারের দুর্ভিক্ষ দমনের দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে যুগ্ম ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন এবং ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ম্যাজিস্ট্রেট ও কালেক্টর হন। ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে তাঁকে বোর্ড অব রেভিনিউয়ে জুনিয়র সেক্রেটারি নিযুক্ত করা হয়। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে আবগারি কমিশনার নিযুক্ত হন এবং ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে বর্ধমানের বিভাগীয় কমিশনারের দায়িত্ব পান। এরপর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ভারতীয় হিসেবে বোর্ড অব রেভিনিউয়ের সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় আবগারি শুল্ক কমিটির সদস্য নিযুক্ত হন এবং ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মৎস্য খাতের বিশেষ দায়িত্ব লাভ করেন।

আবগারি শুল্ক কমিটির সদস্য থাকাকালীন ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলার মৎস্য খাতের ওপর কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত’র দাখিলকৃত একটি প্রতিবেদন থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় মৎস্য অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা পায়। অভ্যন্তরীণ মৎস্য খাত, মাছ, চিংড়ি ও অন্যান্য পানিভিত্তিক চাষাবাদ তখন থেকে ব্রিটিশ সরকারের অন্যতম প্রধান খাতে পরিণত হয়। ব্রিটিশ বাংলার উত্তরাধিকার হিসেবে অদ্যাবধি ভারত ও বাংলাদেশে মৎস্য খাতে প্রাধান্য দেয়া হয়। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জুলাই ড. সৈয়দ হুসেন বিলগ্রামির সাথে যৌথভাবে কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত প্রথম ভারতীয় হিসেবে ভারতের স্টেট কাউন্সিলের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এছাড়া তিনি হাউজ অব কমন্সের একমাত্র ভারতীয় সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তিনি লর্ড এশারের সেনাবাহিনীর ভারতীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

ভারতীয় আইসিএস কর্মকর্তাদের তালিকা (১৮৬১-৯৯)

ক্রমিক নং নাম পরীক্ষার বছর নিযুক্ত হবার বছর
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৩ ১৮৬৪
রমেশ দত্ত ১৮৬৯ ১৮৭১
বিহারীলাল গুপ্ত ১৮৬৯ ১৮৭১
সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৬৯ ১৮৭১
আনন্দ রাম বড়ুয়া ১৮৭০ ১৮৭২
কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত ১৮৭১ ১৮৭৩
ব্রজেন্দ্রনাথ দে ১৮৭৩ ১৮৭৫
কুরসেতজি রুস্তমজি ১৮৭৪ ১৮৭৬
পেরুঙ্গাভুর রাজাগোপালচারী ১৮৮৬ ১৮৮৮
১০ বসন্তকুমার মল্লিক ১৮৮৭ ১৮৮৯
১১ অ্যালবিয়ন রাজকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৯৪ ১৮৯৫
১২ অতুলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৯৬ ১৮৯৭

