একজন কমরেড বাবর আলী মাস্টার

এতো ত্যাগ-তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে এই দেশ স্বাধীন হলেও কমরেড বাবর আলীদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। যে-দেশে মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে দালালের সংখ্যা বেশি, শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধার্মিকের চেয়ে ধর্মান্ধ বেশি, সেখানে বাবর আলীরা উপেক্ষিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক নয় কি? তিনি প্রায়ই রুদ্ধকণ্ঠে বলতেন, “অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে অর্জিত বাংলাদেশের সকল মানুষ তাঁর অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন অনেকটা স্বপ্নই রয়ে গেলো।”

তিনি স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন, “আগুনের উপর দিয়ে কেমন করে হেঁটে যায় আগুন/ আঁধারের জরায়ু ফেটে কেমন করে অঙ্কুরিত হয় স্বাধীনতার ভ্রুণ।” তিনি নিজেও বলতেন, “যারা লুকিয়ে যায় লুণ্ঠন ও লেহনের লিকপিক শব্দে, যারা ডুবে যায় ইতরের অদ্ভুত অবগাহনে, তারা ঘাতকের চেয়ে ভয়ঙ্কর।”

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কমরেড বাবর আলী মাস্টারের জন্ম ১৯৩৫ সালে, তৎকালীন রায়পুরা থানার (বর্তমান বেলাব উপজেলাধীন) লক্ষ্মীপুর গ্রামে। ছাত্রকাল থেকেই তিনি ছিলেন অসম্ভব সাহসী ও বাগ্মী। ছাত্রজীবন শেষ করে মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করলেও শরীরের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছিলো বাম রাজনীতির তপ্ত তরঙ্গ। বরেণ্য কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকারের সংস্পর্শে এসে তিনি জড়িয়ে পড়েন কৃষক আন্দোলনে। বিশেষ করে, হাট-বাজারের ইজারা বিরোধী আন্দোলন, কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফের আন্দোলন, সার ও কীটনাশকের দাম কমানোর আন্দোলন, পাটের দাম বাড়ানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন, জলমহাল ইজারা বিরোধী আন্দোলনসহ গরীব-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে তিনি ছিলেন সদা সোচ্চার।

বর্তমানে তাঁর বাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে হলেও ১৯৭১ সালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছিলো না। তখন তাঁর বাড়িটি ছিলো জঙ্গলাকীর্ণ, বেশ নিরিবিলি ও জনশূন্য। তাই বাম নেতাদের পরামর্শে ১৯৭১ সালে তাঁর বাড়িটিকে বানানো হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদ ক্যাম্প। সাহসী বাবর আলী মাস্টার ও তাঁর স্ত্রী যতো ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, প্রায় সবই দিয়েছেন আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সংগ্রহ, রান্না ও বিতরণ সবই করেছেন অতি আন্তরিকতার সাথে। রাজাকার ও শান্তিবাহিনীর দিক থেকে নানা হুমকি-ধমকি এলেও সেসবে কোনো কর্ণপাত করেননি বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড বাবর আলী। উপরন্তু, কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকারের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নানা স্থানে ছাত্র-যুবকদের জন্যে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করেছেন।

বীর মুক্তিযোদ্ধা অশীতিপর বৃদ্ধ বাবর আলী মাস্টার ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আমাকে বলেন, “বঙ্গবন্ধু যখন ৭ই মার্চের ঘোষণা দেন, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, মূলত তখন থেকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হতে থাকি। ২৫শে মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে আমরা এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এলাকার ছাত্র-যুবকদের গোপনে সমবেত করে প্রথমে পরামর্শ-সভা ও পরে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করি। ফজলুল হক খোন্দকার স্যারের সাথে পরামর্শ করে পিরিজকান্দির তালেব হোসেন, কাঙ্গালিয়ার হযরত আলী, জালালাবাদের সার্জেন্ট (অব.) আব্দুল কাদের প্রমুখদের দিয়ে চার-পাঁচ জায়গায় ছাত্র-যুবকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করি।”

