ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে মরজাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মরজাল বাজার নরসিংদীর অন্যতম বৃহৎ মৌসুমী ফলের বাজার। বর্তমানে মরজাল বাজার হয়ে উঠেছে লটকনের বিশাল পাইকারি বাজার। জুন থেকে আগস্ট মাসে এখানে প্রতিদিন ভোর থেকে বসে এই বাজার। মহাসড়ক ধরে দীর্ঘ সারিতে দেখা যায় কেবল সবুজ-সোনালি লটকন। শিবপুর, বেলাব, রায়পুরা উপজেলা থেকে চাষীরা গাছ থেকে লটকন সংগ্রহ করে বিক্রির জন্যে নিয়ে আসেন এই বাজারে। সারা দেশ থেকে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী এবং আড়তদাররা জড়ো হন এখানে। বাজার চলে রাত ১০ টা থেকে ১১ টা পর্যন্ত। স্থানীয় লটকন চাষী, পাইকারি ক্রেতা ও সংশ্লিষ্টজনের কাছ থেকে জানা যায়, এই হাটে প্রতিদিন ১২০ থেকে ২০০ মেট্রিক টন লটকন বিক্রি হয়, যার বাজার মূল্য কোটি টাকার উপরে। আকারভেদে লটকন কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ২০০ টাকা এবং মণপ্রতি ২ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এখানকার লটকন সুস্বাদু হওয়ায় দিন দিন এর চাহিদা বাড়ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্ববাজারে রপ্তানি হচ্ছে। কম খরচে অধিক লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকায় এলাকার চাষী ও বেকার যুবকেরা লটকন চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। নরসিংদী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নরসিংদীর রায়পুরা, শিবপুর ও বেলাব উপজেলায় এই বছর প্রায় ২,৮৫০ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে। প্রতিটি পূর্ণবয়স্ক গাছে প্রতি মৌসুমে ৩ থেকে ১২ মণ লটকন ধরে। বর্ষার শুরুতে ভারি বর্ষণে কিছু পরিমাণ লটকনের ক্ষতি হলেও ধারণা করা হচ্ছে, এ-বছরে প্রায় ৩০ হাজার মেট্রিক টন লটকনের উৎপাদন হবে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।

শিবপুর, বেলাব, রায়পুরা উপজেলার লালমাটির এলাকা, পাহাড়ি টিলা এলাকায় গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ে সারি সারি লটকন বাগান। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হচ্ছে লটকন। রাস্তার দুই পাশে থাকা অসংখ্য লটকনের বাগান যে-কারো চোখ জুড়াবে। শত বছর আগে লালমাটির এসব পাহাড়ি এলাকার বনে-জঙ্গলে লটকনগাছ দেখা যেতো। স্থানীয়ভাবে এর নাম বোগী বা গোডা। অনেকে ‘জংলি ফল’ হিসেবে চিনতো। সে-সময় স্থানীয়দের কাছে ফলটির কোনো অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিলো না। অযত্নে বেড়ে ওঠা লটকনগাছ একটি-দুটি করে শিবপুর উপজেলা ও পার্শ্ববর্তী বেলাব উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ে। বছর দশেক আগে থেকে সারা দেশে সুস্বাদু লটকনের সুনাম ছড়িয়ে পড়লে শত শত বাগানে বাণিজ্যিকভাবে চাষের প্রবণতা শুরু হয়। বর্তমানে পাইকাররা আগেই কৃষকের বাগান এক মৌসুমের জন্যে চুক্তিতে কিনে নেন। বর্তমানে শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলায় প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে লটকন।