আইসিএস কর্মকর্তা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪২-১৯২৩) কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্ত’র সামাজিক-সাহিত্যিক কর্মকাণ্ডের ঘনিষ্ঠ সহকারী ছিলেন। সত্যেন্দ্রনাথের পার্ক স্ট্রিট ও বালিগঞ্জের বাড়ির নিয়মিত সাহিত্য সভায় (মজলিশ) আগত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন তারকনাথ পালিত, মনমোহন ঘোষ, সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহ, বিহারী লাল গুপ্ত এবং কৃষ্ণ গোবিন্দ গুপ্ত। কে জি গুপ্ত ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় ‘রামমোহন রায় গ্রন্থাগার’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কে জি গুপ্ত ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। তিনি ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে (১৩০০ বঙ্গাব্দ) নিজ জমিদারি কাওরাইদে একটি ব্রাহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এবং তাঁর পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত ঢাকা ও ময়মনসিংহে ব্রাহ্মসমাজের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তাঁর বিলেত যাত্রা উপলক্ষে ঢাকা প্রকাশ পত্রিকায় ৩ অক্টোবর ১৮৬৯ সালে একটি চিঠি ছাপানো হয়। চিঠিতে তৎকালে ইংরেজ প্রশাসনে চাকরি বিষয়ে দেশীয়দের মনোভাবের একটি বিশেষ দিক ধরা পড়ে। চিঠির একটি অংশে বলা হয় : “আর দুর্বৃত্ত শ্বেতাঙ্গদের কষাঘাত সহ্য হয় না। অবিচার, অবমাননা দেখিতে দেখিতে হৃদয় বিদীর্ণ হয়! বঙ্গ দেশীয়দিগের এইরূপ শোচনীয় অবস্থার সময় কোন ভ্রাতা ইংলন্ডে চলিলেন, এটা কি সামান্য সুখকর বিষয়? বিশেষত: তিনি নাকি সিবিলিয়ান হইবেন। এ কথা শুনে কার না মনে হয় যে এ দুর্ভাগ্য দেশের দুঃখ রজনী আসন্ন প্রায়? দেশীয়েরা এখন বিচারক হইবেন। অবিচার দূরে পলায়ন করিবে। বাঙ্গালীদিগের মান বাড়িবে। আপনি বোধহয় বেশ বুঝিতে পারিয়াছেন যে শ্রীযুক্ত কৃষ্ণগোবিন্দ গুপ্তের ইংলন্ড যাত্রা লক্ষ্য করিয়াই আমরা এই কয়েকটি কথা বলিলাম। প্রকৃত দেশ হিতৈষী মহাশয় ব্যক্তির স্বদেশ হিতৈষিতার এই একটী প্রধানতম ক্ষেত্র।”