শুধু তাই নয়, বিপ্লবী বাবর আলী মাস্টার একাত্তরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শীর্ষস্থানীয় বাম নেতাদের ভারতে পৌঁছে দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল একটি চিরকুটের মাধ্যমে খবর পান যে, কটিয়াদির দেবেন সাহার বাড়িতে আটক রয়েছেন বাম রাজনীতিবিদ বজলুর রহমান, মতিয়া চৌধুরী ও জিতেন ঘোষ। তিনি তখনই সাইকেল চালিয়ে রওনা দেন কটিয়াদি। সল্লাবাদের তাঁর এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে বাম নেতাদের অসীম সাহসিকতার সাথে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। নদীপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মিঠামইন, ইটনা, আজমিরিগঞ্জ হয়ে সুনামগঞ্জের বর্ডার দিয়ে এক রাত এক দিনের অক্লান্ত পরিশ্রমে, লগি-বৈঠার নৌকা বেয়ে, খেয়ে-না খেয়ে তাঁদের ভারতে পৌঁছে দেন।

স্বাধীন দেশেও কমরেড বাবর আলী নিরলস পরিশ্রম করেছেন গরীব-মেহনতি মানুষের ভাগ্য বদলের জন্যে। ১৯৭২ সালে বেলাব বাজারের অদূরে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নব্য স্বাধীন দেশে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন। বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির ইতিহাসে এমন জমজমাট সম্মেলন বোধ করি আর হয়নি। বিভিন্ন জায়গা থেকে কৃষক-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের শতাধিক মিছিল যোগ দেয় সেই কৃষক সম্মেলনে। পৃথিবীর ১৭ টি দেশ থেকে ডেলিগেট আসে সেখানে। কৃষকনেতা ফজলুল হক খোন্দকারের তত্ত্বাবধানে যুবক বাবর আলীও তখন অক্লান্ত পরিশ্রম করেন সম্মেলন সফল করার জন্যে। তাঁর দায়িত্ব ছিলো প্রচারের। সম্মেলনের একমাস আগে থেকেই গ্রামের রাস্তার মোড়ে মোড়ে হাট-বাজারে সম্মেলনের প্রচার চালিয়ে গণমানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন বাবর আলী স্যারসহ আরো কয়েকজন।

স্বাধীনতার পর বেলাব বাজারে, ডোমরাকান্দা বাজারে, হাতিরদিয়া বাজারে, ভৈরব ফেরিঘাটে ইজারা বিরোধী আন্দোলন হয়। বাবর আলী স্যার এসব আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন। ১৯৬৭ সালে রায়পুরা-বেলাব অঞ্চল থেকে দশ হাজার কৃষক নিয়ে ঢাকামুখী পদযাত্রার পেছনে বাবর আলী মাস্টারের ছিলো নির্ভেজাল ও অসীম শ্রম-ঘাম।

তিনি ছিলেন সুবক্তা, অভিনয়ও করতেন দারুণ। বিশেষ করে, কবি জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতায় দাদার অভিনয় করে বোদ্ধা মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন।

এতো ত্যাগ-তিতিক্ষার ভেতর দিয়ে এই দেশ স্বাধীন হলেও কমরেড বাবর আলীদের ভাগ্যের তেমন পরিবর্তন হয়নি। যে-দেশে মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে দালালের সংখ্যা বেশি, শস্যের চেয়ে আগাছা বেশি, ধার্মিকের চেয়ে ধর্মান্ধ বেশি, সেখানে বাবর আলীরা উপেক্ষিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক নয় কি? তিনি প্রায়ই রুদ্ধকণ্ঠে বলতেন, “অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে অর্জিত বাংলাদেশের সকল মানুষ তাঁর অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন অনেকটা স্বপ্নই রয়ে গেলো।”

বাম রাজনীতির এই পুরোধা পুরুষ, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম শীর্ষ সংগঠক কমরেড বাবর আলী মাস্টার ২০২২ সালের ২৮ জুন মৃত্যুবরণ করেছেন।


মহসিন খোন্দকার
সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘ, নরসিংদী

সম্পর্কিত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

সর্বশেষ