বছরের বেশিরভাগ সময় এসব বাগানে মানুষের তেমন আনাগোনা থাকে না। কিন্তু ফল ধরার সময় ঘনিয়ে এলে প্রতিটি গাছ যেন কৃষকের কাছে হয়ে ওঠে একটি স্বপ্ন। চারা লাগানোর পর প্রথম কয়েক বছর তেমন আয় আসে না। একটি কলম করা চারা সাধারণত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ফল দিতে শুরু করলেও বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ফলন পেতে আরো সময় লাগে। বীজ থেকে জন্মানো গাছে অপেক্ষা আরো দীর্ঘ। বাগান তৈরি প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হয় দীর্ঘদিনের লটকন চাষী হাসান আলীর নিকট। তিনি বলেন, “বাগান তৈরির জন্য টিলা বা উঁচু জমি নির্বাচন করতে হয়। উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি, যেখানে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে না, সেখানে লটকন ভালো জন্মায়। নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে গর্ত করে চারা রোপণ করা হয়। প্রয়োজনমতো গোবর, জৈব সার এবং রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হয়। শুরুতে নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার, সেচ এবং গাছের পরিচর্যা করতে হয়।” আরেক অভিজ্ঞ চাষী কামাল বলেন, “লটকনের সবচেয়ে বড়ো শক্তি হলো, গাছ একবার পরিণত হলে বহু বছর ধরে ফলন দিয়ে যায়। তাই দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি লাভজনক ফলের বাগানে পরিণত হয়।”
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, লটকনের উন্নত ফলন পেতে বারি লটকন-১ বা বাউ লটকন-১ জাতের কলমের চারা লাগানো উত্তম। চারা রোপণের উপযুক্ত সময় বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ (এপ্রিল-মে) মাস। তবে শ্রাবণ থেকে আশ্বিন (জুলাই-সেপ্টেম্বর) মাসেও রোপণ করা যায়। লটকনের বংশবিস্তার দুইভাবে করা যায়Ñ বীজ ও অঙ্গজ (কলম) পদ্ধতিতে। লটকনের পুরুষ ও স্ত্রী গাছ আলাদা। বীজের চারা লাগালে পুরুষ গাছের সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ফল পেতে সাধারণত ৫ থেকে ৭ বছর সময় লাগে। অন্যদিকে, কলমের চারা মাতৃগাছের গুণাগুণ বজায় রাখে, গাছ তুলনামূলক খাটো হয় এবং সাধারণত ৩ থেকে ৪ বছরের মধ্যে ফল দিতে শুরু করে।
লটকন সুনিষ্কাশিত বেলে-দোআঁশ মাটিতে স্যাঁতসেঁতে ও আংশিক ছায়াযুক্ত পরিবেশে সবচেয়ে ভালো জন্মে। তবে খেয়াল রাখতে হয় গাছের গোড়ায় যেন পানি না জমে। চারা লাগানোর ১০-১৫ দিন আগে ১:১:১ মিটার আকারের গর্ত করে প্রতি গর্তে ১৫-২০ কেজি পচা গোবর, ৫০০ গ্রাম টিএসপি ও ২৫০ গ্রাম এমওপি (পটাশ) মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে হয়। এরপর গর্তের মাঝখানে চারা রোপণ করে সেচ দিতে হয়।
রোপণের পর প্রথম কয়েক বছর নিয়মিত সেচ, আগাছা পরিষ্কার, বছরে দুই দফা সুষম সার প্রয়োগ এবং শুকনো বা রোগাক্রান্ত ডাল ছাঁটাই করে নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। অতিরিক্ত চিকন ডাল (ওয়াটার সাকার) অপসারণ করলে ফলন বৃদ্ধি পায়। অনুকূল পরিবেশে লটকনের চারা বছরে গড়ে ৩০-৬০ সেন্টিমিটার (১-২ ফুট) পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে লটকন গাছে ফুল আসে। ফুল আসার পর ছোটো ছোটো ফলগুলো আস্তে আস্তে বড়ো হতে থাকে এবং পুরোপুরি পরিপক্ব হতে প্রায় ৪ থেকে ৫ মাস সময় নেয়। অবশেষে বর্ষাকালে, অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে ফলগুলো পাকে। পাকা লটকন দেখতে সোনালি-সবুজ রঙের হয়। ঠিকঠাক পরিচর্যা করলে ফলন ভালো হয়।