জগদ্বিখ্যাত বাঙালি এবং নরসিংদীর গর্ব স্যার কে জি গুপ্ত সম্পর্কে ইতোপূর্বে অনেক আলোচনা করা হয়েছে। এবার তাঁর জীবিত উত্তরপুরুষদের সম্পর্কে কিছু বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হলো। উক্ত বংশের শাখা-প্রশাখা এতোই বেশি যে, সারা উপমহাদেশ জুড়ে তাঁদের অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবস্থান অতি উঁচুতে। বাংলার সাধুপুরুষ, প্রভাবশালী জমিদার, গীতিকার, গায়ক, সমাজ সংস্কারক কালী নারায়ণ গুপ্ত’র বংশধর হিসেবে তাঁদের গর্বের কোনো সীমা নেই। অস্কার পুরস্কারপ্রাপ্ত ভারতবর্ষের একমাত্র চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় কালী নারায়ণ গুপ্ত’র বংশধর হিসেবে নিজেকে নিয়ে গর্ব করতেন। বর্তমানে সত্যজিৎ রায়ের একমাত্র সন্তান সন্দ্বীপ রায় পিতার পথ অনুসরণ করে বিখ্যাত হয়ে ওঠেছেন। তাঁর মা অর্থাৎ সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায়ও কালী নারায়ণ গুপ্তের বংশের। স্যার কে জি গুপ্ত’র বংশধর সুজিত গুপ্ত কর্মসূত্রে বাংলাদেশে এসে পৈতৃক স্মৃতির খোঁজ করেছেন। সুজিত গুপ্ত হলেন টাটা ইন্ডাস্ট্রিজের আবাসিক পরিচালক। তাঁর কর্মস্থল ও বাসস্থান নয়াদিল্লীতে। বৎসরে এক বা একাধিকবার টাটার প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশে এসে তিনি ছুটে যান গুপ্ত জমিদারদের কাওরাইদস্থ স্মৃতিফলক, বাসস্থান ও ব্রাহ্মসমাজ মন্দির পরিদর্শনে। গত ২৩ এপ্রিল ২০০২ তারিখে কাওরাইদ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, পুনরায় সপরিবারে এসে তিনি পূর্বপুরুষদের ভিটা ভাটপাড়ায় যাবেন। সেই সাথে বড়ো দাদা স্যার কে জি গুপ্ত’র নামে প্রতিষ্ঠিত পাঁচদোনাস্থ বিদ্যাপীঠটি পরিদর্শন করবেন। সুজিত গুপ্ত’র স্ত্রীর নাম শীলা গুপ্তা। তাঁর একমাত্র সন্তানের নাম সমীতা গুপ্তা। ডা. প্রজিত চক্রবর্ত্তীর সাথে বৈবাহিক কারণে গুপ্তা থেকে হয়েছেন চক্রবর্ত্তী। তাঁদের একমাত্র কন্যার নাম আশিকা চক্রবর্ত্তী। জানা যায়, সুুজিত গুপ্ত’র উদ্ভব হয়েছে স্যার কে জি গুপ্ত’র ছেলে বিচারপতি ফণীন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত ও হিরণবালা গুপ্তা থেকে। তাঁর দুই ছেলে মণীন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত (স্ত্রী চিত্রা গুপ্তা ও অরুণা গুপ্তা) এবং ইন্দ্রকুমার গুপ্ত (স্ত্রী সীমা গুপ্তা)। মণীন্দ্র গুপ্ত’র প্রথম স্ত্রী চিত্রা গুপ্তার মৃত্যুর পর অরুণা গুপ্তাকে বিয়ে করেছিলেন। এই মণীন্দ্রচন্দ্র গুপ্ত’র ছেলেই সুজিত গুপ্ত। সুজিত গুপ্ত’র আরেক ভাইয়ের নাম চিত্রজিৎ গুপ্ত (স্ত্রী অরুণিমা গুপ্তা)। তিনি সিএ হিসেবে বাহরাইনে কর্মরত ছিলেন। তাঁর ছেলে অভিজিৎ গুপ্ত (স্ত্রী তনুকা গুপ্তা)-ও সিএ হিসেবে বর্তমানে বাহরাইনে কর্মরত রয়েছেন। চিত্রজিৎ গুপ্ত কলকাতার অভিজাত এলাকা সল্টলেকে নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করছেন। অপরদিকে ইন্দ্রকুমার গুপ্ত (স্ত্রী সীমা গুপ্তা)-র এক ছেলে জয় গুপ্ত (স্ত্রী সাহানা গুপ্তা) বর্তমানে আমেরিকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। তাদের এক পুত্র জিসন্ত গুপ্ত ও এক মেয়ে ঈশান গুপ্তাও আমেরিকায় বসবাস করছেন। ইন্দ্রকুমার গুপ্ত’র অপর সন্তান দীপান্বিতা গুপ্তা বর্তমানে তাদের পূর্বপুরুষ স্যার কে জি গুপ্ত’র বালিগঞ্জের বাড়িতে বসবাস করছেন, যা বর্তমানে ২১২, হিন্দুস্থান রোড, কলকাতা ২৯ নামে পরিচিত। উক্ত বাড়ির লোকেশন হলো গড়িয়াহাট মোড়।

স্যার কে জি গুপ্ত’র পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত

স্যার কে জি গুপ্ত’র পিতা কালী নারায়ণ গুপ্ত কাওরাইদ কাচারি বাড়িটিকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। এই কারণে প্রাণের টানে তিনি প্রায়ই কাওরাইদ চলে আসতেন। তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিও তাঁর সাথে কাওরাইদ এসেছেন। পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রী তাঁর সাথে কাওরাইদে এসেছেন বলে কালী নারায়ণ গুপ্ত’র জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়। তিনি কাওরাইদকে এতোই ভালোবাসতেন যে, মৃত্যুর পর তাঁকে যেন কাওরাইদে সমাহিত করা হয়, সেটা জীবিত অবস্থায় বলে গেছেন। কাওরাইদ জমিদারির প্রজাদেরকে তিনি সন্তানতুল্য জ্ঞান করতেন। তাদের সুখ-দুঃখের সার্বক্ষণিক ভাগিদার ছিলেন তিনি। তিনি প্রায়ই প্রজাদের খাজনা মওফুফ করে দিতেন। শুধু খাজনা মওকুফই নয়, অনেক সময় প্রজাদের গুরুতর বিপদে নিজে সহায়তা করতেন।

কালী নারায়ণ গুপ্ত কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কাওরাইদ ব্রাহ্ম মন্দির

তাঁর জীবনীগ্রন্থ থেকে জানা যায়, কাওরাইদের গণেশচন্দ্র পাল ছিলেন জমিদার কালী নারায়ণ গুপ্ত’র অত্যন্ত অনুগত। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরের সেবায়েত হিসেবে গণেশ পাল দেখাশোনা করতেন। কালী নারায়ণ গুপ্ত অত্যন্ত শখ করে উক্ত গণেশ পালকে উড়িষ্যা গণেশ পলিকেশন্দর উত্তিষা ব্রাহ্মসমাজভুক্ত শর্মিলীনি পাল নামে এক যুবতীর সাথে বিয়ে দিয়েছিলেন। শর্মিলীনিকে তিনি নিজ কন্যার মতো স্নেহ করতেন। গণেশ পালের মৃত্যুর পর শর্মিলীনিই কাওরাইদ ব্রাহ্মসমাজ দেখাশোনা করতেন। এরপর তাদের ছেলে শশীভূষণ পাল ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব পান। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্রাহ্মসমাজের সেক্রেটারি হিসেবে তিনি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তার ছেলে সবুজকুমার পাল দীপক সেক্রেটারি হিসেবে সুষ্ঠুভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। বলা যায়, ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্রাহ্মসমাজকে উক্ত দীপকই পুনর্জীবন দান করেছেন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় কাওরাইদ ব্রাহ্মসমাজ উজ্জীবিত হয়ে ওঠেছে। এখানে উল্লেখ্য, শর্মিলীনি পালের সময় (১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের দিকে) কালী বিজয়কৃষ্ণ আচার্য্য ভারতীয় ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে নিযুক্ত ছিলেন। এখানে এসে তিনি শশীভূষণ পালকে একটি প্রশংসামূলক সার্টিফিকেট প্রদান করেছিলেন। শশীভূষণ পালের ছোটো ভাই পরেশচন্দ্র পালও কালী নারায়ণ গুপ্ত’র অত্যন্ত প্রিয়জন ছিলেন। ব্রাহ্মসমাজভুক্ত হিসেবে তিনি অনেক সমাজ সংস্কারমূলক কাজ করেছেন। তার ছেলে সচিন কুমার পাল ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। কালী নারায়ণ গুপ্ত’র সময় কাওরাইদ ব্রাহ্মসমাজের আচার্য্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন গফরগাঁও থানাধীন প্রসাদপুরের হৃদয় আচার্য্য। পরবর্তীতে তার ছেলে রমেশ আচার্য্য কিছুদিন মন্দিরে আচার্য্যের কাজ করেন। বর্তমানে কাওরাইদে শশীভূষণ পালের এক ছেলে এক মেয়ে, পরেশচন্দ্র পালের এক মেয়ে তিন ছেলে, প্রসাদপুরের রমেশ আচার্য্যের ছেলে সাধন আচার্য্য এবং তার চার মেয়ে তিন ছেলে স্থানীয়ভাবে ব্রাহ্মসমাজকে আকড়ে ধরে আছেন। গুপ্ত জমিদারদের স্মৃতিফলক, ব্রাহ্মসমাজ মন্দির, কাচারি বাড়ি এবং কালী নারায়ণ উচ্চ বিদ্যালয় ও শ্মশানঘাট— সবকিছু তারাই সংরক্ষণ করছেন। তাই তারাও ভবিষ্যতে এই মহৎ কাজের জন্যে ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবেন।


আপেল মাহমুদ
সাংবাদিক, গবেষক ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ সংগ্রাহক

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