ফল ধরার সময় শুরু হয় আরেক দফা ব্যস্ততা। প্রতিটি থোকা যেন আলাদা যত্ন দাবি করে। ঝড়, অতিবৃষ্টি কিংবা দীর্ঘ খরায় ফল ঝরে পড়তে পারে। আবার রোগবালাই দেখা দিলে পুরো মৌসুমের লাভ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই চাষীরা প্রায় প্রতিদিন বাগান পরিদর্শন করেন।
লটকন সংগ্রহের কাজও দক্ষতার সাথে করতে হয়। ফল পুরোপুরি পাকলে বেশি নরম হওয়ার আগেই তা গাছ থেকে নামাতে হয়। শ্রমিকেরা বাঁশের মই ব্যবহার করে অথবা গাছে উঠে থোকাসহ ফল কেটে নামান। কারণ একটি ফল আলাদা করে ছিঁড়লে দ্রুত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এরপর শুরু হয় বাছাইয়ের কাজ।
সব লটকনের দাম এক নয়। আকার, রঙ, পরিপক্বতা অনুসারে এবং দাগমুক্ত ফল আলাদা করা হয়। বড়ো আকার ও ভালোমানের ফলের দাম বেশি পাওয়া যায়। ছোটো বা কম মানসম্মত ফল তুলনামূলক কম দামে বিক্রি হয়। বাজারে যাওয়ার আগেই এই শ্রেণিবিন্যাস কৃষকের সম্ভাব্য আয় অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়। এরপর ফল সাজানো হয় বাঁশের ঝুড়ি, প্লাস্টিকের ক্রেট কিংবা অন্যান্য পাত্রে।
ভোর হলেই শুরু হয় বাজারমুখী যাত্রা। কোনো বাগান থেকে ভ্যানে, কোনোটি থেকে অটোরিকশায়, আবার বড়ো বাগান থেকে পিকআপে করে ফল পৌঁছে যায় মরজাল বাজারে। অনেক কৃষক নিজেই বিক্রি করেন, আবার অনেকে বিক্রি করেন আড়তদারের মাধ্যমে। সারা দেশ থেকে পাইকারি ক্রেতারা মরজাল বাজারে আসেন। ভোর থেকেই শুরু হয় কেনাবেচা। তারপর খুব দ্রুতই সেগুলো পৌঁছে যায় দূর-দূরান্তে। সুনামগঞ্জের পাইকারি ক্রেতা সুমন মিয়ার সাথে চায়ের আলাপে জানা যায়, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে লটকন চাষ হলেও নরসিংদীর লটকন তুলনামূলক সুস্বাদু। আকারে যেমন বড়ো, তেমনি মিষ্টি-টক স্বাদ। আবার দেখতেও বেশ সুন্দর।
কলেজ পড়ুয়া স্থানীয় এক যুবক চাষী বলেন, “লালমাটির লটকন বেশ মিষ্টি। ভিটামিন বি-১, ভিটামিন বি-২, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, আয়রন, পটাশিয়াম, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং খাদ্যআঁশসহ অজস্র গুণে সমৃদ্ধ এই লটকন স্বাস্থ্যের জন্যেও ভীষণ উপকারি। বাছাই করা সুস্বাদু বড়ো লটকনগুলো সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি হচ্ছে।” লটকন কতোদিন পর্যন্ত ভালো থাকে জানতে চাইলে এক আড়তদার বলেন, “সাধারণত লটকন দু’-তিনদিন পর্যন্ত রাখা যায়। আর প্যাকেট করা লটকন সাত-আটদিন পর্যন্ত সংরক্ষণ সম্ভব।”
মরজাল বাজারে লটকনের পাশাপাশি সব ধরনের মৌসুমী ফল পাওয়া যায়। মরজালের আড়তগুলো মৌসুমে একেকটি ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাজার ঘিরে আরো একটি বড়ো অর্থনীতি তৈরি হয়েছে, যাকে বলা যায় ‘মৌসুমী শ্রমবাজার’। গাছ থেকে ফল নামানো, বাছাই, ওজন করা, ঝুড়ি বহন, ট্রাকে তোলা, গাড়ি খালাস— প্রতিটি কাজের জন্যে শত শত শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। মৌসুম এলেই আশপাশের গ্রামের অনেক মানুষ কয়েক সপ্তাহের জন্যে এই বাজারে কাজ পান। অনেক শিক্ষার্থী ছুটির সময়ে শ্রমিক হিসেবে কাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচের একটি অংশ জোগাড় করে। নারীরাও ফল বাছাই ও প্যাকেজিংয়ের কাজে অংশ নেন।
পরিবহন খাতও এই বাজারের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। ট্রাকচালক, পিকআপ মালিক, ভ্যানচালক, অটোরিকশাচালক— সবারই আয় বাড়ে। শুধু ফল বহন নয়, বাজারে আসা ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের যাতায়াতও স্থানীয় পরিবহন ব্যবস্থাকে কয়েক সপ্তাহের জন্যে ব্যস্ত করে তোলে।
এদিকে বাজারের আশপাশের ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোও এই মৌসুমের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। চায়ের দোকান, খাবারের হোটেল, বরফ বিক্রেতা, বাঁশের ঝুড়ি নির্মাতা, দড়ির দোকান, প্লাস্টিকের ক্রেট বিক্রেতা, এমনকি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের লেনদেনও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। একটি ফলকে ঘিরে কীভাবে বহুমাত্রিক গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে ওঠে— মরজাল বাজার তার বাস্তব উদাহরণ।
তবে এই বিপণন ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ফল সংরক্ষণের জন্যে এখনো আধুনিক কোল্ড চেইন বা শীতল সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে ব্যবসায়ীদের দ্রুত বিক্রি করতে হয়। কোনো কারণে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ হলে দাম কমে যায়, আর সেই ক্ষতির বড়ো অংশ বহন করেন কৃষকেরাই।
আরেকটি বড়ো সমস্যা হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অভাব। মৌসুমে বাজারে প্রচুর লটকনসহ বিভিন্ন ফল এলেও এর বড়ো অংশ বিক্রি হয় তাজা ফল হিসেবেই। জুস, জ্যাম, জেলি, ক্যান্ডি বা অন্যান্য প্রক্রিয়াজাতকৃত খাদ্য তৈরির শিল্প গড়ে না ওঠায় অতিরিক্ত উৎপাদনের পুরো সুবিধা কৃষকেরা পান না। অনেক সময় কম দামে ফল বিক্রি করা ছাড়া তাদের আর কোনো বিকল্প থাকে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি মরজালকে কেন্দ্র করে আধুনিক সংগ্রহকেন্দ্র, মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা যায়, তাহলে শুধু নরসিংদী নয়, দেশের সামগ্রিক ফল অর্থনীতিতে অন্য ফলের পাশাপাশি লটকন আরো গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিযোগ্য পণ্যে পরিণত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় যেমন বাড়বে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।
মরজালের লটকন বাজার তাই কেবল একটি মৌসুমী হাট নয়। এটি কৃষি, পরিবহন, শ্রম, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি চলমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কয়েক সপ্তাহের এই বাজারে প্রতিদিন যে-লেনদেন হয়, তার প্রভাব সারা বছর ধরে অনুভূত হয় অসংখ্য পরিবারের জীবনে।


এটা থেকে অনেক কিছু জানার পাশাপাশি শিখতে এবং বুঝতেও পারলাম 🌺
ভালো ছিলো 🔥